বিবিধ

মহারাজা

ভারতীয় উড়ান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া’ই ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্হা যারা তাঁদের বিলাসবহুল পরিষেবার মানকে চিহ্নিত করার জন্য মহারাজা (The Maharaja) ম্যাসকটটি ব্যবহার করে। ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় এই ‘মহারাজা’ ম্যাসকটটিই প্রথম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছে। প্রথম দর্শনেই ম্যাসকটটিকে রাজকীয় বলে মনে হয় এবং এই রাজকীয়তার প্রতীক হিসেবেই ‘মহারাজা’ বিখ্যাত। যদিও সময়ের সঙ্গে তাঁকে বিদায় নিতে হয়েছে ‘এয়ার ইন্ডিয়া’র লোগো থেকে। কিন্তু জাতীয় পরিবহনের চিহ্নস্বরূপ আজও ‘মহারাজা’ রয়ে গেছে লক্ষ ভারতীয়দের মনের মধ্যে। বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে এই ম্যাসকটটি। চলুন জেনে নেওয়া যাক কীভাবে এই ম্যাসকট জন্ম নিল আর কীভাবেই বা বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও ক্রমে তা অবলুপ্ত হয়ে গেল এয়ার ইণ্ডিয়ার লোগো থেকে।

১৯৩২ সালের ১৫ অক্টোবর জামশেদজী টাটা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ভারতে প্রথম বিমান পরিবহণ শুরু করেন। মূলত চিঠিপত্র আদান-প্রদান করার জন্য নিজস্ব বিমান পরিষেবা শুরু করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে জামসেদজী টাটা নিজেও একজন দক্ষ বিমানচালক ছিলেন। প্রথমদিকে বম্বের (অধুনা মুম্বাই) জুহু থেকে করাচি পর্যন্ত এই বিমান পরিবহন শুরু হয়। ১৯৪৬ সালে ভারত সরকার ‘টাটা সন্স’-এর থেকে উনপঞ্চাশ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। ২৯ জুলাই ১৯৪৬ সালে বাণিজ্যিকভাবে ‘এয়ার ইণ্ডিয়া’-র আত্মপ্রকাশ ঘটে। ববি কুকা নামে এক দক্ষ ব্যক্তি টাটা এয়ারলাইন্সে যোগদান করেছিলেন সেক্রেটারি হিসেবে। সেই টাটা এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিকীকরণ হওয়ার পরে জামশেদজী টাটা এয়ার ইণ্ডিয়ার চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হন এবং ববি কুকা এয়ার ইণ্ডিয়ার বাণিজ্যিক নির্দেশক পদে নিযুক্ত হন। তিনি এয়ার ইণ্ডিয়াকে একটি ব্র্যাণ্ড হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেন। তাঁদের বুকিং অফিস স্থাপিত হয় বম্বের (অধুনা মুম্বাই) চার্চগেটে। স্বাধীনতার পরে ১৯৪৮ সালে বম্বে থেকে লণ্ডনের হিথ্‌রো বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রথম আন্তর্জাতিক উড়ান শুরু হয় এয়ার ইণ্ডিয়ার।

মনে রাখতে হবে, ১৯৪৬ সালেই বাণিজ্যিকীকরণ ঘটে গেছে এয়ার ইণ্ডিয়ার। ফলে তারা তাদের পরিষেবাগুলি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করে। সেইসময় এয়ার ইণ্ডিয়ার বাণিজ্যিক নির্দেশক ববি কুকা এয়ার ইণ্ডিয়ার লেটারপ্যাডে একটি লোগো ব্যবহার করার জন্য প্রথম একটি ম্যাসকট কল্পনা করেন। ম্যাসকটে দেখা যায় হাত জোড় করে বিনয়ের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভারতীয়কে যার পরনে রয়েছে লাল রঙের শেরওয়ানি, হলুদ চোস্তা, মাথায় ডুরি পাগড়ি, পায়ে বুট জুতো। এর সঙ্গে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় ছিল তার টিকালো নাক ও চোখে পড়ার মত গোঁফ জোড়া। একেবারে খোদ ভারতীয় নবাবের চিত্রিত রূপ। এই সেই বিখ্যাত ‘মহারাজা’। মজার বিষয় হল, ‘মহারাজা’র গোঁফ জোড়া জামশেদজী টাটার বন্ধু সৈয়দ ওয়াজিদ আলীর গোঁফের অনুকরণে এঁকেছিলেন ববি কুকা। তাঁর এই রূপ ছিল পরিপূর্ণভাবে ভারতীয় রাজার। ববি কুকার কল্পনাকে বাস্তব রূপ প্রদান করেছিলেন উমেশ রাও যিনি বম্বের বিজ্ঞাপন সংস্হা ‘জে থম্পসন লিমিটেড’ কোম্পানির একজন শিল্পী ছিলেন। ফলে উমেশ রাও এবং ববি কুকা উভয়ে মিলে এয়ার ইণ্ডিয়ার জন্য এই ম্যাসকটটি তৈরি করেন এবং নাম রাখেন ‘মহারাজা’। এই ম্যাসকটের বর্ণনা দিতে গিয়ে তাঁর স্রষ্টা বলেছেন যে, তাকে দেখতে মহারাজার মতো হলেও তাঁর নীল রক্ত (Blue Blood) ছিল না। যদিও তাকে রাজার মতো দেখতে, তবু এই মহারাজা আসল রাজা নয়। সেই সময়ে ভারতে বিমানযাত্রা ছিল বিলাসিতার প্রতীক, সাধারণ মানুষের কাছে যা রাজসুখের মতো। ‘মহারাজা’ ম্যাসকটটি তখন রাজকীয়তার প্রতীক হিসেবেই প্রচারিত হত। উচ্চতর জীবন, ঔজ্জ্বল্য আর শৌখিনতার প্রতীক ছিল ‘মহারাজা’। একেবারে প্রথম বিজ্ঞাপনে ‘মহারাজা’কে দেখা যায় গালিচায় বসে তিনি হুঁকো খাচ্ছেন, গড়গড়ায় টান দিচ্ছেন। বিমানযাত্রীদের মধ্যে এই বিজ্ঞাপনটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। ‘মহারাজা’ ম্যাসকটটিই ভারতের প্রথম ম্যাসকট হয়ে ওঠে যা সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে ভীষণভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। লেটারপ্যাডের একটি ছোট্ট লোগো থেকে জীবন্ত মানুষ হয়ে ওঠে ‘মহারাজা’। সারা পৃথিবীতে এয়ার ইণ্ডিয়ার নতুন নতুন গন্তব্যে ‘মহারাজা’কে প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা যায়। কখনও তাঁকে লণ্ডনের বিগ বেনের পাশে, কখনও জুডোকাসের সঙ্গে কুস্তি করতে, আবার কখনও বা প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের পাশে দেখা যায় ‘মহারাজা’কে। ববি কুকা এই ‘মহারাজা’ ম্যাসকটটির মাধ্যমে ‘এয়ার ইণ্ডিয়া’কে বিশ্বব্যাপী অন্যতম সর্বাধিক আর্কষণীয় ব্র্যাণ্ডে পরিণত করেছিলেন।

বিনয়ের প্রতিমুর্তি হিসেবে সকলের কাছে প্রিয় ‘মহারাজা’। তাঁকে শুধু বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশেই দেখা যায়নি, ‘মহারাজা’কে আমরা বিভিন্ন রূপেও দেখতে পেয়েছি। কখনও প্যারিসের ‘লাভার বয়’, কখনও ব্যাঙ্ককে নর্তকী হিসেবে, জাপানের সুমো রেসলার হিসেবে, নিউইয়র্কের জনসাধারণ হিসেবে, আবার কখনও তিব্বতের সাধুরূপে মহারাজা বিজ্ঞাপনের পাতায় উঠে এসেছেন। মহারাজার অসাধারণ রসবোধ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। দেশেই শুধু নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও যেখানে যেখানে ভারতীয় চিত্রকলা ও নৃত্যকলা সমাদৃত হয়েছে সেইসব জায়গায় ‘মহারাজা’ সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছে, পেয়েছে বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার। সে একজন বন্ধু হিসেবেই বিমানযাত্রীদের পাশে থেকেছে। তাঁর উষ্ণ অভ্যর্ত্থনা অভিভূত করেছে সকল যাত্রীদের। যাত্রীরাও তাঁকে নিজেদের মানুষ ভেবেই আপন করে নিয়েছে। এয়ার ইণ্ডিয়ায় ভ্রমণকালে অনেকেই ‘মহারাজা’র প্রতিকৃতি সংগ্রহ করে রাখতেন।
কিন্তু ১৯৭৭ সালে জামশেদজী টাটার চেয়ারম্যান পদ থেকে অবসর গ্রহণ করার পরে আশির দশকে এয়ার ইণ্ডিয়ায় বারংবার চেয়ারম্যান পরিবর্তনের ফলে ‘মহারাজা’র উপরে তার প্রভাব পড়ে। আশির দশকের চেয়ারম্যানরা মহারাজাকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক রূপ দেওয়ার পরিবর্তে তাঁকে মেরে ফেলার চেষ্টা করতে থাকেন এবং বেশ কিছু বছর তাঁকে ‘এয়ার ইণ্ডিয়া’র লোগো থেকে সরিয়ে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত একটি সুযোগ এসে উপস্থিত হয় তাদের সামনে। ১৯৮৯ সালে ‘মহারাজা’ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সমাজতান্ত্রিক প্রচারের উদ্দেশ্যে একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করার কারণে এয়ার ইণ্ডিয়া কর্তৃপক্ষ দ্বিধান্বিত হয়ে এই ম্যাসকটটিকে তাদের লোগো থেকে বাদ দিয়ে দেন। কিন্তু সারা পৃথিবী জুড়ে জনপ্রিয়তার কারণে যাত্রীদের মধ্যে মহারাজাকে ফিরিয়ে আনার দাবি ওঠে। প্রবল চাপের মুখে এয়ার ইণ্ডিয়া ‘মহারাজা’কে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়।

২০০০ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন রাজ্যসভায় এয়ার ইণ্ডিয়ার একান্ন শতাংশ শেয়ার বেসরকারীকরণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। তাঁর সেই পথকেই অনুসরণ করে ২০১৭ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রস্তাব রাখেন ‘মহারাজা’ ম্যাসকটটিকে এয়ার ইণ্ডিয়া থেকে সরিয়ে আনার এবং ‘এয়ার ইণ্ডিয়া’কে উচ্চবিত্তদের আওতা থেকে বাইরে এনে সাধারণ মানুষের কাছে আরো সুলভ করার নির্দেশ দেন তিনি। সেই বছরই ‘মহারাজা’কে জিন্স, টি-শার্টে একদম আধুনিক রূপে দেখা যায় শেষবারের মতো। বর্তমানে এয়ার ইণ্ডিয়ার লোগো থেকে ‘মহারাজা’ ম্যাসকটটিকে সরিয়ে কোনারক সূর্যমন্দিরের চাকাটিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।