সববাংলায়

বারুইপুর

পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার একটি অন্যতম ইতিহাস প্রসিদ্ধ জনপদ হল বারুইপুর(Baruipur)। কলকাতা মেট্রোপলিটান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (KMDA)’র আওতাধীন এই জনপদ ভৌগোলিক দিক থেকে ২২.৩৫° উত্তর ও ৮৮.৪৪° পূর্ব আক্ষিকে অবস্থান করছে। প্রশাসনিক দিক থেকে বারুইপুর শহরটি যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এবং বারুইপুর পূর্ব ও বারুইপুর পশ্চিম এই দুই বিধানসভা কেন্দ্রে বিভক্ত। বারুইপুর সাব ডিভিশন ৯টি থানা, ৭টি সম্প্রদায় উন্নয়ন ব্লক, ৭টি পঞ্চায়েত সমিতি, ৮০টি গ্রাম পঞ্চায়েত, ৫২৩ মৌজা, ৪৮২টি গ্রাম এবং ৩টি পুরনিগম নিয়ে গঠিত।

বারুইপুর » সববাংলায়

ঐতিহাসিক দিক থেকে এই জনপদ যথেষ্ট প্রাচীনত্বের ধারা বহন করে। ষোড়শ শতাব্দী নাগাদ পুরোনো ভাগীরথীর শাখা বরাবর কালীঘাট, বোড়াল, রাজপুর, মাহিনগর, বারুইপুর, বহরু, জয়নগর মজিলপুর প্রভৃতি জনপদ গড়ে উঠেছিল। ১৪৯৫ তে রচিত ‘মনসাবিজয়’ কাব্যে বিপ্রদাস পিপলাই এই অঞ্চলের অনেক স্থানের নাম উল্লেখ করেছিলেন। চাঁদ সদাগর কালীঘাট থেকে ভাগীরথী বেয়ে এখানে এসেই নেমেছিলেন। কেবল ‘মনসাবিজয়’ নয়, কবি অযােধ্যারাম রচিত ‘সত্যপীরের পাঁচালি’তেও বারুইপুরের উল্লেখ পাওয়া যায়।

“সাকু বানুমরে ভাঁটা বাইল বৈষ্ণবঘাটা
বারুইপুর করিল পশ্চাৎ।
বারাশত গ্রামে গিয়া নানা পাচার দিয়া।
পূজা দৈল অনাদি বিশ্বনাথ।।”

রত্নাকর সওদাগর এই জনপদ হয়েই তাঁর বাণিজ্য যাত্রা করেছিলেন।

এই অঞ্চলের নাম বারুইপুর হল কিভাবে সে নিয়েও গল্প গাথা কম নেই। কারও মতে,এই অঞ্চলে একদা বৃষ্টিপাতের প্রাবল্য থাকার ফলে এই অঞ্চলকে একসময় ডাকা হত ‘বারিপুর’ নামে। ‘বারি’ অর্থে জল বোঝায়। এই বারিপুর থেকেই বারুইপুর নাম এসে থাকতে পারে।

আবার অন্য আরেকটি মতানুসারে এই নামটি এসেছে ‘বারু’ থেকে। বারু মানে পান। একদা এখানে প্রচুর পানের আড়ৎ ছিল। বারুজীবি দের বাসস্থান থেকেই বারুইপুর নাম হয়ে থাকতে পারে।

একথা এখানকার অনেক নিবাসীই জানেননা হয়ত এই জনপদ শ্রী চৈতন্যদেবের পদধূলি ধন্য। পুরী যাওয়ার আগে এখানকারই আটিসার গ্রামে একরাত কাটিয়েছিলেন নিমাই।এখানকার একদা জমিদারদের মধ্যে লেঠেল রাখার চল ছিল খুব। এই লেঠেলদের প্রধানকে সর্দার বলা হত। এখানে তাই এখনো প্রচুর সর্দার পদবীধারীর বাস দেখা যায়।

বারুইপুরের সাথে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যোগসূত্র আছে একথা অনেকেই জানেন না। তাঁর বিখ্যাত দূর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের বেশ কিছুটা অংশ এখানেই লিখেছিলেন তিনি। নিজের স্মৃতি চারণায় তিনি এখানে থাকাকালীন সময়কে জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় বলেছেন। এই জনপদ আসলে বহু বিখ্যাত মানুষের পদধূলিধন্য। এখানকার ভূমিপুত্র ছিলেন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন মুখোপাধ্যায়।

লর্ড কর্ন‌ওয়ালিসের আমলে তৈরি বারুইপুরের রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো এখানকার অন্যতম বনেদি পুজো। জমিদার রাজবল্লভ চৌধুরী এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। শোনা যায় ঋষি অরবিন্দ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়িতে এসেছিলেন। এমনকি বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন এই বাড়িতে বসেই ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসের কিছুটা নাকি লিখেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যবহৃত সেই চেয়ার, টেবিল এখনও সযত্নে রাখা আছে জমিদার বাড়িতে। দুর্গাপুজো সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত ছাগ বলির প্রথা এখনও আছে। আগে ১০১ টি বলি হত, বর্তমানে সংখ্যাটা কমেছে। প্রথা মেনে আজও প্রতিমা বিসর্জনের পর নীলকন্ঠ পাখি ওড়ান রায়চৌধুরী বাড়ির কর্তারা। পুরাণ মতে, নীলকন্ঠ পাখিরাই কৈলাসে গিয়ে শিবকে খবর দেয় মা দুর্গা ফিরছেন। সেই বিশ্বাস আজও চলে আসছে এই বাড়িতে।

একসময় বাংলায় নীলচাষের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই অঞ্চল। উনিশ শতকে এখানে বিরাট লবণগোলাও ছিল। ১৮৮২ সালে শিয়ালদা থেকে প্রথম বাষ্পচালিত ট্রেন চলাচল শুরু হয় বারুইপুর পর্যন্ত। লোকমুখে একথা শোনা যায় এই বাষ্পচালিত ট্রেনের ইঞ্জিনে জল দেওয়ার জন্য স্টেশনের কাছেই পুকুর কাটা হয়। ওই পুকুর থেকে মোটা পাইপের পাম্পের/কলের মাধ্যমে জল তোলা হত। সেই পুকুরই আজ লোক মুখে কলপুকুর। অরবিন্দ ঘোষ তাঁর লেখায় বারুইপুরকে বিপ্লবী কাজকর্মের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এখানকার গাজন উৎসব ও যথেষ্ট বিখ্যাত। এখানে একসময় লাঠি খেলা হত।

বারুইপুরের জমিদার ১৮২৪ সালে ৬৫০০ টাকা খরচ করে কলকাতা থেকে বারুইপুর পাকা সড়ক সংস্কার করেন। বারুইপুর থেকে মগরহাট পর্যন্ত ট্রেন লাইন ১৮৮৩ সালে সম্প্রসারিত হয়। বারুইপুর থেকে লক্ষ্মীকান্তপুর পর্যন্ত ট্রেন লাইনের ভিত্তিপ্রস্তর ১৯২৭ সালের নভেম্বর মাসে স্থাপন করা হয়। বারুইপুরে বাস চলাচল শুরু হয় ১৯৪৮ সাল বা তার কাছাকাছি সময়ে। ৮০এ রুটের বাসটি বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে যাদবপুর হয়ে বারুইপুর রাসমাঠ পর্যন্ত। আর একটি ৮০ চলত টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপাে থেকে নাকতলা গড়িয়া হয়ে বারুইপুর রাসমাঠ। এই দুটো ছিল বারুইপুরের প্রথম বাসরুট।

এখানকার উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলি হল বারুইপুর কলেজ, আল আমীন মেমোরিয়াল মাইনরিটি কলেজ বারুইপুর হাই স্কুল। শতাব্দী প্রাচীন এই বিদ্যালয় ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত। এছাড়াও বারুইপুর গার্লস হাই স্কুল, ওয়েলকিন ন্যাশনাল স্কুল, রাসমণি বালিকা বিদ্যালয় ইত্যাদি।

আটঘরাতে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এখানকার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে পড়ে কল্যাণপুরের কল্যাণ মহাদেব মন্দির। এখানকার ধবধবী গ্রামের দক্ষিণ রায়ের মন্দির যথেষ্ট প্রসিদ্ধ। বারুইপুর মিউজিয়াম এখানকার অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। এখানে গঙ্গারিডি বংশ থেকে শুরু করে সেন, পাল, কুষান,গুপ্ত বংশের অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রাখা আছে। পুরাতন বাজারের কাছে অবস্থিত শ্রী চৈতন্যদেবের মন্দির, কাছারি বাজারে অবস্থিত বিশালাক্ষী মন্দির। এছাড়াও এখানকার কালিদাস দত্ত মেমোরিয়াল মিউজিয়াম ও সুন্দরবন রিজিওনাল মিউজিয়াম এখানকার প্রাচীন ইতিহাসের অনেক সাক্ষ্য বহন করছে।

এতো গেল বারুইপুরের প্রাচীন গৌরবের জয়গাথা। এক বিংশ শতাব্দীতে বারুইপুরকে তার অধিবাসীরা কিভাবে  তার গৌরবোজ্জ্বল মুকুটে একের পর এক সাফল্যের পালকে মহিমান্বিত করেছে নীরবে, কিভাবে সবার অগোচরে তারা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সেটাও বরং জেনে নেওয়া যাক এই অবসরে

প্রথমেই বারুইপুরের ভূমিপুত্র উজ্জ্বল সর্দারের কথা বলতেই হয়। অসম বিদ্যালয় থেকে সুন্দরবনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ব্রিটিশ যুগের সুন্দরবনের দলিল থেকে চিঠি, দস্তাবেজ এবং পত্রপত্রিকা যেমন রয়েছে তেমন রয়েছে ১৭৫০ শকাব্দের পুঁথি, ১৯৪৭ সালের প্রশ্নপত্র, তুলোট কাগজে লেখা পুঁথি সহ আরও দুষ্প্রাপ্য সব প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহ।

এরপর বলতেই হয় বারুইপুরের শহিদুল লস্করের কথা। শহিদুলের বোন মারুফা ছোট থেকেই ক্যানসারে আক্রান্ত। অর্থনৈতিক অনটনে চিকিৎসার অভাবে শহিদুলের বোন মারা যান। এরপরই শহিদুল শপথ নেন তাঁর গ্রামে বিনামূল্যের হাসপাতাল তৈরি করবেন মৃত বোনের স্মৃতিতে। হাসপাতাল তৈরির স্বপ্নে শহিদুল ট্যাক্সি চালাতে শুরু করেন এবং একসময় তাঁর স্বপ্নকে সে সত্যি পরিণত করে তৈরি করেন বিনামূল্যের মারুফা মেমোরিয়াল হাসপাতাল। তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে লাইভ মন কী বাত অনুষ্ঠানে অংশ নেন শহিদুল। 

বারুইপুর বাইপাশের ওপর অবস্থিত ‘আকাশের কাছে’ নামের মন্দিরটি সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র প্রেমের মন্দির। এখানে এসে প্রেমিক প্রেমিকারা তাদের প্রেমের স্থায়িত্বের কামনা জানিয়ে প্রার্থনা করে যান এখানে। এখানের আরাধ্য দেবতা মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা দেবদাস সর্দারের পুত্র আকাশ সর্দার।

সম্প্রতি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে বারুইপুরের টংতলায় একথা অনেক কলকাতাবাসীই এখনও জানেন না।

আনুমানিক ১৭০০ সালে বারুইপুর পশ্চিম বিধানসভার ২ নং শিখরবালি গ্রাম পঞ্চায়েতের ধনবেড়িয়া গ্রামে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মহামারী রোগের প্রকোপ থেকে বাঁচতে প্রাচীন লৌকিক দেবদেবীর যে পূজা শুরু হয়েছিল তা আজও সমানভাবে চলে আসছে। এখানকার জগাদি ঘাটে বনবিবি পূজা করে থাকেন ফকির সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

বারুইপুর থেকে জয়নগর-মগরাহাটকে বলা হয় রাজ্যের অন্যতম ফলভান্ডার।  বারুইপুরের কথা হবে আর সেখানকার জগদ্বিখ্যাত পেয়ারার কথা উঠবে না তা কি করে হয়। বারুইপুরে আগে চাষ হত ‘‌খাজা’‌ পেয়ারার। গত ১০/‌১২ বছরে খাজার সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘‌এলাহাবাদি’‌ পেয়ারা। এই পেয়ারা খাজার তুলনায় সাইজে ছোট হলেও স্বাদে অতুলনীয়। এখানকার ১০ থেকে ১২০০০ পরিবারের পেট চলে মূলত পেয়ারা থেকেই। তবে কেবল পেয়ারা নয় বারুইপুরের বোম্বাই লিচু এবং গোলাপ খাস আম এবং গোলাপ জামুনও জগদ্বিখ্যাত। 

বিশ্বজুড়ে এক সময় চিকিত্সকদের প্রথম পছন্দ ছিল বারুইপুরের সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি৷ ডাক্তারি সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির জন্য এক সময় বারুইপুরের খ্যাতি এতটাই ছিল যে ইউরোপ -আমেরিকায় ব্যবহৃত সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি এই বারুইপুর থেকেই রপ্তানী যেত। কেবল তাই নয়, রাষ্ট্রপুঞ্জের শিল্পোন্নয়ন নিগম (ইউনিডো )-এর ম্যাপেও সার্জিক্যাল সিটি বলে সার্চ করলে বারুইপুর দেখাত একটা সময়। এখন অবশ্য এই শিল্পে বারুইপুরের সে সুদিন আর নেই।

বাজি শিল্পেও সারা বাংলায় বারুইপুর জায়গা করে নিয়েছে। বারুইপুর থানার অন্তর্গত চম্পাহাটির ‘হাড়ালে’ গ্রামের নামই হয়ে গিয়েছে ‘বাজি গ্রাম’। বিদ্যাধরী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এই গ্রামের জমি লবণাক্ত হওয়ায় একপ্রকার বাধ্য হয়েই জীবিকার টানে এই গ্রামের প্রায় ২০০টি পরিবার বাজি তৈরিকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছে।

অনেকেই জানেননা একসময় এই বারুইপুরে তৈরি ধূপকাঠি ইটালি, আমেরিকা থেকে শুরু করে মিশর এমনকি ব্রাজিলেও রপ্তানী হত। এখানকার ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ এই ধূপকাঠি তৈরি শিল্পের সাথে যুক্ত। এখানকার ফুলতলা, শাঁখারিপুকুর,কুলাড়ি, শসারি, জয়াতলা, ধপধপি,উত্তরভাগ এলাকায় এখনো প্রচুর ধূপকাঠি তৈরির ইউনিট রয়েছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুর থেকে এখানে এই ধূপকাঠি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে যান কিছু ওখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading