দেবকীকুমার বসু (Debaki Kumar Bose) বা দেবকী বসু ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা ও পরিচালক। নির্বাক ও সবাক চলচ্চিত্র যুগের সন্ধিক্ষণে তিনি ভারতীয় সিনেমা জগতে পদার্পণ করেন। বাংলায় প্রথম সার্থক সবাক চলচ্চিত্র ‘চণ্ডীদাস’ নির্মাণ করেন তিনি। দেবকী বসুই প্রথম দেখিয়েছিলেন শিল্পগুণান্বিত ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রকৃত স্বরূপ। তিনি ভারতীয় সিনেমায় সংলাপ, গান ও আবহ সংগীত ব্যবহার করে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে আধুনিকতার রূপ দেন। তাছাড়া দেবকী বসুর ‘সীতা’ সিনেমা প্রথম ভারতীয় সিনেমা, যা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছিল।
১৮৯৮ সালের ২৫ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বর্ধমান জেলার অকালপৌষ গ্রামের মামার বাড়িতে দেবকী বসুর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম মধুসুদন বসু ও মায়ের নাম গোপীসুন্দরী দাসী। তাঁর বাবা ছিলেন বর্ধমানের এক বিখ্যাত উকিল। দেবকী বসুরা ছিলেন মোট আট ভাইবোন। দেবকী বসুর বাবার বাড়ি ছিল কৈগ্রামে। জমিদার বাড়ির সবচেয়ে উৎশৃঙ্খল, আবেগপ্রবণ ও বিদ্রোহী মানুষ ছিলেন তিনি। দেবকী বসু ১৯২০ সালে লীলাবতী সেনকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের আটটি সন্তান ছিল। তাঁর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র দেবকুমার বসুই বাবার পথ অনুসরণ করে সিনেমা পরিচালনার কাজে যুক্ত হন। দেবকুমার অসমীয়া ও মণিপুরী সিনেমা পরিচালনা করেন। তিনি নিজের চলচ্চিত্র পরিচালনার দক্ষতা দ্বারা হয়ে ওঠেন মণিপুরী সিনেমার জনক। মণিপুরী সিনেমায় অবদানের জন্য দেবকুমার বসু রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও পান।
দেবকী বসুর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছিল নিজের গ্রামেই। তারপর তিনি বর্ধমানের খোসবাগানের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে তিনি কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন এবং ওই কলেজ থেকেই আই.এ পরীক্ষা দেন। তবে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে দেবকী বসু তাঁর বি.এ পরীক্ষা অসম্পূর্ণ রেখেই আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি ‘শক্তি’ নামক এক সরকার বিরোধী পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এই কারণে তাঁকে ইংরেজ সরকারের রোষের মুখেও পড়তে হয়েছিল।
এক নজরে দেবকী বসুর জীবনী:
- জন্ম: ২৫ নভেম্বর, ১৮৯৮
- মৃত্যু: ১৭ নভেম্বর, ১৯৭১
- কেন বিখ্যাত: দেবকীকুমার বসু বা দেবকী বসু ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা ও পরিচালক। ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথম সার্থক সবাক চলচ্চিত্র ‘চণ্ডীদাস’ নির্মাণ করেন তিনি। তাঁর পরিচালনায় প্রথম নির্বাক সিনেমা ‘পঞ্চসার’। তাঁর বিখ্যাত কিছু সিনেমা ‘বিদ্যাপতি’, ‘সীতা’, ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’, ‘সাগর সঙ্গমে’ ইত্যাদি।
- পুরস্কার ও স্বীকৃতি: দেবকী বসু পরিচালিত ‘সীতা’ প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় সিনেমা। তাঁর ‘সাগর সঙ্গমে’ বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়। এই সিনেমাটি সেরা ভারতীয় সিনেমা হিসেবে জাতীয় পুরস্কারও পায়। তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানও দেওয়া হয়েছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি ছোট থেকেই শিল্পচর্চার প্রতি আগ্রহ ছিল দেবকী বসুর। বিদ্যাসাগর কলেজে পড়ার সময় তাঁর পরিচয় হয় নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীর সঙ্গে। শিশিরবাবুর পরিচালনায় ১৯১৯ সালে ইউনিভার্সিটি ইন্সিটিউট হলে ‘সোহরাব রুস্তম’ নাটকের সেনানায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। তারপর ‘মেবার’ নাটকে মহব্বত খাঁ-এর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের প্রশংসা লাভ করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে অত্যাচারী জমিদার বাড়িতে থাকতে চাননি বিদ্রোহী দেবকীবাবু। এছাড়া নিজের সরকারবিরোধী কাজের জন্য বাবার আদেশে তাঁকে জমিদার বাড়ি ছাড়তে হয়। এই সময় চরম অর্থকষ্টে পড়ে তিনি কখনও গামছা বিক্রি করে, কখনও কয়লার ব্যবসা করে আবার কখনও বিভিন্ন রেল স্টেশনে সাহেবদের ম্যাজিক ল্যান্টার্ন প্রোজেক্টরে ছবি দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করতেন।
এরপর একদিন বর্ধমানে কলকাতার জনপ্রিয় প্রযোজক ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। শান্ত, ধৈর্যবান দেবকী বসুর লেখনীর ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে ধীরেন গাঙ্গুলি তাঁকে কলকাতায় আসার আমন্ত্রন জানান। দেবকী বসু সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে কলকাতায় আসেন এবং নিজের প্রথম সিনেমা ‘কামনার আগুন’-এর চিত্রনাট্য লেখেন। এই সিনেমাতে তিনি অভিনয়ও করেন। ছবিটি ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্মসের ব্যানারে মুক্তি পায়। এরপর তিনি চিত্রনাট্য রচনা ও অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র পরিচালনাতেও মন দেন। শুরু হয় এক উদ্ভাবনী পরিচালকের পথ চলা, যিনি নির্বাক ও সবাক সিনেমার সন্ধিক্ষণে থেকে দুই যুগের শিল্পশৈলী, প্রযুক্তিকে মিলিয়ে দিয়ে ভারতীয় সিনেমায় আধুনিক শিল্পকৌশল ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৩০ সালে তিনি তাঁর প্রথম সিনেমা পরিচালনা করেন, যার নাম ছিল ‘পঞ্চসার’। এই সিনেমায় তিনি ধীরেন গাঙ্গুলির সঙ্গে অভিনয় করেন এবং সিনেমার চিত্রনাট্যও রচনা করেন। এই সিনেমাটিও ব্রিটিশ ডোমিনিয়ান ফিল্ম কোম্পানি থেকে মুক্তি পায়। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৩১ সালে তিনি তাঁর দ্বিতীয় নির্বাক সিনেমা ‘অপরাধী’ তৈরি করেন, যেটি প্রমথেশ বড়ুয়ার বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিটের প্রযোজনায় মুক্তি পায়। এই সিনেমার চিত্রগ্রহণেই প্রথম কৃত্রিম আলোর ব্যবহার করা হয়। এই নির্বাক ছবিটি দর্শকদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। তারপর তৃতীয় নির্বাক ছবি ‘শ্যাডোজ অব দা ডেড’ পরিচালনা করেন তিনি। তাঁর শেষ নির্বাক ছবি ‘নিশির ডাক’ তৈরি করেন ১৯৩২ সালে।
এই নির্বাক চলচ্চিত্রগুলি তাঁর কাছে ক্রমশ একঘেয়ে ও নিষ্প্রাণ মনে হতে থাকে। তাই চলচ্চিত্রে নতুন প্রাণের সঞ্চার করার জন্য তিনি নানা পরীক্ষা শুরু করেন। অবশেষে অভিনেতাদের অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গীত, কণ্ঠ যোগ করে তিনি তৈরি করেন প্রথম সার্থক বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘চণ্ডীদাস’। ১৯৩২ সালে মুক্তি পায় ছবিটি। এটি তাঁর সর্বকালীন সেরা ছবি। সিনেমার অভিনেতাদের কথা বলতে দেখে বাঙালি দর্শক অবাক হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া এই সিনেমাতেই প্রথম আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার করা হয়। এই সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল। এরপর ১৯৩৩ সালে তিনি প্রথম হিন্দি সিনেমা ‘পুরাণ ভকত’ তৈরি করেন। এই চলচ্চিত্রেও ব্যবহার করা হয় আবহ সংগীতের, যা সমগ্র ভারতীয় দর্শকের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয় এবং তিনিও বিখ্যাত পরিচালকের আসনে অধিষ্ঠিত হন। এই দুটি সিনেমা পরিচালনার মাধ্যমে ‘নিউ থিয়েটার্স’ বিখ্যাত হয়ে ওঠে। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যানারে ১৯৩৪ সালে তিনি তৈরি করেন ‘সীতা’ চলচ্চিত্রটি। এই সিনেমাটি বাণিজ্যিক সফলতার সঙ্গে এনে দেয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সিনেমার আর কোনও কপিই বর্তমানে অবশিষ্ট নেই।
দেবকী বসু হলেন সেইসব ভাগ্যবান পরিচালকদের মধ্যে একজন যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের মত লেখকদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। দেবকী বসুর সুপারহিট সিনেমা ‘বিদ্যাপতি’র গল্প লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এছাড়া তিনি দেবকী বসুর ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের কাহিনীকার ও সুরকার ছিলেন। ১৯৪৫ সালে তিনি নিজের প্রোডাকশন হাউস ‘দেবকী প্রোডাকশন’-এর সূচনা করেন। এরপর ১৯৫৪ সালে বৈষ্ণব দর্শনে বিশ্বাসী দেবকী বসু তৈরি করেন ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’ সিনেমাটি। সিনেমার চিত্রনাট্য, সংগীতের পাশাপাশি বিষ্ণুপ্রিয়া সুচিত্রা সেন ও চৈতন্যরূপী বসন্ত চৌধুরীর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। ১৯৫৬ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘চিরকুমার সভা’ নাটক অবলম্বনে তিনি তৈরি করেন ‘চিরকুমার সভা’ চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে ছিলেন উত্তম কুমার। এরপর ১৯৫৯ সালে বাংলায় দেবকী বসু তৈরি করেন ‘সাগর সঙ্গমে’ চলচ্চিত্রটি। দেবকী বসুর পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র ‘অর্ঘ্য’ ১৯৬১ সালে মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্র রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস উপলক্ষে তৈরি করা এক বিশেষ তথ্যচিত্র। এই সিনেমাটি মূলত রবীন্দ্রনাথের চারটি কবিতা ‘পুজারিনী’, ‘অভিসার’, ‘পুরাতন ভৃত্য’ ও ‘দুই বিঘা জমি’-র উপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়েছিল।
দেবকী বসু বাংলার পাশাপাশি হিন্দি ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় বেশ কিছু জনপ্রিয় সিনেমা দর্শকদের উপহার দিয়েছিলেন। তিনি মোট চারটি নির্বাক, বত্রিশটি সবাক সিনেমা তৈরি করেন। যার মধ্যে একুশটি বাংলা, বারোটি হিন্দি, একটি মারাঠি (‘আপনা ঘর’), একটি তামিল (‘রত্নদীপম’) ও একটি উর্দু (‘দুলারি বিবি’) সিনেমা ছিল। তবে দুঃখের বিষয় পাঁচটি বাংলা ও একটি হিন্দি ছাড়া বাকি সব সিনেমাগুলির কপি নষ্ট হয়ে গেছে।
দেবকী বসু শিল্পগুণ সমৃদ্ধ উৎকৃষ্ট মানের সিনেমা নির্মাণের জন্য ১৯৫০ সালের ভারতীয় ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন কড়া শিক্ষক তবে ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন নম্র ও বন্ধু প্রিয় এক মানুষ। রাজ কাপুর, শশী কাপুরের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তিনি কানন দেবী, চন্দ্রাবতী, উমাপতি, ছায়া দেবীর মতো প্রতিভাধর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে ভারতীয় সিনেমার পরিচয় করিয়ে দেন। মৃণাল সেন দেবকীবাবুর জীবন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন।
দেবকী বসু পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘সীতা’ প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র যা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (১৯৩৪ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব) নির্বাচিত হয়েছিল এবং পুরস্কার (অনারারি ডিপ্লোমা) পেয়েছিল । আর দেবকী বসুই প্রথম ভারতীয় যিনি নিজের পরিচালিত সিনেমার জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া এই সিনেমাটি ‘মুসোলিনি কাপ’-পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে সেরা কাহিনী হিসাবে ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’ সিনেমাটি সর্বভারতীয় মেরিট সার্টিফিকেট পায়। ১৯৫৭ সালে তিনি সেরা পরিচালক হিসাবে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি থেকে পুরস্কৃত হন। এরপর ১৯৫৮ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়। ১৯৫৯ সালের নবম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর ‘সাগর সঙ্গমে’ সিনেমাটি গোল্ডেন বিয়ারের জন্য মনোনীত হয়। এই সিনেমাটি ১৯৫৯ সালে ভারতের ষষ্ঠ জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র হিসাবে পুরস্কারও পায়।
১৯৭১ সালের ১৭ নভেম্বর কলকাতায় দেবকী বসুর মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান