বিজ্ঞান

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং

স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং (Sir Alexander Fleming) ছিলেন একজন স্কটিশ ডাক্তার এবং মাইক্রোবায়োলজিস্ট। তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হল- ১৯২৩ সালে এনজাইম লাইসোজাইম (enzyme lysozyme) এবং ১৯২৮ সালে বিশ্বের প্রথম কার্যকর এন্টিবায়োটিক পদার্থ বেঞ্জাইলপেনিসিলিন (Benzylpenicillin) বা পেনিসিলিন জি (Penicillin G), যা তিনি আবিষ্কার করেন পেনিসিলিয়াম রুবেন (Penicillium rubens) থেকে। পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য, ১৯৪৫ সালে তিনি, হাওয়ার্ড ফ্লোরি (Howard Florey) এবং আর্নেস্ট বরিস চেইন (Ernst Boris Chain) সম্মিলিতভাবে ফিজিওলজি বা মেডিসিনে ‘নোবেল’ পুরস্কার লাভ করেন।

১৮৮১ সালের ৬ আগষ্ট স্কটল্যান্ডের অর্ন্তগত এয়ারসায়ারের (Ayrshire) লকফিল্ড (Lochfield) নামক এক গ্রামে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল হিউ ফ্লেমিং (Hugh Fleming) এবং মায়ের নাম ছিল গ্রেস স্টারলিং মর্টন (Grace Stirling Morton)। আলেকজান্ডার ছিলেন তাঁর বাবা-মার চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান। তাঁর বাবা ছিলেন চাষী। তাই দারিদ্রের মধ্যেই ছেলেবেলা কাটে ফ্লেমিং-এর। তাঁর ৭ বছর বয়সে তাঁর বাবার মৃত্যু হয়।

প্রথম জীবনে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং লাউডন মূর স্কুল (Loudon Moor School) এবং ডারভেল  স্কুলে (Darvel School) পড়াশোনা করেন। এরপর দু’বছরে স্কলারশিপ পান কিলমার্নক একাডেমী (Kilmarnock Academy) থেকে। পরে চলে আসেন লন্ডনে এবং এখানে তিনি রয়েল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে (Royal Polytechnic Institute) ভর্তি হন। চার বছর এক জাহাজ কোম্পানিতে চাকরি করার পর কুড়ি বছর বয়সে কাকা জন ফ্লেমিং (John Fleming) এর কাছ থেকে কিছু টাকা নেন। ১৯০৩ সালে তাঁর বড় ভাই চিকিৎসক টম ফ্লেমিং-এর পরামর্শ অনুযায়ী তিনি পাডিংটনের (Paddington) সেন্ট মেরি’স হসপিটাল মেডিকেল স্কুলে (St Mary’s Hospital Medical School) ভর্তি হন। ১৯০৬ সালে তিনি ডিস্টিংশন নিয়ে এমবিবিএস (MBBS) ডিগ্রী পান। ১৯০৮ সালে তিনি ব্যাকটেরিওলজির ওপর স্বর্ণপদকসহ বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।‌ এরপর তিনি সেন্ট মেরি’স মেডিকেল স্কুলের লেকচারার পদে যোগদান করেন এবং ১৯১৪ সাল পর্যন্ত তিনি এখানে লেকচারার হিসেবে কাজ করেন। ১৯১৪ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট হিসেবে অনুমোদিত হন এবং ১৯১৭ সালে ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রয়েল আর্মি মেডিক্যাল কর্পসে (Royal Army Medical Corps) কাজ করেন। তিনি এবং তাঁর অনেক সহকর্মী যুদ্ধক্ষেত্রে ফ্রান্সের ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের (Western Front) হাসপাতালে কাজ করেছিলেন। ১৯১৮ সালে তিনি সেন্ট মেরি’স হাসপাতালে (St. Mary’s Hospital) ফিরে আসেন এবং ১৯২৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের (University of London) ব্যাকটেরিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে তিনি তিন বছরের জন্য এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Edinburgh) রেক্টর হিসেবে নির্বাচিত হন।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং দেখেছিলেন প্রতিদিন বহু সৈন্য ক্ষতস্থানে সংক্রমনের ফলে সেপসিস হয়ে মারা যাচ্ছে। ফ্লেমিং লক্ষ করলেন, যে সব অ্যান্টিসেপ্টিক ঔষধ চালু আছে তা কোন ভাবেই কার্যকরী হচ্ছে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ‘ল্যানসেট’ (The Lancet) নামক এক মেডিকেল জার্নালে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এখানে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যাখ্যা করেন, কেন অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করার ফলে সৈন্যরা মারা যাচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, গভীর ক্ষতস্থানে কিছু এ্যানারোবিক ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে সরানো সম্ভব নয় এবং এই ধরনের ক্ষতস্থানে অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহারের ফলে শরীরের নিজস্ব ক্ষত সারানোর ক্ষমতাও কমে যায়। স্যার আলমর্থ রীট (Sir Almroth Wright) তাঁর ব্যাখ্যা সমর্থন করলেও, বেশীরভাগ ডাক্তাররাই অ্যান্টিসেপটিকের প্রয়োগ অব্যাহত  রাখেন।

যদি খুব বেশি পরিমাণে অ্যান্টিসেপ্টিক ব্যবহার করা হয়, তাহলে কিছু পরিমাণে ব্যাক্টেরিয়া ধ্বংস হলেও তার সাথে দেহকোষগুলোও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফ্লেমিং উপলব্ধি করলেন, দেহের স্বাভাবিক শক্তিই একমাত্র এসব ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করতে পারে, কিন্তু আমাদের শরীরের এই সহজাত ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ।

১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন ফ্লেমিং। ইংল্যান্ডে ফিরে এসে তিনি সেন্ট মেরিজ মেডিকেল স্কুলে ব্যাকটেরিয়োলোজির প্রফেসর হিসেবে যোগ দিলেন। এখানে পুরোপুরিভাবে ব্যাকটেরিয়োলোজি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। ১৯২১ সালে, একদিন ল্যাবরেটরিতে বসে কাজ করছিলেন ফ্লেমিং। এই সময় তিনি  সর্দি কাশিতে ভুগছিলেন। তখন প্লেটে জীবাণু কালচার নিয়ে কাজ করার সময় একটু সর্দি এসে পড়ে প্লেটের ওপর। তিনি প্লেটটি একপাশে সরিয়ে রেখে নতুন একটা প্লেট নিয়ে কাজ শুরু করলেন। কাজ শেষ হয়ে গেলে বাড়ি ফিরে গেলেন ফ্লেমিং। পরেরদিন ল্যাবরেটরিতে ঢুকে দেখলেন আগের দিন টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখা প্লেটটিতে যে জীবাণুগুলো ছিল, সেগুলো আর নেই। সব জীবাণু মারা গেছে।
এইভাবেই আবিষ্কার হল যে, চোখের জল, মুখের লালায় জীবাণু ধ্বংস করার ক্ষমতা আছে। তিনি দেহ নির্গত হওয়া এই প্রতিষেধক উপাদানটির নাম দিলেন লাইসোজাইম, যার অর্থ জীবাণু ধ্বংস করা। তবে সাধারণ জীবাণুগুলোকে এটি ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও অধিকতর শক্তিশালী জীবাণুগুলোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়।
১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস, বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং টাইফয়েড রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারের কাজ করছিলেন। এই সময় তিনি ল্যাবরেটরিতে স্ট্যাফাইলোকক্কাস (Staphylococci) নামক এক ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করেছিলেন। একদিন ফ্লেমিং ভুল করে ল্যাবরেটরিতে ব্যাকটেরিয়া জন্মাবার পাত্র অর্থাৎ পেট্রিডিশগুলো পরিষ্কার না করেই ফেলে রেখে দেন। কিছুদিন পরে ফ্লেমিং দেখতে পান সেই প্লেটে এমন একটা কিছু জন্মাচ্ছে যার কারণে তার চারপাশে কোন ব্যাকটেরিয়া জন্মাচ্ছে না। ১৯২৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ফ্লেমিং নিশ্চিত হন পেনিসিলিয়াম নামক খুব সাধারণ এক ছত্রাকের জন্মাবার কারণেই ঠিক এমনটি হচ্ছে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই ঘটনাকে অনেকে বলেন “Most Fortunate Mistake”।‌ দীর্ঘ পরীক্ষার পর ফ্লেমিং নিশ্চিত হন যে পেনিসিলিয়াম ছত্রাকটি পেনিসিলিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক ক্ষরণ করে, যা ব্যাকটেরিয়াকে প্রতিহত করে। এমনকি এই রাসায়নিক পদার্থে স্কারলেট ফিভার, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া আর মারণঘাতী মেনিনজাইটিস জীবাণুও জন্মাতে পারে না। গনোরিয়া রোগের জীবাণুকেও জন্মাতে দেয় না এই রাসায়নিক দ্রব্য।  তিনি তাঁর ল্যাবরেটরিতে পেনিসিলিয়াম জন্মানো থেকে শুরু করে কিভাবে পেনিসিলিন আলাদা করা যায় এই নিয়ে বিস্তর গবেষণা করতে থাকেন।
১৯২৯ থেকে ১৯৪০ নাগাদ পেনিসিলিন নিয়ে টানা কাজ করেন বিজ্ঞানী ফ্লেমিং। তাঁর লক্ষ্য ছিল, ছত্রাক থেকে এই পদার্থ নিয়ে আলাদা করা এবং চিকিৎসাকাজে পেনিসিলিন ব্যবহার করা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ দুই গবেষক হাওয়ার্ড ফ্লোরে এবং আরনেস্ট বরিস কেইনীর এই কাজে তাঁর সঙ্গী হয়। এই তিনজন মিলে আবিষ্কার করেন পেনিসিলিনের রাসায়নিক কাঠামো এবং পৃথকীকরণের পদ্ধতি। এরপর সেই রাসায়নিকের ব্যবহার শুরু হয় ইঁদুর এবং আরো কয়েকটি প্রাণীর উপরে। সবশেষে মানব দেহের ওপরে এর সফল প্রয়োগ ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪২ সালের জানুয়ারী থেকে মে, এই কয়েক মাসের মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ইউনিট পেনিসিলিন তৈরী করে আমেরিকার ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো। যুদ্ধের শেষ দিকে, একটি হিসেবে দেখা যায় আমেরিকাতে ৬৫০ বিলিয়ন ইউনিট পেনিসিলিন তৈরী হয়েছে, যা মিত্র বাহিনীতে জীবাণু সংক্রান্ত রোগের মৃত্যুর হার ৯০ শতাংশ হ্রাস করে।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর জীবন রক্ষাকারী এন্টিবায়োটিক ‘পেনিসিলিন’ বিশ্বব্যাপী প্রস্তুত করা শুরু হয়। এছাড়াও তিনি ব্যাকটেরিওলজির, ইমিউনোলজি, কেমোথেরাপির ওপর (Bacteriology, Immunology, and Chemotherapy) বহু প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং দুইবার বিবাহ করেন। ১৯১৫ সালে তিনি প্রথম বিবাহ করে। তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম সারা ম্যারিয়ন ম্যাকলরি (Sarah Marion McElroy)। তিনি ছিলেন একজন প্রশিক্ষিত নার্স। তাঁদের একটি পুত্র সন্তান হয়। কিন্তু ১৯৪৯ সালে তাঁর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হয়। এরপর ১৯৫৩ সালের ৯ এপ্রিল ফ্লেমিং তাঁর সহকর্মী Dr. Amalia Koutsouri Vourekas-কে বিবাহ করেন।

এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা প্রমাণ হবার পরেই খ্যাতির স্বর্ণশিখরে পৌঁছে যান ফ্লেমিং। তিনি বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৪৩ সালে রয়্যাল সোসাইটি অফ বায়োলজির (Royal Society of Biology) ‘ফেলো’ (Fellow) নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৪৪ সালে তাঁকে সম্মানিত করা হয় ‘নাইটহুড’ (Knighthood) দিয়ে।  ১৯৪৫ সালে চিকিৎসাবিদ্যায় ‘নোবেল’ (Nobel) পুরষ্কারে ভূষিত হন ফ্লেমিং, ফ্লোরে এবং চেইন। ‘পেনিসিলিন ম্যান’ নামে খ্যাত হন ফ্লেমিং। 
ফ্লেমিং Pontifical Academy of Sciences-এর একজন সদস্য ছিলেন। এছাড়াও Royal College of Surgeons of England কর্তৃক Hunterian Professorship পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জ‌ (King George VI) তাঁকে ‘স্যার’ (Sir‌) উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৯৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন (Time magazine) পত্রিকা তাঁকে বিংশ শতাব্দীর ১০০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের মধ্যে একজন বলে গণ্য করে।‌ ২০০২ সালে বিবিসি টেলিভিশন তাঁকে ১০০ জন ‘মহান ব্রিটিশ’-এর অন্তর্ভুক্ত বলে অভিহিত করে। এমনকি তিনি ‘তৃতীয় মহান স্কট’ হিসেবে বিবেচিত হন।

১৯৫৫ সালের ১১ মার্চ লন্ডনে নিজের বাড়িতে হার্ট অ্যাটাক করে মৃত্যু হয় আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।