বিজ্ঞান

মহাজাগতিক স্ফীতিশীলতা তত্ত্ব ।। কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি

কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি

এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের এত রহস্য, এত অজানা দিক, এত বৈচিত্র্য সব আমাদের মনে একটাই প্রশ্নের জন্ম দেয় – কীভাবে সৃষ্টি হল এই মহাবিশ্ব? চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারায় ভরা আজকের সুবিন্যস্ত ব্রহ্মাণ্ডের প্রাথমিক অবস্থা ঠিক কেমন ছিল? বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য নিয়ে বহু বিজ্ঞানী বহু বছর ধরে গবেষণা করেছেন। স্টিফেন হকিং, এডুইন হাব্‌ল প্রমুখ বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণার ফলে এই সৃষ্টি রহস্যের একটা সর্বজনস্বীকৃত কাঠামো আবিষ্কৃত হয়েছে আর সেখান থেকেই আমরা জেনেছি মহাবিশ্ব সৃষ্টির মূলে রয়েছে মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব, বিগ ব্যাং (Big Bang)। এই অসীম বিপুল বিস্তৃত মহাবিশ্বের জন্ম কিন্তু একটি বিন্দু থেকে। কিন্তু শুধুমাত্র এই তত্ত্ব দিয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্যকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। এই তত্ত্বেরও কিছু সীমাবদ্ধতা এবং ত্রুটির দিক ছিল। পরে সেই দুর্বলতার দিকগুলিকে মাথায় রেখেই আবিষ্কৃত হয় মহাবিশ্ব প্রসারণের আরেক নতুন তত্ত্ব ‘মহাজাগতিক স্ফীতিশীলতা তত্ত্ব’ বা ‘কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি’ (Cosmic Inflation Theory)।

আজ থেকে প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর আগে এক মহাবিস্ফোরণের ফলেই নাকি এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে। এই বিগ ব্যাং তত্ত্বই এতদিন মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য ব্যাখ্যা করে এসেছে। কিন্তু ১৯৮১ সালে আমেরিকান পদার্থবিদ অ্যালান গুথ (Alan Guth) প্রথম মহাবিশ্ব সৃষ্টির পিছনে কসমিক ইনফ্লেশন থিওরির কথা বলেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্ব একটি অত্যন্ত দ্রুত সূচকীয় সম্প্রসারণের সময়কাল (Extremely Rapid Exponential Expansion) অনুসারে প্রসারিত হয়েছে। বিগ ব্যাং বিস্ফোরণের ১০-৩৬ সেকেন্ডের মধ্যেই এই দ্রুত সম্প্রসারণটি ঘটেছিল বলেই এই তত্ত্বে বলা হয়। দ্রুত সম্প্রসারণকালের পরে মহাবিশ্বের আকার খুব ধীর গতিতে বাড়ছিল। সমগ্র মহাবিশ্বের বয়স যখন ৭৭০ কোটি বছর পেরিয়ে গেছে তখন আবার ডার্ক এনার্জির কারণে সম্প্রসারণের গতি বাড়তে থাকে। বিগ ব্যাং থিওরিতে বলা হয়েছিল যে মহাবিশ্ব সৃষ্টির পর থেকে খুব ধীরে ধীরেই প্রতিদিন এই মহাবিশ্বের আকার বাড়ছিল, কিন্তু কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি অনুসারে এই প্রসারণপর্বের মধ্যে এমন কিছু সময়ও ছিল যেখানে মাত্র ১০-৩২ সেকেন্ডের মধ্যে মহাবিশ্বের আকার ১০২৬ গুণ বর্ধিত হয়েছিল। শুধু অ্যালেন গুথ নয়, তাঁর সঙ্গে ল্যান্ডাউ ইনস্টিটিউট ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স-এর অধ্যাপক অ্যালেক্সেই স্টারোবিন্সকি, লেবেদফ ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউটের আন্দ্রেই লিন্ডেও এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। সেই কারণে ২০১৪ সালে তাঁরা তিনজন একত্রে কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি প্রণয়নের জন্য কাভ্লি পুরস্কারে (Kavli Prize) ভূষিত হন। অনেক পদার্থবিদ মনে করেন সমগ্র মহাবিশ্ব কেন সবদিকে একইরকম, তার ব্যাখ্যাও এই তত্ত্ব থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু এই মহাজাগতিক স্ফীতির জন্য দায়ী কণার কোনওরূপ অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে তাত্ত্বিকভাবে মহাজাগতিক স্ফীতির জন্য দায়ী তাত্ত্বিক ক্ষেত্রটিকে অনেকে ‘ইনফ্ল্যাটন’ (Inflaton) বলে থাকেন। ২০০২ সালে অ্যালান গুথ, আন্দ্রেই লিন্ডে এবং পল স্টেইনহার্ড কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি প্রণয়নের জন্য ডিরাক পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১২ সালে অ্যালান গুথ এবং লিন্ডে ‘ব্রেক-থ্রু’ পুরস্কারে ভূষিত হন।

কসমিক ইনফ্লেশন থিওরিতে বলা হচ্ছে, যে কোনও প্রসারণশীল মহাবিশ্বের একটি মহাজাগতিক দিগন্ত থাকে। এই দিগন্তটি আসলে অনেকটা পৃথিবীর মানুষের চোখে দেখা দিগন্তের মতই যা একজন দর্শকের কাছে দৃশ্যমান জগতের সীমানা নির্ধারণ করে। একইভাবে মহাজাগতিক দিগন্তের ওপারে থাকা কোনও বস্তু থেকে আলোক নিঃসৃত হলে তা কিন্তু এই সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের পর্যবেক্ষকের চোখে ধরা পড়বে না। কারণ পর্যবেক্ষক এবং বস্তুর মধ্যে থাকা শূন্যস্থানটি অতি দ্রুতহারে প্রসারিত হচ্ছে। এক বিরাট অসীম অপর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের কেবলমাত্র সামান্যই পর্যবেক্ষণ করা যায়। অন্যান্য অংশগুলির সঙ্গে পৃথিবীর কোনও সংযোগই থাকে না। এই অংশগুলি বর্তমান মহাজাগতিক দিগন্তের ওপারে রয়েছে। সাধারণ মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব অর্থাৎ যে তত্ত্বে প্রসারণ বা স্ফীতিকে মেনে নেওয়া হয় না সেই তত্ত্বে মহাজাগতিক দিগন্তের সরে যাওয়ার ফলে নতুন নতুন অঞ্চল প্রকাশ্যে আসে। অথচ এই নতুন অঞ্চল স্থানীয় পর্যবেক্ষকের চোখে একই রকম লাগে। এক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন এবং উষ্ণতা একই হয়। এই সদৃশ্যতাই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয় – যে কীভাবে এটা সম্ভব হতে পারে কারণ এই নতুন অঞ্চলগুলির দৃশ্যমান জগতের কোনো সংকেত পাওয়ার কথা নয় যা থেকে এই বিকিরণ, উষ্ণতা, বক্রতা সম্পর্কিত কোন তথ্য পাওয়া যায়! কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় – পূর্ববর্তী কালের মহাজাগতিক ধ্রুবকসমন্বিত অঞ্চল থেকেই এই নতুন অঞ্চলগুলি আসে। যেহেতু এই প্রসারণের জন্য দায়ী কোনও বস্তুকে চিহ্নিত করা যায়নি, ফলে অ্যালান গুথ একটি তাত্ত্বিক ক্ষেত্রের কল্পনা করেছেন যাকে তিনি নাম দেন ‘ইনফ্লেশন ফিল্ড’ বা স্ফীতি ক্ষেত্র। ইনফ্লেশন এমনই এক কোয়ান্টাম ক্ষেত্র যা স্থান ও সময়কে প্রসারিত করে এবং শূন্যস্থানেও থাকতে পারে এমন শক্তি ধারণ করে। বিপুল পরিমাণ শূন্য শক্তি (Vaccum Energy) নিয়ে এই প্রসারণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তত্ত্ব অনুসারে প্রসারণকাল শেষ হলে তা সাধারণ বস্তু এবং বিকিরণের রূপ নেয়।

এই কসমিক ইনফ্লেশন তত্ত্ব পূর্বতন মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের বেশ কিছু সমস্যা বা দুর্বলতার দিকগুলির যথাযথ সমাধান খুঁজে পেয়েছে।

১. সামতলিক সমস্যা (Flatness Problem) – সংকট ঘনত্বযুক্ত (Critical Density) মহাবিশ্বকে সমতল (Flat) বলা হয়। সাধারণভাবে দেখা যায় আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব এই সংকট ঘনত্বের খুব কাছাকাছি। কিন্তু বিগ ব্যাং তত্ত্বে বলা হয়েছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্বের বক্রতাও বাড়তে থাকে। ফলে এখানে এই মহাবিশ্বের সমতল হওয়া নিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান দেয় কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি।

২. দিগন্ত সমস্যা (Horizon Problem) – মহাবিশ্ব কেন সবদিকেই একইরকম – এই প্রশ্নের উত্তর মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বে সেভাবে পাওয়া না গেলেও এই কসমিক ইনফ্লেশন থিওরিতে বলা হয় মহাবিশ্বের দূরবর্তী সকল অঞ্চলই একসময় একইসূত্রে আবদ্ধ ছিল। মহাবিশ্বে দূরবর্তী স্থানগুলিতেও দেখা যায় তাপমাত্রা একই রকমের। এর কারণ অনুসন্ধানেই এই কসমিক ইনফ্লেশন তত্ত্ব জানায় যে একসময় মহাবিশ্বের এক পর্যায়ে সব কিছুই অনেক কাছাকাছি ছিল এবং কোনও না কোনও সময় মহাবিশ্ব স্ফীত হওয়ার আগে সংকুচিত হয়েছিল।  

৩. মনোপোল সমস্যা (Monopole Problem) – বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুসারে মহাবিস্ফোরণের পরে অসংখ্য চৌম্বকীয় একমেরু (Magnetic Monopole) উৎপন্ন হয়েছিল। কিন্তু এই সব চৌম্বকীয় একমেরুগুলিকে পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। ফলে ইনফ্লেশন তত্ত্ব অনুসারে সেইরকম চৌম্বকীয় একমেরু যদি থেকেও থাকে, তবে তা প্রসারণ শুরু হওয়ার আগেই ছিল এই মহাবিশ্বে। প্রসারণের সময় এই একমেরুগুলির ঘনত্ব সূচক হারে (exponentially) কমতে থাকে।

এর পাশাপাশি কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি মহাবিশ্বের সৃষ্টিকালীন আকার সম্পর্কেও ধারণা দেয়। এই তত্ত্ব অনুসারে আমাদের আজকের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের অংশটি আগে ছিল আণুবীক্ষনিক এবং তার পরবর্তী কয়েক বছর ধরে উচ্চ ঘনত্বের অঞ্চলগুলি ক্রমে ক্রমে নক্ষত্র, ছায়াপথ ইত্যাদিতে ঘনীভূত হয়েছে। ফলে মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব বা বিগ ব্যাং থিওরিকে পিছনে ফেলে এই কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাসের এক নতুন দিশা রচনা করতে সক্ষম হয়েছে।

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন