সববাংলায়

অগস্ত্য যাত্রা

বিভাগঃ ,

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “অগস্ত্য যাত্রা”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: চির বিদায় বা চিরদিনের জন্য কোন স্থানত্যাগ। “অগস্ত্য যাত্রা” প্রবাদের উৎস লুকিয়ে আছে হিন্দু পুরাকাহিনিতে। এখানে আমরা জেনে নেব কে এই অগস্ত্য আর “অগস্ত্য যাত্রা” প্রবাদটি এলো কীভাবে।

বেদ ও পুরাণে অনুযায়ী এক স্বনামখ্যাত মুনি হলেন অগস্ত্য। ইনি বেদের একজন মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি। ঋকবেদে আছে যে, তিনি মিত্র (তেজোময় সূর্য) ও বরুণের (পশ্চিম দিকের দিকপাল ও জলের দেবতা) পুত্র। ঋগ্বেদমতে সূর্যের উপাসনা-সূচক আদিত্যযজ্ঞে মিত্র ও বরুণ দেবতা স্বর্গের অপ্সরা উর্বশীকে দেখে বিমোহিত হয়ে পড়েন। তাঁদের কামস্পৃহা এত বেশি হয় যে, বাসতীবর নামক যজ্ঞকলসে তাঁদের বীর্যপাত ঘটে। সেই বীর্য থেকে সঙ্গে সঙ্গে অগস্ত্য ও বশিষ্ঠ নামে দুই মহাঋষির জন্ম হয়।

অগস্ত্যমুনির স্ত্রী হলেন লোপামুদ্রা। লোপামুদ্রা সমস্ত জীবের সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ অংশ লোপ করে নিজে ধারণ করেছেন বলে তাঁর এই নাম। অগস্ত্য ও লোপামুদ্রার পুত্রের নাম দৃঢ়স্যু। দৃঢ়স্যুর অন্য নাম ইধ্নবাহ কারণ ছোটবেলা থেকে তিনি ইন্ধন বা যজ্ঞের জ্বালানি সংগ্রহ করতেন। নানান স্থানে ছিল অগস্ত্যের আশ্রম। কখনো গয়ার কাছে আবার কখনো দণ্ডকারণ্যে।

এই অগস্ত্য ছিলেন বিন্ধ্যপর্বতের গুরু। বিন্ধ্য পর্বত মধ্যভারতে পূর্বপশ্চিমে
বিস্তৃত একটি পর্বতশ্রেণী যা আর্যাবর্ত থেকে দাক্ষিণাত্যকে পৃথক করেছে। পুরাণমতে দেবতারা বসবাস করতেন এই পর্বতের নানা স্থানে। দেবীভাগবত থেকে জানা যায় যে, বিন্ধ্যপর্বত সকল পর্বতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও মাননীয় – এ বিষয়ে বিন্ধ্য পর্বতের গর্বও ছিল। এদিকে নারদমুনি ছিলেন দ্বন্দ্ব বাধাতে দক্ষ। একদিন তিনি বিন্ধ্যের কাছে এসে বললেন, ‘তুমি যতই শ্রেষ্ঠ বা মাননীয় হও না কেন, ওদিকে সুমেরুকে দেখে আমার মনঃপ্রাণ জুড়িয়ে গেছে। স্বয়ং সূর্যদেব সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রসহ এই সুমেরুকে প্রদক্ষিণ করেন। তাই সুমেরু বেশ গর্বিত।’

নারদের মুখে সুমেরু পর্বতের প্রশংসা শুনে বিন্ধ্যর গর্বে আঘাত লাগল। সুমেরুর গর্ব খর্ব করার জন্য বিন্ধ্যপর্বত তার চূড়াগুলি উঁচু করতে আরম্ভ করল। ফলে সূর্যের গতি বাধাপ্রাপ্ত হতে থাকে। বিন্ধ্যের পশ্চিম ও দক্ষিণে অন্ধকার এবং পূর্ব ও উত্তরে প্রখর সূর্যতাপ দেখা দেয়। হাহাকার পড়ে গেল সর্বত্র। দেবতারা ভয় ও ভাবনায় অস্থির হয়ে পড়লেন।

সূর্যের পথ বন্ধ হওয়ায় দেবপুরীতে নানা রকম গোলযোগ বেধে গেল। হোম, যজ্ঞ, শ্রাদ্ধতর্পণ ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান বিলুপ্ত হতে থাকলো। পশ্চিম ও দক্ষিণদিকে সবসময় রাত্রি থাকায় দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হল। আবার পূর্ব ও উত্তরদিকের অধিবাসীরা প্রচণ্ড সূর্যতাপে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। দেবরাজ ইন্দ্র পর্যন্ত সমস্যা সমাধানে প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অন্য সব রাজকর্ম ফেলে। দেবতারা মহাদেবের দ্বারস্থ হলেন সাহায্যের জন্য। মহাদেবের পরামর্শে আবার তাঁরা চললেন পালনকর্তা বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণু তাঁদের পরামর্শ দিলেন অগস্ত্যের কাছে যেতে। মহাদেব ও বিষ্ণু বিন্ধ্যকে নত করতে ব্যর্থ বলে অবশেষে অগস্ত্যের শরণাপন্ন হলেন দেবতারা। সে সময় অগস্ত্য অবস্থান করছিলেন কাশীতে। দেবতারা তাঁর কৃপাভিক্ষা করায় তিনি যাত্রা করলেন শিষ্য বিন্ধ্যের উদ্দেশে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্ত্রীসহ সেখানে উপস্থিত হলেন।

গুরুদেবকে দেখে বিন্ধ্য নত হয়ে প্রণাম করলেন। বিন্ধাকে নত দেখে খুশি হলেন অগস্ত্য। তিনি শিষ্যকে বললেন যে, তিনি দাক্ষিণাত্যে যাচ্ছেন। যতদিন তিনি ফিরে না আসেন ততদিন যেন বিন্ধ্য এরূপ নত হয়েই থাকে। কারণ উঁচু পাহাড় ডিঙ্গানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। বিন্ধ্য গুরুর অনুরোধ ফেলতে পারলেন না। এরপর অগস্ত্য দাক্ষিণাত্যে গেলেন এবং মলয়পর্বতে আশ্রম স্থাপন করে সেখানে রয়ে গেলেন, আর ফিরলেন না। এদিকে গুরুর ফেরার অপেক্ষায় বিন্ধ্যপর্বত মাথা নিচু করেই রইলেন আর মাথা উঁচু করেননি। এর ফলে সূর্য আবার দক্ষিণদিকে যাত্রা করতে সক্ষম হলেন আর বিশ্বের অচলাবস্থা কাটল।

স্ত্রী লোপামুদ্রাসহ মহামুনি অগস্ত্য ভাদ্রমাসের ১ তারিখে দাক্ষিণাত্যে যাত্রা করেছিলেন বলে কথিত আছে। এই গল্প অনুযায়ী ভাদ্রমাসের ১ তারিখ অগস্ত্য যাত্রার দিন। সংস্কারবশত মানুষ সাধারণত ঐদিন বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও যাত্রা করতে চায় না। এজন্য বাংলায় অগস্ত্য যাত্রা প্রবাদের সৃষ্টি হয়েছে শাস্ত্র ও সংস্কারের কল্যাণে। প্রবাদটি অগস্ত্যদোষ নামেও পরিচিত।

‘অগস্ত্য যাত্রা’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। গত শীতে গ্রামের বুড়ো পণ্ডিতমশায়ের অগস্ত্য যাত্রা ঘটেছে।
২। ৫ মিনিটের মধ্যে ঘুরে আসছি বলে এমন গেল আর ফেরার নাম নেই – যেন ওর অগস্ত্য যাত্রা ঘটেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১৮ পৃঃ
  2. https://archive.roar.media/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading