ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীর মৃত্যু

দুর্যোধনকে মৈত্রেয় মুনির অভিশাপ

মহাভারতের বনপর্বের দশম অধ্যায়ে দুর্যোধনকে মৈত্রেয় মুনির অভিশাপ দেওয়ার কথা বর্ণিত আছে। পাশাখেলার পর পান্ডবরা যখন বনে চলে যান, তখন মহামতি বিদূর ধৃতরাষ্ট্রকে উপদেশ দিয়েছিলেন পান্ডবদের সাথে মিটমাট করে নেওয়ার জন্য। সেই কথা ধৃতরাষ্ট্রের পছন্দ না হওয়ায় তিনি বিদূরকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। কিন্তু পরে আবার তিনি সঞ্জয়কে আদেশ করেন বিদূরকে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং বিদূর ফিরে এলে তাঁর কাছে ক্ষমাও চান।

বিদূরের আবার ফিরে আসার খবর শুনে দুর্যোধন মোটেই খুশি হলেন না। তিনি তখনই শকুনি, কর্ণ, ও দুঃশাসনকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রণা করতে বসলেন। কর্ণ বললেন, “কুরুরাজ! এখন পান্ডবরা বনে একা বাস করছে। তাদের এখন কোন ক্ষমতা নেই। এখন যদি আমরা সবাই গিয়ে তাদের আক্রমণ করি তবে তারা আমাদের বাধা দিতে পারবে না। পান্ডবদের সাহায্য করার মত কোন বন্ধুও ওই বনে নেই। চলুন, আমরা এখনই সৈন্য নিয়ে গিয়ে পান্ডবদের সাথে যুদ্ধ করি এবং তাদের হত্যা করি।”

কর্ণের এই প্রস্তাব দুর্যোধনের খুবই পছন্দ হল। তখনই তিনি শকুনি, কর্ণ, দুঃশাসন এবং অনেক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের সাজে সেজে কাম্যক বনের দিকে যাত্রা করলেন। এদিকে এই খবর পেয়ে মহামুনি ব্যাস ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে দেখা করতে হস্তিনাপুরে এলেন। ব্যাসদেব ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, “মহারাজ! আমি কুরুবংশের ভালোর জন্য আপনাকে কিছু কথা বলব। আপনি দয়া করে মন দিয়ে শুনুন। দুর্যোধন ছলনা করে পান্ডবদের রাজ্য কেড়ে নিয়ে তাঁদের বনবাসে পাঠিয়ে অনেক কষ্ট দিয়েছে। এর প্রতিশোধ পান্ডবরা অবশ্যই নেবেন। আপনার ছেলে কেন বোকার মত রাজ্যের লোভে পান্ডবদের ক্ষতি করতে চাইছে? যদি ভালো চান তবে এখনই ওকে বারণ করুন। নাহলে শেষকালে দুর্যোধনের জন্যই এই বংশ নষ্ট হয়ে যাবে এবং তার জন্য দায়ী হবেন আপনি।”

ধৃতরাষ্ট্র উত্তর দিলেন, “মহাশয়! পান্ডবদের সঙ্গে পাশাখেলা এবং তাদের বনে পাঠানো কোনটাতেই আমার মত ছিল না। কিন্তু দুর্যোধন আমার কথা শোনে না এবং আমি স্নেহের বশে ওকে বারণও করতে পারি না।” ব্যাসদেব এবং ধৃতরাষ্ট্র যখন কথাবার্তা বলছিলেন, তখন মহর্ষি মৈত্রেয় কাম্যক বন থেকে ধৃতরাষ্ট্রকে দেখতে হস্তিনাপুরে এলেন। তাঁকে দেখে ধৃতরাষ্ট্র উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখালেন এবং আসন ও পা ধোয়ার জল দিয়ে সেবা করলেন। মুনি আসনে বসলে ধৃতরাষ্ট্র হাত জোড় করে জিজ্ঞাসা করলেন, “মহর্ষি! রাস্তায় আসতে আপনার কষ্ট হয়নি তো? পান্ডবরা সবাই ভালো আছে তো? তারা কি তাদের দেওয়া কথা রাখবে নাকি তেরো বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হস্তিনাপুর আক্রমণ করবে? কৌরব এবং পান্ডবদের মধ্যে কি শান্তি বজায় থাকবে?” এ কথার উত্তরে মুনি বললেন, “মহারাজ! আমি পান্ডবদের মুখে সব কথা শুনে কুরুকুলের ভালোর জন্যই আপনার কাছে এসেছি। আপনি বেঁচে থাকতে আপনার ছেলেরা এইভাবে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করলে সেটা মোটেই ভালো দেখায় না। আপনি কী জন্য এখনও পান্ডবদের সঙ্গে মিটমাট করে নিচ্ছেন না? সেদিন রাজসভায় পাশাখেলার নাম করে যে সব অন্যায় হয়েছে এবং আপনি তার প্রতিবাদ না করে যে পাপ করেছেন, সারাজীবন সাধুদের সঙ্গে থাকলেও আপনার সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে না।” একথা বলে মৈত্রেয় দুর্যোধনকে দেখতে চাইলে ধৃতরাষ্ট্র মাঝরাস্তা থেকে দুর্যোধনকে ডাকিয়ে আনালেন। দুর্যোধন প্রণাম করে দাঁড়ালে মৈত্রেয় তাঁকে আশীর্বাদ করে বললেন, “বাছা! তুমি কী জন্য পান্ডবদের সাথে লড়াই করছ? আমি তোমাকে ভালো কথা বলছি শোন। পান্ডবদের সাথে ঝগড়া করতে যেও না। তুমি তো জান, ভীম এবং অর্জুন কত বলবান। তাঁরা একসঙ্গে বক, হিড়িম্ব, কির্মীর প্রভৃতি ভয়ঙ্কর রাক্ষসদের হত্যা করেছেন। এমনকী, মগধের রাজা জরাসন্ধের মতো শক্তিশালী রাজাও ভীমের হাতে মারা গেছেন। বাছা! স্বয়ং বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ পান্ডবদের বন্ধু এবং রক্ষক। তাই আমি তোমাকে বলছি, নিজের ভালো চাও তো ওদের ক্ষতি কোরো না। যত তাড়াতাড়ি পার পান্ডবদের কেড়ে নেওয়া সম্পত্তি ফিরিয়ে দাও এবং তাঁদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও। এতেই তোমার মঙ্গল হবে।”

মুনির এই সব কথা শুনে দুর্যোধন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে থাকলেন এবং মাটির দিকে তাকিয়ে দুই হাত দিয়ে নিজের দুই ঊরুতে চাপড় মারতে মারতে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটিতে আঁকিবুকি কাটতে লাগলেন। মহর্ষি মৈত্রেয় বুঝতে পারলেন দুর্যোধন তাঁর কথায় গুরুত্ব দিচ্ছেন না এবং তাঁকে উপেক্ষা করছেন। এমন ব্যবহারে রাগে জ্বলে উঠলেন তিনি। দুর্যোধনকে অভিশাপ দিলেন, “হে অভিমানী কুরুরাজ! তুমি নিজের ঊরুতে চাপড় মারতে মারতে আমার কথা উপেক্ষা করলে! এমন ব্যবহারের উপযুক্ত উত্তর তুমি অবশ্যই পাবে। আজ থেকে তেরো বছর পরে বিশাল ধর্মযুদ্ধে ভীম গদার আঘাতে তোমার ঊরু ভেঙে তোমাকে তোমার অন্যায়ের শাস্তি দেবেন।”

এই অভিশাপ শুনে খুব ভয় পেয়ে গেলেন ধৃতরাষ্ট্র। তিনি হাত জোড় করে দুর্যোধনের এমন ব্যবহারের জন্য ঋষি মৈত্রেয়র কাছে ক্ষমা চাইলেন এবং এই অভিশাপ কাটানোর উপায় জানতে চাইলেন। তখন মৈত্রেয় বললেন যে, যদি পান্ডব ও কৌরবদের মধ্যে সব মিটমাট হয়ে যায়, একমাত্র তবেই এই অভিশাপ ফলবেনা। আর যদি তা না হয়, তবে অবশ্যই এই অভিশাপ কাজ করবে।” এই বলে মহর্ষি মৈত্রেয় হস্তিনাপুর ছেড়ে চলে গেলেন।

তথ্যসূত্র


  1. কালীপ্রসন্ন সিংহ বিরচিত ‘মহাভারত’, বনপর্ব, অধ্যায় ৭-১০, পৃষ্ঠা ৪০৮-৪১১
  2. ‘মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত’, ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ‘মৈত্রেয় মুনির অভিশাপ', পৃষ্ঠা ২০৯-২১৩

আপনার মতামত জানান