‘বুম বুম বুমার’ এই জিল টিউনটা নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশনের জগতে আর্কষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। ছোট বাচ্ছাদের টেলিভিশনের সামনে বসিয়ে রাখতে আঠার মত কাজ করত এই জিগলটি। ফ্যান্টমরূপী ‘বুমারম্যান’ বাচ্চাদের মনে পাকাপাকিভাবে একটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছিল যা বহু বছর অবধি স্হায়ী ছিল। ভারতীয় পণ্যের বাজারে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ম্যাসকটগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘বুমার বাবল্গাম ম্যান’ (Boomer Bubble Gum Man)।
১৯৯৫ সালে ‘জায়কো’ (Jayco) নামে একটি স্প্যানিশ মিষ্টদ্রব্য প্রস্তুতকারক কোম্পানি এই বুমার বাবল্গাম নিয়ে আসে ভারতের বাজারে। তার আগে থেকেই ভারতে বাবল্গামের একটা বাজার ছিলই। ৭০-৮০’র দশকে ‘বিগ ফান’ ছিল ভারতে বাবল্গ্যামের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি এই ‘বিগ ফান’ (Big Fun) থেকে বিভিন্ন ক্রিকেটার, প্রো-রেসলারদের ছবি সম্বলিত ট্রাম্পকার্ডও দেওয়া হত। সেটাই ছিল তখনকার শিশু-কিশোরদের কাছে একটা অন্যতম বিনোদন। কিন্তু এই বিগ ফানকেও ছাড়িয়ে বুমার বাবল্গাম (Boomer) তার বিশেষ কৌশলী পণ্যায়নের মাধ্যমে ভারতের এক অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। ২০০০ সালের মধ্যেই প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি বাজার অংশীদারিত্ব নিয়ে এই বুমার বাবল্গাম ভারতের একক বৃহৎ ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চুংইগাম প্রস্তুতকারক এবং বিক্রয়কারী একটি নামজাদা কোম্পানি ছিল ‘রিগলি’ (Wrigley)। ২০০৪ সালে বুমার বাবলগাম ‘রিগলি’ কোম্পানির অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তার নতুন নাম হয় ‘রিগলি বুমার’। এই কোম্পানিটি চিন, ভারত, স্পেন, ইতালি, পোল্যান্ড ইত্যাদি দেশে চুইংগাম তৈরি এবং বিক্রি করার বরাত পায়। এইসব দেশগুলিতে ‘রিগলি’ নিজেদের বিক্রি বাড়ানোর জন্য একটি ম্যাসকট তৈরি করে। শুধু ভারত নয়, বিশ্বের বহু দেশেই বিভিন্ন পণ্য ও কোম্পানির ম্যাসকট রয়েছে, এটা অনেকেরই জানা। যেমন, ‘ডুরাসেল ব্যাটারি’র ডুরাসেল বানি, ‘ম্যাকডাওয়েলস’ কোম্পানির রোনাল্ড ম্যাকডোনাল্ড ইত্যাদি। রিগলি কোম্পানির লক্ষ্য ছিল ১০ থেকে ১৫ বছরের বাচ্চারা। নব্বইয়ের দশকে শিশুদের কাছে কমিক্স চরিত্রগুলি খুবই জনপ্রিয় ছিল। সেই কারণেই বুমারম্যান সেই সুযোগটা নেয়। রিগলির তৈরি করা ম্যাসকটটির অবয়ব ছিল কার্টুন চরিত্র ফ্যান্টমের মত যার ফলে এই ম্যাসকটটি ছোটদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। শুধু বাচ্চারা নয়, তাদের বাবা-মায়েদের কাছেও বুমার বাবল্গাম ম্যান ম্যাসকটটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের কাছে ‘বুমারম্যান’ ছিল একজন ত্রাণকর্তা। রিগলি বুমারম্যানকে একটি সুপার পাওয়ার দেয় যার দ্বারা ‘বুমারম্যান’ বাচ্ছাদের যে কোন বিপদে ত্রাণকর্তা হিসেবে তাঁদের উদ্ধার করে। বুম্যারম্যানের এই চরিত্রটি খুব সহজেই বাচ্চাদের দৃষ্টি আর্কষণ করেছিল। টেলিভিশনে বুম্যারম্যানের বিজ্ঞাপন এলেই সব বাচ্চারা প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। এইভাবেই তাদের সঙ্গে বুমারম্যানের একটি মিষ্টি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর ফলে এই ‘বুম্যারম্যান’ ম্যাসকটটি বুমার বাবলগামের বিপণন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় বাজারে একটি অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে। বুম্যারম্যানের জনপ্রিয়তা ভারতীয় বিজ্ঞাপনের ইতিহাসে অপ্রতিরোধ্য এক জায়গায় চলে যায়। সেই সময়ে জনপ্রিয়তার নিরিখে ভারতীয় সুপ্যারম্যান ‘শক্তিমান’-এর পরেই বুমারের জনপ্রিয়তা স্হান পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবল্গাম ছাড়াও ‘রিগলি’ কোম্পানি আরো কিছু পণ্য বাজারে আনে যার মধ্যে তরল ভরা গাম, গাম জেলির কম্বো, চুইংগাম টেপ রোল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ভারতের চারটি মেট্রোপলিটন শহর ছাড়াও গ্রামীণ বাজারে ১৪ লক্ষ আউটলেটের মাধ্যমে রিগলি বুমার ভারতীয় বাজারে বিক্রি হতে শুরু করে যা ভারতীয় পণ্যের বাজারে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এইভাবেই ‘রিগলি বুমার’ ভারতে বিক্রিত সবচেয়ে বড় বাবল্গামের ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে যার পিছনে ‘বুমারম্যান’-এর অবদান অনস্বীকার্য। ২০০৮ সালে জোকা ইন্ডিয়া ২৩ বিলিয়ন ডলারে ‘রিগলি’কে অধিগ্রহণ করে। তারপরেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বুম্যারম্যানকে স্পনসর করতে দেখা যায়। অস্হায়ী বুম্যারম্যান ট্যাটু তৈরি করে, বাচ্ছাদের স্কুল কলেজের স্টেশনারী দ্রব্যে, বুমার জেলি তৈরি করে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। এরপরে ‘পারফেটি’ (Perfetti) নামে আরেকটি সংস্থা ‘বিগ বাবুল’ (Big Babol) নামে নতুন আরেকটি বাবল্গাম বাজারে আনে যা বুমারের জনপ্রিয়তায় ভাগ বসায়। অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও ‘বিগ বাবুলের’ জনপ্রিয়তার কাছে বুমারম্যান তাঁর জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে হারাতে থাকে। বুমার বাবল্গাম ম্যান-এর জনপ্রিয়তা ফেরানোর উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে বুমার ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে নতুনভাবে প্রদর্শিত হয় ‘টি টোয়েন্টি ম্যানিয়া’ নাম দিয়ে। এর ফল হিসেবে আট লাখ মানুষ বুমারের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই লিগে তারা সানগ্লাস, রিস্ট ব্র্যান্ড, ঘড়ি থেকে ম্যাচের টিকিট ইত্যাদি উপহার দিয়ে নিজের জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়ার শেষ চেষ্টা করে। কিন্তু সেভাবে সাফল্য আসে না। এর ফলস্বরূপ দীর্ঘদিন ‘বুমারম্যান’কে দেখা যায় না বাবল্গামের বিজ্ঞাপনে। ২০১৬ সালে ‘রিগলি’র সঙ্গে ‘মার্স’ যুক্ত হয়ে একটি নতুন কোম্পানি তৈরি হয় যা ‘মার্স রিগলি’ নামে পরিচিত হয়। তাঁরা একসঙ্গে কাজ শুরু করার পরে কিছু পরিবর্তন আনে। বুমার বাবল্গামের অধঃপতিত বাজারকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে তাঁরা বুমার বাবল্গামের বিজ্ঞাপন থেকে কার্টুন ম্যাসকট ‘বুমারম্যান’কে সরিয়ে দেয় এবং যুবসমাজের জন্য অন্য ধরনের বিজ্ঞাপন বানায়। ভারতের যুবসমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁদের উজ্জীবিত করে পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায় বুমারকে। কিন্তু এত চেষ্টার পরেও এই পরিকল্পনা সঠিকভাবে ফলপ্রসূ হয় না। দ্রুত বদলে যাওয়া ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে ‘বুমারম্যান’।
ভারতের বাজার মিষ্টদ্রব্য প্রস্তুতকারী সংস্থার মধ্যে ‘মার্স রিগলি’র বাবল্গাম অন্যতম। তাঁদের ম্যাসকটটি ভারতীয় বাজারে জনপ্রিয়তার নিরিখে এক ইতিহাস তৈরি করেছে। ২০১০ সালের পরে বাবল্গামের বিজ্ঞাপনে ম্যাসকটটিকে দেখা না যাওয়া সত্ত্বেও রিগলির বাবল্গামের জনপ্রিয়তা মানুষের মনে অনেকটা জায়গা দখল করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এর পিছনে রিগলি বাবল্গামের ‘বুমারম্যান’ এবং ‘বুম বুম বুমার’ এই জিঙ্গলটির অবদান অসামান্য। কালের পরিবর্তনে ম্যাসকটটিকে বিজ্ঞাপন থেকে বিদায় নিতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার জনপ্রিয়তার স্মৃতিটুকু রয়ে গেছে নব্বইয়ের দশকে বড়ো হওয়া মানুষের মনে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান