ভিলহেল্ম কনরাড রন্টজেন

ভিলহেল্ম রন্টজেন

ভিলহেল্ম রন্টজেন (Wilhelm Rontgen) একজন খ্যাতনামা জার্মান পদার্থবিদ যিনি মূলত রঞ্জন রশ্মি (X-Ray) আবিষ্কারের জন্যই ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। ১৮৯৫ সালে তিনিই প্রথম একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের মধ্যেই এই রঞ্জন রশ্মি বা এক্স-রে আবিষ্কার করেন। এই কারণে ১৯০১ সালে তাঁকে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারেও ভূষিত করা হয়। তাঁর স্মৃতিতে ২০০৪ সালে আইইউপিএসি (IUPAC) ১১১ পরমাণু ক্রমাঙ্ক বিশিষ্ট একটি মৌলকে ‘রন্টজেনিয়াম’ নামে চিহ্নিত করা হয় যা আদতে একটি তেজস্ক্রিয় মৌল।

১৮৪৫ সালের ২৭ মার্চ জার্মানির নিম্ন রাইন অঞ্চলের লেনেপ শহরে ভিলহেল্ম রন্টজেনের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ভিলহেল্ম কনরাড রন্টজেন। তাঁর বাবা ফ্রেডরিক কনরাড রন্টজেন পেশায় একজন বস্ত্র-প্রস্তুতকারক এবং বস্ত্র-ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম শার্লট কনস্ট্যাঞ্জ ফ্রোউইন। তাঁর মায়ের আদি নিবাস ছিল আমস্টারডামে। মাত্র তিন বছর বয়সে রন্টজেনের পরিবার হল্যান্ডে চলে যায় এবং সেই থেকেই হল্যান্ডের অ্যাপেলড্রুনে বসতি গড়ে তোলেন তাঁরা। ১৮৭২ সালে আনা বার্থা লুডউইগের সঙ্গে বিবাহ হয় ভিলহেল্ম রন্টজেনের। বয়সে লুডউইগ রন্টজেনের থেকে ছয় বছরের বড় ছিলেন।

হল্যান্ডের ইনস্টিটিউট অফ মার্টিনাস হার্মান ভন ডুর্ন নামের একটি আবাসিক স্কুলে ভর্তি হন ভিলহেল্ম রন্টজেন। ছোটবেলায় বিশেষ মেধার প্রাখর্য তাঁর মধ্যে দেখা না গেলেও প্রকৃতির প্রতি এক অসম্ভব মমত্ব ছিল তাঁর এবং দেশে দেশে, অরণ্যের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে ভালবাসতেন তিনি। বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মধ্যে সমস্যা তৈরি ছিল তাঁর অন্যতম শখ। পরবর্তীকালেও তাঁর এই স্বভাবটি অক্ষত ছিল। ১৮৬২ সালে আটরেক্টে একটি টেকনিক্যাল বিদ্যালয়ে ভর্তি হন ভিলহেল্ম রন্টজেন। সেই স্কুল থেকে তাঁকে কিছুদিনের মধ্যেই বহিষ্কার করা হয়, বিদ্যালয়ের কোনও এক শিক্ষকের নকল করার অভিযোগে। এরপর জুরিখের ফেডারেল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে সেখানেই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে শুরু করেন ভিলহেল্ম রন্টজেন। ক্লসিয়াসের বক্তৃতা নিয়মিত শুনতেন তিনি। এখানে অধ্যাপক কুন্ৎ-এর (Kundt) গবেষণাগারেও কাজ করেন রন্টজেন। তাঁর চিন্তার বিকাশে ক্লসিয়াস এবং কুন্ৎ উভয়ই প্রভূত প্রভাব ফেলেছিলেন। ১৮৬৯ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি সহ স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। সেই সময় অধ্যাপক অগাস্ট কুন্ৎ-এর অতি প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন রন্টজেন এবং তাঁর অনুসরণেই ভিলহেল্ম রন্টজেন স্ট্রাসবার্গে সদ্য প্রতিষ্ঠিত কাইজার উইলিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

১৮৭৪ সালে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে যুক্ত হন এবং ১৮৭৫ সালে তাঁকে উর্তেমবার্গের হোহেনহেইমে অ্যাকাডেমি অফ এগ্রিকালচারে নিযুক্ত করা হয়। ১৮৭৬ সালে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে স্ট্রাসবার্গে ফিরে আসেন ভিলহেল্ম রন্টজেন। তিন বছর পরে গিসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে চেয়ার অফ ফিজিক্স পদে আমন্ত্রিত হন। একইভাবে ১৮৮৬ সালে জেনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৮৮৮ সালে আটরেক্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ এলে তিনি এই আমন্ত্রণ নাকচ করে দেন। তবে ১৮৮৮ সালে উর্জবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সেখানে বিজ্ঞানী কোলরাশের অধীনে কাজ করতে শুরু করেন রন্টজেন। সেখানে রন্টজেন সহকারী হিসেবে পেয়েছিলেন হেল্মহোলৎজ এবং লরেঞ্জকে। ১৮৯৯ সালে লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ার অফ ফিজিক্সের পদের আমন্ত্রণও ফিরিয়ে দেন তিনি। কিন্তু ১৯০০ সালে বাভারিয়ান সরকারের বিশেষ অনুরোধে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ স্বীকার করেন রন্টজেন। সেখানে তিনি বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ই লোমেলের অধীনে কাজ করতে থাকেন। জীবনের বাকি সময়টা তিনি এখানেই কাটিয়েছেন। যদিও পরবর্তীকালে বার্লিনের ফিজিক্যালিশ টেকনিশি রেইস্যান্সটল্ট (Physikalisch-Technische Reichsanstalt) এবং বার্লিন অ্যাকাডেমির চেয়ার পফ ফিজিক্স পদের আমন্ত্রণও অস্বীকার করেছিলেন ভিলহেল্ম রন্টজেন।

১৮৭০ সালে গ্যাসের প্রকৃত তাপমাত্রা সম্পর্কে রন্টজেনের প্রথম গবেষণামূলক লেখাটি প্রকাশিত হয়। এর কয়েক বছর পরে কেলাসের তাপীয় পরিবাহিতা সম্পর্কেও তাঁর গবেষণালব্ধ লেখাটি প্রকাশ পায়। কোয়ার্জের তড়িৎ-ধর্ম ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও গবেষণা করেছিলেন তিনি। তাছাড়া বিভিন্ন তরলের প্রতিসারক গুণাঙ্কের উপর চাপের প্রভাব, তড়িৎ-চুম্বকীয় প্রভাবে আলোর আয়নীভবনের ফলে তলের পরিবর্তন কিংবা জল ও অন্যান্য তরলের তাপমাত্রা ও সংকোচনযোগ্যতার পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে দীর্ঘ গবেষণা করেছিলেন ভিলহেল্ম রন্টজেন। জলে তেলের অণুর প্রসারণ সংক্রান্ত বিষয়েও তাঁর গবেষণা ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়াতে তাঁর পরিবার থাকত, সেই কারণে কাজের জায়গা বদলানোর কথা ভাবছিলেন তিনি। ফলে নিউ ইয়র্ক সিটির কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজে যোগ দেন এবং তাঁর কর্মজীবনের বাকি সময়টা তিনি মিউনিখেই কাটিয়েছেন।

১৮৯৫ সালে উর্জবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্জবার্গ ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউটে তাঁর গবেষণাগারে রন্টজেন নানা ধরনের ভ্যাকুয়াম টিউব সরঞ্জামের মধ্য দিয়ে একটি তড়িৎ-প্রবাহ যাওয়ার ফলে কীরূপ পরিবর্তন ঘটে তা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে লেনার্ডের টিউবের মধ্যে একটি পাতলা অ্যালুমিনিয়াম পাত বসান যাতে ক্যাথোড রশ্মি টিউবের বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে কিন্তু ঐ অ্যালুমিনিয়ামের পাতটি যাতে স্থির তড়িৎ ক্ষেত্রের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে কারণে পাতের চারদিকে একটি কার্ডবোর্ডের আবরণী লাগিয়ে দেন রন্টজেন। তিনি জানতেন যে ঐ কার্ডবোর্ডের আবরণী আলোকে বাইরে বেরোতে দেবে না, তারপরেও তিনি লক্ষ্য করেন ঐ অদৃশ্য ক্যাথোড রশ্মি বেরিয়াম প্ল্যাটিনোসায়ানাইডের (Barium Platinocyanide) আবরণ যুক্ত ঐ কার্ডবোর্ডের উপর একটি উজ্জ্বল আভা বিস্তার করেছে। রন্টজেন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এও প্রমাণ করেন যে লেনার্ড টিউবের থেকেও পুরু ক্রুকস-হিটর্ফ টিউবের মধ্য দিয়েও একইভাবে আলোকীয় উজ্জ্বল আভা সৃষ্টি হচ্ছে। ১৮৯৫ সালের ৮ নভেম্বর রন্টজেন তাঁর এই ভাবনা পরীক্ষা করার ভেবেছিলেন তিনি। ভিলহেল্ম রন্টজেন খুব যত্ন নিয়ে কালো একটি কার্ডবোর্ড তৈরি করে লেনার্ড টিউবের মতই ক্রুকস-হিটর্ফ টিউবকে আবৃত করে দেন এবং টিউবের তড়িৎদ্বারগুলিকে রুহ্‌মকর্ফ কয়েলের সঙ্গে যুক্ত করে স্থির তড়িৎ আধান উৎপাদনের পরিকল্পনা করেন। বেরিয়াম প্ল্যাটিনোসায়ানাইড পাতটি বসানোর আগে রন্টজেন সমস্ত ঘর অন্ধকার করে দেন। যেইমাত্র তিনি কয়েল চালু করে আধান পাঠানো শুরু করেন, তিনি বুঝতে পারেন যে ঐ আবরণীটি আলোক চলাচলের পক্ষে উপযুক্ত নয়। কিন্তু ঐ সময়েই খুব ক্ষীণ একটা আন্দোলন অনুভব করেছিলেন তিনি কাছেই রাখা একটি বেঞ্চের মধ্যে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি বেশ কয়েকবার এই পরীক্ষা করেন এবং একইভাবে আন্দোলন দেখতে পান ঐ বেঞ্চের মধ্যে। একটা দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে ঐ আন্দোলনের কারণ বেরিয়াম প্ল্যাটিনোসায়ানাইডের পাতটি। তিনি বুঝতে পারেন যে এক নতুন ধরনের অদৃশ্য রশ্মি এটি ঘটাচ্ছে। ৮ নভেম্বর দিনটি ছিল শুক্রবার, তাই সেই সপ্তাহান্তে তিনি প্রথম এই পরীক্ষার নোটস নেন। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ধরে এই নতুন অদৃশ্য রশ্মির বৈশিষ্ট্য নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন ভিলহেল্ম রন্টজেন। সেই রশ্মির নাম দেন তিনি ‘এক্স রে’ (X Ray) কারণ গণিতের ভাষায় অজানা কোনও কিছুকে ‘এক্স’ দিয়ে বোঝান হয়। পরবর্তীকালে তাঁর নিজের নামে এই রশ্মির নামকরণ করেন তিনি ‘রন্টজেন রে’। কোন কোন পদার্থ এই রশ্মির গতিপথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তা নিয়ে অনুসন্ধান করতে করতে ভিলহেল্ম রন্টজেন আবিষ্কার করেন একটি সীসার টুকরো সেই টিউবের মধ্যে আধান নিঃসরণের সময় রাখলে তাঁর নিজেরই কঙ্কালের একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে বেরিয়াম প্ল্যাটিনোসায়ানাইড মাখানো ঐ পাতের উপর। এরপর নিজের পেশাগত পরিচয়ে যাতে কোনও আঁচ না লাগে তাই গবেষণা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থেকে তিনি গোপনেই এই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে থাকেন।

তাঁর এই আবিষ্কারের প্রায় ছয় সপ্তাহ পরে নিজের স্ত্রী আনা বার্থার হাতের একটি রেডিওগ্রাফ ছবি তোলেন রন্টজেন। আনা তাঁর সেই ছবিতে নিজের কঙ্কাল দেখতে পেয়ে বলেছিলেন যে তিনি মৃত্যুকে দেখে ফেলেছেন। পরে রন্টজেনের এক বন্ধু অ্যালবার্ট ভন কলিকারের হাতেরও রেডিওগ্রাফি ছবি তুলেছিলেন ভিলহেল্ম রন্টজেন একটি বক্তৃতাসভায়। রন্টজেনের লেখা এক্স রশ্মি সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি ‘অন এ নিউ কাইন্ড অফ রে’স’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর। ১৮৯৬ সালের ৫ জানুয়ারি অস্ট্রিয়ার একটি সংবাদপত্রে প্রথম রন্টজেন কর্তৃক আবিষ্কৃত একটি নতুন ধরনের বিকিরণের সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এই আবিষ্কারের পরে রন্টজেনকে সম্মানীয় ডক্টর অফ মেডিসিন ডিগ্রিতে ভূষিত করা হয় উর্জবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। ১৮৯৬ সালে ফিলিপ লেনার্ডের সঙ্গে একত্রে ব্রিটিশ রয়্যাল স্যোসাইটির পক্ষ থেকে রামফোর্ড পদক অর্জন করেন ভিলহেল্ম রন্টজেন। ১৮৯৫ থেকে ১৮৯৭ সালের মধ্যে এক্স রশ্মিকে কেন্দ্র করে তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় তাঁর। বর্তমানে ডায়াগনস্টিক রেডিওলজির জনক বলা হয় ভিলহেল্ম রন্টজেনকে। তাঁর সমস্ত গবেষণাপত্রগুলি মেরিল্যান্ডের বেথেসডায় অবস্থিত ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন-এ সংরক্ষিত আছে। ১৯০১ সালে এক্স রশ্মি আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন রন্টজেন। তাছাড়া ২০০৪ সালে আইইউপিএসি (IUPAC) তাঁর নামানুসারেই ১১১ নং মৌলের নাম রাখে রন্টজেনিয়াম।

১৯২৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ৭৭ বছর বয়সে মিউনিখে ভিলহেল্ম রন্টজেনের মৃত্যু হয়।

One comment

আপনার মতামত জানান