মূলত উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকায় গেলে দেখতে পাওয়া যায় অসংখ্য বৌদ্ধ মঠ। তিব্বতীয় স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন সেইসব মঠ বা মনাস্ট্রিগুলি খুবই দৃষ্টিনন্দন এবং আকর্ষণীয়। দার্জিলিং টাউন সেন্টার থেকে প্রায় ৩.৩ কিলোমিটার দূরত্বে পাহাড়ের ওপরে রয়েছে তেমনই একটি মঠ যেটি সাধারণভাবে ডালি মনাস্ট্রি (Dali Monastery) বা ডালি মঠ নামে পরিচিত। সমুদ্র থেকে ৭০০০ ফুট উচ্চতায় এর অবস্থান। হিল কার্ট রোড থেকে অপূর্ব সুন্দর দেখতে লাগে মনাস্ট্রিটিকে। মঠটির আরেকটি নাম হল দ্রুক সাঙ্গাগ চোলিং মনাস্ট্রি ( Druk Sangag Choling Monastery)। দার্জিলিংয়ের সবচেয়ে বড় মঠগুলির মধ্যে একটি হল এই ডালি মঠ। বহু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবং সন্ন্যাসিনীর বসবাস এখানে। শান্তিপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত ডালি মঠটির বয়স সেই অর্থে খুব বেশি না হলেও, এত অল্পদিনের ইতিহাসেও গরিমার অভাব নেই। দলাই লামার নাম জড়িত রয়েছে মঠটির সঙ্গে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মঠ পরিদর্শনের জন্য এসে ভিড় করেন পর্যটকের দল।
সাম্প্রতিক পোস্ট
ডালি মনাস্ট্রি বা দ্রুক সাঙ্গাগ চোলিং মনাস্ট্রিটি ১৯৭১ সালে প্রথম কিবজে থুকসে রিনপোচে (1st Kyabje Thuksey Rinpoche) নির্মাণ করেছিলেন। তিনি তাঁর সময়কার একজন সুপরিচিত ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। তিব্বতী সন্ন্যাসীদের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য মঠটি বিশেষভাবে পরিচিত। এই মনাস্ট্র্রি কার্গ্যুপা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। ডালি মঠ দ্বাদশ দ্রুকচেন রিম্পোচের সদর দফতর ও বাসস্থান, যিনি বৌদ্ধদের কার্গ্যুপা সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ প্রধান। ডালি মঠে বসবাসকারী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সংখ্যার বিচারে এটি সবচেয়ে বড় মনাস্ট্রিগুলির মধ্যেও অন্যতম একটি। এখানে ৩০০জনেরও বেশি সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনী বসবাস এবং অধ্যয়ন করেন, যাঁরা হিমালয় অঞ্চল থেকে এখানে বাস করতে এসেছিলেন। তাঁরা বৌদ্ধধর্মের নানারকম উচ্চমার্গীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হন এবং প্রার্থনাসহ আধ্যাত্মিক কাজকর্মেও নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। ১৯৯৩ সালে মহামহিম শ্রী দলাই লামা এই মঠে স্বয়ং এসেছিলেন এবং তিনদিন এখানে অবস্থান করে এখানকার আবাসিক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের গভীরভাবে শিক্ষা প্রদান করেছিলেন, বৌদ্ধ দর্শনের পাঠ দিয়েছিলেন।
ডালি মঠ বা মনাস্ট্রির স্থাপত্যশৈলী খুব সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঐতিহ্যবাহী তিব্বতীয় স্থাপত্যরীতিতে গড়ে তোলা এই অসামান্য বৌদ্ধবিহারটি খুবই দৃষ্টিনন্দন। লাল, সবুজ, নীল ইত্যাদি নানা রঙের সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায় মনাস্ট্রি জুড়ে। দূর থেকে বিশেষত হিল কার্ট রোডের ওপর থেকে উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত ডালি মনাস্ট্রিকে দেখতে যে অপূর্ব সুন্দর লাগে তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ডালি মঠের যে নাম অর্থাৎ দ্রুক সাঙ্গাগ চোলিং মনাস্ট্রি, তা মঠের বাইরের দেওয়ালে বড় বড় অক্ষরে খোদিত রয়েছে। ত্রিতল বিশিষ্ট এই মনাস্ট্রির সম্মুখদিকটিকে দেখলে লাল, হলুদ এবং সাদা রঙের আধিক্য স্পষ্টতই লক্ষ করা যায়। নীচের তলায় পরপর বেশ কয়েকটি স্তম্ভ দেখা যায় এবং প্রত্যেকটি স্তম্ভের গায়ে রয়েছে জটিল ও সূক্ষ্ম সব নকশা। এছাড়াও মনাস্ট্রির বাইরের এবং ভিতরের দেওয়ালের গায়ে এমনই বহু তিব্বতীয় অলঙ্করণের ছড়াছড়ি। দেয়ালের সেইসব নকশায় খুব উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। কেবলমাত্র তিব্বতী নকশাই নয়, ভগবান বুদ্ধের জীবন এবং প্রদত্ত শিক্ষার নানা টুকরো অংশও মঠের দেওয়ালে চিত্রিত রয়েছে। মঠের ভিতর প্রবেশ করে ভিতরের ভবনগুলির কাঠামো দেখে মোহিত হয়ে যেতে হয়। ভিতরে হাঁটতে হাঁটতে পথের ডানদিকে রয়েছে একটি বিশাল প্রার্থনা কক্ষ। সেই ঘরের সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষক জিনিস হল ঘরের একপাশে পরপর সাজিয়ে রাখা সোনালি রঙের নলাকার ড্রামের মতো জিনিস, তাদের গায়ে রয়েছে বিভিন্নরকম নকশা। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা প্রার্থনার সময় ওই সোনালি নলাকার কাঠামোগুলির সামনে বসে প্রার্থনা করে থাকেন এবং প্রার্থনার সময় সেই সোনালি চাকাগুলি তাঁরা ঘোরান। তাদের গুনগুন মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনিতে ছেয়ে যায় নিস্তব্ধ মঠের পরিবেশ। এরপর আরও খানিকটা উপরের দিকে হাঁটলে একটি সমতল খোলা জায়গায় পৌঁছে যাওয়া যাবে। সেখানেই ভিতরদিকে রয়েছে একটি স্কুল। এছাড়াও মঠে রয়েছে একটি ছোট্ট লাইব্রেরি, যেখানে বৌদ্ধ সংস্কৃতি এবং দর্শনের ওপর অনেক বই পাওয়া যায়। বই ছাড়াও পুরোনো কিছু মূল্যবান পান্ডুলিপিও রয়েছে এখানে। এছাড়াও মঠের ভিতরে রয়েছে একটি ক্যাফে, যার নাম কুঙ্গা পালজোর কফি শপ। সেখানে চা, কফি-সহ বিভিন্নরকম নিরামিষ খাবার পাওয়া যায়।
নিত্যদিন ডালি মনাস্ট্রিতে নিয়ম করে প্রার্থনা হয়। সকাল এবং বিকালে নির্দিষ্ট একটি সময়ে মঠ পরিদর্শনে গেলে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সমবেত প্রার্থনার অপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যায়। এছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে, বিশেষত বৌদ্ধদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলিতে এই মঠে উৎসবের এক পরিবেশ গড়ে ওঠে। বিশেষভাবে বলতে হয় বুদ্ধ পূর্ণিমার কথা। এই দিনটিকে গৌতম বুদ্ধের জন্মতিথি হিসেবে উদযাপন করা হয়ে থাকে। এসময় বিশেষ প্রার্থনার এবং নানারকম ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে মঠে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকের দল এসে ভিড় জমান এখানে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান