সববাংলায়

অলিম্পিকে ভারতের অংশগ্রহনে দোরাবজী টাটার অবদান

বিভাগঃ ,

স্যার দোরাবজী টাটা (Dorabji Tata)– এই নামটার সঙ্গে অলিম্পিক প্রতিযোগিতার কোন সম্পর্ক থাকতে পারে কখনো ভেবেছেন? টাটা শুনলেই শিল্প-ব্যবসা-উদ্যোগপতিদের কথাই মাথায় আসে প্রথমে, কিন্তু টাটা পরিবারের অন্য সকল সদস্য ব্যতিরেকে এই বিশেষ ব্যক্তিটির কাছে ভারতীয়রা চিরদিন ঋণী হয়ে থাকবে। কিন্তু ভেবেছেন কখনো এত ঐতিহ্যবাহী বিশ্ব-ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পরাধীন ভারতের যোগদান কীভাবে সম্ভব হল? এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন স্যার দোরাবজী টাটা। চলুন জেনে নেওয়া যাক ভারত অলিম্পিক ও দোরাবজী টাটা -র এক অনবদ্য মেলবন্ধনের কাহিনি।

ভারতের ক্রীড়াচর্চার সঙ্গে প্রথম স্যার দোরাবজী টাটার পরিচয় ঘটে পুনেতে ১৯১৯ সালে যখন তিনি ডেকান জিমখানার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মুখ্য অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। সেই প্রতিযোগিতায় তিনি লক্ষ করেন যে, বেশিরভাগ প্রতিযোগীই কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন এবং খালি পায়েই তাঁরা ইউরোপীয়দের সমান সময়ে রেস শেষ করছে দেখে অবাক হলেন দোরাবজী। তিনি নিজেও একজন ক্রীড়াপ্রেমী, টেনিস খেলা এবং ঘোড়-দৌড়ে তাঁর ছিল অসাধারণ দক্ষতা। ভারতীয় ওই প্রতিযোগীদের দেখেই তিনি বুঝেছিলেন তাঁরা কতটা সম্ভাবনাময়। মনে মনে এক অসম্ভবকে ছোয়াঁর চেষ্টা করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন তিনি- অলিম্পিকে সোনা জেতা। এখন সোনা জিততে হলে তো আগে অলিম্পিকে অংশ গ্রহণ করতে হবে।

তাই শুরু হয়ে গেল তোড়জোড়। সেই সময় বম্বের গভর্নর ছিলেন স্যার লয়েড জর্জ। তাঁকে অনুরোধ করলেন দোরাবজী আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির পক্ষ থেকে ভারতের অ্যাথলিটদের খেলায় যোগদানের বিষয়ে অনুমোদন সংগ্রহ করার জন্য। পুনেতে দোরাবজী টাটা একটি আধুনিক ‘মিট’-এর আয়োজন করেন অলিম্পিকে যোগদানের জন্য অ্যাথলিট নির্বাচনের উদ্দেশ্যে। এইচ. জি. ওয়েবারের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি ছয়জন অ্যাথলিটকে নির্বাচন করে যারা তৎকালীন ভারতের জাতীয় টেনিস চ্যাম্পিয়ন ড. এ. এইচ. ফয়েজির তত্ত্বাবধানে ‘এস এস মান্টুয়া’ নামক একটি জাহাজে চেপে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সেইসময় অলিম্পিকে যোগদানের খরচ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা যার মধ্যে মাত্র আঠারো হাজার টাকাই সংগৃহীত হয়েছিল। ভারত সরকার মাত্র ছয় হাজার টাকা সাহায্য করেছিল আর বাকি পুরো অর্থই দিয়েছিলেন স্যার দোরাবজী টাটা। ফলে তাঁর উৎসাহ এবং উদ্যোগেই ১৯২০ সালে অ্যান্টওয়ার্পে আয়োজিত অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় ভারত প্রথম অলিম্পিকের মঞ্চে পা রাখে। সেই প্রথমবার অলিম্পিকে যোগদানে ভারতীয় দল থেকে যোগ দিয়েছিলেন চারজন অ্যাথলিট এবং দুজন কুস্তিগীর। হাবলি থেকে পি. এফ. চৌগলে, সাতারা থেকে এ. দত্তার উভয়েই ম্যারাথন দৌড় এবং দশ হাজার মিটার দৌড়ে যোগ দেন। বেলগাঁও থেকে অ্যাথলিট এম. কৈকারি ক্রস-কান্ট্রি রেসে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিলেন এবং বাকি দুজন কুস্তিগীরদের মধ্যে বম্বের জি. নাভালে এবং কোলাপুরের এন. শিণ্ডে অলিম্পিকে যোগ দিয়েছিলেন। আর সবশেষে উল্লেখ করতেই হয় এক বাঙালির নাম – পুরমা ব্যানার্জি। চারশো মিটার দৌড়ে যোগ দিয়েছিলেন পুরমা এবং একইসঙ্গে ভারতীয় দলের পক্ষ থেকে জাতীয় পতাকা বহনের মাধ্যমে দলের নেতৃত্ব দিয়ে সেদিনের অলিম্পিকের মঞ্চে পরিচয় করিয়েছিলেন ভারতকে সমগ্র বিশ্ববাসীর সঙ্গে। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন সাধারণ ঘরের মানুষ, শুধুমাত্র দক্ষতার ভিত্তিতেই এঁরা অলিম্পিকে যোগদানের সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির তৎকালীন সভাপতি কাউন্ট বেলি লাটুরকে ১৯২৯ সালে এক চিঠিতে দোরাবজী টাটা জানান যে, প্রথমে ১৯২০ সালের অলিম্পিকে তাঁর পরিকল্পনা ছিল শুধুমাত্র তিনজন শ্রেষ্ঠ ভারতীয় দৌড়বিদকে পাঠানোর। কিন্তু সেই প্রস্তাবে সারা শহর জুড়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়ে যায় এবং সেই আন্দোলনের ফলে একটি সম্পূর্ণ ভারতীয় দলকেই অলিম্পিকে পাঠানোর সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়।

প্রথম অলিম্পিকে যোগদানকারী ভারতীয় এই দলটি কোনো পদক জিততে না পারলেও ভারতের মর্যাদা ও গর্ব অক্ষুণ্ন রেখেছিল। এর পর থেকে প্রত্যেক গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ভারত নিয়মিতভাবে যোগদান করেছে। অ্যান্টওয়ার্প অলিম্পিক থেকে ফিরে দোরাবজী সিদ্ধান্ত নেন দেশের অ্যাথলিটদের উচ্চমানের প্রশিক্ষণ দেওয়ার আশু প্রয়োজন আর সেই জন্যে নিজের অর্থেই ওয়াইএমসিএ(YMCA)-র ফিজিক্যাল ডিরেক্টর এ. নোহেরেনকে তিনি সমগ্র দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে ঘুরে ক্রীড়াচর্চার প্রসার ঘটানোর জন্য পাঠান। চার বছর পরে ভারতীয় দলের ১৯২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে যোগদানের জন্য অবশ্য খুব বেশি খরচ বহন করতে হয়নি দোরাবজীকে কারণ তাঁর দেখানো পথে অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন রাজ্য এরপর থেকে অলিম্পিকে যোগদানকে উৎসাহিত করতে থাকে এবং অর্থসাহায্য করতে শুরু করে। প্রথমত সেই বছর নয়জন প্রতিযোগীকে নিয়ে দিল্লিতে একটি জাতীয় ক্রীড়া প্রদর্শনী আয়োজিত হয় যাকে অনেকে দিল্লি অলিম্পিকও বলে থাকেন। তারপর শুরু হয় তহবিল গঠন। পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে আড়াই হাজার টাকা, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, বিহার, মাদ্রাজ প্রত্যেক জায়গা থেকে দুই হাজার টাকা করে এবং কলকাতা শহর থেকে চার হাজার টাকা অর্থসাহায্য উঠে আসে। পাটিয়ালার লং-জাম্পার দলীপ সিংয়ের জন্য পাটিয়ালার ক্রীড়াপ্রেমী মহারাজা ভূপিন্দর্‌ সিং পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ১৯২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে ভারতীয় দলের প্রশিক্ষক ছিলেন ওয়াইএমসিএ কলেজের শারীরশিক্ষার অধ্যাপক এবং একইসঙ্গে আমেরিকান অ্যাথলিট এইচ. সি. বাক। কিন্তু এই অলিম্পিকেও স্বপ্নপূরণ হয়নি দোরাবজী টাটার।

১৯২৭ সালে ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয় যার প্রথম সভাপতি ছিলেন স্যার দোরাবজী টাটা। এই অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক নির্বাচিত একটি দল ভারতীয় হকি ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ১৯২৮ সালের অ্যামস্টারডামে আয়োজিত অলিম্পিকে হকি প্রতিযোগিতায় যোগ দেয় এবং অভাবিতভাবে চূড়ান্ত ম্যাচে নেদারল্যাণ্ডকে ৩-০ স্কোরের ব্যবধানে পরাজিত করে প্রথম স্বর্ণপদক জয়ের খেতাব অর্জন করে। অলিম্পিকে ভারতের প্রথম স্বর্ণপদক জয়ের ইতিহাস তৈরি হয় হকি খেলাকে ঘিরে। ভারতের অলিম্পিক জয়ের যে স্বপ্ন স্যার দোরাবজী টাটা দেখেছিলেন তা পূর্ণ হল অবশেষে। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিরও সদস্য হয়েছিলেন তিনি যা ভারতের পক্ষে অত্যন্ত গর্বের বিষয় ছিল।

১৯৩২ সালের ৩ জুন স্যার দোরাবজী টাটার মৃত্যু হয়। অলিম্পিক ও দোরাবজী টাটা তাই ভারতীয়দের কাছে সমার্থক তাঁর দেখানো পথেই ভারত প্রত্যেক অলিম্পিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে যোগদান করে চলেছে শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষ্যে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading