সববাংলায়

এডগার অ্যালান পো মৃত্যুরহস্য

বিভাগঃ , ,

মানবসভ্যতার ইতিহাসে রহস্যজনক মৃত্যুর একটি তালিকা করলে লক্ষ করা যাবে, সেই তালিকায় নাম রয়েছে বহু জ্ঞানীগুণী মানুষের। অত্যন্ত জনপ্রিয় আমেরিকান সাহিত্যিক এডগার অ্যালান পো-এর নামও সেই মৃত্যুরহস্যের তালিকায় খুঁজে পাওয়া যাবে। এক বৃষ্টির রাতে বাল্টিমোরের রায়ানস ট্যাভার্নে বিভ্রান্ত অবস্থায় নোংরা জামাকাপড়ে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল পো-কে। এর ঠিক চারদিন পরে মৃত্যু হয় তাঁর। বিষাদের কারণে আত্মহত্যা, খুন, সিফিলিস, জলাতঙ্ক, কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি আরও নানা তত্ত্ব গড়ে উঠেছিল পো-এর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। কেউ কেউ তাঁর অতিরিক্ত মদ্যপানকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে দাবী করেছিলেন, যদিও তা নাকচ করে দিয়েছিল আরেকদল। অনেকে আবার বলে থাকেন পো কুপিং (আমেরিকায় প্রচলিত নির্বাচনে ছাপ্পা ভোট দেওয়ার জন্য বেপরোয়াভাবে পথচারীদের অপহরণের প্রথা) – এর শিকার হয়েছিলেন। মৃত্যু যেভাবেই হোক, এমন বিখ্যাত একজন মানুষের অন্তিম সময়টি যে নিতান্তই কষ্টকর এবং দুর্ভাগ্যজনক ছিল, সে নিয়ে দ্বিমত নেই কোন। এডগার অ্যালান পো মৃত্যুরহস্য আজও যবনিকার অন্তরালে রয়ে গেছে।

১৮৪৯ সালের ৭ অক্টোবর রবিবার ভোর পাঁচটার সময় মাত্র ৪০ বছর বয়সে আমেরিকান লেখক এডগার অ্যালান পো-এর মৃত্যু হয়। এই আকস্মিক মৃত্যুটিকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল অনেকগুলি রহস্য। আজ এত বছর পেরিয়ে এসেও পো -এর মৃত্যুর সঠিক কারণ যথাযথভাবে নির্ণয়ে অপারগ থেকে গেছেন গবেষকেরা। কেবল অসংখ্য তত্ত্বের অবতারণা করেছেন তাঁরা পো-এর মৃত্যুর কারণ হিসেবে। এই তত্ত্বগুলি হল – ১. মদ্যপানজনিত কারণে মৃত্যু ২. কুপিং এর কারণে মৃত্যু ৩. প্রহার জনিত কারণে মৃত্যু ৪. খুন ৫. বিষক্রিয়ায় মৃত্যু ৬. রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যু।

১. মদ্যপানজনিত কারণে মৃত্যু: প্রথমত যে দিনটি এই মৃত্যুকে রহস্যজনক করে তুলেছিল সেই দিনটির উল্লেখ করা যাক। ১৮৪৯ সালের ৩ অক্টোবর। বাল্টিমোরে ঝমঝমে বৃষ্টির রাত। সেদিন আবার নির্বাচনের দিন ছিল। বাল্টিমোরের রায়ানস ট্যাভার্নে, যেটিকে গানারের হলও বলা হয়ে থাকে, সেটি চতুর্থ ওয়ার্ডের নির্বাচনের পোলিং লোকেশন ছিল৷ বাল্টিমোর সান পত্রিকার কম্পোজিটর জোসেফ ডব্লিউ ওয়াকার সেই গানারের হলে পৌঁছে দেখতে পেয়েছিলেন এক ব্যক্তি, পরনের পোশাক অত্যন্ত মলিন, প্রলাপরত বিভ্রান্ত অবস্থায় নর্দমায় পড়ে রয়েছেন। ওয়াকার ব্যক্তিটিকে ভালো করে লক্ষ করে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। অমন বিভ্রান্ত অবস্থায় নোংরার মধ্যে পড়ে রয়েছেন আমেরিকার তৎকালীন অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক এডগার অ্যালান পো। ওয়াকার  তৎক্ষনাৎ কী করবেন বুঝতে না পেরে পো-কেই জিজ্ঞেস করলেন বাল্টিমোরে তাঁর কোনো পরিচিত লোক আছে কিনা, যে তাঁকে সাহায্য করতে পারে। তখন অতিকষ্টে পো বলেছিলেন জোসেফ ই. স্নোডগ্রাসের নাম। স্নোডগ্রাস এসে দেখেন মদ্যপ অবস্থায় সস্তা এক নোংরা পোশাকে পড়ে আছেন পো। তৎক্ষনাৎ তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ওয়াশিংটন কলেজ হাসপাতালে। সেই হাসপাতালে জন জোসেফ মোরান নামের এক চিকিৎসকের দায়িত্বে ছিলেন পো। মোরানের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, পো-এর পরনে ছিল পুরোনো বিবর্ণ বোমাজাইন কোট, ওই ধরনেরই প্যান্ট, মাথায় ছিল খড়ের টুপি। আরও জানা যায় যে, পো-এর পরনে যে পোশাকটি ছিল, তাও তাঁর নিজের নয়। হাসপাতালে মাতাল ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত ভবনের একটি অংশে বদ্ধ জানালাসহ কারাগারের মতো ঘরে বন্দী অবস্থায় ছিলেন এডগার।

২৭ সেপ্টেম্বর পো রিচমন্ড ছেড়ে রওনা দিয়েছিলেন ফিলাডেলফিয়ার উদ্দেশ্যে মার্গুয়েরাইট সেন্ট লিওন লাউডের কবিতার সংকলন সম্পাদনা করার জন্য। কিন্তু পো তাঁর সম্পাদনার কাজে অংশ নিতে ফিলাডেলফিয়ায় আদৌ যাননি। বরং মনে করা হয় পুরোনো কিছু সেনা বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপানের জন্য বাল্টিমোরে থামেন তিনি। অনেকে মনে করেন রিচমন্ড থেকে বাল্টিমোর হয়ে নিউইয়র্ক যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল হয়তো পো-এর৷ কিন্তু ২৭ তারিখ রিচমন্ডে অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখানকারই এক ডাক্তারকে দেখান তিনি এবং তার পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর বাল্টিমোরে পৌঁছন। পরবর্তী পাঁচদিন আর কোনো হদিশ মেলেনি তাঁর। কিন্তু নিউইয়র্ক আর যাননি তিনি। অবশেষে সেই বাল্টিমোরেই প্রলাপ বকা মদ্যপ অবস্থায় জোসেফ ওয়াকার খুঁজে পান তাঁকে৷ পো-এর মৃত্যুর ঠিক পরপরই তাঁরই এক প্রতিদ্বন্দ্বী রুফাস উইলমট গ্রিসওল্ড ‘লুডউইগ’ ছদ্মনামে পো -কে নিয়ে একটি মৃত্যু পরবর্তী স্মৃতিকথা লেখেন। সেই রচনায় তিনি পো-কে একজন বিকৃত, মাতাল, মাদকাসক্ত পাগল হিসাবে চিত্রিত করেছিলেন। জোসেফ স্নোডগ্রাসও পো-এর মৃত্যুর জন্য মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানকেই দায়ী করেছিল। কিন্তু স্নোডগ্রাসের এই তত্ত্বকে খন্ডন করে দিয়েছিলেন ডাক্তার মোরান। ডাক্তার মোরান দাবী করেন পো – কে যখন তাঁর কাছে নিয়ে আসা হয়েছিল তখন পোয়ের শরীরে মদ্যপানের লক্ষণ বা তাঁর শরীরে মদের উপস্থিতি তিনি খুঁজে পাননি৷ পো-এর মৃত্যুর সময় একমাত্র ডাক্তার জোসেফ মোরানই তাঁর পাশে ছিলেন। ফলে মৃত্যুর আগে বলা পো-এর কথাগুলির একমাত্র সাক্ষী ডাক্তার মোরান। কিন্তু মোরানের বলা সেইসব কথায় অনেকেই বিশ্বাস করতে চান না। ডাক্তার মোরানের দাবিকে নস্যাৎ করে ১৮৭২ সালে ইউজিন ডিডিয়ার লেখা প্রবন্ধে বলা হয়, বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপান করে বেসামাল হয়ে পড়েন পো এবং সেই অবস্থায় তাঁকে ছিনতাই ও মারধর করে অজ্ঞান করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায় গুন্ডারা।

২. কুপিং এর কারণে মৃত্যু: একদল ঐতিহাসিকের মতে পো কুপিং-এর শিকার হয়েছিলেন। উনিশ শতকে আমেরিকায় দুষ্কৃতীদের একটি দল ছিল যারা ভোট জালিয়াতি করত এক বিশেষ পদ্ধতিতে। কোন সন্দেহাতীত ব্যক্তিকে অপহরণ করে তাঁকে একাধিক ছদ্মবেশে একাধিক পরিচয়ে একাধিকবার ভোট দিতে বাধ্য করত। মনে করা হয় পো এই কুপারদের হাতে পড়েছিলেন। ফলে তাদের অত্যাচারে, জোরপূর্বক মদ্যপান করিয়ে বেআইনিভাবে ভোট করানোর কাজে লাগানোয় পো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বলে মনে করা হয়। সেইকারণে তাঁকে বিভ্রান্ত ও প্রলাপ বকা অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল রায়ানস ট্যাভার্নে। দীর্ঘকাল এই তত্ত্বটিকেই উপস্থাপন করা হয়েছে মৃত্যুর আগে পো-এর অমন নোংরা বিপর্যস্ত অবস্থার কারণ হিসেবে।

৩. প্রহার জনিত কারণে মৃত্যু: অন্যদিকে পো-এর জীবনীকার ই.ওকস স্মিথ মনে করেন একজন মহিলার প্ররোচনায় পো-কে নিষ্ঠুরভাবে মারধর করা হয়েছিল। সেই মহিলা নিজেকে পো-এর দ্বারা অত্যাচারিত বলে মনে করতেন এবং মূলত তাঁর নির্দেশেই পো-কে অজ্ঞান করে গুন্ডারা মারধর করেছিল বলেই উল্লেখ করেন জীবনীকার।

৪.খুন: আরেকটি তত্ত্ব অনুযায়ী পো তাঁর বাগদত্তা এলমিরা শেলটনের ভাইদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল। এই তত্ত্বটিকে পরোক্ষে খুন বলেও মনে করেন অনেকে। আসলে বিধবা এলমিরাকে বিবাহ করতে বারণ করে পো-কে শাসিয়েছিল এলমিরার ভাইয়েরা। বাল্টিমোরে পো-কে অনুসরণ করে গিয়ে ভাইয়েরা তাঁকে জোর জবরদস্তি হুইস্কি খাইয়ে মারধর করে একেবারে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল। এই তত্ত্বগুলি অবশ্য অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণের অভাবে এগুলি টেকেনি বেশিদিন।

৫. বিষক্রিয়ায় মৃত্যু: ১৯৯৯ সালে, জনস্বাস্থ্য গবেষক অ্যালবার্ট ডোনাই যুক্তি দিয়েছিলেন যে উনিশ শতকে গৃহমধ্যস্থ আলোর জন্য ব্যবহৃত কয়লা গ্যাস থেকে কার্বন মনোক্সাইডের বিষক্রিয়ার ফলে পো’র মৃত্যু হয়েছিল। পো-এর চুলে কয়লা গ্যাসের উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছিল। এছাড়াও পো-এর শরীরে পারদের উচ্চমাত্রার উপস্থিতিও পাওয়া গিয়েছিল। হতে পারে ১৮৪৯ সালে ফিলাডেলফিয়ায় যখন কলেরার প্রকোপ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল তখন পো ওই ফিলাডেলফিয়ার কাছাকাছি ছিলেন ফলে কলেরায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং সেসময় ডাক্তারের দেওয়া পারদ ক্লোরাইডের মাত্রাধিক্যের কারণেও পো-এর চুলে পারদের মাত্রা পাওয়া যেতে পারে।

৬. রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যু: পো-এর মৃত্যুর শংসাপত্র-সহ সমস্ত মেডিকেল রেকর্ড এবং নথি হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে একটি স্থানীয় সংবাদপত্র এবং মৃত্যুর রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের কারণে বিষক্রিয়ার ফলে মস্তিষ্কে প্রদাহের কারণে (ডাক্তারি পরিভাষায় ‘ফ্রেনাইটিস’ বলা হয়) মৃত্যু হয় পো-এর।

কেউ কেউ অনুমান করেন জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছিলেন পো এবং তার ফলেই মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। হতে পারে, ফ্লু হয়তো নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। বাল্টিমোরে যে রাতে তাঁকে পাওয়া গিয়েছিল সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই বৃষ্টিজনিত ঠান্ডা হয়তো ফ্লু থেকে নিউমোনিয়া হতে সাহায্য করেছিল।

সাম্প্রতিককালে যে একটি নতুন তত্ত্বকে সামনে আনা হয়েছে তা হল, গবেষকদের একাংশের দাবি পো-এর ব্রেনে টিউমার হয়েছিল এবং তার ফলস্বরূপ তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। সেই ব্রেন টিউমারের প্রভাবেই নাকি মৃত্যুর পূর্বে অমন অদ্ভুত আচরণও লক্ষণ লক্ষ করা গিয়েছিল তাঁর মধ্যে। পোকে বাল্টিমোরের ওয়েস্টমিনস্টার প্রেসবিটারিয়ান কবরস্থানে একটি অচিহ্নিত কবরে সমাহিত করা হয়েছিল । ২৬ বছর পরে, কবরস্থানের প্রবেশদ্বারের কাছে পো-কে সম্মান জানিয়ে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়। পো-এর কফিনটি খনন করে নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত করার জন্য তার দেহাবশেষ বের করা হয়েছিল। তখন দুই দশকের ক্ষয়ে যাওয়া পো-এর কফিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শরীরের খুব সামান্যই অবশিষ্ট ছিল কিন্তু তারমধ্যেও পো-এর মাথার খুলিতে শ্রমিকরা আশ্চর্য একটা বৈশিষ্ট্য টের পেয়েছিল। পরে বিজ্ঞানীরা পুনরায় সেই বিষয়ের ওপর গবেষণা চালিয়ে সিদ্ধান্ত করেন মাথার খুলিতে ব্রেন টিউমারের উপস্থিতির সম্ভাবনাই বেশি। এসব ছাড়াও জীবনীকারেরা মৃত্যুর কারণ হিসেবে সিফিলিস, মৃগীরোগ ইত্যাদিকেও দায়ী করে থাকেন।

অনেক গবেষক মনে করে থাকেন যে, জীবনের শেষের দিকে ভীষণ বিষন্নতায় ভুগছিলেন পো, যে-কারণে আত্মহত্যার তত্ত্বটিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও আত্মহত্যার সম্ভাবনা কম বলেই একাংশ গবেষকের মত।

কিন্তু এত বছর পরেও নিশ্চিতভাবে এডগার অ্যালান পো মৃত্যুরহস্য সমাধান করতে পারেননি তামাম গবেষকের দল। আজও তা নানারকম তত্ত্বের জল্পনা-কল্পনার আড়ালে রহস্যময় হয়েই থেকে গেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading