মহাভারতের আদিপর্বে ১৮৪তম অধ্যায় থেকে ১৯০তম অধ্যায় জুড়ে বর্ণিত আছে পাঞ্চালের রাজা দ্রুপদের কন্যা কৃষ্ণা বা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভা র বর্ণনা। জতুগৃহ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর পান্ডবরা সকলের অলক্ষ্যে লুকিয়ে ছিলেন একচক্রা নামক এক গ্রামে। সেখানেই এক ব্রাহ্মণের মুখে তাঁরা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরা হওয়ার খবর পেয়ে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কয়েকজন সহযাত্রী ব্রাহ্মণের সঙ্গে পান্ডবরা পাঞ্চাল রাজ্যে পৌঁছান।
মহারাজ দ্রুপদের আন্তরিক ইচ্ছা ছিল জগতের শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ অর্জুনের সাথে দ্রৌপদীর বিবাহ দেওয়া। এদিকে সবাই জানে যে পান্ডবরা বারণাবত নগরে জতুগৃহে থাকার সময় আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। কিন্তু দ্রুপদ আদৌ এই কাহিনী বিশ্বাস করতেন না। সুতরাং যাতে অর্জুন ছাড়া আর কেউ দ্রৌপদীকে বিবাহ করতে না পারে তার জন্য তিনি একটি কৌশল করেছিলেন। দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভা য় যোগ্য পাত্রের নির্বাচনের জন্য একটি ধনুর্বিদ্যা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। অনেক উঁচুতে ঝোলানো ছিল একটি লক্ষ্যবস্তু। আর ছিল একটি ভয়ঙ্কর ভারী ধনুক। সেই ধনুকে গুণ চড়িয়ে বিদ্ধ করতে হবে লক্ষ্য। যিনি এই কাজটি করতে পারবেন, তিনিই লাভ করবেন সুন্দরী দ্রুপদনন্দিনীকে। মহারাজ দ্রুপদ জানতেন যে এই কাজ একমাত্র অর্জুন ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু এই কথা তিনি কাউকে বলেননি। দ্রৌপদীর সৌন্দর্য্যের কথা সারা পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ ছিল। সেই দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভার খবর পেয়ে সকল রাজা, রাজপুত্র, যোদ্ধা এবং ধনী ব্যক্তি এসে উপস্থিত হয়েছেন পাঞ্চাল রাজ্যে। এর মধ্যে ছিলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ এবং দুর্যোধন সহ সকল কৌরবেরা।
সভার জন্য নির্বাচিত জায়গাটি অতি সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। অতিথি রাজা-রাজড়াদের মনোরঞ্জনের জন্য গান-বাজনা চলছে। পান্ডবরা সকলের চোখের আড়ালে ব্রাহ্মণদের সঙ্গেই বসে আছেন। টানা পনেরোদিন শুধু গান-বাজনা আর আমোদ-আহ্লাদই হল। ষোলো দিনের দিন রাজকন্যা দ্রৌপদী রাজবেশ ও অলঙ্কারে নিজের অতুল রূপ বহুগুণ বাড়িয়ে তুলে সকলের সামনে উপস্থিত হলেন। তাঁর ভাই রাজপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রৌপদীকে সভার মাঝখানে নিয়ে এসে আবার ঘোষণা করলেন, যিনি লক্ষ্য ভেদ করতে পারবেন তাঁর সাথেই বিবাহ হবে রাজকন্যা দ্রৌপদীর।
তারপর শুরু হল লক্ষ্যভেদের প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেই ভয়ানক ধনুকের কাছে সকল রাজা-রাজপুত্ররাই হেরে যেতে লাগলেন। অনেক চেষ্টা করা সত্ত্বেও বিষম ভারী সেই ধনুককে তুলে ধরে কেউই তাতে গুণ পরাতে পারলেন না। লক্ষ্য ভেদ তো পরের কথা! একে একে ফিরে গেলেন মগধরাজ জরাসন্ধ, চেদীরাজ শিশুপালের মতো মহাযোদ্ধারা।
সকলকে হতাশায় ডুবে যেতে দেখে মহাবীর কর্ণ এগিয়ে এলেন। তিনি চোখের পলকে সেই ধনুকে গুণ দিয়ে লক্ষ্যভেদ করার জন্য প্রস্তুত হতেই দ্রৌপদী বলে উঠলেন তিনি সারথির ছেলেকে বরণ করবেন না। অগত্যা লক্ষ্যভেদ না করেই ফিরে যেতে হল কর্ণকে।
এরপর আর কেউ সেই ধনুকের কাছে যেতে সাহস পাচ্ছেন না দেখে উঠে দাঁড়ালেন অর্জুন। ব্রাহ্মণবেশী অর্জুনকে দেখে কেউ চিনতে পারল না। সাধারণ এক ব্রাহ্মণ হয়ে এই দুঃসাহসের জন্য অনেকেই তাঁকে বিদ্রুপ করতে লাগলো। কিন্তু অন্যান্য ব্রাহ্মণরা সকলেই অর্জুনকে সমর্থন করতে লাগলেন।
মঞ্চে উঠে এসে অর্জুন দেবতাদের মনে মনে স্মরণ করে সেই ধনুক হাতে নিলেন। অর্জুনের ক্ষমতার কাছে হার মানলো সেই ভয়ঙ্কর ধনুক। তিনি সেই ধনুকে গুণ চড়িয়ে পাঁচটি তীর হাতে নিলেন। তারপর দেখতে দেখতে লক্ষ্যবস্তুটি তীরে বিদ্ধ হয়ে মাটিতে এসে পড়ল। তখন আকাশ থেকে দেবতারা অর্জুনের উপরে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন। সভাতেও শুরু হল জয়ধ্বনি। সকলের আনন্দ-উল্লাসের মাঝেই দ্রৌপদী অর্জুনের গলায় পরিয়ে দিলেন বরমাল্য।
এদিকে এক ব্রাহ্মণের রাজকন্যা লাভের মতো কাণ্ড দেখে সভার সকল রাজা ও রাজপুত্ররা ভীষণ অপমানিত বোধ করলেন। সামান্য ব্রাহ্মণের এমন স্পর্ধা দেখে রাগে জ্ঞানশূন্য হয়ে তাঁরা সকলে মহারাজ দ্রুপদের প্রাণনাশ করতে গেলে মহারাজ দ্রুপদ ব্রাহ্মণদের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন। তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন ভীম ও অর্জুন। দুই দলের মধ্যে বেধে গেলো ভয়ানক যুদ্ধ।
অনেকক্ষণ ধরে যুদ্ধ চলার পরও ভীম ও অর্জুনকে হারাতে না পেরে রাজারা সকলেই হার স্বীকার করে নিলেন। এরপর পান্ডবরা দ্রৌপদীকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন। মা কুন্তির কাছে উপস্থিত হলে কুন্তী কিছু না দেখেই বলে ফেলেন, “যা এনেছ পাঁচ ভাই মিলে ভোগ করো’’। তাঁর এই কথার মান রাখতে পরবর্তীকালে পাঁচ পান্ডবের সাথেই রাজকন্যা দ্রৌপদীর বিবাহ হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘মহাভারত’, শ্রী কালীপ্রসন্ন সিংহ, আদিপর্ব, অধ্যায় ১৮৪-১৯০, পৃষ্ঠা ২৪৭-২৫৪
- ‘উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র’, ‘ছেলেদের মহাভারত’, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১৯৫-১৯৯


Leave a Reply to Manotosh GaraiCancel reply