ইতিহাস

শক্তিপদ রাজগুরু

শক্তিপদ রাজগুরু

বাংলা কথাসাহিত্য বিশ শতকে যে সমৃদ্ধি এবং পরিপুষ্টি লাভ করেছিল, তা বহু প্রতিভাবান লেখকের সাধনা এবং তাঁদের অনবদ্য লেখনীর জাদুস্পর্শে সম্ভব হয়েছে। সেই লেখক তালিকায় নিঃসন্দেহে উপরের দিকে স্থান পাবেন সাহিত্যিক শক্তিপদ রাজগুরু (Shaktipada Rajguru)। এতই জনপ্রিয় এবং চিত্তাকর্ষক ছিল তাঁর কিছু লেখা যে বাংলা এমনকি হিন্দি ভাষাতেও বহু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সেসব সাহিত্যকে অবলম্বন করে। বাংলার প্রখ্যাত পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের মতো মানুষও ছবি তৈরির জন্য বেছে নিয়েছিলেন শক্তিপদ রাজগুরুর উপন্যাস এবং ‘মেঘে ঢাকা তারা’র মতো কিংবদন্তী চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছিলেন আমাদের। এছাড়াও বলিউডের ‘বরসাত কি এক রাত’-এর মতো ছবিও তাঁর সাহিত্য অবলম্বনেই নির্মিত। ভীষণ ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছিলেন বলে ভারতের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন তিনি, ফলে কলকাতার ইঁট-কাঠ-পাথরের নাগরিকতার বাইরে যেখানে প্রকৃতির অবাধ লীলা, প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা মানুষ, তাদের জীবনযাপন ইত্যাদি শক্তিপদর কলমে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল৷ দেশভাগের ফলে ছিন্নমূল মানুষের যন্ত্রণাও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তিনি যা তাঁর কোনও কোনও লেখায় স্পষ্টতই লক্ষ্য করা যায়। আবার শিশুদের জন্য ‘পটলা’ নামক চরিত্রের নির্মাণ করে শৈশবের সারল্য, দুষ্টুমি, ইত্যাদিকে নিপুণ হস্তে নির্মাণ করেছিলেন শিশুসুলভ একটা মন নিয়েই।

১৯২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত বাঁকুড়া জেলার গোপবন্দী গ্রামে এক বাঙালি পরিবারে শক্তিপদ রাজগুরুর জন্ম হয়। তাঁর বাবা মণীন্দ্রনাথ ছিলেন ডাক ও তার (Postal and Telegram Dept.) বিভাগের একজন কর্মচারী এবং কর্মসূত্রে থাকতেন মুর্শিদাবাদের পাঁচথুপী গ্রামে। ফলে শৈশব এবং কৈশোরের অনেকখানি সময় শক্তিপদর কেটেছিল সেই গ্রামে। প্রায় বারো বছর বয়স পর্যন্ত পাঁচথুপীতে কাটিয়েছিলেন তিনি। সেই গ্রামের বেশ একটু ঐতিহাসিক মূল্যও ছিল। পঞ্চম শতকের কাছাকাছি সময়ে জৈন সম্প্রদায়ের লোকজন এই গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমনকি মোগল বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের সঙ্গেও এই গ্রামের নাম জড়িত। যখন শক্তিপদ এখানে চলে এসেছিলেন, তখনও শিক্ষা-দীক্ষায় বেশ সমৃদ্ধশালী ছিল এই পাঁচথুপী গ্রাম। সেই সবুজ প্রকৃতির কোলে অবাধ স্বাধীনতায় বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। কখনও ঝুমুরগান শুনে, আবার খন গান বা বায়োস্কোপওয়ালার ছেঁড়া ফিল্মের সাহায্যে ছবি তৈরির চেষ্টা করে শক্তিপদ রাজগুরু শৈশব-কৈশোরকাল উপভোগ করেছিলেন। সেই গ্রামে তাঁর সব কাজের সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল ন্যাড়া নামের এক বালক। পাখি ধরে পোষা, বাউলদের গান শুনে বেড়ানো ইত্যাদি ছিল তাঁদের বিনোদন। ভবিষ্যতে এই ‘ন্যাড়া’ নামক বালকটির ছায়া অবলম্বন করেই শক্তিপদ রাজগুরু শিশুদের জন্য তৈরি করেছিলেন ‘পটলা’ নামক চরিত্রটি। সেই চরিত্রকে কেন্দ্র করে অনেকগুলি রোমহর্ষক, রোমাঞ্চকর গল্প তিনি রচনা করেছিলেন, অথচ পটলার কাহিনীগুলি লেখার সময় তাঁর যে এক শিশুসুলভ মনও কাজ করত তাও লক্ষ্য করা যাবে গল্পের ভাষ্য থেকেই। তিনি প্রায়ই নিজে বলতেন যে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা শিশু সারাজীবন বাস করে।

সেই পাঁচথুপী গ্রামেই শক্তিপদ রাজগুরু বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষালাভ করেছিলেন। পাঁচথুপী গ্রামের ত্রৈলোক্যনাথ ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই স্মৃতিশক্তি তাঁর প্রখর ছিল। রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ কবিতা তিনি মুখস্থ বলতে পারতেন। এরপর আরও উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি চলে এসেছিলেন কলকাতায়। তাঁর বাবা তখন কর্মসূত্রেই অন্যত্র বদলি হয়ে চলে গিয়েছেন। কলকাতায় এসে তৎকালীন রিপন কলেজে (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) বাণিজ্য বিভাগে প্রবেশ করেন পঠন-পাঠনের অভিপ্রায়ে। কলকাতায় মেসবাড়িতে ভাড়া থেকে পড়াশোনা চালাতেন শক্তিপদ রাজগুরু। সেসময় থেকেই সাহিত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করতে থাকেন শক্তিপদ। তাঁর মেসের অদূরেই ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় থাকতেন। যদিও এই দুজনেই পাঁচথুপী গ্রামের খুব কাছেই থাকতেন বলে আগে থাকতেই পরিচয় ছিল তাঁদের সঙ্গে। এসময় শক্তিপদ তখনকার বিখ্যাত সব পত্রিকা ‘দেশ’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘উল্টোরথ’ ইত্যাদিতে লেখা পাঠাতে থাকেন। ‘আবর্তন’ নামে তাঁর লেখা প্রথম গল্পটি ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তৎকালীন ‘দেশ’-এর সম্পাদক সাগরময় ঘোষের খুব কাছাকাছি চলে আসার সুযোগ হয় তাঁর। রিপন কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

বাবার মতোই ডাক বিভাগে কাজ পেয়েছিলেন শক্তিপদ। তিনি কাজ করতেন কলকাতার জেনারেল পোস্ট অফিসে, সাহিত্যচর্চাও চলত পাশাপাশি। ১৯৪৫ সালে শক্তিপদর প্রথম উপন্যাস ‘দিনগুলি মোর’ প্রকাশিত হয়। অদম্য ভ্রমণের নেশা ছিল তাঁর। সুযোগ পেলেই কলকাতা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন। ছোটনাগপুর আর দণ্ডকারণ্যের বনভূমি তাঁকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করত। এই প্রসঙ্গে তাঁর ‘দণ্ডকারণ্যের গহনে’ কিংবা ‘দণ্ডক থেকে মরিচঝাঁপি’ বইগুলির কথা মনে পড়বে। তাঁর অধিকাংশ লেখাতে পাহাড়, অরণ্যের প্রেক্ষাপটে নির্মিত দৃশ্য বিরল নয়। প্রসঙ্গত ‘মেঘে ঢাকা তারা’র কথা মনে পড়বে। যদিও প্রথমে ‘চেনামুখ’ নামে একটি বড় গল্প লিখেছিলেন তিনি ‘প্রসাদ’ পত্রিকায়। বন্ধুর ছেলের অসুস্থতার জন্য তিনি টাকা ধার করেছিলেন ‘প্রসাদ’-এর সম্পাদকের কাছে, শর্ত ছিল একটি গল্প লিখে দিতে হবে। এভাবেই ‘চেনামুখ’ গল্পের জন্ম। এ গল্পের উপন্যাস-রূপ ‘মেঘে ঢাকা তারা’ নাম দিয়ে পরে প্রকাশিত হয়। উদ্বাস্তুদের নিদারুণ যন্ত্রণার ছবি তাঁর লেখার গুণে জীবন্ত এক রূপ পেয়েছে এই গ্রন্থে।জেনারেল পোস্ট অফিসে স্বনামধন্য পরিচালক ঋত্বিক ঘটক নিজে এসে শক্তিপদকে বলেছিলেন ‘চেনামুখ’ গল্পটি নিয়ে তিনি ছবি করতে চান। তারপরেই বাংলা চলচ্চিত্র সেই অবিস্মরণীয় সৃষ্টির সাক্ষী হয়েছিল। ছবিটি শক্তিপদকেও জনপ্রিয় করে তুলেছিল পাঠকের মধ্যে৷ এই ছবি দেখার পর উদ্বাস্তু জীবনের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার এত নিপুণ চিত্রাঙ্কণ দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন লেখক বুঝি পূর্ববঙ্গের বাস্তুহারা মানুষ। অথচ শক্তিপদ রাজগুরু বরাবরই এপার বাংলার। কিন্তু দেশভাগের পর কাতারে কাতারে উদ্বাস্তু মানুষদের ভিড় দেখেছিলেন তিনি, তাঁদের সঙ্গে অনেকটা সময় যাপনও করেছিলেন শক্তিপদ রাজগুরু। কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি তাঁদের যন্ত্রণাগুলিকে। এমনকি ‘তবু বিহঙ্গ’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট নির্মাণের উদ্দেশ্যে এইসব পূর্ববঙ্গীয় ছিন্নমূল মানুষদের বেদনা উপলব্ধির জন্য ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তিনি নিরন্তর। সিনেমার প্রতি ঝোঁকটা ছোটবেলাতেই ন্যাড়ার সঙ্গলাভের ফলেই গড়ে উঠেছিল তাঁর মধ্যে। সেই ছেঁড়া ফিল্ম নিয়ে ছবি তৈরির চেষ্টা থেকে তা বোঝা যায়। এরপর তাঁর অনেকগুলি লেখা বাংলায় তো বটেই হিন্দিতেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন গুণী পরিচালকেরা।

শক্তিপদর লেখা ‘নয়া বসত’ উপন্যাসটি থেকে ১৯৭৫ সালে পরিচালক শক্তি সামন্ত ‘অমানুষ’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। হিন্দি এবং বাংলা উভয় ভাষাতেই ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল। উত্তমকুমার ও শর্মিলা ঠাকুরের জুটিতে সুন্দরবনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমা প্রভূত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল সেসময়ে। ১৯৮১ সালে সেই শক্তি সামন্তই আবার শক্তিপদ রাজগুরুর ‘অনুসন্ধান’ নামক উপন্যাসটি থেকে হিন্দিতে তৈরি করলেন ‘বরসাত কি এক রাত’ নামে একটি চলচ্চিত্র। সেবছরই এই ছবিটির একটি বাংলা সংস্করণ ‘অনুসন্ধান’ নামেই মুক্তি পায়। বলিউডি তারকা অমিতাভ বচ্চন ছাড়াও আমজাদ খান, রাখী গুলজারের মতো কলাকুশলীরা এই ছবিতে অভিনয় করেন৷ বাংলা সংস্করণটিতেও এই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের গলাই শোনা গিয়েছিল। বাণিজ্যিকভাবে এই ছবিটিও যথেষ্ট জনপ্রিয় হয় এবং অবশ্যই লক্ষ্য করার মতো এই গল্পটির প্রেক্ষাপটও কিন্তু উত্তরবঙ্গের সুদৃশ্য পাহাড়ি এক অঞ্চল। শক্তি সামন্তই আবার ‘অন্যায় অবিচার’ তৈরি করেন শক্তিপদ রাজগুরুর উপন্যাস অবলম্বনে। এছাড়াও শক্তিপদর ‘মুক্তিস্নান’, ‘শেষ নাগ’ ইত্যাদি রচনা অবলম্বনেও জনপ্রিয় সব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। এমনকি তাঁর রচনা নিয়ে নাটক ও টেলিভিশন ধারাবাহিকও তৈরি হয়েছে যা প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

শক্তিপদ রাজগুরু চিত্রনাট্য লেখাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’র চিত্রনাট্যে তো তাঁর অবদান ছিলই, এছাড়াও তাঁরই লেখা অবলম্বনে নির্মিত ‘মণি বেগম’, ‘অমানুষ’, ‘জীবন কাহিনী’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘বাঘিনী’ ইত্যাদি কয়েকটি ছবির চিত্রনাট্য রচনার কৃতিত্ব তাঁরই। এখানে উল্লেখ্য ‘অমানুষ’ ছবির চিত্রনাট্যের জন্য ২০০৯ সালে ‘অল ইন্ডিয়া লায়ন’স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিলেন তিনি।

প্রায় ১০০টিরও বেশি উপন্যাস লিখেছিলেন শক্তিপদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য আরও বেশ কয়েকটি রচনা হল ‘অচিন পাখি’, ‘জনপদ’, ‘অধিগ্রহণ’, ‘আজ-কাল পরশু’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ইত্যাদি। জীবন থেকেই রসদ, চরিত্র সংগ্রহ করে নিরলসভাবে সাহিত্য সৃষ্টি করে গিয়েছেন তিনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল যে, তাঁর লেখা হিন্দি, মালয়ালম্‌, তামিল ও মারাঠিতে অনুবাদ হয়েছিল, ফলে ভারতের নানা প্রান্তের মানুষ জেনেছিল শক্তিপদকে। তিনি নিজেও মালয়ালম্‌, তামিল, তেলেগু এবং ওড়িয়া ভাষা শিখেছিলেন। এছাড়াও সম্পাদনার কাজ করবার অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর। ‘উল্টোরথ’ এবং ‘সিনেমাজগৎ’-এর মতো জনপ্রিয় পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি বেশ কিছুদিন।

সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য শক্তিপদ রাজগুরুকে ২০০৯ সালে ‘দ্য হল অফ ফেম—লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’ ‘সাহিত্যব্রহ্ম পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। সাহিত্যিক কৃতিত্বের জন্যই ‘বিভূতিভূষণ পুরস্কার’-এও সম্মানিত করা হয়েছিল তাঁকে। তিনি পেয়েছিলেন ‘সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কার’ও। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করেছিলেন।

২০১৪ সালের ১২ জুন কলকাতায় ৯২ বছর বয়সে এই শক্তিপদ রাজগুরুর মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়