ইতিহাস

অ্যালান টুরিং

অ্যালান টুরিং

বিখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ, দার্শনিক, কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং তাত্ত্বিক জীববিশারদ ছিলেন অ্যালান টুরিং (Alan Turing)। তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রণয়নে তাঁর বিশেষ অবদান ছিল। বিশেষভাবে নির্মিত অ্যালগোরিদ্‌ম (Algorythm) এবং গাণিতিক সক্ষমতা সম্বলিত তাঁর ‘টুরিং মেশিন’টিই (Turing Machine) তাঁকে সমগ্র বিশ্বে সুপরিচিত করে তুলেছিল। এই টুরিং মেশিনটি একপ্রকার সাধারণ মানের কম্পিউটার মডেল ছিল। অ্যালান টুরিং বিশ্বের ইতিহাসে তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জনক হিসেবে বিখ্যাত। লজিক এবং ক্রিপ্ট্যানালিসিস (Cryptanalysis)-এর জগতেও তাঁর অবদান ছিল স্মরণীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বেশ কিছু কোড সম্বলিত বার্তার অর্থ অনুসন্ধান করে অক্ষশক্তিকে পরাজিত করতে মিত্রশক্তির হয়ে সহায়তা করেছিলেন। ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে অ্যালান টুরিংই প্রথম তৈরি করেন ‘অটোমেটিক কম্পিউটিং ইঞ্জিন’ বা এসিই (ACE)।

১৯১২ সালের ২৩ জুন লন্ডনের মেইডা ভেল অঞ্চলে অ্যালান টুরিং-এর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম জুলিয়াস ম্যাথিসন টুরিং। অ্যালান টুরিং-এর ঠাকুরদাদা রেভারেন্ড জন রবার্ট টুরিং একজন স্কটিশ পাদ্রি ছিলেন যিনি থাকতেন নেদারল্যান্ডে। টুরিং-এর মা এথেল সারা টুরিং ছিলেন মাদ্রাজ রেলওয়ের তৎকালীন প্রধান এডওয়ার্ড ওয়েলার স্টোনির কন্যা। টুরিং-এর ঠাকুরদাদা ভারতে এসে বেঙ্গল আর্মিতেও যোগ দিয়েছিলেন এবং টুরিং-এর বাবা জুলিয়াস সেই সময় ব্রিটিশ শাসিত ভারতে সিভিল সার্ভেন্টের পদে আসীন ছিলেন। কিন্তু জুলিয়াস এবং তাঁর স্ত্রী এথেল দুজনেই চাইতেন যে তাঁদের সন্তান ব্রিটেনে বড় হোক, তাই তাঁরা চলে আসেন লন্ডনের মেইডা ভেল অঞ্চলে। অ্যালান টুরিংয়ের এক দাদা ছিল জন নামে। খুব ছোটবেলা থেকেই টুরিংয়ের মধ্যে মেধাবী বৈশিষ্ট্যগুলি প্রতিভাত হয়েছিল। ১৯২৭ সালে তাঁর বাবা-মা গিল্ডফোর্ডে একটি বাড়ি কেনেন এবং সেখানেই টুরিং স্কুলের ছুটির দিনগুলি কাটাতেন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

ছয় বছর থেকে নয় বছর বয়স পর্যন্ত অ্যালান টুরিং সেন্ট মাইকেলস নামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯২২ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে সাসেক্সের ফ্রান্ট গ্রামে হ্যাজেলহার্ট প্রিপারেটরি স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯২৬ সালে ১৩ বছর বয়সে শেরবোর্ন স্কুলে ভর্তি হন অ্যালান টুরিং। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাঁর স্কুল যাওয়ার প্রথম দিনেই সমগ্র ব্রিটেনে সাধারণ ধর্মঘট ঘোষিত হয়। কিন্তু অদম্য টুরিং নিজের বাইসাইকেল নিয়ে সাউথ অ্যাম্পটন থেকে ৬০ মাইল দূরে শেরবোর্নে একা একা চলে গিয়েছিলেন। এমনকি মাঝে ইন শহরে একটা রাতও কাটিয়েছিলেন তিনি। প্রাথমিক ক্যালকুলাস না জেনেই তিনি ১৯২৭ সালে জটিল গণিতের সমস্যা সমাধান করে দিয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণাকেও প্রশ্ন করেছিলেন অ্যালান টুরিং। কেমব্রিজের কিংস কলেজে ১৯৩১ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত টুরিং পড়াশোনা করেছিলেন। এখানে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন তিনি। ১৯৩৫ সালে তাঁর গবেষণাপত্রের গুণমান বিচার করে কিংস কলেজের সদস্যপদ দেওয়া হয় টুরিংকে। ১৯৩৬ সালে প্রসিডিংস অফ দ্য লন্ডন ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি জার্নালে টুরিং-এর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এই গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল ‘ডিসিশন প্রবলেম’ (Decision Problem)। সেই বছরই পরের দিকে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গাণিতিক যুক্তি (Mathematical Logic) বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে যান তিনি এবং ১৯৩৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে সক্ষম হন। তাঁর পিএইচডি বিষয় ছিল ‘সিস্টেমস অফ লজিক বেসড অন অর্ডিনালস’। তাঁর এই কাজে প্রীত হয়ে জন ভন নিউম্যান তাঁকে পোস্ট-ডক্টরাল সহকারী হিসেবে নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু টুরিং সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে ফিরে যান ব্রিটেনে।

১৯৩৯ সালে গণিতের ভিত্তির উপর আয়োজিত একটি সভায় লুডউইগ ভিটগেনস্টাইনের একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এই বক্তৃতার পরে ভিটগেনস্টাইন ও অ্যালান টুরিংয়ের মধ্যে বিতর্ক বাধে । ভিটগেনস্টাইনের বক্তব্য ছিল গণিতশাস্ত্র কখনও কোনও চরম সত্যের কথা বলে না। অন্যদিকে টুরিং মনে করতেন গণিতশাস্ত্রেরও একটি নির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে। ফলে পরবর্তীকালে টুরিং-এর সঙ্গে বাক্যালাপ, অন্যান্য ছাত্রদের মন্তব্য ইত্যাদির ভিত্তিতে এই বক্তৃতাটিকে পুনর্নির্মাণ করেন ভিটগেনস্টাইন। ইতিমধ্যে ১৯৩৮ সালেই ‘গভর্নমেন্ট কোড অ্যান্ড সাইফার স্কুল’-এ টুরিং একটি আংশিক সময়ের চাকরি নেন। যুদ্ধের বিশেষ বিশেষ কোডের অর্থ নির্ণয় করাই এই দপ্তরের কাজ ছিল। এখানে আরেক বিখ্যাত কোড-নির্ণায়ক (Code-breaker) ডিলি ব্রেকারের সঙ্গে কাজ করতেন অ্যালান টুরিং। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান কর্মকর্তাদের পাঠানো কোডগুলি নির্ণয় হত। ১৯৩৯ সালে পোলিশ সাইফার ব্যুরো এই প্রতিষ্ঠানকে তাঁদের নিজেদের কোড নির্ণয়ের পদ্ধতি জানিয়েছিল। ডিলি নক্স ও অ্যালান জটিল সেইসব পোলিশ পদ্ধতিকে একটি সহজ ও কার্যকর পদ্ধতিতে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। পোলিশদের দ্বারা উল্লিখিত সূচকগুলি খুব বেশি নির্ভরযোগ্য ছিল না এবং জার্মানরা তা যে কোনও সময় পরিবর্তন করতে পারত। এভাবেই টুরিং ডিকোডিং পদ্ধতি ব্যবহার করে ‘বোম্বে’ (Bombe) নামক একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন।

১৯৩৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ ব্যবহার করে একটি ডিক্রিপ্টিং কৌশল (Decrypting Process) উদ্ভাবন করেন এবং একে ‘ব্যানবুরিসমাস’ (Banburismus) নামে অভিহিত করেন। এনিগমা কোডগুলি এই ব্যানবুরিসমাস সহজেই পাঠোদ্ধার করতে পারত। কিন্তু অন্যান্য যুদ্ধরত দেশগুলির ব্যবহৃত কোডের তুলনায় তা ছিল বেশ জটিল। ১৯৪০ সালের ১৮ মার্চ ব্লেচলি পার্কে প্রথম অ্যালান টুরিং-এর ‘বোম্বে’ যন্ত্রটি কাজ করা শুরু করে। ১৯৪২ সালে জার্মানদের দ্বারা নির্মিত এক বিশেষ টাইপিং মেশিনের মাধ্যমে প্রেরিত সাংকেতিক বার্তাগুলিকে প্রতিহত করার জন্য ‘টুরিঙ্গারি’ (Turingery) নামে নতুন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ১৯৪৫-৪৭ সালে টুরিং ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে কাজ শুরু করেন যেখানে তিনি অটোমেটিক কম্পিউটিং ইঞ্জিন নামে একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। প্রায় একই সময়ে তিনি একটি গবেষণাপত্র তৈরি করেন যেখানে কম্পিউটার সম্পর্কে তাঁর ধারণা বর্ণনা করা হয়।

১৯৪৮ সালে ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ‘কম্পিউটিং ল্যাবরেটরি’-তে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। এখানেই টুরিং গাণিতিক জীববিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক দেখাতে শুরু করেন। একই বছর তিনি ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে প্রভাষকের পদে যোগ দেন। এই সময় তাঁর এক বন্ধু ডি. জি. চ্যাম্পারনোনের সাহায্যে কম্পিউটারে খেলা যায় এমন একটি দাবা প্রোগ্রাম উদ্ভাবন করে ফেলেন অ্যালান টুরিং। ঐ বছরই ম্যাট্রিক্স সমাধানের জন্য টুরিং উদ্ভাবন করেন একটি বিশেষ পদ্ধতি যার নাম ‘এল ইউ ডিকম্পোজিশন মেথড’ (LU Decomposition Method)। ১৯৪৯ সালে কম্পিউটিং মেশিন ল্যাবরেটরির ডেপুটি ডিরেক্টর পদে উন্নীত হন তিনি। বিমূর্ত গণিত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে অ্যালান টুরিং ‘ম্যাঞ্চেস্টার মার্ক ১’ নামে একটি নতুন সফটওয়্যার তৈরি করেন। কোনও যন্ত্র বুদ্ধিসম্পন্ন কিনা তা পরীক্ষা করতে টুরিং উদ্ভাবন করেন ‘টুরিং টেস্ট’ (Turing Test)। ১৯৫২-৫৪ সাল নাগাদ গাণিতিক জীববিদ্যার উপরে তিনি একটি গবেষণাপত্র লেখেন যার শিরোনাম ছিল ‘দ্য কেমিক্যাল বেসিস অফ মর্ফোজেনেসিস’।

শেরবোর্ন স্কুলে পড়াকালীন ক্রিস্টোফার মর্কোমের সঙ্গে এক ভালবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল টুরিংয়ের, কিন্তু মর্কোমের মৃত্যুতে তা ছিন্ন হয়। পরে ১৯৪১ সালে সহকর্মী জোয়ান ক্লার্কের প্রেমে পড়েছিলেন টুরিং, কিন্তু যেহেতু তিনি নিজে একজন সমকামি ছিলেন তাই ক্লার্কের সঙ্গে বিবাহের কথাবার্তা এগোলেও বিয়েতে রাজি হননি টুরিং। ৩৯ বছর বয়সে তাঁর বাড়িতে একটি চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্তের সূত্রে তাঁর সমকামিতার সংবাদ প্রকাশ্যে আসে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৫২ সালে তাঁকে দুটি বিকল্প দেওয়া হয় – হয় কারাবাস নচেৎ হরমোনাল কাস্ট্রেশান (Hormonal Castration)। অ্যালান টুরিং দ্বিতীয় পথটিকেই বেছে নেন যাতে ঘরে বসে গণিতের গবেষণা চালিয়ে যেতে পারেন তিনি।

১৯৩৯ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবহারিক গণিতের জগতে বিশেষ অবদানের জন্য অ্যালান টুরিংকে স্মিথস পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রাজা ষষ্ঠ জর্জ টুরিংকে ‘মোস্ট এক্সেলেন্ট অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ সম্মানে ভূষিত করেন।

১৯৫৪ সালের ৭ জুন মাত্র ৪১ বছর বয়সে পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন অ্যালান টুরিং।

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: আজকের দিনে ।। ২৩ জুন | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন