ইতিহাস

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (Sailajananda Mukhopadhyay) কল্লোল যুগের একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী লেখক ছিলেন তিনি।

১৯০১ সালের ১৯ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার অন্ডাল গ্রামে মামাবাড়িতে জন্ম হয় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর বাবার নাম ধরণীধর মুখোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম হেমবরণীদেবী। তিন বছর বয়সেই তাঁর মায়ের মৃত্যু হলে তাঁর বাবা আবার বিয়ে করেন৷ শৈলজানন্দ মূলত তাঁর দাদু রায়সাহেব মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় ও দিদিমা কাদম্বরী দেবীর কাছে বড় হয়ে ওঠেন ৷ তাঁর দাদু ছিলেন বর্ধমানের ধনী কয়লা ব্যবসায়ী। কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটে ছিল ‘দ্য রিট্রিট’ নামে তাঁর দাদুর বিশাল বাড়ি।

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বোলপুর হাই স্কুলে। এরপর তিনি ভর্তি হন উখরা এন্ট্রান্স স্কুলে। চোদ্দো বছর বয়সে তাঁর দাদু তাঁকে রানিগঞ্জ হাই স্কুলে নিয়ে যান। বছরখানেক সেখানে পড়াশোনা করেন তারপর দেশের বাড়ি রূপসপুরে ফিরে আসেন। দেশের বাড়ি ফিরে স্থানীয় নাকড়াকোঁদা হাই স্কুলে তিনি ভর্তি হন। এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেওয়ার সময়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলেও তিনি পরীক্ষা দেন এবং তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন। কাজী নজরুল ইসলাম এবং তিনি ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নজরুল ইসলামের সঙ্গে শৈলজানন্দও চেয়েছিলেন সামরিক বাহিনীতে চাকরি নিতে কিন্তু বাড়ির আপত্তি থাকায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ম্যাট্রিক পাশ করে শৈলজানন্দ কলকাতায় এসে কলেজে ভর্তি হন কিন্তু ম্যালেরিয়ায় বারবার ভুগতে থাকায় তাঁকে দেশের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। শৈলজানন্দ চেয়েছিলেন ডাক্তারি পড়তে কিন্তু তাঁর সে ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি। তবে কিছু দিন পরে তাঁর মামার ইচ্ছেতেই কলকাতায় এসে শৈলজানন্দ কাশিমবাজারের মহারাজার পলিটেকনিকে ভর্তি হয়ে শর্ট-হ্যান্ড ও টাইপ শিখতে শুরু করেন।

১৯২১ সালে শৈলজানন্দের বিয়ে হয়৷ বিয়ের পর তিনি শ্বশুরের সাহায্যে কয়লার ডিপো খুলে জোড়জোনাকি কয়লাখনি অঞ্চলে কুলিমজুর সরবরাহের কাজ করতেন। কাজের সূত্রে তাঁকে সাঁওতাল পরগনার বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হত। বারে বারে সেখানে যাতায়াতের ফলে সেখানকার কয়লাখনির শোষিত শ্রমিক-মজুরদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর৷ তারই প্রভাব পড়ল তাঁর লেখায়। শৈলজানন্দের কলমে ফুটে উঠল তাঁর কালজয়ী প্রথম গল্প ‘কয়লাকুঠি’। বলাবাহুল্য যা বাংলা সাহিত্যের নতুন একটি দিক খুলে দিয়েছিল ।

১৯২২ সালে মাসিক বসুমতী পত্রিকায় সেই গল্প ছাপা হয় এবং খুব কম সময়ের মধ্যেই শৈলজানন্দের নাম ও খ্যাতি বাংলা সাহিত্য জগতে ছড়িয়ে পড়ে। বলা চলে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান তিনি৷ শরৎচন্দ্রের পরে এমন সাড়া জাগানো আত্মপ্রকাশ আর কারোর হয়নি বললেই চলে৷

শৈলজানন্দের প্রকৃত নাম ছিল শৈলজা। তাঁর শৈলজানন্দ নামকরণ করেছিলেন ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সম্পাদক জলধর সেন৷ ধীরে ধীরে নিজ লেখনীর গুনে শৈলজানন্দ কল্লোল গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীতে তাঁর প্রবেশ সাহিত্যিক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত ধরে। ক্রমে ক্রমে প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ও মণীন্দ্রলাল বসুর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে৷ এরপরে ১৯২৩ সালে নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘বাঁশরী’ পত্রিকায় ছাপা হয় শৈলজানন্দের লেখা ‘আত্মঘাতীর ডায়েরী’ গল্পটি৷ সেই বছরেই অর্থাৎ তিনি লিখলেন ‘বাঙালী ভাইয়া’ উপন্যাস ও পরের বছর ‘ধ্বংসপথের যাত্রী’র মতো গল্প যা বাংলা সাহিত্যের চিরকালীন সম্পদ। শৈলজানন্দের লেখা ছোটগল্পের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চারশোরও বেশি । ধীরে ধীরে ‘কল্লোল’, ‘প্রবাসী’, ‘বসুমতী’, ‘সংহতি’, ‘বিজলী’-র মতো বিভিন্ন খ্যাতনামা পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। তবে লেখা বাবদ প্রাপ্য অর্থ কখনই তিনি সময় মত পেতেন না। দারিদ্রের চাপে সামান্য কিছু রোজগারের আশায় ভবানীপুরের পূর্ণ সিনেমার কাছে তিনি, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও মুরলীধর বসুর সাথে একটি পানের দোকানও খুলেছিলেন। যদিও সেই দোকানও চলেনি৷ নিজের এবং সমগোত্রীয় সাহিত্যিকদের দুরাবস্থার কথা বর্ননা করতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, “সাহিত্যের প্রয়োজন আছে, সাহিত্যিকদের প্রয়োজন আছে সবই সত্য। আবার এও সত্য সাহিত্যিকরাও মানুষ, তাদেরও খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে হয়। তাদের বাঁচিয়ে রাখবার কোনও ব্যবস্থা আমাদের নেই।”

‘কালিকলম’ পত্রিকাতে শৈলজানন্দ ধারাবাহিক ভাবে লেখেন ‘মহাযুদ্ধের ইতিহাস’ উপন্যাসটি। কিন্তু ‘দিদিমণি’ গল্পটি লেখার পরেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে অবশ্য তাঁকে সমস্ত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিরিশের দশকে তিনি পরপর যুক্ত হয়েছেন ‘বায়োস্কোপ’, ‘ছায়া’, ‘সাহানা’ চলচ্চিত্র পত্রিকার সম্পাদনার কাজে। শৈলজানন্দের সাহিত্যচর্চার সময়সীমা পঁয়ত্রিশ বছর। তাঁর জীবনীকারের হিসেব অনুযায়ী শৈলজানন্দের উপন্যাসের সংখ্যা প্রায় পৌনে তিনশো এবং গ্রন্থসংখ্যা প্রায় সওয়া তিনশো।

এরপর শৈলজানন্দ ঝুঁকলেন সিনেমার দিকে। ১৯৩৫ সালে প্রথম তাঁর লেখা কাহিনি নিয়ে ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এরপরে আরও দুটি কাহিনী ‘দেশের মাটি’ ও ‘জীবন-মরণ’ নিয়ে নিউ থিয়েটার্সে চলচ্চিত্র তৈরি করেছিলেন পরিচালক ছিলেন নীতিন বসু। এমনি করেই শৈলজানন্দ সিনেমার জগতের সঙ্গে যুক্ত হন এবং নিউ থিয়েটার্সের নীতিন বসুর সহকারী হিসেবে চাকরি নেন । ধীরে ধীরে তিনি সিনেমা তৈরির খুঁটনাটি শিখে নিতে থাকেন। সিনেমার জগতে তাঁর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে লেখার জগতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমে আসতে থাকে। ১৯৪০ সাল থেকে শৈলজানন্দ চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে শুরু করেন এবং ১৯৫৭ সাল অবধি দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে মোট ষোলোটি ছবি তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁর তৈরি ছবিগুলি প্রায় সব ক’টিই ছিল বাণিজ্যিক ভাবে সফল। তাঁর সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে সমাদৃত হয়েছিল ১৯৪১ সালে ‘নন্দিনী’, ১৯৪২ সালে ‘বন্দী’, ১৯৪৩ সালে ‘শহর থেকে দূরে’, ১৯৪৫ সালে ‘অভিনয় নয়’ ও ‘মানে না মানা’। ১৯৪৮ সালে ‘ঘুমিয়ে আছে গ্রাম’, ১৯৫০ সালে ‘রংবেরঙ’ এছাড়া ‘সন্ধ্যে বেলার রূপকথা’, ‘বাংলার নারী’, ‘কথা কও’, ‘আমি বড় হব’ , ‘ক্রৌঞ্চমিথুন’, ‘বিজয়িনী’, ‘রূপবতী’, ‘গঙ্গা যমুনা’, ‘পাতালপুরী’, ‘আকাশকুসুম’, সারারাত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় কেবল সিনেমার জগতেই নয় আকাশবাণীতে তিনি বহু নাটক প্রযোজনা ও পরিচালনাও করেছিলেন । প্রথম যৌবনে শৈলজানন্দ সুন্দর স্বাস্থ্য ও কণ্ঠস্বরের অধিকারী ছিলেন। তারাশঙ্করের ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর নাট্যরূপ দিয়েছিলেন তিনি। তবে চলচ্চিত্র জীবনের শেষ দিকে আবারও তিনি আর্থিক অনটনে পড়েছিলেন। চলচ্চিত্রজীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পর ‘বসুমতী’ পত্রিকার সম্পাদক প্রাণতোষ ঘটকের অনুরোধে তিনি আবার কলম ধরেছিলেন। চেয়েছিলেন নতুন করে তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু করতে। সাহিত্য জীবনে ফিরে এসে তিনি আবার লিখলেন সেই ‘কয়লাকুঠির দেশ’-এর কাহিনি এবারে উপন্যাসের আকারে, ধারাবাহিক ভাবে। সেই উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পরে তাঁর বন্ধু প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “তোমার সেই হারিয়ে যাওয়া কলমটা কোথায় কুড়িয়ে পেলে?”

শৈলজানন্দ তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বেশ কিছু পুরস্কার অর্জন করেছিলেন৷ তিনি আনন্দ পুরস্কার, উল্টোরথ পুরস্কার এবং যাদবপুর এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ডি লিট পান। এছাড়া তিনি ১৯৫৯ সালে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য প্রফুল্লকুমার ও সুরেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন৷

১৯৭৬ সালের ২ জানুয়ারি পঁচাত্তর বছর বয়সে শৈলজানন্দের মৃত্যু হয়। জীবনের শেষ চার বছর পক্ষাঘাতে বিছানায় শুয়েই কাটিয়েছিলেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন