অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে বঙ্গদেশে বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশের একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। সর্বধর্ম-সমন্বয়ের দেশ এই ভারতবর্ষের শিকড়ে বৌদ্ধ সংস্কৃতির ধারাও দীর্ঘকাল প্রবাহিত হয়েছে এবং আজও সে-ধারা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। খাস কলকাতা শহরের বুকেই এমন অনেক বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া যায় যেখানে নিষ্ঠাভরে বৌদ্ধ সংস্কৃতির যেমন চর্চা হয়ে থাকে, তেমনই সেইসব স্থানে ভ্রমণ করলে বহু পুরাতন ইতিহাসের স্বাদও গ্রহণ করা যেতে পারে। কলকাতার বো ব্যারাক অঞ্চলে অবস্থিত এমনই এক বৌদ্ধ বিহার হল ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহার (Dharmankur Bauddha Vihar)। সেই উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে এই বিহারের ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল। আজও বিশেষ বিশেষ দিনে এখানে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখলেই বোঝা যায় পর্যটন স্থান হিসেবে এর গুরুত্ব কতখানি। বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তারের জন্য এই বিহার ও বৌদ্ধ ধর্মসভাকেন্দ্রটি কাজ করে চলেছে বহুকাল ধরে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
ইঙ্গ-ভারতীয়দের পাড়া এবং সারি সারি লাল বাড়িওয়ালা জনপ্রিয় রাস্তার জন্য বিখ্যাত বো ব্যারাক অঞ্চলে ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহারের অবস্থান। এখানে উল্লেখ্য যে এই বো ব্যারাকের সারি সারি লাল বাড়ি আসলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈন্যদের ব্যারাক হিসেবে ব্যবহৃত হত। যাই হোক, প্রথমেই এই ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহারটি তৈরি হয়নি। তার নেপথ্যে ছিল একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। কৃপাশরণ মহাস্থবির নামের এক বৌদ্ধ কলকাতায় বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা (Bauddha Dharmankur Sabha) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৯২ সালের ৫ অক্টোবর বেঙ্গল বৌদ্ধ অ্যাসোসিয়েশনের (Bengal Buddhist Association) উদ্যোগে এই ধর্মাঙ্কুর সভা সফলভাবে গড়ে উঠেছিল। উল্লেখ্য যে, এই সভা আধুনিকতাবাদী দক্ষিণ এশীয় বৌদ্ধ স্রোত, ঠিক যেমন শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ আধুনিকতা এবং পাশাপাশি পশ্চিমা ধর্মীয় আন্দোলন থিওসফি দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত ছিল। এই সভার প্রথম সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে কৃপাশরণ মহাস্থবির এবং সুরেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দি। কলকাতার ললিতমোহন দাশ লেনে, যেটি বর্তমানে বুদ্ধিস্ট টেম্পল স্ট্রিট নামে পরিচিত, সেখানে প্রথম এই সভার কার্যালয় গঠন করে কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই ধর্মাঙ্কুর সভার উদ্যোগে এবং বেঙ্গল বৌদ্ধ অ্যাসোশিয়েসনের সহায়তায় ১৯০৩ সালে ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হয়েছিল। আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে এই বিহারের উদ্বোধন হয়েছিল। প্রখ্যাত বৌদ্ধশাস্ত্রবিদ এবং ভারততত্ত্ববিদ বেণীমাধব বড়ুয়া এই বৌদ্ধ বিহারের সঙ্গেই যুক্ত থেকে প্রভূত কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।
১৯০৮ সালে এই ধর্মাঙ্কুর সভার একটি মুখপত্র ‘জগজ্জ্যোতি’ প্রকাশিত হয়েছিল। অনেকবার বন্ধ হওয়ার পরেও এই পত্রিকাটি ১৯৭০ সালে পুনরায় প্রকাশিত হয় এবং ১৯৮০ সালে এটি একটি দ্বিভাষিক পত্রিকায় পরিণত হয়েছিল। বিহার তৈরির পর জ্ঞানচর্চার বিকাশের জন্য ধর্মাঙ্কুর সভা ১৯০৯ সালে আবার গুণালঙ্কার লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিল। বেণীমাধব বড়ুয়ার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৩৫ সালে এখানে পালি শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র নালন্দা বিদ্যাভবন গড়ে উঠেছিল। এছাড়াও নৈশ বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এইভাবে আদতে এই ধর্মাঙ্কুর সভা ও ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহার বঙ্গদেশে এবং বঙ্গদেশের বাইরেও বৌদ্ধ সংস্কৃতিকে সমস্ত কোনায় পৌঁছে দেওয়ার নিরলস প্রয়াস করে চলেছে। বর্তমান সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের পুনর্গঠনে ও পুনর্জাগরণে এই ধর্মাঙ্কুর সভা ও বৌদ্ধ বিহারের গুরুত্ব অপরিসীম।
এই বৌদ্ধ বিহারটির মধ্যে রয়েছে একটি ছোট মন্দির। সেই মন্দিরের নিচের তলায় উন্মুক্ত প্রাঙ্গনের একপাশে একটি কাচের ঘেরাটোপের মধ্যে রয়েছে এক সোনার বুদ্ধমূর্তি, যা-কিনা এই ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহারের আকর্ষণের এক মূল কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়াও এই বিহারের বিশাল কমপ্লেক্সের মধ্যে লাইব্রেরি এবং গেস্ট হাউসও রয়েছে। এইসব গেস্ট হাউস বৌদ্ধ ছাত্র এবং তীর্থযাত্রীদের আশ্রয়ের অন্যতম জায়গা তবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষকেই এখানে স্বাগত জানানো হয়।
এছাড়াও এই সমিতি ও বিহার নানারকম সমাজসেবামূলক কাজেও নিজেদের নিয়োজিত করে রেখেছে। শিক্ষা প্রদানের জন্য যেমন স্কুল গঠন করেছেন তাঁরা, তেমনই মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরিষেবা প্রদানের জন্য ধর্মাঙ্কুর ফ্রী মেডিকেল সেন্টারও গড়ে তুলেছেন।
সমস্ত বৌদ্ধ বিহারের মতোই বো ব্যারাকের এই ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহারেও বুদ্ধ পূর্ণিমা খুবই ধুমধাম করে পালিত হয়ে থাকে। এই দিনটি বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক শ্রী গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। এই সময় গোটা বৌদ্ধ বিহারের চতুর্দিকে এক উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বিহারটিকে নানা আলোকমালায় সজ্জিত করে তোলা হয়। বৌদ্ধ পতাকা উত্তোলন করা হয়, বুদ্ধদেবের মূর্তিকে স্নান করানো হয়। অগণিত ভক্ত, পর্যটক এই বিশেষ দিনটিতে এসে ভিড় জমান ও বুদ্ধদেবের পূজা ও প্রার্থনায় অংশ নেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান