সববাংলায়

চীনা কালী মন্দির

চীনারা সাধারণত বৌদ্ধ ধর্মানুসারী হন এবং সংস্কৃতিগত দিক থেকে ভারতীয় বা বাঙালিদের থেকে বেশ আলাদা। তাই চীনা কালী মন্দির দুই সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির এক সুন্দর মিলনক্ষেত্র হিসেবে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। পূর্ব কলকাতার ট্যাংরা অঞ্চল, যেটি চায়না টাউন নামেও পরিচিত, সেখানেই এই চীনা কালী মন্দির (Chinese Kali Temple) অবস্থিত। ওই ট্যাংরা অঞ্চল কলকাতার চীনা পাড়া নামে খ্যাত এবং সেখানেই হিন্দুধর্মের এই দেবীমন্দিরের অবস্থান সত্যিই আশ্চর্যজনক এক ঘটনা। সাধারণত হিন্দু দেবদেবীর পূজায় প্রসাদ হিসেবে মিষ্টান্ন ব্যবহৃত হলেও চাইনিজ কালী মন্দিরে আজও প্রসাদ হিসেবে নুডলস এবং চপসুই নামক একটি চাইনিজ পদ দেবীকে অর্পণ করা হয়ে থাকে। চীনা কালী মন্দির হলেও একজন বাঙালি পুরোহিতই এখানে পূজা করেন। মন্দিরটির আনুমানিক বয়স প্রায় ৬০ বছর বলে মনে করা হয়। হিন্দু এবং চীনাদের ঐক্যের এক মহান উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই মন্দির। আজও দীপাবলির রাতে এখানে ধুমধাম করে পূজা হয়ে থাকে। এই বিশেষ কালী মন্দির দেখতে পর্যটকেরাও ভিড় করেন কলকাতার এই চীনা পাড়ায়।

এই চীনা কালী মন্দির নির্মাণের নেপথ্যে একটি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে, অবশ্য তার সত্যতা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা চলে না। প্রথমে এই মন্দিরের জায়গায় ছিল কেবলই একটি গাছ এবং তার বেদিতে দুটি কালো পাথরকে স্থানীয়রা দেবী কালীরূপে পূজা করতেন। সেসময় এক বছর দশেকের চীনা ছেলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কোনরকম ডাক্তারি চিকিৎসাতেই ছেলেটির শরীর সুস্থ হচ্ছিল না। তখন তার বাবা-মা তাকে সেই গাছের বেদিতে মা কালীরূপে পূজিত পাথর দুটির সামনে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিয়েছিলেন এবং দেবীর কাছে ছেলের সুস্থতা প্রার্থনা করেছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে, সেই অসাড়, অসুস্থ ছেলে ক্রমে ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে। তখন ছেলেটির বাবা-মা মা কালীর প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত সেইখানে একটি মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন, যেটি কিনা বর্তমানে চীনা কালী মন্দির হিসেবে পরিচিত। উল্লেখ্য যে, মন্দির নির্মাণের সময় কিন্তু সেই গাছটি এবং তার নীচে প্রতিষ্ঠিত সেই বেদি, যেখানে দিব্য কালো পাথরদুটি ছিল, তার কোনটিই ধ্বংস করা হয়নি। সেগুলিকে কেন্দ্র করেই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল৷ তাই মন্দিরের ভিতরে সেই গাছ এবং বেদি আজও লক্ষ করা যায়।

কলকাতায় চীনাদের আগমনের বিশেষত ট্যাংরা অঞ্চলে তাদের বসতি স্থাপনের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস রয়েছে। কলকাতায় চীনা বসতি প্রায় আড়াই শতাব্দী জুড়ে রয়েছে এবং তার কৃতিত্ব দেওয়া হয় টং আচেউকে। ১৮ শতকের শেষেরদিকে তিনি বজবজের কাছে বসতি স্থাপন করেন এবং তাঁর নাম অনুযায়ী সেই জায়গাটির নাম হয় অছিপুর। পরবর্তীতে, চীনারা কলকাতার কেন্দ্রীয় অংশে বসতি স্থাপন করে এবং মধ্য কলকাতার টেরিটি বাজার অঞ্চলে শহরের প্রথম চায়না টাউন প্রতিষ্ঠা করে। আরও পরে তারা চলে আসে এই ট্যাংরা অঞ্চলে। ১৯১০ সালের পরে ট্যানারি শুরু করার পর থেকে এই ট্যাংরা শীঘ্রই কলকাতার দ্বিতীয় চায়না টাউনে পরিণত হতে থাকে। ১৯৬০-এর দশকে আবার কলকাতার এই চৈনিক সম্প্রদায় ভারত-চীন যুদ্ধের কারণে দারুণ সংকটের মুখোমুখি হয়। চীনা বাসিন্দাদের গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করে ভারত সরকার তাদের অনেককেই এই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। এরফলে কলকাতা এবং অন্যান্য শহরের অনেক চীনা মানুষ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলিতে চলে যায়। কলকাতায় চৈনিক জনসংখ্যা কমে গেলেও তা একেবারে নির্মূল হয়ে যায়নি। ট্যাংরার এই চৈনিক কালী মন্দিরের ইতিহাস অবশ্য খুব পুরোনো নয়। ষাট বা আশি বছর আগে এই মন্দির ছিল না, কেবল ছিল একটি গাছ এবং তার নীচে বেদিতে স্থাপিত কালোরঙের দুটি গ্রানাইট পাথর যা দেবী কালিরূপে সিঁদুর ও বেলপাতা সহযোগে পূজিত হত। ১৯৯৮ সালে বর্তমান মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল৷ সেই থেকে আজ প্রায় ২৬ বছর ধরে এই মন্দির স্বমহিমায় বিরাজমান। শোনা যায়, সেই সময়কার ট্যাংরার সমস্ত চীনা পরিবার এবং বহু বাঙালিও এই মন্দির নির্মাণের জন্য অর্থ প্রদান করেছিলেন।

চীনা কালী মন্দিরটি দেখতে খুবই ছিমছাম ধরনের। সমস্ত মন্দিরটি বাদামী রঙের পাথরে বাঁধানো এবং সামনে দুটি বড় বড় প্রবেশ দ্বার। রাস্তার ধারেই একতলা চতুর্ভুজাকৃতি মন্দিরটির বাইরে খিলানের মাঝখানে একটি হলুদ বোর্ডের ওপর চীনা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখা আছে ‘চাইনিজ কালী মন্দির’। মন্দিরের ভিতরে সেই গাছ এবং তার নীচে বাঁধানো বেদি ও সেই কালো পাথরদুটি আজও রয়েছে। এছাড়াও সাধারণ কালীমূর্তি রয়েছে এবং একটি শিবের মূর্তিও দেখা যায়। মূর্তি ছাড়াও কালী ও লক্ষ্মী-গণেশের বাঁধানো ফোটোফ্রেমও রয়েছে। মন্দিরে কিন্তু নারায়ণ শিলাও রয়েছে। দেবতাদের পিছনের দেয়ালে ওম চিহ্ন রয়েছে এবং সেই সঙ্গে কিছু চীনা মোটিফও লক্ষ করা যায়। মন্দিরের শিলিং-এর দিকে তাকালে দেখা যাবে ঈগল এবং ড্রাগনের চিত্র, ঠিক যেমন চৈনিক কোন মনাস্ট্রিতে গেলে দেখা যায়।

চীনা কালী মন্দিরে যে উৎসবটি খুব ধুমধাম করে পালিত হয়ে থাকে, তা হল, দীপাবলি উৎসব। রঙিন আলোয়, প্রদীপে এসময় মন্দির সাজানো হয়। বিশেষ পূজা ও আরতি হয় এইদিনে। ভক্তেরা দেবীদর্শনের জন্য ভিড় করেন, মনষ্কামনা জানিয়ে মাকে পূজা দেন। এছাড়াও, নিত্য পূজা এবং বছরের বিভিন্ন সময়ে বিশেষ বিশেষ কালীপূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে এই মন্দিরে। অশুভ আত্মাকে দূরে রাখতে এখানে সন্ধ্যা আরতির সময় হাতে তৈরি একরকম কাগজ জ্বালিয়ে দেবতার সামনে আরাধনা করা হয়৷ এই রীতি সাধারণত চৈনিক মঠগুলিতে দেখা যায়। প্রসাদ হিসেবে এখানে নুডলস, চপসুই, স্টিকি রাইস ইত্যাদি দেবীকে পরিবেশন করা হয়ে থাকে। অমাবস্যার পরদিন বিশেষ ভোগ প্রদান করা হয়৷ উল্লেখ্য যে, মন্দিরে নারায়ণ শিলা থাকার কারণে নিরামিষ ভোগ হয়। দীপাবলি ছাড়াও চৈনিক নববর্ষের সময়তে চীনা পাড়ায় যখন উৎসবের আমেজ থাকে তখন এই মন্দিরেও বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়।

২০২২ সালে কালীপূজার সময় এই মন্দির দুটি পুরস্কার জিতেছিল, তা মন্দিরেই ভিতরেই সজ্জিত রয়েছে। হিন্দু এবং বৌদ্ধদের আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি প্রতীক হিসেবে এই মন্দিরটি সত্যিই এক দর্শনীয় স্থান হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading