ইতিহাস

বিমান বিহারী মজুমদার

বিংশ শতকের প্রথম দিকের ইতিহাস ও অর্থনীতির পণ্ডিত পাশাপাশি বৈষ্ণব সাহিত্যের এক অন্যতম লেখক ও কবি ছিলেন বিমান বিহারী মজুমদার (Biman Bihari Majumdar)।

১৯০০ সালের ৭ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কুমারখালিতে জন্ম হয় বিমান বিহারী মজুমদারের৷ তাঁর বাবা শ্রীশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক যিনি বেশ কিছুকাল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা পরিচালনা করেছিলেন৷ পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বৈষ্ণবপদসংকলন ‘পদরত্নাবলী’ সম্পাদনাও করেন তিনি৷

বিমান বিহারী মজুমদারের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় নবদ্বীপের স্কুলে। সেখানকার হিন্দু স্কুল থেকেই ১৯১৭ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করেন৷ এরপর তিনি ভর্তি হন বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজে৷ সেখানে তিনি ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করে স্নাতক হিসেবে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন৷ স্নাতক স্তর শেষ করে তিনি স্নাতকোত্তর ভর্তি হন এবং ১৯২৩ সালে ইতিহাসে এম.এ পরীক্ষায় প্ৰথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীকালে অর্থনীতির ওপরও তিনি স্নাতকোত্তর করেন। ‘চৈতন্যচরিতের উপাদান’ নামক গবেষণা-গ্ৰন্থ বাংলায় রচনা করে তিনি ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পি-এইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।

বিমান বিহারীর কর্মজীবন শুরু হয় পাটনা বি. এন. কলেজে ইতিহাস ও অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে৷ তাঁর জীবনের বেশীরভাগ সময়টা পাটনাতেই কেটেছে৷ ১৯৪৫ সালে বিহারের আরায় হরপ্রসাদ জৈন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন বিমান বিহারী। এরপর ১৯৫২ সালে বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ-পরিদর্শক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। বিমান বিহারী ইতিহাস এবং অর্থনীতি বিষয়ে পন্ডিত ব্যক্তি হলেও বৈষ্ণব সাহিত্য নিয়েও তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা এবং সম্পাদনা করেছেন৷ ফলে বৈষ্ণব সমাজে তাঁর স্থান ছিল শীর্ষে।

পাটনার বি.এন কলেজে অধ্যাপনার সময়ে তিনি ‘History of Political Thought: From Rammohun to Dayananda: 1821–84’ এবং এইসঙ্গে এর সহায়ক গ্ৰন্থ ‘History of Religious Reformatinion in India in the Nineteenth century’ গ্ৰন্থ রচনা করেন এবং যার জন্য পরবর্তীকালে তিনি প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন।

১৯৫৯ সালে তিনি তাঁর কর্মজীবন থেকে অবসর নেন। ১৯৬৫ সাল থেকে যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিসি গবেষক অধ্যাপক হিসেবে তিনি নিযুক্ত ছিলেন। বিমান বিহারী সম্পাদিত ও সঙ্কলিত গ্ৰন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৬০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত ‘চণ্ডীদাসের পদাবলী’, ১৯৬১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘গোবিন্দ দাসের পদাবলী ও তাঁহার যু্গ’, ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী সাহিত্য’, একই বছর প্রকাশিত হয় ‘পাঁচশত বৎসরের পদাবলী’ ও ‘শ্ৰীশ্ৰীক্ষণদাগীতচিন্তামণি’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলি।

বিমান বিহারী সম্পাদিত ‘পাঁচশত বৎসরের পদাবলী’ বইটির পরিশিষ্টে তিনি সমৃদ্ধিমান সম্ভোগ পর্যায়ে কুরুক্ষেত্রে রাধাকৃষ্ণের মিলন লীলার পদাবলী গীত রচনা করেছেন। সেই বক্তব্য উল্লেখ করে পরিশিষ্টের মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন, “সমৃদ্ধিমান্ সম্ভোগ পর্যায়ে কুরুক্ষেত্রে রাধাকৃষ্ণের মিলন একটি বিশেষ লীলা। এটি গীত না হইলে চৌষট্টি রসের কীর্তন পূর্ণ হয় না ; অথচ এ বিষয় কোনো পদ নাই। তাই নিতান্ত অক্ষম হইলেও সংকলয়িতা তাঁহার গুরুদত্ত নাম, নিতাই ভণিতা দিয়া আধুনিক ভাষায় কয়েকটি পদ রচনা করিয়াছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অনেক আগে, সনাতন গোস্বামীর মতে রাজসূয় যজ্ঞের পরে (শ্রীমদ্ভাগবতের বৃহদ্বৈষ্ণবতোষণী টীকা ১০।৮২। কিন্তু শ্রীজীব গোস্বামীর মতে রাজসূয়ের পূর্বে ( শ্রীকৃষ্ণ সন্দর্ভ ১৭৪ ), সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে সমাগত শ্রীকৃষ্ণের
সহিত ব্রজের গোপগোপীদের দেখাসাক্ষাৎ হইয়াছিল।”

ঊনসত্তর বছর বয়েসে ১৯৬৯ সালের ১৮ নভেম্বর বিমান বিহারী মজুমদারের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি


শ্রীকান্ত জিচকর
শ্রীকান্ত জিচকর

এনার সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।