ইতিহাস

অ্যামিদিও অ্যাভোগাড্রো

বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য নাম হলেন লোরেঞ্জো রোমানো অ্যামিদিও কার্লো অ্যাভোগাড্রো (Lorenzo Romano Amedeo Carlo Avogadro)। পেশায় উকিল হলেও পরবর্তীকালে অঙ্ক এবং পদার্থবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিজ্ঞানের জগতে প্রবেশ করেন অ্যাভোগাড্রো। ইতালিতে তিনিই ছিলেন প্রথম পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। এমনকি পিডমন্টে তিনিই প্রথম মেট্রিক ব্যবস্থা চালু করেন। আণবিক তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা আধুনিক বিজ্ঞানচর্চাকে ভীষণভাবে ত্বরাণ্বিত করেছিল। তাঁর অ্যাভোগাড্রো সূত্র আজও সমান প্রাসঙ্গিক। এক গ্রাম-অণু পরিমাণ যেকোনো পদার্থে যে সংখ্যক অণু থাকে, তাকে অ্যাভোগাড্রো সংখ্যা বলা হয়।  আণবিক তত্ত্বে অ্যাভোগাড্রোর অবদানের প্রতি সম্মান জানাতে তাঁর নামানুসারে এই নামকরণটি করা হয়।

১৭৭৬ সালের ৯ আগস্ট সার্ডিনিয়া এবং পিডমন্টের (Kingdom of Sardinia and Piedmont) বর্তমানে যা ইতালির অংশ, সেখানকার তুরিন (Turin) নামক একটি এলাকায় এক অভিজাত পরিবারে অ্যাভোগাড্রোর জন্ম হয়। তাঁর বাবা কাউন্ট ফিলিপ্পো অ্যাভোগাড্রো (Count Filippo Avogadro) ছিলেন একজন আধিকারিক এবং সেনেট সভার সদস্য। আনা মারিয়া ভার্সিলোন ছিলেন (Anna Maria Vercellone) বিয়েলার (Biella) একজন অভিজাত বংশের নারী।

অ্যাভোগাড্রো অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ১৭৯৬ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি যাজকীয় অনুশাসনে (Canon Law) ডক্টরেট উপাধি পান এবং তারপর থেকেই পারিবারিক ধারা অনুসরণ করে যাজকীয় আইনজীবী (Ecclesiastical Lawyer) হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি উপলব্ধি করেন যে এই পেশা তাঁর জন্য যথাযথ নয়। এরপর থেকেই তিনি নিজেকে অঙ্ক এবং পদার্থবিদ্যার হাতে সমর্পণ করেন। এই বিষয় দুটিকে তৎকালীন সময়ে ইতিবাচক দর্শন (Positive Philosophy) বলা হত। ১৮০৯ সালে ভার্সেলিতে (Vercelli) একটি উচ্চবিদ্যালয়ে তিনি পড়াতে শুরু করেন।

উনিশ শতকের শুরুর দিকে অণু-পরমাণু সম্পর্কে বিজ্ঞানমহলে বিশেষ ধারণা ছিলনা। অ্যাভোগাড্রো পদার্থের আণবিক গঠন সম্পর্কে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তিনি বিখ্যাত বিজ্ঞানী জন ডাল্টন (John Dalton) এবং যোশেফ গে-লুস্যাকের (Joseph Gay-Lussac) গবেষণা নিয়ে পড়াশোনা করেন। যোশেফ গে-লুস্যাকের আয়তনের সূত্র প্রকাশ পাওয়ার পরেই অ্যাভোগাড্রো তাঁর গবেষণা শুরু করেন। সবচেয়ে বড় যে সন্দেহ তাঁকে নিরসন করতে হতো তা ছিল অণু এবং পরমাণু সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব। অ্যাভোগাড্রো দেখান যে গ্যাসীয় পদার্থ অণু দ্বারা তৈরি, আর সেই অণু আবার পরমাণু দ্বারা তৈরি। তবে অ্যাভোগাড্রো স্পষ্ট করে অণু (Atom) এবং পরমাণু (Molecule) শব্দের উল্লেখ করেননি। তিনি তিন ধরণের অণুর উপস্থিতির কথা বলেছিলেন, যার মধ্যে একটি প্রাথমিক অণুর (Elementary Molecule)  উল্লেখ ছিল। এছাড়াও, কোনো পদার্থের ভরের (Mass) সংজ্ঞার ওপর বেশি জোর দেন যা পদার্থের ওজনের (Weight) থেকে আলাদা।

১৮১১ সালে জেন-ক্লড দিমিত্রির (Jean-Claude Delametheie) ‘জার্নাল অফ ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ন্যাচারাল হিস্ট্রি’তে (Journal of Physics, Chemistry and Natural History) আণবিক তত্ত্বের ওপর অ্যাভোগাড্রোর একটি যুগান্তকারী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৮২০ সালে তিনি তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Turin) পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৮২১ সালে বিপ্লবী কার্যকলাপে যুক্ত হওয়ার ফলে তাঁকে অধ্যাপনা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং বলা হয় উচ্চতর গবেষণার জন্য তাঁকে অধ্যাপনা থেকে বিরতি দেওয়া হয়েছে। যদিও ১৮৩৩ সালে তাঁকে আবার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিরিয়ে আনা হয়, এবং পরবর্তী কুড়ি বছর তিনি এখানেই পড়ান।

অ্যাভোগাড্রো দেখান যে সমান উষ্ণতা ও চাপে সমান আয়তন বিশিষ্ট দুটি গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে সমসংখ্যক অণু থাকে। এই সূত্রটিকে ১৮১২ সালে ‘অ্যাভোগাড্রো সূত্র’ হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হয়। এই সূত্র দেখায় যে সমান উষ্ণতা ও চাপে সমান আয়তনবিশিষ্ট প্রত্যেকটি গ্যাসের ভরের সঙ্গে তাদের প্রত্যেকের আণবিক ওজনের সম্পর্ক সমানুপাতিক। এই সূত্রের সাহায্যে কোনো গ্যাসীয় পদার্থের আয়তন জানা থাকলে তার ভরের ভিত্তিতে সেই গ্যাসীয় পদার্থের আণবিক ভর খুঁজে বের করা সম্ভব।

১৮১৮ সালে ফেলিসিটা মাজের (Felicita Mazze) সঙ্গে অ্যাভোগাড্রোর বিয়ে হয়। তাঁদের ছয়টি ছেলে ছিল। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে যে সামান্য তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে জানা যায় তিনি অত্যন্ত ভদ্র এবং ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন।

অ্যাভোগাড্রো তাঁর সুদীর্ঘ গবেষণাকালীন তথ্য একাধিক প্রবন্ধে লিখে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং তত্ত্বগুলি সমকালে বিজ্ঞানমহলে খুব সহজে গৃহীত হয়নি। যুগ যত এগিয়েছে, ততই তাঁর বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্ব মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। পরবর্তী বিজ্ঞানীরা নানান গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে অ্যাভোগাড্রোর প্রস্তাবিত তত্ত্ব যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য। ১৮৫৭ সালে রুডলফ ক্লসিয়াস (Rudolf Clausius) গ্যাসের গতিতত্ত্ব সম্পর্কিত আলোচনায় অ্যাভোগাড্রো সূত্রের স্বপক্ষে যুক্তি দেন। জ্যাকোবাস হেনরিকাস ভ্যান এট হফ (Jacobus Henricus van ‘t Hoff) দেখান যে দ্রবণের ক্ষেত্রেও অ্যাভোগাড্রোর তত্ত্ব প্রযোজ্য হতে পারে। ১৯১১ সালে  অ্যাভোগাড্রোর ১৮১১ সালের বিখ্যাত প্রবন্ধের শতবার্ষিকী উপলক্ষে তুরিনে একটি আলোচনাসভায় রসায়নবিদ্যায় তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে অ্যাভোগাড্রোকে আণবিক-পারমাণবিক তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

১৮৫৬ সালের ৯ জুলাই এই কীর্তিমান বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।