ধর্ম

দ্রোণাচার্যের মৃত্যু

দ্রোণ বধ নিয়ে অর্জুন যুধিষ্ঠিরের ঝগড়া

মহাভারতের দ্রোণপর্বের একেবারে শেষে কৌরব ও পান্ডবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের মৃত্যু র কথা বর্ণিত আছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পনেরোতম দিনে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের ছেলে ধৃষ্টদ্যুম্ন খড়্গ দিয়ে মাথা কেটে দ্রোণকে হত্যা করেন এবং এভাবেই দ্রোণাচার্যের মৃত্যু হয়।

যুদ্ধের চৌদ্দতম দিনে জয়দ্রথের মৃত্যু হওয়ার পর রাত্রিতেও যুদ্ধ চলেছিল। সেদিন রাতে কেউ আর শিবিরে ফিরে যায়নি। পনেরোতম দিনের ভোরবেলায় দ্রোণের হাতে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা দেখে দ্রুপদের ছেলে ধৃষ্টদ্যুম্ন রাগে-দুঃখে অধীর হয়ে প্রতিজ্ঞা করেন, “আজ যদি আমি আমার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ না নিই, যদি আজ আমার হাতে দ্রোণাচার্যের মৃত্যু না হয়, তবে যেন আমার স্বর্গলাভ না হয়।”


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

সেদিনের যুদ্ধে দ্রোণ নিজের সব শক্তি প্রয়োগ করে পান্ডবসৈন্যদের হত্যা করতে শুরু করেন। পান্ডবরা অনেক চেষ্টা করেও সেদিন তাঁকে বারণ করতে পারছিলেন না। দেবাসুরের যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্র যেভাবে দানবসৈন্যদের হত্যা করেছিলেন, দ্রোণও ঠিক তেমনভাবেই পান্ডবসৈন্যদের ধ্বংস করতে লাগলেন। তাঁর এই বীরত্ব দেখে মহারাজ যুধিষ্ঠির ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন।
দ্রোণের এই বিরামহীন বাণবৃষ্টি দেখে কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “অর্জুন! হাতে ধনুর্বাণ থাকলে দ্রোণকে দেবতারাও হারাতে পারবেন না। কিন্তু হাত খালি থাকলে মানুষও তাঁকে বধ করতে পারবে। তোমরা এখন ধর্মের কথা না ভেবে জয়ের উপায় ঠিক কর, নাহলে দ্রোণই তোমাদের সবাইকে বধ করবেন। আমার মনে হয়, ছেলে অশ্বত্থামা মারা গেছে এই কথা শুনলে তিনি আর যুদ্ধ করবেন না। সুতরাং, তোমাদের মধ্যে কেউ গিয়ে ওঁকে বলুক যে, অশ্বত্থামা যুদ্ধে মারা গিয়েছে।”

কৃষ্ণের এই প্রস্তাব অর্জুনের মোটেই পছন্দ হল না। কিন্তু আর সবাই এতে মত দিলেন। তা দেখে মহারাজ যুধিষ্ঠির অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই প্রস্তাবে রাজি হলেন। পান্ডবপক্ষের যোদ্ধা মালবরাজ ইন্দ্রবর্মার ‘অশ্বত্থামা’ নামে একটি হাতি ছিল। ভীম তখন সেই হাতিটিকে গদাঘাতে বধ করলেন এবং দ্রোণের কাছে গিয়ে লজ্জিত হয়ে বললেন, “অশ্বত্থামা যুদ্ধে নিহত হয়েছে।”

সাগরের জলে যেমন বালি গলে যায়, ভীমের মুখে এই কথা শুনে শোকে তেমনি দ্রোণের অঙ্গ গলে গেল। কিন্তু তিনি ছেলের বীরত্ব জানতেন, তার পক্ষে এইভাবে যুদ্ধে মারা যাওয়া অসম্ভব মনে করে তিনি আবার যুদ্ধ শুরু করলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁকে বধ করবে এই কথা মনে করে তিনি সবার আগে ধৃষ্টদ্যুম্নকেই হত্যা করার চেষ্টা করতে লাগলেন। দুজনের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হল। যুদ্ধ করতে করতে দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নের রথের ঘোড়া, সারথি ও রথ—সবই ধ্বংস করে দিলেন। নিরস্ত্র দেখে ধৃষ্টদ্যুম্নকে ভীম তাঁর নিজের রথে তুলে নিলেন এবং তাঁকে বললেন, “পাঞ্চালরাজকুমার! তুমি ছাড়া আর কেউ দ্রোণকে হত্যা করতে পারবে না। এই কাজের জন্যই তোমার জন্ম হয়েছে। তাই তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আচার্যকে হত্যা করার চেষ্টা কর।”

এদিকে দ্রোণ ভীষণ রেগে গিয়ে সাধারণ সৈন্যদের উপরেই ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। সেই ভয়ঙ্কর অস্ত্রের প্রভাবে নিমেষের মধ্যেই কুড়ি হাজার পাঞ্চালদেশীয় রথী, পাঁচশ মৎস্যদেশীয় সৈন্য, ছয় হাজায় সৃঞ্জয়দেশীয় সৈন্য, দশ হাজার ঘোড়া এবং দশ হাজার হাতি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এই ভয়াবহ কাণ্ড দেখে পান্ডবরাও ভয় পেয়ে গেলেন এবং কৌরবরা আনন্দে সিংহনাদ করতে লাগলেন।
এই সময় বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, ভরদ্বাজ, গৌতম, বশিষ্ঠ, কশ্যপ, অত্রি প্রভৃতি ঋষিরা এবং শিকত, পৃশ্নি, গর্গ, বালখিল্য, মরীচি, ভৃগু, অঙ্গিরা প্রভৃতি মহর্ষিরা অগ্নিদেবকে সঙ্গে নিয়ে সূক্ষ্মদেহে দ্রোণের সামনে উপস্থিত হলেন। তাঁরা দ্রোণকে সম্বোধন করে বললেন, “আচার্য! তুমি অধর্মযুদ্ধ করছ, তোমার মৃত্যুর সময় এসে গেছে। তুমি বেদজ্ঞানী ও সর্বশাস্ত্রের জ্ঞান তোমার আছে, তা সত্ত্বেও তুমি নিতান্ত সাধারণ সেনা, যারা ব্রহ্মাস্ত্রের সঙ্কেত জানে না, তাদের তুমি ব্রহ্মাস্ত্র দিয়ে হত্যা করছ? এই পাপকর্ম আর কোরো না। এখনই তুমি অস্ত্র ত্যাগ কর।”

দ্রোণ মহর্ষিদের এই কথা, ভীমের মুখে অশ্বত্থামার মৃত্যুর খবর এবং সামনে যাঁর হাতে তাঁর মৃত্যু হবে সেই ধৃষ্টদ্যুম্নকে দেখে যুদ্ধ বন্ধ করে দিলেন। সামনে যুধিষ্ঠিরকে দেখতে পেয়ে দ্রোণ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ধর্মরাজ! আমি জানি তুমি ত্রিলোকের সব সম্পদের বিনিময়েও কখনো মিথ্যা কথা বলবে না। আমাকে সত্য করে বল, সত্যিই কি আমার ছেলে অশ্বত্থামা যুদ্ধে মারা গেছে?”
এই প্রশ্ন শুনে যুধিষ্ঠির চুপ করে রইলেন। তখন কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে ডেকে বললেন, “মহারাজ! দ্রোণ যদি আর দুই প্রহর এইভাবে যুদ্ধ করেন, তবে আপনার সব সৈন্যরাই ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন আমাদের রক্ষা করা আপনার হাতেই আছে। আপনি দয়া করে দ্রোণকে মিথ্যা কথা বলুন। কারণ শাস্ত্রমতে জীবনরক্ষার জন্য মিথ্যা বললে তাতে কোনো পাপ হয় না।”

কৃষ্ণের কথা শুনে ভীম বললেন, “আমি মালবরাজ ইন্দ্রবর্মার হাতি অশ্বত্থামাকে মেরেছি। তারপর আমি দ্রোণকে বলেছিলাম যে অশ্বত্থামা মারা গিয়েছে। কিন্তু তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি। আপনি কৃষ্ণের কথা শুনুন, দ্রোণকে বলুন একথা সত্যি। আপনার মুখে ওইকথা শুনলে দ্রোণ আর যুদ্ধ করবেন না। তখন তাঁকে হত্যা করা সহজ হবে এবং তৎক্ষণাৎ দ্রোণাচার্যের মৃত্যু হবে ।”

কৃষ্ণের অনুরোধে এবং ভীমের সমর্থনে যুধিষ্ঠির এই কাজ করতে রাজি হলেন। তখন তিনি দ্রোণের কাছে গিয়ে উচ্চস্বরে বললেন, “অশ্বত্থামা নিহত হয়েছেন…’’ আর তারপর গলা নামিয়ে বললেন, “ওটা একটি হাতি।” যুধিষ্ঠিরের রথ আগে কখনোই মাটি স্পর্শ করত না, মাটি থেকে চার আঙুল উঁচুতে থাকত। তিনি এই অর্ধসত্য বলার পর, রথটি মাটিতে নেমে পড়ল।

মহর্ষিদের কথা শুনে দ্রোণের মনে হয়েছিল যে তিনি সত্যিই অপরাধ করেছেন। এখন ছেলের মৃত্যুর কথা জেনে তাঁর সব অঙ্গ অবশ হয়ে গেল। তিনি আর যুদ্ধ করতে পারলেন না। এই সময় ভীম তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে বললেন, “এই সৈন্যরা নিজেদের কাজ হিসেবে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু আপনি ব্রাহ্মণ হয়েও যুদ্ধ করে অব্রাহ্মণের মতই কাজ করেছেন। আপনি একটি ছেলের জন্য বহু মানুষকে হত্যা করেছেন। আপনি যার অপেক্ষায় বেঁচে আছেন, সেই অশ্বত্থামা আজ প্রাণ হারিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে আছে। তাহলে আর কীসের জন্য আপনি যুদ্ধ করছেন?”

দ্রোণ তখন ধনুর্বাণ রথের উপর ফেলে দিয়ে কৌরবদের ডেকে বললেন, “তোমরা নিজেদের শক্তি অনুযায়ী যুদ্ধ করো, পান্ডবদের আর তোমাদের মঙ্গল হোক, আমি অস্ত্র ত্যাগ করলাম।” এই বলে তিনি উচ্চস্বরে অশ্বত্থামার নাম ধরে ডাকলেন এবং রথের উপরেই ধ্যানে বসে একমনে শ্রীহরির চিন্তা করতে লাগলেন। তাঁর দেহে থেকে এক দিব্য জ্যোতি বেরিয়ে এসে উল্কার মত আকাশে মিশে গেল। এই দৃশ্য শুধু পাঁচজন দেখতে পেলেন—অর্জুন, যুধিষ্ঠির, কৃষ্ণ, কৃপ ও সঞ্জয়।

এই সময় ধৃষ্টদ্যুম্ন এক বিশাল খড়্গ হাতে নিয়ে নিজের রথ থেকে লাফিয়ে নেমে দ্রোণের রথের দিকে ছুটলেন। কৌরব ও পান্ডব দুই সৈন্যদলেই হাহাকার উঠল। “আচার্যকে জীবন্ত ধরে আনো, বধ কোরো না” বলতে বলতে অর্জুন রথ থেকে নেমে ধৃষ্টদ্যুম্নকে বারণ করতে ছুটে গেলেন। কিন্তু তাঁকে আটকাবার আগেই ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রাণহীন দ্রোণের চুলের মুঠি ধরে তাঁর মাথা কেটে ফেললেন। তারপর তিনি সিংহনাদ করতে করতে দ্রোণের কাটা মাথা তুলে নিয়ে কৌরবসৈন্যদের সামনে ছুঁড়ে মারলেন।

এই ভয়ঙ্কর কাণ্ড দেখে কৌরবসৈন্যরা ভয়ে পালাতে লাগল। দুর্যোধন তাঁর ভাইদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের বহু মৃতদেহের মধ্যে দ্রোণের মুণ্ঢীন দেহে খুঁজতে লাগলেন, কিন্তু তা পাওয়া গেল না। ওদিকে ভীম ধৃষ্টদ্যুম্নকে আলিঙ্গন করলেন, পান্ডবরা দুঃখ পেলেও জয়ের আশায় উল্লসিত হলেন। রথের উপরে ভীম আনন্দে নাচতে লাগলেন।

তথ্যসূত্র


  1. ‘মহাভারত’, কালীপ্রসন্ন সিংহ , দ্রোণপর্ব, অধ্যায় ১৮৮-১৯৩, পৃষ্ঠা ৩৩৫-৩৪৯
  2. ‘মহাভারত সারানুবাদ', রাজশেখর বসু, কলিকাতা প্রেস, তৃতীয় প্রকাশ, দ্রোণপর্ব, অধ্যায় ১৯-২০, পৃষ্ঠা ৪১০-৪১৪
  3. ‘ছেলেদের মহাভারত', উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় মুদ্রণ, দ্রোণপর্ব, পৃষ্ঠা ১৬৩-১৬৫

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মনোরথ দ্বিতীয়া ব্রতকথা নিয়ে জানতে


মনোরথ দ্বিতীয়া

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন