সববাংলায়

দশচক্রে ভগবান ভূত

বিভাগঃ ,

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “দশচক্রে ভগবান ভূত”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: দশ জনের চক্রান্তে ন্যায়কে অন্যায় প্রতিপন্ন করা বা প্রভাবের জোরে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানানো।

এখানে দশ জন বলতে অনেকজনকে বোঝানো হয়েছে। চক্র অর্থ চক্রান্ত বা কুট অভিসন্ধি। বহুলোকের চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্রে আসলকে নকল, নকলকে আসল, সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে প্রতিপন্ন করা সম্ভব। “দশে লাগে ভূত ভাগে” এ ধরনের প্রবাদে যেমন অনেকজন মিলে অতি দুঃসাধ্য কাজও সুসাধ্য হয় বোঝানো হয় তেমনই দশ জনের ষড়যন্ত্রে ভগবান নামক জনৈক পণ্ডিত ভূত হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন বলে এই প্রবাদ। আমরা এখানে সেই কাহিনিটি জেনে নেবো।

এক রাজদরবারের মুকুটমণি ছিলেন ভগবান নামে এক বিদ্বান পণ্ডিত। ভগবানের নামডাক ও প্রশংসা সহ্য করতে পারছিলেন না অন্যান্য অমাত্য ও গণ্যমান্য সভাসদেরা। সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করলেন ভগবানকে দরবার ছাড়া করার। একদিন ষড়যন্ত্রকারী সভাসদেরা মিথ্যা করে দারোয়ানকে বলে দিলেন যে, রাজা নির্দেশ দিয়েছেন পণ্ডিত ভগবানকে যেন রাজদরবারে প্রবেশ করতে না দেওয়া হয়। বেচারা দারোয়ান এই মিথ্যা বুঝতে না পেরে ভগবানকে আর দরবারে ঢুকতে দিল না।

ভগবানকে রাজা খুব পছন্দ করতেন বলে দরবারে এসেই তিনি ভগবানের খোঁজ করলেন। অন্যান্য সভাসদ রাজাকে বললেন যে, ভগবান পণ্ডিত মারা গেছেন। রাজ-চিকিৎসককেও ষড়যন্ত্রকারীরা আগেই হাত করে রেখেছিলেন, তাই তিনিও সাক্ষ্য দিলেন যে সত্যিই ভগবান পণ্ডিতের মৃত্যু হয়েছে। রাজসভায় যথারীতি শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হল — ভগবানের আত্মার শান্তি কামনা করে রীতিমতো শোকসভাও হয়ে গেল।

কিছুদিন পর রাজা বের হয়েছেন নগরভ্রমণে। ভগবান পণ্ডিত রাজার সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে এলেও জনতার ভিড়ে ও সুরক্ষার কড়াকড়িতে তাঁর পক্ষে রাজার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হল না। এদিকে রাজসভাতেও তাঁর প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হয়েছে ষড়যন্ত্রকারীদের কৌশলে। নিরুপায় ভগবান রাজদর্শনে বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। রাজপথের ধারে এক গাছে চড়লেন তিনি। রাজার উদ্দেশে গাছের উপর থেকে চিৎকার করে ভগবান পণ্ডিত তাঁর উপস্থিতি জানানোর চেষ্টা করলেন। রাজা সেদিকে তাকাতেই চক্রান্তকারী পারিষদগণ তাঁকে বললেন, ‘মহরাজ! ভগবান পণ্ডিত মরে গিয়ে ভূত হয়েছে। গাছের উপর থেকে তার আত্মা তার রূপ ধরে আপনাকে ডাকছে। ঐদিকে আর তাকানো উচিত নয়। বরং অন্যপথে চলুন।’ পারিষদগণের কথায় রাজার বিশ্বাস হল। অমঙ্গলের ভয়ে তিনি অন্যপথে যাবার আদেশ দিলেন সবাইকে। ভগবান পণ্ডিতের মতো ভাল মানুষও পাত্রমিত্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ভূত হিসেবে গণ্য হলেন এবং সবার কাছে তা সত্য বলে মনে হল।

‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ প্রবাদটি নিয়ে একটি সংস্কৃত শ্লোক প্রচলিত আছে —
চক্রং সেব্যং নৃপঃ সেব্যো
ন সেব্যঃ কেবলং নৃপঃ।
অহো চক্রস্য মাহাত্ম্যাৎ
ভগবান্ ভূততাং গতঃ ॥

শ্লোকটির অর্থ হল – কেবল রাজার সেবা করলেই চলে না, তার সাথে চক্র অর্থাৎ জনমণ্ডলীর সেবাও প্রয়োজন। চক্রের মাহাত্ম্যে বা দশচক্রে পড়ে আজ ভগবানকেও ভূত হতে হল।

‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মানুষ হিসেবে খুব ভাল কিন্তু ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ হয়, তাই তাঁকে সব দায় নিয়ে বিদ্যালয় ছাড়তে হল।
২। ইদানিং কালে ভাল মানুষের কোন দাম নেই কারণ ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ৮২ পৃঃ
  2. https://sattacademy.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading