১৯৫৮ সালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, প্রতিবাদ, বিক্ষোভের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন বলবৎ করে। বিশেষত মণিপুর, নাগাল্যাণ্ড এবং অসমের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এই আইনটি নিয়েই পরবর্তীকালে সামরিক অত্যাচার, ধর্ষণের পাশাপাশি আরও নানা অভিযোগকে সামনে তুলে ধরে, দেশ জুড়ে এই আইনের বিরুদ্ধে চলে সমালোচনার ঝড় এমনকি এই আইনকে অনেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বলেও চিহ্নিত করেছেন। মণিপুর থেকে এই আইন প্রত্যাহারের দাবীতেই দীর্ঘ ১৬ বছর অনশন করেছিলেন ইরম শর্মিলা চানু। ফলে ভারতের রাজনৈতিক আবহে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই বিশেষ আইনটি সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৯৫৮ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক এই আইন প্রচারিত হলেও ব্রিটিশ শাসিত ভারতে ১৯৪২ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার প্রথম এই আইন চালু করেছিল মূলত ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে দমন করার জন্য। সেই সময় সমগ্র ভারতকে চারটি বিভাগে ভাগ করে তার জন্য পৃথক পৃথক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। সেই বিভাগগুলির মধ্যে ছিল বাংলার উপদ্রুত অঞ্চল, অসমের উপদ্রুত অঞ্চল, পূর্ববাংলার উপদ্রুত অঞ্চল এবং যুক্তপ্রদেশের উপদ্রুত অঞ্চল। স্বাধীন ভারতে ১৯৪৭ সালে দেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য ভারত সরকার এই আইনটি বজায় রাখে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৫৫ নং ধারায় বলা আছে যে ভারতের যে কোন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং সমস্ত প্রকার বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। ফলে তখন থেকেই এই আইনের একটা তাৎপর্য গড়ে উঠেছিল। নাগাল্যাণ্ডে ১৯৫১ সালে তৈরি হয়েছিল নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল নেশন এবং এই বিপ্লবী সমিতি ১৯৫২ সালে নাগাল্যাণ্ডে সাধারণ নির্বাচন বয়কট করে, পরবর্তীকালে সমস্ত সরকারি বিদ্যালয়ও বয়কট করে। ফলে এই অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে অসম সরকার নাগাল্যাণ্ডের পার্বত্য অঞ্চলে ‘আসাম মেন্টেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট, ১৯৫৩’ জারি করে এবং অসম রাইফেলস বাহিনীকেও নিয়োগ করে বিপ্লবীদের আটক করার জন্য। কিন্তু এতে কোন লাভ না হওয়ায়, ১৯৫৫ সালে অসম উপদ্রুত অঞ্চল আইন জারি করে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে আধা সামরিক বাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ নাগা ন্যাশনালিস্ট কাউন্সিল একটি সমান্তরাল সরকার গঠন করে ফেলে। এই চরম বিশৃঙ্খলা নিরশনের লক্ষ্যে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ ১৯৫৮ সালের ২২ মে অসম ও মণিপুরে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা অধ্যাদেশ জারি করে যা ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য যথা অসম, মণিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যাণ্ড, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও অরুণাচল প্রদেশে এই আইন বলবৎ করা হয়। সাধারণভাবে আফস্পা আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের সুপারিশই প্রাধান্য দেওয়া হয়। কোন রাজ্যের রাজ্যপাল সুপারিশ করতে পারেন, কিন্তু তা মানতে বাধ্য থাকে না কেন্দ্রীয় সরকার।
খুব সহজ করে বললে উপদ্রুত অঞ্চল বা বিশৃঙ্খলাপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেখানকার সেনাবাহিনীর উপর পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যার বলে সেনা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা, প্রয়োজনে সতর্ক করার পরে গুলি চালানো কিংবা জমায়েত সরিয়ে দেওয়া ইত্যাদি করতে পারে। তাছাড়া বিশেষ ক্ষেত্রে এই আইনের সহায়তায় ভারত সরকার নির্দিষ্ট অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করার ক্ষমতাও রাখে।
যদি কোন অঞ্চলে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ ব্যবস্থা ব্যর্থ হয় বিশৃঙখলা দমনে, স্থানীয় কোন সমস্যা যদি স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতের বাইরে চলে যায় সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার ঐ অঞ্চলে এই আফস্পা আইন বলবৎ করতে পারে। এই আইনের মোট ৬টি মুখ্য ধারা রয়েছে যেখানে বলা আছে –
১) সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে সতর্ক করে দেওয়ার পরেও সমস্যা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট অফিসার বা সামরিক বাহিনীর প্রধান তাঁকে গুলি করতে পারেন, তাতে মৃত্যু ঘটলেও এই আইন অনুযায়ী সেটাই ন্যায্য।
২) সন্দেহভাজন হিসেবে যে কোন ব্যক্তিকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করা যাবে।
৩) সন্দেহজনক সব গোপন ডেরা বা অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করে দেওয়া যাবে।
৪) সন্দেহভাজন কাউকে বা কোনও অস্ত্র উদ্ধার করতে উপদ্রুত এলাকার যে কোনও বাড়ি বা জায়গায় ঢুকে পড়তে পারবে সশস্ত্র বাহিনী।
৫) সন্দেহজনক যে কোনও গাড়িকে আটকে তল্লাশি চালাতে পারবে নিরাপত্তা বাহিনী।
৬) উপদ্রুত এলাকায় আফস্পা বলবৎ হলে কোনও ঘটনায় অভিযুক্ত সংশ্লিষ্ট অফিসারের বিরুদ্ধে কোনোরূপ তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
৭) সরকার কেন কোনও এলাকাকে উপদ্রুত বলে মনে করছে সেই সিদ্ধান্ত দেশের সাধারণ বিচার ব্যবস্থায় খতিয়ে দেখা যাবে না।
১৯৫৮ সালে প্রথম অসম ও মণিপুরের উপর এই আইন বলবৎ হওয়ার পরে খলিস্তানি আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে ১৯৮৩ সালে পাঞ্জাব ও চণ্ডীগড়ের উপরেও সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন বলবৎ করা হয়। সেক্ষেত্রে মূল আইনের ৪ ও ৫ নং ধারার সঙ্গে দুটি উপধারা যোগ করা হয় যাতে বলা হয় –
ক) বিপ্লবীদের উপস্থিতি বা আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতির সন্দেহে যে কোনো যানবাহনকে আটক করে অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে।
খ). কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে, সেনাবাহিনী সেক্ষেত্রে নিজের দায়িত্বে সমস্ত প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করতে পারে।
১৯৯০ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের উপর এই আইন বলবৎ করে ভারত সরকার। ২০১৬ সালের ৮ জুলাই এই আইনের ৬ নং ধারাটিকে প্রত্যাহার করে নেয় ভারত সরকার। ঐ বছরই ভারত সরকার অরুণাচল প্রদেশের তিনটি জেলা তিরাপ, চাংলাং ও লংডিং-এ এই আইন প্রসারিত করে এবং ২০১৮ সালে সেখানে এই আইনের মেয়াদ আরও ৬ মাস বাড়িয়ে ঐ অঞ্চলগুলিকে ‘উপদ্রুত অঞ্চল’ বলে ঘোষণা করা হয়।
সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন ভারতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরাট আলোড়ন তৈরি করেছিল। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই আইনটি প্রত্যাহার করার জন্য আন্দোলনে নেমেছিল। ২০০৪ সালে অসম রাইফেলসের হাতে কয়েকজন মণিপুরি নারীর ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে ১৫ জুলাই তারিখে মণিপুরের অসংখ্য নারী সেনাবাহিনীর এই ক্ষমতায়নের প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন। এর আগে ২০০০ সালে এই আইনকে কাজে লাগিয়ে মণিপুরে বিনা কারণে ১০ জনকে হত্যা করে সেনাবাহিনী। এই ঘটনার প্রতিবাদেই দীর্ঘ ষোলো বছর ধরে অনশনের মাধ্যমে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন মণিপুরি সমাজসেবী ইরম শর্মিলা চানু। জম্মু ও কাশ্মীরেও জনসুরক্ষা আইন, উপদ্রুত অঞ্চল আইন এবং এই সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইনের বলে আধা সামরিক বাহিনী, নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী কাশ্মীরের অধিবাসীদের উপর যথেষ্ট অত্যাচার চালাচ্ছে বলে অনেকেই বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলেন। এক সময় সমগ্র কাশ্মীরই সেনাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পরিণত হয়েছিল। সংবিধানের বত্রিশ নং ধারা অনুযায়ী কাশ্মীরবাসীদের সাংবিধানিক প্রতিকার চাওয়ার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন রাজ্যে এই আইন প্রত্যাহার করার দাবি নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে মানুষ।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান