রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার দীর্ঘকাল পরেও নিখোঁজ ব্যক্তির কোনো খোঁজ না পাওয়া গেলে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে তাঁকে আইনত মৃত বলে ঘোষণা করা হয়ে থাকে। আমেরিকার বিখ্যাত মহিলা বিমানচালক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল একই ঘটনা। বিমানপথে বিশ্বভ্রমনের পরিকল্পনা করেছিলেন অ্যামেলিয়া এবং তাঁর বিমানচালক অন্তরঙ্গ বন্ধু নুনান। প্রশান্ত মহাসাগরের হাওল্যান্ড দ্বীপে পৌঁছনোর কথা থাকলেও তার আগেই নিখোঁজ হয়ে যায় তাঁদের বিমান। দু’বছর পরেও তাঁদের কোনোরকম সন্ধান না পাওয়া গেলে অ্যামেলিয়া এবং তাঁর বন্ধু নুনানকে মৃত বলে ঘোষণা করে আদালত। বিমানটির এই হারিয়ে যাওয়া নিয়ে নানারকম তত্ত্ব সেসময়ে এবং আজও প্রচলিত আছে। কেউ বলেন তাঁরা জাপানিদের হাতে বন্দী হয়েছিলেন, কেউ বলেন জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় বিমান ধ্বংস হয়ে যায়। এমনই নানারকম তত্ত্বের ভীড়ে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট মৃত্যু রহস্য আজও অন্ধকারেই রয়ে গেল ।
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট (Amelia Mary Earhart) ছিলেন আমেরিকার বিখ্যাত মহিলা বিমানচালক যিনি প্রথম মহিলা বিমানচালিকা হিসেবে এককভাবে আটলান্টিক মহাসাগর অতিক্রম করেন। এছাড়াও তিনি অনেক জনপ্রিয় বইয়ের লেখিকা ছিলেন।
১৯৩৭ সালের ১৭ মার্চ অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ড থেকে একটি লকহিড ইলেক্ট্রা ১০ই (10E) বিমানে যাত্রা শুরু করেছিলেন। প্রথম মহিলা হিসেবে বিমানপথে বিশ্বভ্রমণের রেকর্ড গড়বার স্বপ্ন ছিল তাঁর। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এই প্রথম উড়ান প্রচেষ্টায় অ্যামেলিয়ার সঙ্গী ছিলেন নুনান, হ্যারি ম্যানিং এবং মান্টজ। প্রথমত প্রোপেলার হাব এবং গ্যালিং সমস্যার জন্য ইলেক্ট্রা বিমান পার্ল হারবারের ফোর্ড দ্বীপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লুক ফিল্ডে থামে। তিনদিন পর সেই লুক ফিল্ড থেকে আবার যাত্রা শুরু হলেও ফরোয়ার্ড ল্যান্ডিং গিয়ার ভেঙে পড়ে, দুটো প্রোপেলার মাটিতে আঘাত করে সজোরে, ফলে বিমানটি সেযাত্রায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তাঁরা দ্বিতীয়বার যাত্রার জন্য প্রস্তুত হন এবং এইবার অ্যামেলিয়ার সঙ্গে কেবল ছিলেন ফ্রেড নুনান। ১৯৩৭ সালের ২০মে তাঁদের উড়ান শুরু হয়েছিল। এইবার তাঁরা ওকল্যান্ড থেকে প্রথমে ফ্লোরিডার মিয়ামি, তারপর সেখান থেকে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অসংখ্য যাত্রা বিরতির পর, নিউগিনির লা -এ এসে পৌঁছোন ২৯ জুন। এই পর্যায়ে প্রায় ২২০০০ মাইল যাত্রা সম্পন্ন হয়েছিল।
এরপর ১৯৩৭-এর ২ জুলাই লা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত হাওল্যান্ড দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন অ্যামেলিয়ারা। এখানে উল্লেখ্য যে, বিমানটি প্রায় ১১০০ গ্যালন পেট্রোল নিয়ে রওনা দিয়েছিল। উক্ত দ্বীপে তাঁদের গাইড করবার জন্য মার্কিন কোস্ট গার্ড ইউএসসিজিসি ইটাস্কা জাহাজ পাঠিয়েছিল। ইটাস্কাতে যোগাযোগ এবং নেভিগেশন ফাংশানও ছিল। এই ইটাস্কার কাজ ছিল ইয়ারহার্টের বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং সঠিকভাবে তাঁদেরকে দ্বীপে নিয়ে আসা। কিন্তু মেঘলা আকাশ, ত্রুটিপূর্ণ রেডিও ট্রান্সমিশন এবং দুটি ইঞ্জিনের লকহিড ইলেক্ট্রা বিমানের জ্বালানি হ্রাস পাওয়ায় অ্যামেলিয়ার প্লেন ইটাস্কার সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। রেডিও নেভিগেশন ব্যবহার করেও দ্বীপে যেতে পারেননি অ্যামেলিয়ারা। এছাড়াও ইটাস্কা এবং ইয়ারহার্টের বিমানের ব্যবহৃত টাইম সিস্টেমের মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল না। ইয়ারহার্ট ব্যবহার করতেন জিসিটি (গ্রিনউইচ সিভিল টাইম) কিন্তু ইটাস্কা ছিল নেভাল টাইম জোন ডেজিগনেশন সিস্টেমের অধীনে। প্রায় আড়াই লক্ষ বর্গমাইল জুড়ে সমুদ্রে মার্কিন নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের জাহাজ অনেক প্রযুক্তি সহকারে তাঁদের অনুসন্ধান করেও ব্যর্থ হয়েছিল। এছাড়াও ইয়ারহার্টের শেষ রেকর্ড করা বার্তার প্রায় একঘন্টা পরে হাওল্যান্ড দ্বীপের উত্তর এবং পশ্চিমে খুঁজেও তাঁদের কোনো সন্ধান মেলেনি। নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের জাহাজ ছাড়াও বিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস লেক্সিংটন, যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কলোরাডো, জাপানি সমুদ্রবিজ্ঞান জরিপ জাহাজ কোশু ইত্যাদির সাহায্যেও ছয়-সাতদিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়েও ফল হয়নি কোনো। ১৯৩৭ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত সরকারী অনুসন্ধান প্রচেষ্টা জারি ছিল। কিন্তু এত সন্ধানের পরও খুঁজে পাওয়া যায় নি অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের বিমান। অবশেষে দীর্ঘকাল কেটে যাওয়ার পর প্রায় ১৮ মাস পর ১৯৩৯ সালের ৫ জানুয়ারিতে আদালতের আদেশে অ্যামেলিয়াকে আইনত মৃত ঘোষণা করা হয়।
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে নানারকম তত্ত্ব গড়ে উঠেছিল সেই সময়ে এবং পরবর্তীকালেও। প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীরা জ্বালানি হ্রাসের ফলে বিমানের ভাঙন এবং সমুদ্রে নিমজ্জনের তত্ত্বকেই আমল দিয়েছিলেন। ইটাস্কা থেকে অতিরিক্ত সংকেত লাভে অক্ষম হয়ে হাওল্যান্ড দ্বীপের খুব কাছাকাছি বা উত্তরের দিকে বিমানের জ্বালানি ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে কোস্ট গার্ডের প্রথম উত্তরদাতাদের মত। ইটাস্কা প্লেন থেকে এইচএফ রেডিও সংকেত গ্রহণ করতে পারছিল, কিন্তু যেহেতু ইটাস্কাতে এই এফ আরডিএফ-এর সরঞ্জাম ছিল না, তাই বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারা মুশকিল হচ্ছিল। ১৯৭০-এর দশকে অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন লরেন্স স্যাফোর্ড বিমানটির একটি দীর্ঘ বিশ্লেষণ শুরু করেছিলেন। তাঁর গবেষণায় জটিল রেডিও ট্রান্সমিশন ডকুমেন্টেশন অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্যাফোর্ড উপসংহারে পৌঁছেছেন যে বিমানটি খারাপ পরিকল্পনা এবং আরও খারাপভাবে তা বাস্তবায়নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ব্রিটিশ এভিয়েশন ইতিহাসবিদ রয় নেসবিট সমসাময়িক বিবরণ ও পুটনামের চিঠিপত্র ঘেঁটে সিদ্ধান্ত করেন লা-এ ইলেক্ট্রা বিমানে সম্পূর্ণ জ্বালানি ছিল না। কেউ বলেছেন নুনানের ‘সিঙ্গেল লাইন অ্যাপ্রোচের’ হিসেবে ভুল ছিল৷ আবার কয়েকজন বলে থাকেন যে, ইয়ারহার্ট এবং নুনান বেঁচে গিয়েছিলেন এবং অন্যত্র অবতরণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি বা হত্যা করা হয়নি। তবে সঠিক পথের অবস্থান নির্ণয়ে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। ২০০২ সাল থেকে তিনটি অভিযানে গভীর-সমুদ্র অন্বেষণ সংস্থা নটিকোস হাওল্যান্ড দ্বীপের চারপাশে অনুসন্ধান করেও ইলেক্ট্রা বিমানের ধ্বংসাবশেষের কোনো চিহ্নই খুঁজে পায় নি।
১৯৮৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ ফর হিস্টোরিক এয়ারক্রাফ্ট রিকভারি (TIGHAR) নামক একটি সংস্থা নিকুমারোরোতে (তখন নাম ছিল গার্ডনার দ্বীপ) অভিযান শুরু করেন। উক্ত সংস্থার পরিচালক রিচার্ড গিলেস্পি বিশ্বাস করেন যে, হাওল্যান্ড দ্বীপ খুঁজে না পেয়ে ইয়ারহার্ট এবং নুনান সেই গার্ডনার দ্বীপে জরুরী অবতরণ করেছিলেন। সেই ক্ষুদ্র জনবসতিহীন দ্বীপে কিছুদিন বসবাসের পর তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল বলেই সংস্থার দাবি। ইয়ারহার্টের নিখোঁজ হওয়ার এক সপ্তাহ পরে ৯ জুলাই, ইউএস নৌবাহিনীর বিমানগুলি গার্ডনার দ্বীপের উপর দিয়ে উড়েছিল কিন্তু কোনো বিমান দেখতে পায়নি যদিও সাম্প্রতিক কিছু বাসস্থানের চিহ্ন নাকি তারা খুঁজে পেয়েছিল পরে। ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা সেই গার্ডনার দ্বীপের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একটি আংশিক কঙ্কাল এবং ধাতুর টুকরো, ফ্রেকল ক্রিমের ভাঙা জার ইত্যাদি উদ্ধার করেছিল। পরবর্তীতে একজন চিকিৎসক সেগুলি পরীক্ষা করে বলেন কঙ্কালগুলি মানুষের। পরে সেই ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ ফর হিস্টোরিক এয়ারক্রাফ্ট রিকভারি সংস্থাটি ১৯৯৮ সালে সেই কঙ্কাল পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করে দাবি করেছিল যে, কঙ্কালটি একজন ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মহিলার। পরে, ২০১৮ সালে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদরা হাড়ের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে মত দেন যে, এগুলির সঙ্গে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের যোগই সবচেয়ে বেশি। পরে অবশ্য গবেষকরা বলেছিলেন যে, সেই হাড়গুলি পুরুষের এবং ইয়ারহার্টের প্লেন যে সেই দ্বীপেই অবতরণ করেছিল তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি।
এছাড়াও আরেকটি যে তত্ত্ব এই অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট মৃত্যু রহস্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল সেটিও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এই তত্ত্বানুসারে হাওল্যান্ড দ্বীপে যেতে ব্যর্থ হলে ইয়ারহার্ট এবং নুনানকে জাপানের দখলে থাকা মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে অবতরণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। একজনের মতে, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে ইলেক্ট্রা বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি কারণ জাপানিরা নাকি ইলেক্ট্রাকে স্ক্র্যাপে কেটে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল। আরও বলা হয় যে, জাপানিরা তাঁদের বন্দী করে মার্কিন সরকারের গুপ্তচর সন্দেহে এবং টোকিও থেকে প্রায় ১,৪৫০ মাইল দক্ষিণে সাইপান দ্বীপে নিয়ে যায়। সেখানে জাপানিদের নির্যাতনে এবং তাদের হেফাজতে সম্ভবত মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়ে মারা যান অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। এই তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে থাকেন আসলে ইয়ারহার্টরা মার্কিন গুপ্তচরের কাজেই বহাল ছিলেন এবং প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানি দূর্গগুলিতে নজরদারি করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তবে অনেকে বলে থাকেন, ইয়ারহার্ট বন্দী হওয়ার পর সাইপানে মারা যাননি, তবে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল এবং একটি ছদ্মনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তিনি। ১৯৭০ দশকে এই তত্ত্বের কিছু সমর্থক বলেন আইরিন বোলাম নামে নিউ জার্সির একজন মহিলা নাকি আসলে ইয়ারহার্ট ছিলেন। যদিও বোলাম নিজেই জোরালোভাবে একথা অস্বীকার করেন। পরে ইয়ারহার্টের এক বিমানচালক বন্ধু জ্যাকি কোচরান জাপানে যুদ্ধোত্তর অনেক ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, ইয়ারহার্টের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে জাপানিরা জড়িত নয়।
আমেরিকার এই সুপরিচিত বিমানচালিকা অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের নিখোঁজ এবং মৃত্যুকে ঘিরে গড়ে ওঠা রহস্য আজও যবনিকার আড়ালেই রয়ে গেছে। অনেক গ্রন্থ যেমন রচিত হয়েছে এই নিখোঁজ হওয়াকে ঘিরে তেমনি বানানো হয়েছে ডকুমেন্টারি। বিভিন্ন জায়গায় ইয়ারহার্টের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে রয়েছে বিবিধ মত। কিন্তু এত জল্পনা-কল্পনার মধ্যে থেকে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট মৃত্যু রহস্য সম্পর্কে আসল সত্যিটা বের করে আনা সম্ভব হয়নি আজও।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট | সববাংলায়Cancel reply