বিবিধ

ভারতীয় নির্বাচনে ভোট গণনা

ভারতবর্ষ বিশ্বের সর্ব বৃহৎ গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আর এই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হল নির্বাচন। ভারতবর্ষে বিভিন্ন প্রকার নির্বাচন হয়ে থাকে। এই নির্বাচনগুলির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভোট গণনা। আসুন জেনে নেওয়া যাক ভারতীয় নির্বাচনে ভোট গণনা (Counting of votes in Indian Election) হয় কীভাবে।

নির্ধারিত দিনে কোন বিধানসভা আসনের ভোট শেষ হওয়ার পরই সেই আসনের প্রতিটি বুথের ইভিএমগুলি স্ট্রং রুমে পাঠানো হয়। সাধারণত স্ট্রং রুম হয় গণনা কেন্দ্রের কাছাকাছি। ইভিএম স্ট্রং রুমে পৌঁছলে প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনী এজেন্টের উপস্থিতিতে স্ট্রং রুম সীল করে দেওয়া হয়। একবার স্ট্রং রুম সীল করে দেওয়ার পর ভোটগণনার দিনের আগে পর্যন্ত স্ট্রং রুম খোলা যায় না। যদি স্ট্রং রুম অনিবার্য কারণে খোলার প্রয়োজন হয় তবে তা প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনী এজেন্টের সামনে খুলতে হবে যাঁরা আবার স্ট্রং রুম সীল করার সময়ে নিজে হাতে তালার ওপর গালা সীল করতে পারেন।

স্ট্রং রুমের নিরাপত্তায় থাকে তিন বলয়ের সশস্ত্র নিরাপত্তা যার মাঝখানে থাকে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং বাইরে থাকে রাজ্য পুলিশের সশস্ত্র বাহিনী এবং জেলা কার্যনির্বাহী বাহিনী। স্ট্রং রুমে প্রবেশ এবং বেরনোর জন্য একটাই দরজা থাকবে। একের অধিক দরজা থাকলে তা ইঁট দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। দরজায় দ্বিস্তরীয় লকিং সিস্টেম থাকবে।

নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশ, রিটার্নিং অফিসার ভোট গুনবেন। প্রত্যেক কেন্দ্রের জন্য একজন রিটার্নিং অফিসার মনোনয়ন করে কেন্দ্র। তিনি সাধারণভাবে কোনও আধিকারিক পর্যায়ের ব্যক্তি হন বা কোনও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রিটার্নিং অফিসার হন সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসক।

গণনা কেন্দ্রে কেবলমাত্র নিম্নলিখিতরা প্রবেশ করতে পারবেন- রিটার্নিং অফিসার, অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার, প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট ও কাউন্টিং এজেন্ট, কমিশনের অবজারভার, মাইক্রো অবজার্ভার, নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সরকারি আধিকারিক। পুলিশ অফিসার এবং মন্ত্রীদের প্রবেশে অনুমতি নেই।

ভোটগ্রহণের দিনক্ষণ নির্ধারণের সময়ই কমিশনকে ঠিক করে নিতে হয় ভোট গণনা কবে হবে এবং তা প্রার্থীদের জানিয়ে দিতে হয়।  এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে যদি কোন আসনের কোন বুথে পুনরায় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত কমিশন নিয়ে থাকে তাহলে যতক্ষণ না সেই ভোট হচ্ছে ততক্ষন নির্ধারিত তারিখে ভোট গণনা করা যাবে না। যদি ভোট গণনার দিনেই পুনরায় নির্বাচন (Repoll) হয় তাহলে ভোট গ্রহণ শেষে সরাসরি বুথ থেকেই ইভিএম গণনা কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে এবং আগের সমস্ত ইভিএম গণনা হয়ে গেলে তবেই এই ভোট গণনা করতে হবে।

আগেই বলা হয়েছে রিটার্নিং অফিসার ভোট গণনার সমস্ত দায়িত্বে থাকবেন। রিটার্নিং অফিসার হিসেবে সাধারনত জেলাশাসকরা গণ্য হয়ে থাকেন। গণনা শুরুর নির্ধারিত সময়ে রিটার্নিং অফিসার ভোট গণনার প্রক্রিয়া শুরু করবেন। রিটার্নিং অফিসার, অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার, প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট ও কমিশনের অবজারভারের উপস্থিতিতে  স্ট্রংরুম খোলা হয়। প্রথমে লগ বুকে (Log book) এ প্রয়োজনীয়  সমস্ত কিছু নথিবদ্ধ করার পর তালায় মারা গালা সীল অপরিবর্তিত আছে কিনা দেখে নিয়ে সীল ভাঙা হবে। শুরু থেকে শেষ অবধি সমস্ত প্রক্রিয়াটি ভিডিও করে রাখতে হবে। এখানে বলে রাখা ভালো প্রত্যেক বিধানসভা আসনের ভোট গণনা আলাদা আলাদা হল ঘরে করার ব্যবস্থা থাকতে হয়। স্থান সঙ্কুলান না হলে কোন একটি ঘরে একটি বিধানসভা আসনের ভোট গণনা শেষ হলে তবেই অন্য  বিধানসভা আসনের ভোট গণনা শুরু করা যেতে পারে। মাথায় রাখতে হবে একটি হল ঘরে কেবলমাত্র একটিই  বিধানসভা আসনের ভোট গণনা করা যায়। কোনভাবেই একাধিক আসনের ভোট একটি নির্দিষ্ট ঘরে করা যাবেনা।

কন্ডাক্ট অব ইলেকশন রুল, ১৯৬১ অনুসারে ভোট গণনা প্রক্রিয়া বিরতিহীনভাবে চালাতে হবে। ভোট গণনার প্রথমে পোস্টাল ব্যালট তারপর ইভিএম এবং শেষে ভিভিপ্যাট  এ পড়া ভোট গণনা করা হয়। পোস্টাল ব্যালট গণনা শুরুর আধ ঘণ্টার মধ্যে ইভিএমে পড়া ভোট গণনা শুরু করা যেতে পারে। রিটার্নিং অফিসারের টেবলেই পোস্টাল ব্যালট গণনা হয়ে থাকে। গণনা শুরুর আগের দিন রিটার্নিং অফিসার কমিশনের অবজারভারকে জানাতে বাধ্য থাকেন সমগ্র সংগৃহীত পোস্টাল ব্যালটের সংখ্যা কত। সাধারণত প্রতি রাউন্ড ভোট গণনায় ৫০০ এর বেশি পোস্টাল ব্যালট গণনা করা হয় না। এই পোস্টাল ব্যালট গণনায় সর্বাধিক চারটি টেবল ব্যবহার করা যেতে পারে সেক্ষেত্রে  প্রতিটি টেবলের দায়িত্বে থাকবেন একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার,একজন কাউন্টিং সুপারভাইজার , দুজন কাউন্টিং অ্যাসিস্ট্যান্ট যাঁরা প্রত্যেকেই গেজেটেড অফিসার হবেন। এছাড়া সঙ্গে থাকবেন প্রত্যেক প্রার্থীর একজন করে নির্বাচনী এজেন্ট।

কন্ডাক্ট অব ইলেকশন রুল,১৯৬১ এর ৫৪(ক) ধারা অনুসারে পোস্টাল ব্যালট গণনা শুরুর আধ ঘণ্টার মধ্যে ইভিএমে পড়া ভোট গণনা শুরু করা যেতে পারে। স্ট্রংরুম থেকে প্রথমে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ইভিএমগুলি গণনা কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হয়। এবার পোলিং বুথের ক্রমিক সংখ্যা অনুসারে ইভিএমগুলি টেবলে সাজানো হয়, অর্থাৎ প্রথম রাউন্ড গণনার সময়ে ১ নং পোলিং বুথের কন্ট্রোল ইউনিটটি থাকবে ১ নং টেবলে, ২নং পোলিং বুথের কন্ট্রোল ইউনিটটি থাকবে দ্বিতীয় টেবলে। এভাবে সমস্ত ইভিএম গুলি ক্রমানুসারে টেবলগুলিতে সাজানো হয়। এভাবে সাজানোর পর শুরু হয় ইভিএমে দেওয়া ভোটের গণনা। এর মাঝে কমিশনের অবজারভার যেকোনো দুটি ইভিএম তাঁর ইচ্ছেমতো একই সাথে সমান তালে গুণতে পারেন। এভাবে প্রথম রাউন্ড গণনার শেষে রিটার্নিং অফিসার প্রথম রাউন্ড গণনার ফলাফল প্রকাশ করেন ও ১৭-গ (17-C) ফর্মের দ্বিতীয় অংশটি পূর্ণ করেন। এরপর তাঁর অনুমতি নিয়ে পরবর্তী রাউন্ড গণনা শুরু হয়। ইভিএমের মাধ্যমে প্রদত্ত ভোট গণনার সময় স্ট্রংরুম থেকে কেবল মাত্র কন্ট্রোল ইউনিট (CU) টি গণনাকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। এর সাথে আনা হয় প্রিসাইডিং অফিসার প্রদত্ত গালা সীল করা  ১৭-গ (17-C) ফর্ম। কনট্রোল ইউনিটের রেজাল্ট বোতামটি টিপে প্রার্থী অনুযায়ী প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা গণনার সময় তা সকল প্রার্থী মনোনীত নির্বাচনী এজেন্টদের সামনে দেখা হয়।

এইভাবে ইভিএমের মাধ্যমে প্রদত্ত ভোট গণনার পর শুরু হয় ভিভিপ্যাট –এ জমা হওয়া কাগজের স্লিপ গণনা করা।কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশিকা অনুসারে প্রতিটি বিধানসভা আসনের  যে কোন পাঁচটি পোলিং বুথের ভিভিপ্যাটে সঞ্চিত কাগজের স্লিপ গণনা ভোট গণনার একটি আবশ্যিক অংশ। ইভিএমের মাধ্যমে প্রদত্ত ভোট গণনা শেষ হলে তবেই ভিভিপ্যাটে সঞ্চিত কাগজের স্লিপ গণনা শুরু করা যাবে। যদি ভিভিপ্যাট এবং ইভিএমের মধ্য়ে সংখ্য়াগত ফারাক দেখা যায়, সেক্ষেত্রে ভিভিপ্যাটের ফলই গণ্য হবে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন