ব্যবসাতে বাঙালির যে বহুযুগব্যাপী বদনাম, কিছু বাঙালি ব্যবসাদারের কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠা সেই ক্ষততে কিছুটা হলেও প্রলেপ দিতে পেরেছে। তেমনই একজন বঙ্গসন্তানের হাতে তৈরি বাঙালির অন্যতম প্রিয় খাবার চানাচুর ‘মুখরোচক’ (Mukharochak ) আজ হয়ে উঠেছে এক বিশ্বমানের পণ্য। বাংলার ঘরে ঘরে চানাচুরের প্রচলন নিয়ে আলাদাভাবে কোনও টিপ্পনী দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সান্ধ্য জলখাবারে মুড়ি-চানাচুর খাওয়ার যে সংস্কৃতি তা আজকের এই বার্গার-পিৎজার যুগেও সমানভাবে সচল। এই যে বাঙালির নোনতা স্ন্যাকস শ্রেণির খাদ্য চানাচুর সেখানে খুবই উপরের দিকে থাকে এবং মুখরোচক চানাচুর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা নির্মলেন্দু চন্দ্র সেখানেই তাঁর উন্নতমানের পণ্য এনে বাঙালির মনে একটা পাকাপোক্ত জায়গা করে নিলেন। আজ ৭৫ বছরে দাঁড়িয়েও মুখরোচকের যেন জুড়ি মেলা ভার। চন্দ্র পরিবারের উত্তরাধিকারীরা এই ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিবিধ পরিকল্পনা করেছেন এবং করে চলেছেন আজও। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে আজ যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে এই ‘মুখরোচক’ নামটি।
সাম্প্রতিক পোস্ট
বাংলার ঘরে ঘরে এমনকি বাংলার বাইরেও মুখরোচক চানাচুরের আজ যে রমরমা তার পিছনে রয়েছে নিরন্তর পরিশ্রম, পণ্যের গুণমান বিষয়ে সচেতনতা এবং সর্বোপরি নিষ্ঠা ও একাগ্রতা। অথচ আজ যখন মুখরোচকের পথচলার একেবারের গোড়ার যে ইতিহাস সেদিকে তাকানো যায়, তখন অবাক লাগে যে, ১৯৫০ সালে টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর কাছে একটি ছোট্ট দোকান থেকে এই ব্যবসার সূচনা নির্মলেন্দু চন্দ্র ও তাঁর পিতা পঞ্চানন চন্দ্র। ক্রমে তাঁদের চানাচুরের স্বাদ বাঙালির মন জয় করতে থাকে। পণ্যের চাহিদা ক্রমশ বাড়তে থাকলে একসময় স্থান সংকুলানে অসুবিধার সৃষ্টি হয় এমনকি উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করবারও প্রয়োজন পড়ে। উৎপাদন ইউনিটের সম্প্রসারণের জন্যই ১৯৭০ সালে বারুলিতে দক্ষিণ গোবিন্দপুরে ছয় একর জমির উপরে মুখরোচকের নতুন কারখানা স্থাপন করা হয়েছিল। মুখরোচকের এই উৎপাদন কেন্দ্রটি আজও স্বমহিমায় সচল রয়েছে এবং উত্তরোত্তর তা আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। সমগ্র ইউনিটটিকে অত্যাধুনিক উপায়ে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়ে থাকে। এখন প্রতিদিন এখানে প্রায় ১০ টন বিভিন্নরকম নোনতা খাবার তৈরি হয়।
নির্মলেন্দু চন্দ্রের পরে তাঁর সুযোগ্য পুত্র প্রণব চন্দ্র উত্তরাধিকারসূত্রে মুখরোচক কোম্পানির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। প্রণববাবু এসে পণ্যের উপাদান নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। যথাযোগ্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়মিত পণ্যের উচ্চমান এবং তা যে যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর এই দুটি বিষয় সুনিশ্চিত করে একটি স্থানীয় চানাচুরের ব্র্যান্ডকে তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করেছেন। মুখরোচক কোম্পানির লক্ষ্যই হল, সেরা মানের পণ্য এবং যে স্বাদ নিয়ে তাঁরা বড় হয়েছেন সেই খাঁটি চানাচুরের স্বাদই মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই স্বপ্নই তাঁর বাবা এবং ঠাকুরদা পঞ্চানন চন্দ্র দেখেছিলেন। উল্লেখ্য যে, মুখরোচকের চানাচুরের প্যাকেটে পঞ্চানন চন্দ্রেরই ছবি দেখতে পাওয়া যায়।
প্রণব চন্দ্র তাঁর গবেষণার দ্বারা বুঝেছিলেন যে, আরও বিচিত্র পণ্য বাজারে নিয়ে আসবার প্রয়োজন রয়েছে। মুখরোচকের প্রধান দুরকম চানাচুর হল, টক-ঝাল-মিষ্টি যেটি কমলা রঙের প্যাকেটে বিক্রি হয় এবং লাল প্যাকেটে বিক্রি হওয়া স্পেশাল পাপড়ি চানাচুর। এই দুই প্রকার চানাচুরই মুখরোচককে চিনিয়েছিল। প্রণব চন্দ্রের তত্ত্বাবধানে তারা বাজারে নিয়ে এল আরও রকমারি সব চানাচুর। তিনি নতুন নতুন স্বাদ নিয়ে পরীক্ষানীরিক্ষা করতে থাকেন নিরন্তর। নোনতা চানাচুর এবং বিশেষ বিশেষ মানুষের জন্য প্রচন্ড ঝাল মশলাযুক্ত মিরচি ঝাল চানাচুর (Mirchi Jhal) ছাড়াও সন্ধ্যা সাতটার চানাচুর (7 PM) নামে একটি অভিনব চানাচুর নিয়ে আসে মুখরোচক। স্পেশাল পাপড়ি চানাচুরের তুলনায় এই চানাচুরে আরও অনেকরকম উপাদান ছিল। এমনকি খাট্টা মিঠা চানাচুরও ও ১০০% লাভ চানাচুরের মতো হরেককিসিমের চানাচুরের পসরা এনে হাজির করেছে মুখরোচক।
যাঁরা একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকর ও স্বাদু স্ন্যাক্স খেতে চান তাঁদের জন্য মুখরোচকের ৭৫ বছর উপলক্ষে আটভাজার (Aath Bhaja) একটা ক্যাটাগরি বাজারে এনেছে, যার মধ্যে রয়েছে, চানা ডাল, সবুজ ছোলা, সবুজ মটর, ছোলা ইত্যাদি। এমনকি টিফিনের জন্য চালভাজা, মশলা মুড়ির মতো পণ্যও বাজারে নিয়ে এসেছে মুখরোচক। দুরকম চানাচুর দিয়ে যাত্রা শুরু করে এই যে পণ্যের আজ এত বহুমুখী বিস্তার তা যেমন মুখরোচকের পরিসীমা বাড়িয়ে দিয়েছে তেমনই একটা বিরাট বাজারকে সে করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছে। প্রণব চন্দ্র বলেছেন নানাবিধ অনুষ্ঠানের কথা মাথায় রেখেই এত বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদন করা হয়েছে। সাতটি ক্যাটাগরিতে প্রায় ৩০টি মুখরোচকের উচ্চমানের পণ্য আজ গ্রাহকদের চাহিদা মাথায় রেখেই বাজারে প্রচলিত রয়েছে।
মুখরোচকের চালভাজার আবার সামান্য একটু ইতিহাস রয়েছে। প্রণব চন্দ্র একবার গিয়েছিলেন দাদাগিরি নামক রিয়্যালিটি শো-তে গিয়েছিলেন। সেই শো-এর সঞ্চালক ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলি প্রণববাবুকে বিশেষভাবে বলেছিলেন তাঁর জন্য মশলাদার নয় এমন কিছু বানাতে এবং যা যে কোনও সময় খাওয়া যায়। এরপরেই চালভাজা তৈরি করবার আইডিয়াটি আসে প্রণববাবুর মাথায়। পাফ করা বাসমতি চাল, ভাজা ছোলা এবং চিনাবাদাম দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। এমনকি স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের জন্য ডায়েট চিড়াও তৈরি করেছেন তাঁরা।
এখন প্রণব চন্দ্রের পুত্র প্রতীক চন্দ্র মুখরোচকের দায়িত্বভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাঁর কাছেও পণ্যের গুণমানই সর্বাগ্রে বিবেচ্য। তিনি নিজেই চূড়ান্ত পণ্য পরীক্ষা করে থাকেন এবং যা উচ্চমানের হয় না তা কখনই তাঁরা মানুষের দরবারে নিয়ে হাজির করেন না। আজ এত বছর ধরে সাফল্যের চূড়ায় অবস্থান করাটা সহজ কাজ নয়। মুখরোচকের কারখানায় কাজ করা ২০০জনেরও বেশি শ্রমিকের নিষ্ঠা ও অক্লান্ত পরিশ্রমই একে সম্ভব করে তুলেছে। এছাড়াও মুখরোচকের পণ্যের উন্নতমানের সুদৃশ্য প্যাকেজিং, বুদ্ধিদীপ্ত মার্কেটিং এবং সর্বোপরি এর অতুলনীয়, অবিকৃত খাঁটি স্বাদই এর সাফল্যের চাবিকাঠি। মুখরোচকের কারখানায় কাঁচামাল স্টোরেজের সুবিধা, পণ্যের গুণমান যাচাই করে দেখবার সুবিধা, আলাদা প্যাকিং জোন ইত্যাদি ছাড়াও শহর জুড়ে বিভিন্ন পরিবেশকের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাদের নিজস্ব ট্রাকও রয়েছে। এছাড়াও আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে প্রতীক চন্দ্র অনলাইন মার্কেটিং দিকটিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম যথা, ব্লিঙ্কিট, বিগ বাস্কেট, ইন্সটামার্ট-এও এখন মুখরোচকের চানাচুর-সহ অন্যান্য পণ্য খুব সহজেই পাওয়া যায়। অনলাইন মার্কেটিং-ই পণ্যটিকে আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছে। উল্লেখ্য যে মুখরোচকের বর্তমান ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হলেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক।
পুরোনো দিনের উচ্চ-গুণমানসম্পন্ন পণ্যের উপরে মানুষের একটা বিশ্বাস জন্মে যায়। মুখরোচকের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মানুষের এই বিশ্বাস মুখরোচক তাদের উচ্চমানের পণ্যের সাহায্যে আজও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান