আলিগড় আন্দোলন (Aligarh Movement) হল ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের একটি সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলন, যা মূলত ভারতীয় মুসলমানদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল। উনিশ শতকের নবজাগরণবাদী এই আন্দোলনের নামকরণ করা হয়েছিল বর্তমান উত্তরপ্রদেশের আলিগড় শহরের নাম অনুসারে। আলিগড় আন্দোলনের প্রধান নেতা, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক স্যার সৈয়দ আহমেদ খান (Sir Syed Ahmed Khan) অনেক মুসলিম প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করে মুসলিমদের সামাজিক অবস্থার উন্নতি করতে চেয়েছিলেন। এছাড়া তিনি সময়ের উপযোগী ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পশ্চিমা শিক্ষা ও সরকারি চাকরি গ্রহণের মধ্যে দিয়ে সকলকে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানান। ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সমগ্র ভারতীয় সমাজে এই আন্দোলনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব লক্ষ করা যায়। এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় মুসলমানরা ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা ও আধুনিক ধারণার সম্মুখীন হয়। আলিগড় আন্দোলনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে একসময় তা উত্তর ভারত থেকে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতের মুসলিম সমাজকে শিক্ষাগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সৈয়দ আহমেদ খান ১৮৭৫ সালে আলিগড়ে মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ (Mohammedan Anglo-Oriental College) প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে আলিগড় আন্দোলনের সূচনা করেন। সৈয়দ আহমেদ খান ছাড়াও মৌলভি সামিউল্লাহ খান (Maulvi Samiullah Khan), নবাব আব্দুল লাতিফ (Nawab Abdul Latif) সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন।
আলিগড় আন্দোলনের ইতিহাস ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পরবর্তী সময় থেকে শুরু হয়। এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণের কারণে ব্রিটিশরা ভারতীয় মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। অন্যদিকে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে মুসলমানরা নিজেদের ক্ষমতা, সম্পদ এবং মর্যাদা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলে। মুঘলদের সমর্থক ভারতীয় মুসলমানরা ব্রিটিশ শাসনের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় পাশ্চাত্য শিক্ষা এড়িয়ে চলত। তবে এই সময়ে হিন্দু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অবস্থা ছিল অনেক উন্নত। ফলস্বরূপ চাকরির সুযোগ এবং শাসনব্যবস্থায় হিন্দুরা এগিয়ে যায় ও ভারতীয় মুসলমানদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। ব্রিটিশ প্রশাসনের দায়িত্ব পালনকারী স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ভারতীয় মুসলমানদের এই পতন লক্ষ করেছিলেন। এই পরিস্থিতির জন্য স্যার সৈয়দ আহমেদ খানসহ কিছু উচ্চশিক্ষিত মানুষ প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থাকে দায়ী করেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, মুসলমানরা পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ না করলে তারা পিছিয়েই থাকবে। তাই সৈয়দ আহমেদ খান মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে এই আন্দোলন ভারতের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে দেন। এই কলেজে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মডেল অনুসরণ করে আধুনিক শিক্ষার সাথে ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় সাধন করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
স্যার সৈয়দ আহমেদ খান বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। তাই তিনি ইসলাম ধর্মের ধর্মীয় নীতিগুলি যুগোপযোগী করে পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক শিক্ষাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেন। এই কারণে তিনি ‘মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল’ কলেজ ছাড়াও বেশ কিছু বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। ১৮৮৬ সালে তিনি আলিগড় আন্দোলনের শিক্ষাগত লক্ষ্যগুলিকে আরও বিস্তৃতভাবে প্রচার করার জন্য ‘অল ইন্ডিয়া মহামেডন এডুকেশনাল কনফারেশন’ (All India Mohammedan Educational Conference) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি গাজীপুরে ইউরোপীয় ভাষার বিজ্ঞান এবং অন্যান্য বিষয়ের বই উর্দুতে অনুবাদ করার জন্য ‘সায়েন্টিফিক সোসাইটি’ (Scientific Society) প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি ১৮৯৩ সালে ‘মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’ (Mohammedan Anglo-Oriental Defense Association) প্রতিষ্ঠা করেন।
সৈয়দ আহমেদ খানের প্রগতিশীল সামাজিক ধারণাগুলি তাঁর ‘তাহজিব-উল-আখলাক’ (‘Tahjib-ul-Akhlaq’) পত্রিকার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। এছাড়া তিনি একটি ইংরেজি-উর্দু পত্রিকায় সমাজ সংস্কারের ধারণা প্রচার করতেন। এই বই ও পত্রিকাগুলি শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি আধুনিক মানসিকতা বিকাশে সহায়তা করেছিল। এছাড়া আলিগড় আন্দোলনের মাধ্যমে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকে উন্নত করা হয়। আবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আঞ্জুমান-ই-তারক্কি উর্দু, দার-উল-উলুম নদভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিষ্ঠা ও সমৃদ্ধিতে সাহায্য করা হয়েছিল। এই আন্দোলনের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত বার্ষিক শিক্ষা সম্মেলনগুলিতে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার প্রচার করা হয়।
আলিগড় আন্দোলনের নেতারা মুসলিম সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বজায় রাখার জন্য মুসলিম সম্প্রদায়কে সরকারের আস্থা অর্জন করার কথা বলেছিলেন। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্যার সৈয়দ আহমেদ খান সরাসরি ব্রিটিশ শাসনকে সমর্থন করেননি, তবে তিনি মনে করতেন যে মুসলমানদের উন্নতির জন্য সরকারের সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। যাইহোক, এইসময় বেশ কিছু মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ ও সরকারী চাকরি করার প্রবণতা দেখা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের পাশাপাশি সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে সৈয়দ আহমেদ খান পর্দা, বহুবিবাহ, দাসত্ব, বিবাহবিচ্ছেদ নিষিদ্ধ করেন ও বিধবা পুনর্বিবাহ, নারী শিক্ষার বিস্তার করার চেষ্টা করেছিলেন।
স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় মুসলমানদের সামাজিক অবস্থার উন্নতি করা। তাই তিনি আলিগড় আন্দোলনের সময় ভারতীয় মুসলমানদের রাজনীতি বিশেষ করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মতো রাজনৈতিক সংগঠন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি মুসলিমদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য এবং সরকারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে তবেই মুসলিমদের স্বার্থরক্ষা হবে। এছাড়া তিনি মনে করতেন যে, ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলমানরা অংশগ্রহণ করলে হিন্দুদের আধিপত্যের কারণে মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই কারণে সৈয়দ আহমেদ খান ক্রমশ ঔপনিবেশিক সরকারের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ এর ঘৃণ্য নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
মুসলিম সমাজের উপর আলিগড় আন্দোলনের এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েছিল। সৈয়দ আহমেদ খান সংকীর্ণতা এবং ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে গিয়ে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলাম ধর্মের সংস্কার করেছিলেন। এছাড়া আলিগড় আন্দোলন উর্দু সাহিত্যে একটি নতুন ধারার সূচনা করে। সৈয়দ আহমদ খান এবং তাঁর সহযোগীরা উর্দু ভাষায় লেখার পুরনো নিয়ম ত্যাগ করে একটি সহজ পদ্ধতিতে লেখালেখি শুরু করেন ফলত উর্দু ভাষা ও সাহিত্যে আধুনিক গদ্যরীতির বিকাশ ঘটে। আবার ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে আলিগড় আন্দোলন উর্দু আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের মতো বেশ কয়েকটি আন্দোলনের পূর্বসূরী হয়ে উঠেছিল।
এই আন্দোলনের ফলে আধুনিক, শিক্ষিত এক মুসলমান শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে। এছাড়া আলিগড় আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থান এবং বোঝাপড়ার মনোভাব দেখা যায়। ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ গঠনে এই আন্দোলনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এই আন্দোলনের ফলে মুসলমানরাও নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠে এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বা মুসলিম লীগে যোগদান করতে শুরু করে। এখানে বলা যায় যে, এই আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক জাগরণের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এই আন্দোলনের প্রতি অবদান স্বীকার করে ১৯২০ সালে ‘মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ’এর নাম পরিবর্তিত করে ‘আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়’ নাম রাখা হয়।
এই আলিগড় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে অনেক মানুষ পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করলেও মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল উলেমারা এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। দেওবন্দ আন্দোলনকারীরা এই আন্দোলনের বিরোধিতা করে আলিগড় আন্দোলনকে ব্রিটিশদের সমর্থক বলে মনে করত। এছাড়া তাদের বিশ্বাস ছিল যে, পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে ইসলামের ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই কারণে তারা আধুনিক শিক্ষার প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। পণ্ডিত রতন নাথ সরশার (Pandit Ratan Nath Sarsa), মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন (Munshi Sajjad Hossain) এবং আকবর এলাহাবাদীর (Akbar Allahabadi) মতো সমালোচকরা ‘আওআধ পাঞ্চ’ (Awadh Punch) নামক উর্দু ব্যঙ্গাত্মক পত্রিকায় সৈয়দ আহমেদ খানকে উপহাস করেন। এছাড়া প্যান-ইসলামবাদী চিন্তাবিদ জামাল আল-দীন আল-আফগানিও (Jamal al-Din al-Afghani) এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। তাছাড়া ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সাথে সহযোগিতা করে পশ্চিমা নীতিশাস্ত্র এবং রীতিনীতি প্রচারের জন্য মুসলমানদের মধ্যেও স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের সমালোচনা করা হয়। আবার পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু (Pandit Jawaharlal Nehru) সহ অনেক কংগ্রেস নেতা আলিগড় আন্দোলনকে সমর্থন করেননি, কারণ এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের সাহায্য করে মুসলিম জনজাতির স্বার্থরক্ষা করা। আর নেহরু ও জাতীয় কংগ্রেসের লক্ষ্য ছিল হিন্দু ও মুসলিম ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত একটি সংঘবদ্ধ ভারত গঠন করা। তাই অনেক সমালোচক মনে করতেন যে এই আন্দোলন ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি পৃথক রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি দিয়েছিল।
আলিগড় আন্দোলন এমন এক আন্দোলন যা শিক্ষা এবং সংস্কারের মাধ্যমে একটি ভাঙা সম্প্রদায়কে পুনর্গঠনে সাহায্য করেছিল। এই আন্দোলনের ফলে মুসলিম সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়। আলিগড়ের ‘মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ’ মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে একথাও স্বীকার্য যে, এই আন্দোলন ব্রিটিশ ভারতে পৃথক রাজনীতির ক্ষেত্রের জন্ম দিয়েছিল। আর এই পৃথকতা থেকে পরবর্তীকালে মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়, যার ফলে ভারতের জাতীয় আন্দোলন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ভারতীয় সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি এই আন্দোলন পরবর্তীকালে ভারতের সাম্প্রদায়িকতা প্রচারের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। এই আন্দোলনের ফলে ভারতের মুসলিমরা একটি উন্নত স্বতন্ত্র সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় লাভ করেছিল, তাই অনেকে আলিগড় আন্দোলনকে ভারতের মুসলিম সমাজের নবজাগরণ বলে চিহ্নিত করেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান