মানুষ যত সভ্য হয়েছে, যত তার ভিতরে জেগেছে নান্দনিকতার বোধ ততই নিজের দেহকে সুসজ্জিত করে তোলবার জন্য সে বিবিধ অলঙ্কার নির্মাণ করে নিয়েছে নিজস্ব রুচি অনুযায়ী। নারী-পুরুষ উভয়েই এককালে গয়নার ব্যবহার করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কেবল নারীদেরই অঙ্গসজ্জার প্রধানতম উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়। উৎসবে, আনন্দে হরেককিসিমের গয়নায় নিজেকে সাজিয়ে তোলার চল আজও বর্তমান কেবল একেকটি প্রজন্ম যত পেরিয়ে যাচ্ছে সবকিছুর মতো অলঙ্কারেও আসছে নানা বদল। সময়ের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে সকলে পারে না অথচ দীর্ঘ আট দশক ধরে গয়নার ক্ষেত্রে অধিকাংশ নারীর পছন্দের তালিকায় যে-নামটি একেবারে উপরদিকে রয়েছে তা হল পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স (PC Chandra Jwellers)। এক বাঙালির মস্তিষ্কপ্রসূত এই ভাবনা আজও রীতিমতো জনপ্রিয় একটি গয়নার ব্র্যান্ড হিসেবে মানুষের বিশ্বাস ও ভরসায় স্বমহিমায় বিরাজ করছে। তাদের তৈরি দুর্দান্ত ও নিখুঁত কারুকার্যমণ্ডিত অলঙ্কারের বিচিত্র সংগ্রহ খুব সহজেই মানুষের মন কেড়ে নিতে পারে।
বাঙালির ব্যবসার বিষয়ে বেশ দুর্নাম রয়েছে। ব্যবসা নাকি বাঙালির দ্বারা হয় না, অথচ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে একসময় এই বাঙালির হাত ধরেই ব্রিটিশ শাসিত দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য ব্যবসার পথে পা বাড়িয়েছিল। প্রসঙ্গত যেসব নাম মনে পড়ে তার মধ্যে প্রথমেই করতে হয় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নাম, যাঁর উদ্যোগে বেঙ্গল কেমিক্যালস এর সূচনা এবং সফল অগ্রগতি সম্ভব হয়েছিল। তারপর একে একে বিভিন্নরকম নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে একেকজন বাঙালি ব্যবসায়ী এসে ঢুকলেন এবং উত্তরোত্তর চুড়ান্ত সফলতা লাভ করলেন। তালমিছরি, বোরোলিন-এর মতো কয়েকটি যুগান্তকারী পণ্য তো আজও মানুষের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই আরও একজন বাঙালি খোদ কলকাতা শহরের বুকে অলঙ্কারের ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন এবং হাতে গড়া নিখুঁত ও অত্যাশ্চর্য শিল্পকর্মে ভরপুর গয়নায় মানুষের মন জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। সময়ের স্রোত বেয়ে সেই সুদূর অতীত থেকে বর্তমানের আবর্তে এসে পড়েও তাদের গয়নার জৌলুস নষ্ট হয়নি এতটুকু বরং এই ব্র্যান্ডের অলঙ্কার আজও মানুষের পছন্দের তালিকায় উপরের দিকেই স্থান পায়।
সময়টা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার বছর অর্থাৎ ১৯৩৯ সাল। সেই বছরেই কলকাতার বউবাজার অঞ্চলে পূর্ণচন্দ্র চন্দ্র তাঁর ছেলে জে.এল চন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম শোরুম খোলেন এবং তাঁর নিজের নামকে সংক্ষেপ করেই ব্র্যান্ডের নামকরণ করেন পিসি. চন্দ্র জুয়েলার্স।
যত দিন যায় পিসি চন্দ্রের নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে, প্রভূত প্রশংসাও কুড়োতে থাকে তাদের অলঙ্কার। পূর্ণচন্দ্রের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ তাঁর ব্র্যান্ডের গহনাতেও পড়েছিল। দারুণ দক্ষতাসম্পন্ন কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত অপূর্ব সব উচ্চমানের সেইসব অলঙ্কার নারীদের অঙ্গসজ্জায় প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠতে থাকে। যত সময় গড়িয়েছে ডিজাইনে তারা বৈচিত্র্য এনেছেন, এমনকি বিভিন্নরকম উৎসবের সঙ্গে মানানসই বিবিধ গহনা নির্মাণের ওপরও জোর দিয়েছেন। বিবাহের ভারী গহনা থেকে শুরু করে ছোটখাটো উৎসব-অনুষ্ঠানের জন্য হালকা গহনা তাঁরা একইরকম দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে নির্মাণ করেছেন। কেবলমাত্র সোনার গহনা নয়, ডায়মন্ড, প্ল্যাটিনাম, সিলভারের গহনাও নির্মাণ করেন তাঁরা এবং তার বিপুল বৈচিত্র্যপূর্ণ সংগ্রহ অন্য যে-কোনো ব্র্যান্ডকেই পিছনে ফেলতে পারে। হস্তনির্মিত প্রতিটি গহনাতে কোনও না কোনও ধাতুর, দামী পাথরের, ফিলিগ্রি কিংবা মিনাকারীর কাজ করা থাকে যা অলঙ্কারের শোভা বহুমাত্রায় বাড়িয়ে দেয়। সময়ের সঙ্গে প্রজন্মের চাহিদার পরিবর্তন হয়েছে ও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই চাহিদা অনুযায়ীই নিত্যনতুন মডার্ন ডিজাইনের অলঙ্কার তৈরি করে পিসি চন্দ্র আজও বাজারের শ্রেষ্ঠ গহনা নির্মাতা ও বিক্রেতার আসন অধিকার করে রয়েছে। ক্রেতা যাতে উচ্চমানের সেরা গহনাটি পেতে পারেন সেই কারণে তাঁরা প্রতিটি গহনার সবরকম মানের যথাযথ পরীক্ষা করেন এবং তারপরেই তা বাজারে নিয়ে আসা হয়। কেবলমাত্র গহনাই নয়, মূল্যবান রত্নপাথরও পাওয়া যায় তাদের কাছে৷ কঠোর পরিশ্রম ও সততা আজও ব্র্যান্ডটিকে মানুষের কাছে এত জনপ্রিয় করে রেখেছে।
কলকাতা ছাড়িয়ে সারা ভারতবর্ষে পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। সারা ভারতে প্রায় ৬৮টিরও বেশি শোরুম রয়েছে তাদের। বাংলার বাইরে দিল্লি, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, পুণে, নয়ডা, ভুবনেশ্বর, পাটনা, রাঁচি, জামশেদপুর, আগরতলা — এই ১০টি শহরে পিসি চন্দ্র জুয়েলার্সের শোরুম বর্তমান। এদিকে কলকাতা ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি, আসানসোল, মালদা, দুর্গাপুর, বসিরহাট, কৃষ্ণনগর, মেদিনীপুর, ব্যারাকপুর ইত্যাদি ২৫টি জায়গায় তাদের ব্র্যান্ডের শোরুম স্বমহিমায় বিরাজ করছে। কেবলমাত্র কলকাতা শহরেই তাদের প্রায় ১২টি শোরুম রয়েছে। তবে পিসি চন্দ্র কিন্তু কেবলই ভারতের গণ্ডীতেই সীমাবদ্ধ নেই৷ লণ্ডন, দুবাই, সিঙ্গাপুর, লস অ্যাঞ্জেলেস-এর মতো জায়গাতেও তারা নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। বলিউডের বিভিন্ন সেলিব্রিটি যেমন দীপিকা পাড়ুকোন, সোনাক্ষী সিনহা, ইয়ামি গৌতম, কৃতি খারবান্দার মতো অভিনেত্রীদের এই ব্র্যান্ডের প্রোমোশনে দেখতে পাওয়া গেছে, যা জাতীয় স্তরে তাদের জায়গা আরও পাকাপোক্ত করেছে এবং অগ্রগতিতে প্রভূত সাহায্য করেছে। ২০২২ সালে তারা বলিউড তারকা শর্বরী ওয়াঘকে তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হিসেবে মনোনীত করেছিল। ২০১৩ সালে পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স একটি বার্ষিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা পিসি চন্দ্র গোল্ডলাইটস ডিভা চালু করেছিল। এছাড়াও ১৯৯৩ সালে পিসি চন্দ্র পুরস্কারের সূচনা করে তারা। প্রতিবছর পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স দ্বারা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
গহনার মাধ্যমেই পিসি চন্দ্রের পথচলা শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে আরও নানাক্ষেত্রে নিজেদের কাজের পরিসর তৈরি করেছিল তারা ও পিসি চন্দ্র একটি প্রভাবশালী গ্রুপ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স নানারকম জনহিতকর প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিভিন্ন মানবিক বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই গ্রুপ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রতিটি জেলার শীর্ষস্থান লাভ করা ছাত্রছাত্রীদের একটি স্কলারশিপ প্রদান করে যা জওহরলাল চন্দ্র মেরিট স্কলারশিপ নামে পরিচিত। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের অর্থের অভাবে যাতে পড়াশুনা বন্ধ না হয়, সেজন্যই এই স্কলারশিপ দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের মোট ৬৪টি কলেজকেও এই প্রকল্প থেকে অর্থ দেওয়া হয় তাদের পরিকাঠামোকে উন্নত করবার জন্য। হিসাব অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের ১১৩টি স্কুলে জল ও শৌচালয়ের যথাযথ ব্যবস্থা হয়েছে এই গ্রুপের হাত ধরেই। পিসি চন্দ্র গ্রুপের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্থ প্রকল্পটি আবার নির্ধারিত রয়েছে ফিল্ম ও টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির বয়স্ক অভিনেতা, পরিচালক, টেকনিশিয়ানদের জন্য, বয়সের ভারে, শারীরিক কারণে আজ যাঁরা বিনোদন জগতের বাইরে। পিসি চন্দ্রের এই প্রকল্প তাঁদের জীবনযাপনের অন্যতম সহায় হয়ে উঠেছে।
এসব ছাড়াও পিসি চন্দ্র গ্রুপ এনআরএস, এসএসকেএম, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার, ইন্সটিটিউট অব চাইল্ড হেলথ এবং ইসলামিয়া হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রদান করেছে। এভাবেই বহুবছর ধরে জনকল্যাণমূলক কাজেও সমানভাবে পিসি চন্দ্র গ্রুপ নিজেদেরকে যুক্ত রেখেছে।
চন্দ্র পরিবারের বিভিন্নজনের হাত ঘুরে বর্তমানে পিসি চন্দ্র জুয়েলার্সের মালিকানা যে চারজনের হাতে ন্যস্ত তাঁরা হলেন, প্রশান্ত চন্দ্র, শুভ্র চন্দ্র, অমিতাভ চন্দ্র এবং উদয়কুমার চন্দ্র।
দীর্ঘদিন ধরে উন্নতমানের অলঙ্কার নির্মাণ করে মানুষের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স। ব্র্যান্ডের নামটুকু শুনলেই মানুষ যেন চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারে। তারা নিজদের সাবটাইটেল হিসেবে লেখে ‘এ জুয়েল অব জুয়েলস’—কথাটি যে একটুও অত্যুক্তি নয় তা তাদের এতদিনকার গৌরবময় ইতিহাস এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়তায় ভরপুর বর্তমানের দিকে একঝলক তাকালেই বুঝতে পারা যায়। একথাও ভুললে চলবে না যে পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স বাঙালির ব্যবসায়িক সফলতার আরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা আজও সমানভাবে নিজের জয়ধ্বজা উড়িয়ে এগিয়ে চলেছে আগামীর দিকে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান