ধর্ম

বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের দুর্গাপুজো

বিষ্ণুপুর বলতেই মনে পড়ে টেরাকোটা শিল্পের অভুতপূর্ব সব নিদর্শনের কথা, মনে পড়ে দলমাদোল কামান কিংবা রাসমঞ্চের কথা। বাংলার মন্দির স্থাপত্যের ইতিহাসে বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাঁকুড়ার প্রাচীন শিল্পকীর্তি, পুরাকীর্তির খাস এলাকা এই বিষ্ণুপুরের দুর্গাপুজোর ইতিহাসও অনেক প্রাচীন। দুর্গাপ্রতিমার শিল্পরীতির ক্ষেত্রে যে বিষ্ণুপুরের জগৎমল্লের রীতির কথা খুব বিখ্যাত, সেই জগৎমল্লই প্রচলন করেন বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো। বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের দুর্গাপুজো সমগ্র বাঁকুড়া জুড়েই এক বনেদিয়ানার স্মারক। প্রায় হাজার বছরের পুরনো এই পুজো নয়টি তোপধ্বনির রীতি চালু ছিল। জগৎমল্ল রাজাই প্রথম বিষ্ণুপুরে দেবী মৃন্ময়ীর মন্দির স্থাপন করেন। সেই থেকেই দেবী দুর্গার অনুরূপে মৃন্ময়ী মায়ের পূজা চলে আসছে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, ৩০৩ মল্লাব্দ নাগাদ বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের দুর্গাপুজো প্রথম চালু করেন জগৎমল্ল বিষ্ণুপুর রাজবাড়িতে। এই মল্লরাজারা এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন সে সময় যে, তাঁরা নিজেদের নামে বর্ষপঞ্জি চালু করেছিলেন। মল্লদের আদি রাজধানী ছিল জয়পুরের প্রদ্যুম্ননগরে, পরে ৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বিষ্ণুপুরে মল্লরা তাঁদের রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। ৩০৩ মল্লাব্দ মানে ৯৯৭ সাল। গঙ্গা থেকে মাটি তুলে এখানে দেবীর প্রতিমা নির্মাণ করা হয়। অন্যান্য জায়গার প্রতিমার থেকে বিষ্ণুপুরের দেবী প্রতিমার চালচিত্র অনেকটাই আলাদা। কার্তিক গণেশ অধিষ্ঠিত উপরের দিকে আর তাদের নীচে আছেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। দেবীর পিছনে ভূত-প্রেত, নন্দী-ভৃঙ্গিসহ শিবের অবস্থান লক্ষণীয়। অসুরদলনী দেবী মৃন্ময়ী একেবারে সামনে রয়েছেন। পঞ্চমীর তেরো দিন আগে থেকেই এখানে পুজো শুরু হয়ে যায়। কামানের তোপধ্বনির মাধ্যমে সমগ্র বাঁকুড়াবাসী জানতে পারে বিষ্ণুপুর রাজবাড়িতে পুজো শুরুর সংকেত। এই তোপধ্বনি দেওয়ারও বিশেষ নিয়ম আছে। রাজবাড়ির বিপরীতে গোপালসায়রে সপ্তমীর দিন নবপত্রিকা স্নান করানোর সময় প্রথমে তিনটি তোপধ্বনি পড়ে। দেবী প্রতিমা মন্দিরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তিনটি তোপধ্বনি দেওয়া হয় আর সবশেষে দেবীকে দুপুরে ভোগ অর্পণের পরে আরো তিনটি তোপধ্বনি দেওয়া হয়। এখানে মৃন্ময়ী দেবীকে ‘বড় ঠাকুরন’ নামেও ডাকা হয়। যদিও এখানে পটপুজোই প্রধান। তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পট আনা হয় যেগুলি বড় ঠাকুরন, মেজ ঠাকুরন এবং ছোট ঠাকুরন নামে পরিচিত। মূল দেবী প্রতিমার পাশে আলাদা আলাদা তিনটি স্থানে এই তিনটি পটকে বসিয়ে পুজো করা হয়। পুজোর রীতিতেও পার্থক্য রয়েছে। বড় ঠাকুরনের পুজোর সময় মহাকালী স্তোত্র, মেজ ঠাকুরনের বেলায় মহালক্ষ্মী স্তোত্র এবং সবশেষে ছোটো ঠাকুরনের ক্ষেত্রে মহাসরস্বতী স্তোত্র পাঠ করা হয়ে থাকে। পূজার সময়ের একেক দিন একেক পটের পূজা শুরু হয়। পূজার আগে আসেন জিতাষ্টমীর দিনে আসেন বড় ঠাকুরন, মান চতুর্থীর দিন আসেন মেজ ঠাকুরন আর সপ্তমীর দিন সকালে অধিষ্ঠিত হন ছোটো ঠাকুরন। প্রত্যেক পটের দেবীর শাড়ির বর্ণও হয় আলাদা আলাদা। মেজ ঠাকুরনের পরনে যেমন থাকে লাল শাড়ি আর ছোট ঠাকুরনের পরনে থাকে কমলা রঙের শাড়ি।

শোনা যায় যে, হাজার বছর আগে রাজা জগৎমল্ল ঘন জঙ্গলের মধ্যে আসেন একদিন শিকারের খোঁজে, সঙ্গে ছিল তাঁর পোষা বাজপাখিটি। আর সেখানেই অলৌকিকভাবে দেবী মৃন্ময়ী নাকি তাঁকে মন্দির প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। একটি বটগাছের তলায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন জগৎমল্ল আর সেখানেই পরে তিনি স্থাপন করেন মৃন্ময়ী মন্দির। অন্যান্য পুজোতে যেমন সাধারণভাবে কালিকাপুরাণ মানা হয়, কিন্তু বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের পুজোতে বলিনারায়ণী প্রথা মেনেই পুজো হয়ে থাকে। মল্লরাজারা প্রত্যেকেই হাম্বীর বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার কারণে দুর্গাপুজোয় পশুবলি প্রথা মানা হয় না। কামানের তোপ-গর্জনের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় সন্ধিপুজো। আর বিষ্ণুপুরের রাজবাড়ির তোপধ্বনি শুনেই জেলার অন্যান্য অংশে দেবীর সন্ধিপুজো সূচিত হয়। মন্দিরের কাছেই একটি ছোটো টিলার উপর থেকেই এই কামান দাগা হয় যা দেখতে আজও মানুষ ভিড় করেন। মহানবমীর রাতে এখানে পূজিতা হন খচ্চরবাহিনী যেখানে পুরোহিত এবং রাজপরিবারের সদস্য ব্যতীত অন্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। লোকবিশ্বাসে আছে, এই দেবী মহামারী থেকে বিষ্ণুপুরবাসীদের রক্ষা করেন। অষ্টমীর দিনে সন্ধিপুজোর আগে মৃন্ময়ী দেবীর সঙ্গেই দেবী বিশালাক্ষীরও পূজা করা হয়ে থাকে। দশমীতে দেবী মূর্তির বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তিন ঠাকুরনের পটও বিসর্জন দেওয়া হয়।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে আজও বিষ্ণুপুরের রাজবাড়িতে পূজিত হয়ে আসছেন দেবী মৃন্ময়ী। কামানের তোপধ্বনি না থাকলেও মল্লরাজাদের পুরনো রীতি অক্ষুন্ন আছে। ইতিহাসের গন্ধ আছে দেবীর মন্দিরে, দেবীর পুজোয়, বাঁকুড়ার মৃৎশিল্পের প্রসারের আড়ালে যে পুজো তুলনায় অনালোচিতই থেকে গেছে।

বিভিন্ন বনেদী বাড়ির পূজা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নাটাই চণ্ডী ব্রত নিয়ে বিস্তারিত জানতে



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও