ধর্ম

জয়দ্রথের মৃত্যু

দ্রোণ বধ নিয়ে অর্জুন যুধিষ্ঠিরের ঝগড়া

মহাভারতের দ্রোণপর্বে ১৪৬তম অধ্যায়ে জয়দ্রথের মৃত্যু র কথা বর্ণিত আছে। জয়দ্রথ নিরস্ত্র অভিমন্যুকে হত্যা করার জন্য কৌরবদের সাহায্য করেছিলেন বলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চৌদ্দতম দিনে অর্জুন তাঁকে হত্যা করেন। 

যুদ্ধের তেরোতম দিনে অভিমন্যুর মৃত্যু হওয়ার পরে এবং তাতে জয়দ্রথের হাত সবথেকে বেশি ছিল বলে জানতে পেরে অর্জুন রাগে-দুঃখে আকুল হয়ে প্রতিজ্ঞা করেন, “কাল আমি নিশ্চয়ই জয়দ্রথকে বধ করব, আর যদি তা না করতে পারি তবে যেন আমার স্বর্গলাভ না হয় এবং পৃথিবীতে যত অধর্ম আছে তার সবকিছুর শাস্তি যেন আমি পাই। কাল যদি জয়দ্রথ বেঁচে থাকতে থাকতে সূর্য অস্ত যায়, তবে আমি জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করে নিজের প্রাণত্যাগ করব।” অর্জুনের ওই প্রতিজ্ঞা শুনে পান্ডবরা সিংহনাদ করে নিজের নিজের ধনুকে টঙ্কার ও মহাশঙ্খে ফুঁ দিলেন। 


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

গুপ্তচরের মুখে এই সব কথা শুনে এবং পান্ডবদের শিবির থেকে শঙ্খ ও ধনুকের টঙ্কারের শব্দ পেয়ে জয়দ্রথ ভীষণ ভয় পেলেন। তিনি তখনই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কৌরবদের কাছে গিয়ে বললেন, “মহারাজ দুর্যোধন! তোমার মঙ্গল হোক। তুমি তো শুনেছ অর্জুন কী প্রতিজ্ঞা করেছে। তোমার অনুমতি পেলে আমি যুদ্ধ ছেড়ে আমার নিজের রাজ্যে ফিরে যাব, কারণ এখানে থাকলে অর্জুন নিশ্চয়ই আমাকে মেরে ফেলবে।” 

একথা শুনে দুর্যোধন তাঁকে বললেন, “সিন্ধুরাজ! আপনি কেন ভয় পাচ্ছেন? আমরা সবাই মিলে আপনাকে রক্ষা করব। আমরা থাকতে অর্জুন আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।” দুর্যোধন অভয় দিলেও জয়দ্রথের চিন্তা গেল না। তিনি তখন দ্রোণের কাছে গিয়ে একই কথা বললেন। দ্রোণ বললেন, “কাল আমি এমন ব্যূহ তৈরি করব, অর্জুন তা পেরোতেই পারবে না। আর যদিই বা অর্জুন আপনাকে বধ করে, তবে তো আপনার নিশ্চিত স্বর্গলাভ হবে। সুতরাং প্রাণের ভয় ত্যাগ করে যুদ্ধ করুন।” 

পরের দিন সকালে যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার আগে দ্রোণ এক অদ্ভুত ব্যূহ তৈরি করলেন। এই ব্যূহের সামনের দিক শকটের মত, পিছনের দিক চক্র বা পদ্মের মত। এটি চব্বিশ ক্রোশ লম্বা ও পিছনের দিকে দশ ক্রোশ চওড়া। এর ভিতরে ‘সূচী’ নামে একটি ছোট ব্যূহ তৈরি করা হল। কৃতবর্মা, কাম্বোজ, জলসন্ধ, দুর্যোধন প্রভৃতি বীরেরা জয়দ্রথকে পিছনে রেখে এই সূচী ব্যূহে লুকিয়ে রইলেন। বড় ব্যূহের মুখ আটকে রইলেন দ্রোণ এবং তাঁর পিছনে রাজা ভোজ সবাইকে রক্ষা করতে লাগলেন।  যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রতিদিনের মত সেদিনও অর্জুন প্রথম থেকেই মহাতেজে যুদ্ধ করতে লাগলেন। তাঁর এক-একটি বাণে দুই-তিনটি করে মানুষ কাটা যেতে লাগল। অর্জুনের এই ভীষণ যুদ্ধ দেখে কৌরবসৈন্যদের মধ্যে হাহাকার উঠে গেল। এই দেখে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন বলে দ্রোণ এগিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ দুজনের ভয়ানক যুদ্ধ শেষের পর দ্রোণকে হারিয়ে অর্জুন এগিয়ে চললেন। 

এরপর অর্জুনের যুদ্ধ হল কৃতবর্মা ও শ্রুতায়ুধের সাথে। কৃতবর্মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন এবং শ্রুতায়ুধ মারা গেলেন। এর পর এলেন সুদক্ষিণ, তারপর শ্রুতায়ু ও অচ্যুত এবং তাঁদের ছেলে নিয়তায়ু ও দীর্ঘায়ু। সবারই মৃত্যু হল অর্জুনের হাতে। ক্রমাগত যুদ্ধ করে অর্জুন হাজার হাজার অঙ্গদেশীয় গজারোহী সৈন্য (হাতির পিঠে চেপে যে সৈন্যরা যুদ্ধ করে), অসংখ্য যবন, পারদ, শক প্রভৃতি সৈন্যদের বধ করলেন। নিজের সৈন্যরা এইভাবে মারা যাচ্ছে দেখে দুর্যোধন ভীষণ রেগে দ্রোণকে অপমান করতে লাগলেন। তাতে দুঃখ পেয়ে দ্রোণ দুর্যোধনের গায়ে এক অভেদ্য কবচ বেঁধে দিলেন, যে কবচকে কোনো অস্ত্রই ভেদ করতে পারবে না। 

এই কবচটি পেয়ে দুর্যোধন উৎসাহের সঙ্গে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলেন। কিন্তু অর্জুন দুর্যোধনের কবচঢাকা শরীরে আঘাত না করে তাঁর ফাঁকা হাতদুটিতে বাণ মারতে লাগলেন। ফলে ক্ষতবিক্ষত হয়ে দুর্যোধনকে পালিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে হল। বেলা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। জয়দ্রথকে পাওয়ার জন্য এখনো অনেকজন যোদ্ধাকে হারাতে হবে। কিন্তু এতক্ষণ হাওয়ার বেগে রথ চালানোর জন্য অর্জুনের রথের ঘোড়াগুলি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কৃষ্ণের মুখে এই কথা শুনে অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই রথ থেকে নেমে সেখানেই বাণ দিয়ে একটি ঘর ও একটি সরোবর তৈরি করলেন। সেই ঘরের মধ্যে কৃষ্ণ ঘোড়াগুলির সাজ খুলে তাদের জল খাইয়ে ও ক্ষতস্থানগুলিতে ওষুধ লাগিয়ে তাদের ক্লান্তি দূর করলেন। তারপর কৃষ্ণ ও অর্জুন আবার রথে উঠে জয়দ্রথের দিকে ছুটে চললেন। 

এরপর অর্জুন জয়দ্রথকে ধরার জন্য আবার ভয়ানক যুদ্ধ আরম্ভ করলে ভয়ে কৌরবদের প্রাণ কেঁপে উঠতে লাগল। অর্জুনের গাণ্ডীবের টঙ্কার ও কৃষ্ণের পাঞ্চজন্য শঙ্খের ভীষণ আওয়াজে বহু সৈন্য অজ্ঞান হয়ে গেল। অর্জুনকে আটকাবার জন্য ভূরিশ্রবা, শাল্ব, কর্ণ, বৃষসেন, কৃপ, শল্য, অশ্বত্থামা ইত্যাদি যোদ্ধারা তাঁকে বহুসংখ্যক বাণ দিয়ে একেবারে ঢেকে ফেললেন। কিন্তু অর্জুন এই সব বাণ কেটে তাঁদের উচিত শিক্ষা দিলেন। বাকি পান্ডবসৈন্যরাও সেদিন ভীষণ যুদ্ধ করেছিলেন। সাত্যকির হাতে সুদর্শন, মহামাত্র, জলসন্ধ ভূরিশ্রবা প্রভৃতি বীর যোদ্ধা মারা যান। পার্বতীয়, কাম্বোজ, শক ও যবন সৈন্যরা হেরে যায়। দুর্যোধনের সতেরোটি ভাই ও কর্ণের পাঁচটি ভাই ভীমের হাতে প্রাণ হারায়। 

এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কিন্তু তখনো ছয়জন যোদ্ধার পিছনে জয়দ্রথ লুকিয়ে আছেন। নিজের প্রতিজ্ঞা রাখতে পারবেন না ভেবে অর্জুন দুশ্চিন্তায় পড়লেন। অর্জুনকে চিন্তা করতে দেখে কৃষ্ণ তাঁকে বললেন, “অর্জুন! এখনো সন্ধ্যা হতে দেরি আছে। আমি মায়া প্রয়োগ করে সূর্যকে ঢেকে দিচ্ছি। তাতে জয়দ্রথ মনে করবে যে সত্যই সন্ধ্যা হয়ে গেছে এবং প্রতিজ্ঞা রাখতে না পেরে তোমাকে আগুনে প্রবেশ করতে হবে। তাহলে সে আর লুকিয়ে থাকতে চেষ্টা করবে না। সেই সময় তুমি তাকে বধ করবে।” এই কথা বলে কৃষ্ণ মায়াবলে সূর্যকে ঢেকে দিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে অন্ধকার নেমে এল। অর্জুনের মৃত্যুকাল এসে গেছে ভেবে কৌরবরা আনন্দ করতে লাগলেন। জয়দ্রথ তখন ব্যূহের মধ্যে থেকে মাথা উঁচু করে দেখতে লাগলেন যে সত্যই সূর্য অস্ত গেছে কি না। তা দেখে কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “ওই দেখ জয়দ্রথ মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এই ঠিক সময়, তুমি তার মাথা কেটে ফেলো।” 

কিন্তু জয়দ্রথের মাথা কাটা সহজ নয়। তাঁর জন্ম হওয়ার সময় দেবতারা বলেছিলেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো মহাবীর মাথা কেটে জয়দ্রথকে হত্যা করবেন।” এই কথা শুনে জয়দ্রথের বাবা মহারাজ বৃদ্ধক্ষত্র বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি আমার ছেলের মাথা মাটিতে ফেলবেন, তাঁর মাথাও তখনই শত টুকরো হয়ে যাবে।” এই বলে বৃদ্ধক্ষত্র তপস্যা করতে বনে চলে গেলেন। এখনো তিনি সমন্তপঞ্চক তীর্থে তপস্যা করছেন। 

এই সব কথা মনে করে কৃষ্ণ আবার অর্জুনকে বললেন, “সাবধান অর্জুন! তুমি যদি জয়দ্রথের মাথা মাটিতে ফেল তবে তোমার মাথাও শত টুকরো হয়ে যাবে। জয়দ্রথের মাথা সমন্তপঞ্চক তীর্থে তার বাবা রাজা বৃদ্ধক্ষত্রের কোলে নিয়ে গিয়ে ফেলতে হবে।”        অর্জুন তখন গাণ্ডীবে এক মহাশক্তিশালী অস্ত্র জুড়লেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই বাণ ছুটে গিয়ে জয়দ্রথের মাথা কেটে ফেলল এবং জয়দ্রথের মৃত্যু হল। কিন্তু অর্জুন জয়দ্রথের মাথাটিকে মাটিতে পড়তে দিলেন না। আরো কয়েকটি বাণ মেরে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেলেন সমন্তপঞ্চক তীর্থে। রাজা বৃদ্ধক্ষত্র তখন ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। তাঁর কোলে গিয়ে পড়ল জয়দ্রথের কাটা মাথা। ভীষণ অবাক হয়ে রাজা উঠে দাঁড়াতে যেতেই তাঁর কোল থেকে মাথাটি মাটিতে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধক্ষত্রের মাথাও কেটে শত টুকরো হয়ে গেল। জয়দ্রথের মৃত্যু হয়েছে দেখে কৃষ্ণ অন্ধকার দূর করে দিলে দেখা গেল সূর্য তখনও একেবারে ডুবে যায়নি। জয়দ্রথকে হত্যা করা হয়েছে দেখে কৃপ ও অশ্বত্থামা ভীষণ রেগে অর্জুনকে আক্রমণ করেন। কিন্তু অর্জুনের তেজ সহ্য করতে না পারায় তাঁদের হার মানতে হয়। জয়দ্রথের মৃত্যু মাধ্যমে এভাবেই অর্জুন নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করলেন এবং প্রতিশোধ নিলেন ছেলে অভিমন্যুকে নিরস্ত্র অবস্থায় অন্যায়ভাবে হত্যা করার।

তথ্যসূত্র


  1. ‘মহাভারত’, কালীপ্রসন্ন সিংহ , দ্রোণপর্ব, অধ্যায় ৭৪-১৪৬, পৃষ্ঠা ১০৬-২৪৮
  2. ‘ছেলেদের মহাভারত', উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় মুদ্রণ, দ্রোণপর্ব, পৃষ্ঠা ১৪৯-১৫৮
  3. ‘মহাভারত সারানুবাদ', রাজশেখর বসু, কলিকাতা প্রেস, তৃতীয় প্রকাশ, দ্রোণপর্ব, অধ্যায় ১২-১৪, পৃষ্ঠা ৩৯৫-৪০২

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: দ্রোণাচার্যের মৃত্যু | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মনোরথ দ্বিতীয়া ব্রতকথা নিয়ে জানতে


মনোরথ দ্বিতীয়া

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন