আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “ত্রিশঙ্কু অবস্থা”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: উভয় সংকট, অনিশ্চিত অবস্থা ইত্যাদি।
প্রবাদটির উৎপত্তির সময়কাল নির্ণয় করতে গেলে আমাদের রামায়ণের দিকে নজর দিতে হবে। রামায়ণ অনুসারে, ত্রিশঙ্কু ছিলেন অযোধ্যার সূর্যবংশীয় রাজা। এই ত্রিশঙ্কুর ছেলে হলেন দাতা হরিশচন্দ্র। বশিষ্ঠমুনি ছিলেন সেই সময় সূর্যবংশের কুলগুরু। সশরীরে স্বর্গ যাওয়ার জন্য রাজা ত্রিশঙ্কু কুলগুরু বশিষ্ঠকে যজ্ঞ করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু বশিষ্ঠ সেই যজ্ঞ করতে রাজি হননি। তখন ত্রিশঙ্কু বশিষ্ঠের তপস্যারত পুত্রদের কাছে গিয়ে সেই একই অনুরোধ করেন। তারাও বশিষ্ঠের মতই রাজাকে জানিয়ে দিলেন যে, এই যজ্ঞ করা তাদের পক্ষেও সম্ভব নয়। তখন রাজা ত্রিশঙ্কু বলেন যে, বশিষ্ঠ ও তার পুত্রদের অসম্মতির কারণে তিনি অন্যকোন ঋষিকে দিয়ে ঐ যজ্ঞ করাবেন। বশিষ্ঠের পুত্ররা এতে রেগে গিয়ে ত্রিশঙ্কুকে চণ্ডাল হবার অভিশাপ দেন।
রাজা ত্রিশঙ্কু অভিশাপের ফলে চণ্ডাল হয়ে এখানে সেখানে ঘুরতে থাকেন। সেই সময় একদিন বশিষ্ঠের প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বামিত্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয় ও তাঁর কাছে গিয়ে তিনি তাঁর প্রার্থনা জানান । ঋষি বিশ্বামিত্র তাঁকে আশ্বাস দিয়ে স্বয়ং পুরোহিত হয়ে যজ্ঞের আয়োজন করলেন। সেই যজ্ঞে বশিষ্ঠ, বশিষ্ঠের পুত্রগণ এবং মহোদয় নামে এক ঋষি ছাড়া অন্য ঋষিরা সবাই উপস্থিত হন।
অনেকদিন ধরে যজ্ঞ করার পরও যখন কোনও দেবতা যজ্ঞভাগ গ্রহণ করতে এলেন না তখন বিশ্বামিত্র রেগে গিয়ে ত্রিশঙ্কুকে নিজ তপস্যার বলে সশরীরে স্বর্গে পাঠাতে লাগলেন। দেবরাজ ইন্দ্রসহ দেবতারা ত্রিশঙ্কুকে স্বর্গে স্থান দিতে অসম্মত হন। যেহেতু ত্রিশঙ্কু গুরুর অভিশাপে শাপগ্রস্ত সেহেতু স্বর্গে তিনি বাস করতে পারেন না – এই যুক্তি দেখিয়ে ইন্দ্র স্বর্গগমনরত ত্রিশঙ্কুকে উল্টোমুখে অর্থাৎ মাটির দিকে মাথা দিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করতে বলেন। ত্রিশঙ্কু অধোমুখে মর্ত্যে অবতরণ করতে থাকেন। বিশ্বামিত্র তাঁর জেদ পূরণ হচ্ছে না দেখে পতনোন্মুখ রাজাকে “তিষ্ঠ, তিষ্ঠ” বলে ঊর্ধ্বাকাশে স্থান করে দেন। এই যে মধ্যাকাশে তিনি ঝুলে রইলেন এটাই ত্রিশঙ্কু অবস্থা বলে পরিচিত।
এই ঝুলে থাকা অবস্থায় বিশ্বামিত্র তপোবলে দক্ষিণ আকাশে অন্য এক সপ্তর্ষি মণ্ডল ও নক্ষত্রলোক সৃষ্টি করেন। বিশ্বামিত্র তাঁর তৈরি জগতে নতুন দেবতা ও নতুন ইন্দ্র তৈরি করতে উদ্যোগী হলেন। বিশ্বামিত্রের এই কাজে ভয় পেয়ে দেবতারা নতি স্বীকার করে মেনে নিলেন যে, তাঁর সৃষ্ট আকাশে নক্ষত্রমণ্ডল থাকবে এবং সেখানে ত্রিশঙ্কুও দেবতুল্য হয়ে অবস্থান করবেন।
মহাভারতের খিল বা পরিশিষ্ট বলে গণ্য হরিবংশ-গ্রন্থে ত্রিশঙ্কুর আসল নাম সত্যব্রত। অন্যের স্ত্রীকে হরণ করে পিতা এষ্যরুণের অসন্তোষভাজন হন তিনি। কুলগুরু বশিষ্ঠের কামধেনুকে হত্যা করে আহার করেছিলেন ত্রিশঙ্কু। কিছুটা ভাগ দিয়েছিলেন বিশ্বামিত্রের পুত্রদের। ক্রুদ্ধ বশিষ্ঠ এজন্য সত্যব্রতকে ত্রিশঙ্কু (ত্রি = তিন, শম্ভু = শলাকা শেল) নামে অভিহিত করেন। ত্রিশঙ্কুর তিন শেল বা পাপ হল — পরস্ত্রী অপহরণ করে পিতার অসন্তোষ উৎপাদন, গুরুর গাভী হত্যা এবং অন্যায়ভাবে গো-মাংস ভক্ষণ।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, সে যুগেই ঋষি-পণ্ডিতদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল; তাছাড়া কোন কোন মুনি ছিলেন দেবতাদের পছন্দের আবার কেউ কেউ ছিলেন অপছন্দের। জ্ঞানী মুনি, ঋষিদের ভয়ে দেবতারাও ভীত হয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। কোন কোন ঋষির ক্ষমতা দেবতার দেবতাদের চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম ছিল।
এরফলে ত্রিশঙ্কু স্বর্গে বা মর্ত্যে কোথাও অবস্থিত না হয়ে মাঝ আকাশে অবস্থিত হয়েছেন দেবতা এবং ঋষিদের দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে। আমাদের সমাজে উভয় সঙ্কটে পড়ে অনিশ্চিত অবস্থায় থাকার বিষয়টি এভাবেই ত্রিশঙ্কুর দশার সাথে তুলনীয় হয়ে প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
‘ত্রিশঙ্কু অবস্থা’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:
১। আমেরিকা ও রাশিয়া দুই প্রবল প্রতিপক্ষের মন রাখতে গিয়ে ভারতের ত্রিশঙ্কু অবস্থা হয়েছে।
২। নির্বাচনের ফলাফলে কোন দলই সংখ্যা গরিষ্ঠতা না পেলে অনেক সময় ত্রিশঙ্কু অবস্থা তৈরি হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান