আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “বিদুরের খুদ” । এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: শ্রদ্ধার সঙ্গে দান বা উপহার। বিদুর মহাভারতের চরিত্র তাই বলা বাহুল্য এই প্রবাদের উৎস খুঁজতে মহাভারতের কাহিনির দিকে নজর দিতে হবে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
চালজাতীয় শস্যের ক্ষুদ্র অংশ বা কণাকে বলা হয় খুদ। সাধারণভাবে, কোনও দীনহীন বা গরীব মানুষের শ্রদ্ধাসহকারে নিবেদন করা সামান্য উপহারকে ‘বিদুরের খুদ’ আখ্যায়িত করা হয়। এই কথাটি শুধু একটি প্রবাদ নয়, এর পিছনে রয়েছে মহাভারত-প্রসিদ্ধ চরিত্র বিদুরের ধর্মপরায়ণতা ও আত্মিক বিশুদ্ধতার দৃষ্টান্ত।
বিদুর ছিলেন মহাভারতের এক বিশিষ্ট চরিত্র। তিনি চন্দ্রবংশীয় মহারাজ শান্তনুর বংশে জন্মগ্রহণ করেন। শান্তনুর প্রথম স্ত্রী গঙ্গার গর্ভে জন্মেছিলেন ভীষ্ম, এবং দ্বিতীয় স্ত্রী দাসরাজকন্যা সত্যবতীর গর্ভে চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। ভীষ্ম ছিলেন চিরকুমার, আর চিত্রাঙ্গদ অল্প বয়সে যুদ্ধে নিহত হন। বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রী ছিলেন কাশীরাজের কন্যা — অম্বিকা ও অম্বালিকা। বিয়ের সাত বছরের মধ্যে বিচিত্রবীর্য যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
তখনকার প্রথা অনুযায়ী, রাজবংশ রক্ষা ও বংশধর উৎপন্ন করার জন্য, সত্যবতী তাঁর কুমারী অবস্থায় ঋষি পরাশরের ঔরসে জন্ম নেওয়া পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শরণাপন্ন হন। বেদব্যাস অম্বিকার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র এবং অম্বালিকার গর্ভে পাণ্ডুর জন্ম দেন। বিচিত্রবীর্যের স্ত্রী অম্বিকার এক রূপবতী শূদ্র দাসীর গর্ভেও বেদব্যাস এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন — যাঁর নাম বিদুর।
শূদ্র মাতার সন্তান হওয়ায় বিদুর কখনও রাজসিংহাসনের অধিকার পাননি, কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা, ধর্মজ্ঞান ও ন্যায়পরায়ণতা তাঁকে হস্তিনাপুরের রাজমন্ত্রীসভায় অসাধারণ মর্যাদা এনে দেয়। ধর্ম ও নীতিবিষয়ে তিনি ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী। কৌরবদের মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও, তাঁদের অন্যায় আচরণ ও লোভের বিরুদ্ধে বারবার সতর্ক করেছিলেন, এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে অনড় থেকেছেন।
বিদুরের বিবাহ হয়েছিল বিদর্ভরাজ আহুকের পুত্র দেবকের এক শূদ্রা স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া এক ব্রাহ্মণ ঔরসজাত সুন্দরী কন্যার সঙ্গে। উল্লেখযোগ্য যে, দেবকের অন্য সাত কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পিতা বসুদেব, এবং দেবকী ছিলেন সেই সাত কন্যার অন্যতম। এই সূত্রে বিদুর ও বসুদেব পরস্পরের ভায়রা, অর্থাৎ বিদুর ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের মামা বা খালু।
মহাভারতের ‘উদ্যোগপর্ব’ এ বর্ণিত একটি ঘটনার সূত্রে এই প্রবাদটির জন্ম। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর আগে শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের দূত হয়ে শান্তির প্রস্তাব নিয়ে কৌরবদের কাছে হস্তিনাপুরে যান। সেই সময় দুর্যোধন রাজপ্রাসাদে রাজকীয় ব্যবস্থা করে শ্রীকৃষ্ণকে নিমন্ত্রণ জানান। শ্রীকৃষ্ণ সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ না করে বলেন: “দূতগণ কাজ সমাধা হবার পরই ভোজন গ্রহণ করে থাকেন। আমি এখনও আমার কাজ শেষ করিনি; আমি বিপন্নও নই, আর আপনি আমাকে প্রীতিপূর্বকও আহ্বান করছেন না। তাই নিরপেক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ মহাত্মা বিদুরের গৃহেই আতিথ্য গ্রহণ করা আমার উপযুক্ত বলে মনে হয়।”
এরপর শ্রীকৃষ্ণ রওনা হন বিদুরের ঘরের উদ্দেশ্যে। যদিও বিদুর রাজমন্ত্রী ছিলেন, তবুও তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তাঁর বাড়িতে দারিদ্র্যের ছাপ ছিল স্পষ্ট — প্রতিদিনের আহার জোটানোও তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না। নানা কিংবদন্তি অনুসারে, গৃহস্থালি সামগ্রী বা সম্পদের অভাবে বিদুর শ্রীকৃষ্ণকে রাজকীয় ভোজে আপ্যায়ন করতে পারেননি। তাই ঘরে যা ছিল — সেই সামান্য চালের খুদের ভাত দিয়েই তিনি অতিথিকে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করেন। আর শ্রীকৃষ্ণ তা গ্রহণ করেন পরম তৃপ্তির সঙ্গে।
এই ঘটনাই পরবর্তীতে ‘বিদুরের খুদ’ প্রবাদের উৎস হয়ে ওঠে। ভক্তি, আন্তরিকতা ও সৎ মনোভাব থেকে সমর্পিত সামান্য উপহারও যে কতখানি মূল্যবান হতে পারে, তা এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত। আজও কেউ আন্তরিকভাবে সাদাসিধে আপ্যায়ন করলে বা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে গিয়ে বলেন: “এ আমার বিদুরের খুদ।”
‘বিদুরের খুদ’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:
১। গ্রামের গরীব মানুষের বাড়ি গেলে তারা বিশাল আয়োজন করতে না পারলেও তাদের আন্তরিক আপ্যায়ন যেন ‘বিদুরের খুদ’।
২। অনাদরের ভূঁড়িভোজের থেকে ‘বিদুরের খুদ’ পেলেই আমি খুশি।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১০৮ পৃঃ
- https://m.somewhereinblog.net/


আপনার মতামত জানান