এই ডিসেম্বরে শীত ভালরকম জমিয়ে বসেছে পশ্চিমবঙ্গে। শীতকাল ঘোরার জন্য আদর্শ সময়। ভাবছেন তো কোথায় যাওয়া যায়? ডিসেম্বরে ঘুরে দেখুন বাংলার পাঁচ জায়গা।
১) বেলপাহাড়ি
আপনাকে যদি বলা হয় এই ডিসেম্বরে ঘুরে দেখুন বাংলার পাঁচ জায়গা, তাহলে সেই তালিকায় প্রথমের সারিতে অবশ্যই বেলপাহাড়িকে রাখবেন। ঝাড়গ্রাম জেলার এই সবুজে ঢাকা অঞ্চল ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই জেগে ওঠে পর্যটকদের পায়ের শব্দে। লালমাটির রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে বেলপাহাড়ির দিকে এগোলে প্রথমেই চোখে পড়ে ঘন শাল বন। জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে উজ্জ্বল রোদ এসে পড়ে – যেন প্রকৃতি উঁকি দিচ্ছে। বেলপাহাড়িতে বেশ কিছু হোটেল বা লজ রয়েছে। তাছাড়া কাছাকাছি ঝাড়গ্রাম শহরে আরও ভালো হোটেলে থাকার সুযোগও রয়েছে।
এখানের বিভিন্ন জলপ্রপাত বা বাঁধগুলো ছোট ট্রেক করার জন্য আদর্শ। দুপুরের দিকে পাহাড়ের মাথায় হালকা রোদে বেশ সুন্দর অনুভূতি হবে – শীতের দিনে সেই অনুভূতি আলাদা। স্থানীয় গ্রামগুলোতে হাঁটাহাঁটি করলে সাঁওতালি সংস্কৃতির ছাপ পাওয়া যায় – টেরাকোটার দেয়াল, মাটির ঘর আর বিকেলের দিকে গ্রাম্য ঢোলের শব্দ মিলিয়ে যায় বনের বাতাসের সঙ্গে। বেলপাহাড়ির আসল আকর্ষণ হল এর নীরবতা। শহরের ভিড় থেকে অনেক দূরে, এই জায়গায় বসে শোনা যায় ঝরনার আওয়াজ আর জঙ্গলের নৈশব্দ। শীতের সকালে পাহাড়ের ওপর জমে থাকা কুয়াশা একটু একটু করে সরে গেলে পুরো অঞ্চলটা যেন নতুন করে জন্ম নেয়। স্থানীয়দের কাছে বেলপাহাড়ি জনপ্রিয় পিকনিক স্পটও বটে – তবে ইচ্ছা করলেই এখানে শান্ত, নিরিবিলি সময় কাটানো যায়। বেলপাহাড়ি ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
২) জয়রামবাটি – কামারপুকুর
সারা বছর ধরে মানুষ জয়রামবাটি – কামারপুকুর ঘুরতে এলেও তা মূলত ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। তবে ডিসেম্বরে জয়রামবাটি–কামারপুকুরের পরিবেশ হয়ে ওঠে আরামদায়ক। মলিন শীতের রোদ আর গ্রামবাংলার সরলতার মিশ্রণে এই জায়গা হয়ে ওঠে একদম ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত। শীতকালে এখানকার শান্ত পরিবেশ আরও মন ছুঁয়ে যায়। সবুজ ধানক্ষেত, খোলা মেঠোপথ আর ভোরের কুয়াশা – এই মিলিয়ে জয়রামবাটি আর কামারপুকুর যেন নিজের মতো করে আপন করে নেয় পর্যটকদের।
জয়রামবাটির মাতৃমন্দিরে শীতের সকালে গেলে মন শান্ত হয়ে আসে। মন্দিরের চারপাশে সুশৃঙ্খল পরিবেশ, দর্শনার্থীদের ভক্তিভাব এবং স্নিগ্ধ বাতাস মিলিয়ে পুরো এলাকা খুবই প্রশান্ত। কামারপুকুরে পৌঁছালে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মস্থান, পুকুর, এবং ছোট ছোট মন্দিরগুলি দেখলে মনে হয় সময় যেন একটু ধীরে বইছে। স্থানীয় মঠ-পরিচালিত ধর্মশালা ছাড়াও এখানে বেশ কিছু লজ আছে, যেগুলোর পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও শান্ত এবং পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত। ধর্মীয় স্থান হলেও জয়রামবাটি–কামারপুকুরের প্রকৃতি এবং গ্রামের নীরবতা পর্যটকদের মনকে আলাদা করে ছুঁয়ে যায়। জয়রামবাটি – কামারপুকুর ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
আরও পড়ুন: বর্ধমানের জনপ্রিয় পিকনিক স্পট
৩) মুরুগুমা
আপনাকে যদি বলা হয় এই ডিসেম্বরে ঘুরে দেখুন বাংলার পাঁচ জায়গা, তাহলে সেই তালিকায় প্রথমের সারিতে অবশ্যই মুরুগুমাকে রাখবেন। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে থাকা মুরুগুমা জলাধার শীতকালেই তার মোহনীয় রূপে দেখা দেয়। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই মুরুগুমা লেকের জলরাশিতে পড়ে রোদের সোনালি আভা, আর পাহাড়ের মাথায় কুয়াশা জমে থাকে। এই দুই মিলিয়ে মুরুগুমা প্রকৃতিপ্রেমীদের আদর্শ শীতের গন্তব্য হয়ে ওঠে।
এখানে থাকার জন্য কিছু হোটেল এবং সুন্দর লেক-সাইড কটেজ পাওয়া যায়। যাদের ট্রেকিং পছন্দ, তারা সহজেই অযোধ্যা পাহাড়ের নিকটবর্তী ট্রেইল ধরে হাঁটতে পারেন। তবে মুরুগুমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এর নীরবতা। শহরের ব্যস্ততা থেকে পালিয়ে এখানে এলে মনে হয় সময় যেন থমকে গেছে। সন্ধ্যার সময় মুরুগুমায় তৈরি হয় অন্যরকম আবহ – লেকের ওপর ভাসতে থাকা হালকা কুয়াশা, আকাশে সোনালি বা কমলা রং, আর শীতের ঠান্ডা বাতাস মিলে তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। অনেকেই তখন লেকের ধারে হেঁটে বেড়ান, কেউ কেউ চুপচাপ বসে সূর্যাস্ত দেখেন। স্থানীয়দের কাছে মুরুগুমা পরিচিত পিকনিক স্পট হলেও জায়গাটা এতটাই বিস্তীর্ণ যে ভিড় মনে হয় না। মুরুগুমা ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
৪) ব্যান্ডেল
হুগলি নদীর ধারে অবস্থিত ব্যান্ডেল শীতের সময় ভ্রমণের জন্য একদম উপযুক্ত একটি জায়গা। ডিসেম্বরের হালকা ঠান্ডা আর স্বচ্ছ আবহাওয়ায় ব্যান্ডেলের ইতিহাসমণ্ডিত সৌন্দর্য যেন নতুন করে ফুটে ওঠে। পর্তুগিজদের পুরোনো বসতি হিসেবে ব্যান্ডেলের পরিচিতি অনেকদিনের, সঙ্গে এখানকার চার্চ, ইমামবাড়া ও নদীর ধারের পরিবেশ মিলিয়ে জায়গাটা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। হুগলি – চুঁচুড়া শহরের হোটেলগুলো থাকার জন্য সুবিধাজনক। স্থানীয়রা ছুটির দিনে এখানে পিকনিকও করতে আসে।
ব্যান্ডেল চার্চ এখানকার প্রধান আকর্ষণ। চার্চের ভিতরের স্থাপত্য, বিশাল প্রার্থনাসভা আর শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস পর্যটকদের অভিভূত করে। চার্চ থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ব্যান্ডেলের আরেক ঐতিহাসিক স্থান হল হুগলি ইমামবাড়া। এই ইমামবাড়ার মূল আকর্ষণ এর ক্লকটাওয়ার। প্রায় ১৫২টি সিঁড়ি অতিক্রম করে সেখানে উঠতে হয়। এর উচ্চতা আনুমানিক ১৫০ ফুট। সম্পূর্ণ ব্যান্ডেল ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
৫) টাকি
ইছামতী নদীর ধারে অবস্থিত টাকি শীতের সময়ে অদ্ভুত সুন্দর হয়ে ওঠে। ডিসেম্বরের সকালে নদীর ওপর জমে ওঠা সাদা কুয়াশা আর ওপারে বাংলাদেশের গ্রামের ছায়া – এই দুই মিলিয়ে টাকি এমন এক অনুভূতি দেয় যা বাংলার অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন। উত্তর ২৪ পরগনার এই শান্ত শহর শীতের শুরু থেকেই পর্যটকদের আহ্বান জানায়। থাকার জন্য এখানে বিভিন্ন রিসর্ট, হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে – সবই নদীর কাছাকাছি। তবে একদিনের ভ্রমণের জন্যই মূলত এখানে পর্যটকেরা আসে। টাকিতে স্থানীয়রা শীতে পিকনিক করতে খুব পছন্দ করে। নদীর ধারের খোলা জায়গায় দুপুরে আড্ডা, রান্নাবান্না আর খেলাধুলা – সব মিলিয়ে জায়গাটির উৎসবমুখর একটা অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু চাইলে এখানে খুব চুপচাপ, শান্ত সপ্তাহান্তও কাটানো যায়।
টাকির রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, মিনি সুন্দরবন এবং অন্যান্য বেশ কিছু প্রাচীন জায়গা রয়েছে, যেগুলো ঘুরে দেখলে বোঝা যায় এই অঞ্চলের ইতিহাস কত সমৃদ্ধ। তবে টাকির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল ইছামতীতে নৌকাবিহার। শীতে নদীর জল শান্ত থাকে, তাই নৌকায় চড়লে দূর পর্যন্ত দেখা যায় বাংলাদেশের মাটি। বিকেলে সূর্যাস্তের সময় নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু’দেশের সীমারেখা মিলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য একেবারে অবিস্মরণীয়। টাকি ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
আরও পড়ুন: ঝাড়গ্রামের জনপ্রিয় পিকনিক স্পট
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব সংকলন


আপনার মতামত জানান