ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নানান জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু নানা সময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নাথুরাম গডসের হাতে মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর থেকে শুরু করে কংগ্রেসি রাজত্বে কখনও ইন্দিরা গান্ধী, কখনও রাজীব গান্ধী রহস্যজনকভাবেই দুষ্কৃতীদের হাতে মারা গিয়েছেন। একইভাবে ভারতীয় জন সঙ্ঘের সভাপতি তথা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের অন্যতম প্রচারক দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যু রহস্যও একইভাবে অমীমাংসিত থেকে গিয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের হয়ে সমগ্র ভারতে হিন্দুত্ববাদের প্রচার করেন তিনি। তাঁর হাত ধরেই ভারতে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ ওরফে বিজেপি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মুঘলসরাই স্টেশনে সেদিন কীভাবে মৃত্যু হয়েছিল দীনদয়াল উপাধ্যায়ের তা আজও সঠিকভাবে জানা যায়নি। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীনদয়াল উপাধ্যায় মৃত্যু রহস্য (Deendayal Upadhyaya Death Mystery) আজও অন্ধকারে।
১৯১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর উত্তরপ্রদেশের মথুরা জেলার নাগাল চন্দ্রভান গ্রামে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তবে তাঁর বাবা ভগবতীপ্রসাদ জলেশ্বরে সহায়ক স্টেশন মাস্টারের পদে কাজ করতেন এবং দীনদয়াল সেই সুবাদে তাঁর নিজের বাড়ির বদলে মা রামপিয়ারীর সঙ্গে আগ্রার গুড়কী মড়াই গ্রামে মামার বাড়িতে বড় হয়ে ওঠেন। ইতিমধ্যে তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। অনেক কষ্টে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল তাঁর। তারপর মাঝে মাঝে কিছু সময়ের বিরতি সহ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি বোর্ডের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন। মেধাবী দীনদয়াল এরপর উচ্চশিক্ষায় মনোনিবেশ করেন এবং ক্রমে আরও বড় হয়ে যোগ দেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘে। এই সঙ্ঘের প্রচারকের কাজে নিয়োজিত হন দীনদয়াল। ‘পাঞ্চজন্য’, ‘হিমালয়’, ‘রাষ্ট্রভক্ত’ ইত্যাদি নানাবিধ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন তিনি এই সঙ্ঘের হয়ে। দীর্ঘ ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের হয়ে কাজ করেছেন তিনি। দীনদয়াল উপাধ্যায় জনসংঘের নিজস্ব স্বতন্ত্র সংবিধান রচনার কাজেও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালের সর্বভারতীয় অধিবেশনে ভারতীয় জনসংঘের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন দীনদয়াল উপাধ্যায় এবং তারপরে ১৯৬৭ সালে জনসংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এই ভারতীয় জনসংঘই পরে ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (BJP) নামে পরিচিত হয়। অথচ সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ঠিক এক বছরের মধ্যেই ১৯৬৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শিয়ালদহ এক্সপ্রেসে চেপে লক্ষ্ণৌ থেকে পাটনার উদ্দেশে যাত্রা করেন। রাত্রি ১টা ৪০ নাগাদ ট্রেনটি বারাণসী ছেড়ে যায়। এরপরে কাশী স্টেশনে মিনিট পাঁচেক দাঁড়াবার পর মুঘলসরাই স্টেশনে ট্রেনটি ঢোকে রাত্রি ২টো বেজে ১০ মিনিটে। কিন্তু তখন আর দীনদয়াল উপাধ্যায়কে ট্রেনে পাওয়া যায়নি। স্টেশন ছেড়ে ট্রেনটি চলে যাওয়ার মিনিট দশেক পরে মুঘলসরাই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্ত থেকে ৭৪৮ ফুট দূরে একটি ট্রাকশান খুঁটির কাছে দীনদয়ালের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। একটা পাঁচ টাকার নোট তাঁর হাতে তখনও ধরা ছিল। মাঝরাতের কিছু সময় পরে তাঁকে সেদিন শেষবারের মত জীবিত দেখা গিয়েছিল জৌনপুরে। কীভাবে মারা গেলেন দীনদয়াল? কেই বা তাঁকে ওভাবে স্টেশনের বাইরে ফেলে রেখে গেল? তাঁর এই মৃত্যু কি স্বাভাবিক নাকি এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে কোনও গোপন চক্রান্ত? এমন হাজারো প্রশ্ন উঠে এসেছিল সেদিনের পর থেকে। যার সমাধান আজও মেলেনি।
মুঘলসরাই স্টেশনে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃতদেহ পাওয়ার পরে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টি ভালমত তদন্ত করার জন্য সিবিআই-এর হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল। সেই সময়ে সিবিআই-এর ডিরেক্টর ছিলেন জন লোবো যিনি তাঁর ন্যায়পরায়ণতা এবং সততার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। সিবিআই-এর হাতে দীনদয়ালের মৃত্যু রহস্যের কিনারা করার দায়িত্ব আসা মাত্রই জন লোবো তাঁর দলবল নিয়ে মুঘলসরাই স্টেশনে ছুটে যান। কিন্তু তাঁর কাজ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। ২০১৮ সালে মুঘলসরাই স্টেশনের নাম বদলে রাখা হয় দীনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশন আর এই কাজের ফলে অমীমাংসিত দীনদয়াল উপাধ্যায় মৃত্যু রহস্য সংক্রান্ত তদন্তের অভিমুখ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বদলে দেওয়া হচ্ছে বলে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। যদিও সেই সময় সিবিআই তাঁর তদন্ত প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে দীনদয়ালের হত্যা একটি সাধারণ খুনের ঘটনামাত্র। দুজন সামান্য চোর নিছক চুরির উদ্দেশ্যেই দীনদয়ালকে খুন করেছিল। এই সিবিআই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশেষ দায়রা আদালত ১৯৬৯ সালের ৯ জুন রায় ঘোষণা করে জানিয়েছে যে এখনও সত্য প্রকাশ্যে আসার পূর্ণ অবকাশ রয়েছে। দীনদয়ালের মৃত্যু রহস্য নিয়ে মামলা চলাকালীন আদালতে বিচারকের ক্ষোভ প্রকাশের ফলে তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধীর সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৬৯ সালের ২৩ অক্টোবর সেই তদন্ত কমিশনের নেতৃত্বে রাখা হয় বিচারপতি ওয়াই ভি চন্দ্রচূড়কে। এই তদন্ত কমিশন আবার দীনদয়াল উপাধ্যায় মৃত্যু রহস্য কিনারা করতে গিয়ে নতুন ও বিস্ময়কর কিছু তথ্য খুঁজে পায়। বিচারপতি চন্দ্রচূড় উল্লেখ করেন যে দীনদয়াল উপাধ্যায়কে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে খুন করা হয়েছে। তাঁর খুন হওয়ার দিন লক্ষ্ণৌ-শিয়ালদা এক্সপ্রেসে লক্ষ্ণৌ থেকে পাটনা যাওয়ার সময় তিনি যে কামরায় ভ্রমণ করছিলেন তার অর্ধেকটা ছিল তৃতীয় শ্রেণির এবং বাকি অর্ধেক কামরা ছিল প্রথম শ্রেণির। এই ধরনের বগিকে এফসিটি বগি (FCT Boggy) বলা হয়। দীনদয়াল উপাধ্যায় ছিলেন প্রথম শ্রেণিতে। জানা যায়, সেই কামরার ‘বি’ কুপে তাঁর সিট থাকলেও তিনি তা বদলে ‘এ’ কুপে পরিবর্তিত করে নিয়েছিলেন। এমনকি সেই ‘এ’ কুপে তিনি একাই ছিলেন যাত্রী। বিধান পরিষদের সদস্য গৌরীশঙ্কর রাইয়ের সঙ্গে তাঁর সিট বদল হয়েছিল। তবে কুপ এ-তে পরে এসে ওঠেন সরকারি কর্মচারী এম পি সিং। পরবর্তীকালে তাঁরই সহচরেরা সাক্ষ্য দিয়েছে যে যেভাবে দীনদয়ালের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, যেভাবে তাঁর পকেটে টিকিট পাওয়া গিয়েছিল কিংবা দীনদয়ালের কুপ থেকে ফিনাইলের বোতল পাওয়া গিয়েছিল তাতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। এমনকি দীনদয়ালের শরীরে কিছু অদ্ভুত ধরনের ক্ষতচিহ্ন ছিল যার কোনওরকম ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি ফরেন্সিক পরীক্ষা থেকে। তবে তদন্তে এটুকু স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল যে দীনদয়ালের মৃত্যু বা হত্যার প্রতিটি পদক্ষেপে রেলওয়ে কর্মচারীদের সংযোগ ছিল।
আদালতে মামলা চলাকালীন এম পি সিং-এর সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, ঐদিন মুঘলসরাইতে কেউ একজন দীনদয়াল উপাধ্যায়ের কেবিনে প্রবেশ করে এবং তাঁর ফাইল, এমনকি বিছানাপত্র নিয়েও চলে যায়। এই অচেনা ব্যক্তিকে এম পি সিং আদালতে ভরতলাল নামে চিহ্নিত করেন। পরে তাঁর সঙ্গী রাম আওয়াধ এবং ভরতলালকে দীনদয়াল হত্যা এবং মৃত ব্যক্তির জিনিসপত্র চুরির দায়ে অভিযুক্ত করে আদালত। ভরতলাল এলাহাবাদ উচ্চ আদালতে আবেদন করলে আদালত জানায় যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সত্য সত্যই খুনের অভিযোগ এখনও প্রমাণিত হয়নি। দীনদয়াল উপাধ্যায় মৃত্যু রহস্য সমাধান ও সত্য প্রকাশের তাড়নায় জনসংঘ তৎপর হয়ে ওঠে, তাদের কাছে সিবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক বিরোধিতার ইঙ্গিত মুছে ফেলার চক্রান্ত বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় জনসংঘ চাইছিল যাতে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যুর পিছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও হিংসার তত্ত্বকে প্রমাণ করা যায় আদালতে। কিন্তু সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ বিচারের পর তদন্ত কমিশনের পক্ষে বিচারপতি চন্দ্রচূড় জানান যে, দীনদয়াল উপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, কিন্তু তারা কোনওভাবেই এই মৃত্যুর সঙ্গে সংযুক্ত নয়। এমনকি জনসংঘের চোখে অভিযুক্ত দেশের কমিউনিস্ট নেতারা এবং সাম্প্রদায়িকতাবাদী নেতাদেরকেও নির্দোষ বলেই প্রমাণ করতে চান চন্দ্রচূড়। সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণাদি বিচার করে দীনদয়াল উপাধ্যায় মৃত্যু রহস্য যে নিছকই চোরদের হাতে খুনের ঘটনা তার দিকেই সম্ভাবনার পাল্লা ঝুঁকে পড়ে। তবে ঘটনাক্রম এবং ঘটনার নানাবিধ সূত্র এতটাই রোমাঞ্চকর ও উত্তেজনাবহুল ছিল যে আজও দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যু রহস্য-ঘনীভূতই রয়ে গিয়েছে। যদিও ২০১৭ সালে আবার দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ভাগ্নে এবং অন্যান্য সহযোগী রাজনীতিবিদরা একত্রে এই মৃত্যু রহস্যের একটি স্বচ্ছ সমাধান দাবি করেন। ঠিক তার পরের বছরই ২০১৮ সালে মুঘলসরাই স্টেশনের নাম বদলে রাখা হয় দীনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশন। এর পিছনে কি তদন্তের দাবির অভিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার সুপ্ত পরিকল্পনা ছিল! এই ধরনের অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। এ যেন এক অমীমাংসিত অধ্যায়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান