বাংলাদেশের রাজশাহী জেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ হল বাঘা শাহী মসজিদ বা বাঘা মসজিদ (Bagha Mosque)। বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের অন্যতম সুন্দর এই মসজিদটি প্রায় পাঁচশো বছরেরও বেশি পুরোনো। মসজিদটি তার অপরূপ স্থাপত্যশৈলীর জন্য দর্শনার্থীদের কাছে যেমন জনপ্রিয়, তেমনই স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এই মসজিদটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয়। বাংলাদেশের ৫০ টাকার পুরনো নোটে এবং ১০ টাকার একটি স্মারক ডাক টিকিটে প্রাচীন এই মসজিদের ছবি রয়েছে। বাঘা মসজিদ এবং এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারকারী পীর-দরবেশদের মাজার দেখার জন্য প্রতিবছর বহু মানুষ এখানে আসেন।
প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, হাজার বছর আগে বাগদাদের আব্বাসীয়া আমলের খলিফা হারুনুর রশীদের বংশধর হজরত মওলানা শাহ মুয়াজ্জিমউদ্দৌলা ওলি ঘর-সংসার ত্যাগ করে রাজশাহীর বাঘার গভীর জঙ্গলে চলে আসেন। এরপর সেখানে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য অধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেছিলেন। ওই সময়ই তিনি ঐতিহাসিক বাঘা শাহী মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। রাজশাহী জেলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৫২৩ থেকে ১৫২৪ সালের মধ্যে অর্থাৎ ৯৩০ হিজরিতে হোসেন শাহী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন হোসেন শাহের ছেলে সুলতান নুসরাত শাহ বাঘা মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। ১৫২৩ সালে এই মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ১৫২৪ সালে এই মসজিদের কাজ শেষ হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময় মসজিদের সংস্কার করা হয়েছে। ১৮৯৭ সালে মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙ্গে গেলে মসজিদের নতুন করে ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯৭৬ সালে গম্বুজগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়। মসজিদটি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত।
বাঘা শাহী মসজিদ সংলগ্ন ঐতিহাসিক চত্বরটি প্রায় ২৫৬ বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত। এই বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্যে মসজিদের মূল ভবনটিই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ভূমি থেকে প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচুতে মসজিদের আঙিনা নির্মাণ করা হয়েছে, যা সম্ভবত বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মসজিদকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল। এই মসজিদের দেয়ালগুলো প্রায় ৮ ফুট পুরু। ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, মসজিদটিতে একসময় মোট ১০টি গম্বুজ ছিল। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় গম্বুজটি ছিল বৃহৎ ও সুউচ্চ, যার ব্যাস ছিল প্রায় ৪২ ফুট। এছাড়া চারচালা ধাঁচের গম্বুজগুলোর ব্যাস ছিল প্রায় ২০ ফুট। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদের গম্বুজগুলো ধ্বংস হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন মসজিদটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। বাঘা শাহী মসজিদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ ফুট, প্রস্থ ৪২ ফুট এবং উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। একসময় এই মসজিদে প্রায় ৩০০ জন ইবাদতকারী একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারতেন।
বাঘা শাহী মসজিদ নির্মাণের সময় প্রধান উপাদান হিসেবে পোড়ামাটির ইট ব্যবহার করা হয়েছিল। পাশাপাশি চুন, সুরকি ও পাথরেরও ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন এই স্থাপত্যে সিমেন্ট বা লোহার রডের ব্যবহার না থাকলেও চুন–সুরকির সংমিশ্রণ, পুরু দেয়াল এবং সুসংগঠিত নির্মাণ কৌশলের কারণে মসজিদটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে রয়েছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর। বাংলার সুলতানি স্থাপত্যধারার সঙ্গে স্থানীয় বাঙালি উপাদান এবং পারস্য খোদাই শিল্পের সংমিশ্রণে এই মসজিদ একটি অনন্য ও অপরূপ রূপ লাভ করেছে। বাঘা শাহী মসজিদটি চারদিকে প্রাচীর দ্বারা ঘেরা। মসজিদের চারটি কোণে অলঙ্করণমূলক মিনার বা টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে, যাদের শীর্ষদেশ গম্বুজাকৃতির, যা মসজিদের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে।
মসজিদে প্রবেশের জন্য উত্তর ও দক্ষিণ দিকে কারুকার্যমণ্ডিত দুটি বৃহৎ ফটক ছিল, যার মধ্যে উত্তর দিকের ফটকটি বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া মসজিদটিতে মোট পাঁচটি প্রবেশপথ রয়েছে। এই প্রবেশপথগুলোর উচ্চতা প্রায় ১২ ফুট, যার ফলে মসজিদের ভেতরে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস প্রবেশ করতে পারে। মসজিদের প্রধান দরজার ওপর ফারসি ভাষায় খোদাই করা একটি শিলালিপি রয়েছে। গম্বুজগুলোর ভার বহনের জন্য মসজিদে ছয়টি স্তম্ভ বা পিলার ব্যবহৃত হয়েছে, যা কালো ব্যাসল্ট পাথর দিয়ে নির্মিত। মসজিদে মোট চারটি মেহরাব রয়েছে, যেগুলোতে আম, গোলাপসহ বিভিন্ন ফুল ও জ্যামিতিক নকশার সূক্ষ্ম অলংকরণ দেখা যায়। পোড়ামাটির ফলক ও খোদাই করা নকশায় মসজিদের দেয়াল ও অভ্যন্তরভাগ সুসজ্জিত করা হয়েছিল।
মসজিদের ভেতরের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি উঁচু স্থান রয়েছে। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী এই স্থান সুলতানের জন্য সংরক্ষিত একটি বিশেষ স্থান, যার নাম ‘বাদশা কা তখত’। এখানে সুলতান ও রাজ কর্মচারীরা নামাজ পড়তেন। মসজিদের ‘মাকসুরা’র সাহায্যে তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হত। এই মসজিদের ভিতরে এবং বাইরে সর্বত্র টেরাকোটার নানা নকশা রয়েছে। এখানে অসংখ্য আম, লিলি ফুল, ভেষজ উদ্ভিদ ইত্যাদির পোড়ামাটির ফলক আছে। এই সকল টেরাকোটার ফলকগুলিতে পারস্য শিল্পের ছাপ রয়েছে বলে মনে করা হয়। তাছাড়া মসজিদের দেওয়ালে আরবি এবং ফারসি ভাষার বিভিন্ন শিলালিপি রয়েছে। তবে এই মসজিদের অনেক পোড়ামাটির ফলক এখন নষ্ট হয়ে গেছে। ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অনুরূপ নকশা প্রতিস্থাপন করে মসজিদের কিছু সংস্কারের কাজ করার চেষ্টা করেছিল। সিরাজগঞ্জের টেরাকোটা শিল্পী মদন পাল খুব সূক্ষ্মভাবে এই কাজটি করেছিলেন। মদন পালের নকশার সঙ্গে আগের নকশার পার্থক্য অতি অল্প।
বাঘা শাহী মসজিদের পাশে ৫২ বিঘা জমির উপর একটি বিশাল দীঘি রয়েছে। নুসরাত শাহ জনকল্যাণের জন্য মসজিদের কাছে এই দীঘিটি খনন করেছিলেন। এই দীঘির চারপাশে সারি সারি নারকেল গাছ রয়েছে। মনে করা হয় যে, এই দীঘির মাটি, মসজিদ নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রতি বছর শীতকালে অসংখ্য পরিযায়ী পাখির কোলাহলে মসজিদ চত্বরটি কোলাহলপূর্ণ থাকে। এছাড়া এই মসজিদ প্রাঙ্গণের উত্তর দিকে হজরত শাহদৌলা এবং তাঁর পাঁচ সঙ্গীর একটি মাজার রয়েছে। মসজিদের পাশে জহর খাকি পীরের একটি সমাধি রয়েছে। এ ছাড়া এখানে রয়েছে বাঘা জাদুঘর। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দ্বারা পরিচালিত এই জাদুঘরটি বাঘা শাহী মসজিদে আগত দর্শনার্থীদের জন্য স্থাপন করা হয়েছিল। এই জাদুঘরে হাজার বছরের পুরোনো পুরাকীর্তি এবং সুলতানি ও মোঘল আমলের বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। ১৯৯৭ সালে এই মসজিদের কাছে খননকাজের সময় ৩০ * ২০ ফুটের একটি মহলপুকুর আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই পুকুরটি একটি সুড়ঙ্গ দ্বারা রাজপ্রাসাদের সাথে সংযুক্ত ছিল। তিন দিক থেকে নির্মিত সিঁড়ি বেয়ে এই পুকুরে নামতে হত। ধারণা করা হয় যে, রাজপরিবারের মহিলাদের ব্যবহারের জন্য এই পুকুর তৈরি করা হয়েছিল। তাছাড়া বাঘা শাহী মসজিদের কাছেই রয়েছে নারী মসজিদ। ছোট তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদে সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীরা নামাজ পড়তে আসতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
প্রতি বছর হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলিম, অসংখ্য পর্যটক এই মসজিদ এবং তৎসংলগ্ন দীঘি ও মাজারগুলি দেখতে আসে। এই মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় প্রতি বছর ঈদুল ফিতরের দিন থেকে শুরু করে তিন দিন ব্যাপী বাঘার মেলা হয়। গ্রামীণ এই মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ধরনের মানুষের সমাগম ঘটে। বাঘার মেলা প্রায় ৫০০ বছর পুরনো। এই মেলা দেখতে প্রচুর মানুষের সমাগম হয় বাঘা শাহী মসজিদে। শুধু মেলা নয়, এছাড়া বহু পুরোনো এই মসজিদে জুম্মার দিনে নামাজ আদায় করতে দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসে। প্রতিদিনই পুরুষ দর্শনার্থীরা এ মসজিদে নফল নামাজ পড়তে পারে। পবিত্র রমজানে এলাকাবাসী এই মসজিদে জুম্মা ও তারাবীহ নামাজ আদায় করেন। তাছাড়া এই মসজিদে মানুষরা আল্লাহর দরবারে মনের আশা পূরণের জন্য দোয়া করে। সঙ্গে অনেক মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষ নিজের মনের আশা পূরণের জন্য হাঁস, মুরগি, ছাগল টাকাসহ বিভিন্ন জিনিস মানত করে।
এই বাঘা শাহী মসজিদে প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত দর্শনার্থীদের সংখ্যা থাকে অনেক বেশি থাকে। এই মসজিদে সব ধর্মের মানুষই প্রবেশ করতে পারে। তবে এই মসজিদে প্রবেশের জন্য দর্শনার্থীদের রুচিশীল পোশাক এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হয়। এই মসজিদের শান্ত, নির্মল, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইবাদতকারীদের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। দর্শনার্থীরা এই মসজিদে যে টাকা দেয়, তা মসজিদের উন্নয়নের কাজেই ব্যয় করা হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান