মাঝে মাঝেই আমাদের পেটে খাবার আগে কিংবা পরে গুরুগুর করে শব্দ হয়। অনেকেই আমরা ভেবে পাই না কী কারণে এই শব্দ হচ্ছে। অনেকে ভাবেন হজমের কারণে বা অনেকক্ষণ পেট খালি থাকার কারণে এই গুরুগুর শব্দ হচ্ছে। পেট ডাকার এই অদ্ভুত অবস্থা আমাদের বেশ চিন্তায় ফেলে, কেউ কেউ আবার এটাকে নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন নন। নিজের কানে নিজের পেটের শব্দ শোনা আমাদের কাছে বেশ মজার অভিজ্ঞতা হলেও এর কারণ জানা দরকার। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক খিদে পেলে পেটে আওয়াজ হয় কেন ।
খালি পেটে বা ভরা পেটে উভয়ক্ষেত্রেই মাঝেমধ্যে পেটের ভিতরে গুরুগুর শব্দ শুনে থাকি আমরা। তবে বেশিরভাগ সময়েই আমরা লক্ষ্য করে থাকি যে পেট খালি থাকলেই এই শব্দ বেশি জোরে হয়। মূলত আমাদের পাকস্থলী থেকেই এই শব্দ নির্গত হয়। ইংরেজিতে একে ‘স্টমাক রাম্বলিং’ (Stomach rumbling) বলা হলেও এর প্রকৃত পরিভাষা হল ‘বর্বরিগ্মি’ (Borborygmi)। প্রাচীন গ্রিকরা প্রথম এই নামকরণ করেছিলেন। তবে এই শব্দ শুধু পাকস্থলী থেকে আসে না। ক্ষুদ্রান্ত্র (intestine) থেকেও মাঝেমধ্যে এই রকম শব্দ নির্গত হয়ে থাকে। দেখা গেছে আমাদের পাকস্থলী থেকে পরিপাকনালি (Gastrointestinal tract) বেরিয়ে ক্ষুদ্রান্ত্র ও ক্রমে বৃহদন্ত্রে উপনীত হয়েছে। এই নালি আসলে একটি ফাঁপা নলের মতো পেশিযুক্ত অঙ্গ। পরিপাকনালির পেশিগুলি কোমল পেশি (Smooth muscle) প্রকৃতির। আমাদের খাবার খাওয়ার সময় খাদ্যের টুকরোগুলি চেবানোর ফলে মণ্ডে পরিণত হয় এবং এই মণ্ডটি তখন পরিপাকনালির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায়। এই সময় পরিপাকনালির পেশিগুলি ক্রমাগত সংকুচিত ও প্রসারিত হয় এবং খাদ্যের পাশাপাশি বায়ু ও তরল পদার্থও মিশে থাকে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে পেরিস্টলসিস (peristalsis) বলে। মূলত এই পেরিস্টলসিস বা পরিপাকনালির সংকোচন-প্রসারণের ফলেই পেট থেকে আওয়াজ নির্গত হয়। এই সংকোচন-প্রসারণেরও একটি নির্দিষ্ট ছন্দ রয়েছে। পাকস্থলীর পেশিগুলি মিনিটে ৩ বার এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের পেশিগুলি মিনিটে ১২ বার সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। আমাদের পেটে যখন খাবার থাকে না বা আমরা অনেকক্ষণ কিছু না খেয়ে থাকি, তখন আমাদের শরীরে শর্করার মাত্রা কমে যায়। এই অবস্থায় প্রায় দুই ঘন্টা যাবৎ পেট খালি থাকলে পাকস্থলীর মধ্যেকার গ্রাহকগুলি (receptor) একটি সংকেত পাঠায় আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে। আর তখনই পেট ডাকে। খাবার পাকস্থলীতে থাকলে তা সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে ক্ষুদ্রান্ত্র বৃহদন্ত্রে সঞ্চারিত হয়ে যায়। আর পেটে খাবার না থাকলে স্নায়ুতন্ত্র এই আওয়াজের মধ্য দিয়ে আমাদের জানায় যে এবারে কিছু খাওয়া দরকার। মোটামুটিভাবে সর্বাধিক কুড়ি মিনিট পর্যন্ত এই অবস্থাটি চলে। তারপরে কিছুটা কমে গিয়ে আবার ১-২ ঘন্টা অন্তর পেটে গুরুগুর শব্দ হতে থাকে।
তবে অনেক চিকিৎসকদের মতে, বেশিরভাগ মানুষের খাবার ভালো করে না চিবিয়ে খাওয়ার কারণে খাদ্যের মণ্ডটি পরিপাকনালি দিয়ে নামার সময় প্রচুর বায়ু পাকস্থলীতে এসে জমে যে কারণে গুরুগুর শব্দ হয়। আর দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে খাবার হজমের সময় খাদ্য মধ্যস্থ উৎসেচকগুলি ভাঙতে শুরু করলে। সাধারণভাবে তিন ধরনের শব্দ হয়ে থাকে – প্রথমত প্রচণ্ড জোরে গুরগুর শব্দ, খুব আস্তে আস্তে গার্গল করা বা পেট মোচড় দেওয়ার শব্দ কিংবা পেটের ভিতরে কোনো তরলের প্রবাহের শব্দ। এই শব্দ খুবই স্বাভাবিক। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই সাধারণভাবে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিশেষ কিছু খাবার বা পানীয় খেলে এই পেট ডাকার ব্যাপারটি বেশি হয়। গ্লুটেন, দুগ্ধজাত পদার্থ, কিছু ফল ও সবজি বা উচ্চমাত্রায় তন্তুযুক্ত দানাশস্য খাবার সময় পাকস্থলীতে অতিরিক্ত গ্যাস উৎপন্ন হয় আর সেই কারণেও পেটে গুরুগুর শব্দ হতে পারে। সাধারণভাবে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে খিদে পেলে পেট ডাকা একটা দৈনন্দিন ঘটনাই বটে। তবে অনিয়মিতভাবে এই গুরুগুর শব্দ হলে সেটা উদ্বিগ্নের কারণ হতে পারে। তবে শুধু খিদে পেলেই পেট গুরুগুর করে তা নয়, ভরা পেটেও বা খাবার খাওয়ার পরেও এইরকম শব্দ হতে পারে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান