সববাংলায়

নির্বাচনী ইস্তেহার

সরকারী বা যে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচী, পরিকল্পনা, জনগণের প্রতি কোন বার্তা অথবা রাজনৈতিক মতাদর্শ যা কিছু ছাপা অক্ষরে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাকেই নির্বাচনী ইস্তেহার (Election Manifesto) বলা হয়।

ভারতের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সহজতম উপায় হল নির্বাচনী ইস্তেহার । সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচনী ইস্তেহারের মূল বিষয়বস্তু নিয়ে ধারনা থাকলেও, ইস্তেহার তৈরী এবং ইস্তেহারের বিষয়বস্তুর চয়ন নিয়ে বিশেষ ধারণা থাকেনা। অথচ, নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের কার্যকারিতা এবং গ্রহণযোগ্যতার অনেকাংশই নির্ভর করে দলীয় ইস্তেহারের উপরই।

ইস্তেহার শব্দটি সাধারণত বিজ্ঞাপন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যে কোন নির্বাচনের আগে, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করার সাথেই আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করে নির্বাচনী ইস্তেহার। রাজনৈতিক দলগুলির দেশ তথা রাজ্য পরিচালনা করার ক্ষেত্রে যা কিছু দৃষ্টিভঙ্গি, দলের কর্মপদ্ধতি নিয়ে ভোটারদের প্রাথমিক ধারণা হয় ইস্তেহার থেকেই। আবার শাসকদলের নির্বাচনী ইস্তেহার সাধারণত প্রচার করে ক্ষমতায় থাকাকালীন সরকার জনগণের জন্য পূর্বপ্রতিশ্রুতি মতো কতটা কাজ করেছে এবং পুনরায় ক্ষমতায় এলে কি কি উন্নতিসাধন করবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ এবং কর্মসূচীর তুলনামূলক বিচার করার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে প্রাথমিক রূপরেখা হল নির্বাচনী ইস্তেহার।

স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫২ সাল থেকে ভারতে নিয়মিত নির্বাচন শুরু হয়। প্রথম দিকে, বৃহৎ এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি ব্যতীত বাকী ছোট ছোট রাজনৈতিক সংগঠনগুলি নিজ নিজ দলীয় মতাদর্শ এবং কর্মসূচী লিখিত আকারে প্রকাশ করত না। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক দলগুলির তরফে নির্বাচনী ইস্তেহারের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতবর্ষে নির্বাচন লড়া হয় সাধারণ মানুষের জীবনধারণের রসদ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির উপর। আবার আঞ্চলিক নির্বাচনে গুরুত্ব পায় সেই অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান। সাধারণত অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের নির্ভরতার সাথে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি, শিক্ষায় সমানাধিকার, প্রত্যন্ত এলাকায় পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা, কৃষিক্ষেত্রে ঋণ মকুব প্রভৃতি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে জনসংখ্যার একটি দুর্বল অংশকে ব্যয়হীন শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুবিধার অন্তর্ভুক্ত করার মতো প্রতিশ্রুতির প্রচার বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। এই জাতীয় প্রচারের উদ্দেশ্য থাকে পিছিয়ে পড়া শ্রেণী, মহিলা, বয়স্ক মানুষের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা।

বিনামূল্যে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি থেকে রাজনৈতিক দলগুলিকে মুক্ত রাখার জন্য ২০১৩ সালে মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট একটি নির্দেশ জারি করে। স্পষ্টত সেখানে বলা হয়, এই ধরণের প্রতিশ্রুতি সবসময়ই জনগণকে প্রভাবিত করে যা স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। সরকারী অর্থ ব্যবহার করে বিনামূল্যে সরকারী প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কিছুটা হলেও কলুষিত করে। নির্বাচন কমিশন এই ক্ষেত্রে সহমত পোষণ করায়, সুপ্রীম কোর্টের কাছে ইস্তেহার প্রকাশের নির্দেশিকা প্রার্থনা করে। যেহেতু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রীম কোর্টের ক্ষমতা সীমিত, তাই কমিশন স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রয়াসে আদর্শ নির্বাচন বিধি লাগু করে। এখনো অবধি সংবিধানে নির্বাচনী ইস্তেহারের বিষয়বস্তু নিয়ে নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা হয়নি, তাই সুপ্রীম কোর্ট কমিশনকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলির সাথে আলোচনা সাপেক্ষে নির্বাচনী প্রচার, প্রার্থী ঘোষণা, জনসভা বা শোভাযাত্রা সম্পর্কিত নির্দেশিকা গঠন করার অনুমোদন দেয়। যদি কোন ক্ষেত্রে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার আগেই কোন রাজনৈতিক দল ইস্তেহার প্রকাশ করে, সেক্ষত্রে কমিশনের পক্ষে নতুন করে কোন বিধি লাগু করা কিছুটা কঠিন। তবে স্পর্শকাতর কোন বিষয় যদি ইস্তেহারে থাকে, সেক্ষেত্রে কমিশন অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে পারে। নির্বাচনী ইস্তেহার এবং আদর্শ নির্বাচন বিধি জনিত সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশ সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বিবৃত করা হয়েছে।

ভারতবর্ষের মতো বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলিও বিভিন্ন নির্বাচনী শর্তাবলী ব্যবহার করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রচার সরকারের শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বিদেশনীতি, অর্থনৈতিক সংস্কার প্রভৃতি বিষয়ের উপর কেন্দ্রীভূত থাকে। দলের কর্মপদ্ধতি কিভাবে জনগণের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে, ইস্তেহারে শুধুমাত্র সেটুকুই আলোচনা করা হয়। কখনোই বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির উল্লেখ থাকেনা। আবার মেক্সিকোতে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য দলগুলিকে Federal Electoral Institute (FEI)-এ পঞ্জীকরণ করা বাধ্যতামূলক। প্রত্যেকটি দল নিজেদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আদর্শের একটি লিখিত রূপ FEI-এ জমা করে। ইস্তেহারে প্রকাশিত দলীয় মতাদর্শ যদি FEI তে জমা করা তথ্যের সাথে সমার্থক হয় তবেই একটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ছাড়পত্র পায়। ইউরোপের পশ্চিমী দেশগুলি আবার ইস্তেহারে দলীয় কর্মপদ্ধতির উপর গুরুত্ব আরোপ করে। অনেক সময় ইস্তেহারে বাজেটের উল্লেখ করা হয়। এশিয়া মহাদেশের সর্বাপেক্ষা সুখী দেশ ভুটানে প্রত্যেকটি দল নির্বাচন কমিশনে নিজেদের ইস্তেহারের খসড়া জমা করে। কমিশনের অনুমোদন পেলে তবেই দলগুলি ইস্তেহার জনগণের কাছে প্রকাশ করতে পারে। নির্বাচনের পর যে দল ক্ষমতায় আসে, কমিশন তাদের ইস্তেহার পুনরায় পরীক্ষা করে এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণকে ভিত্তি করে কোন প্রতিশ্রুতির উল্লেখ থাকলে দেশের জাতীয় ঐক্য রক্ষার স্বার্থে কমিশন পরিমার্জিত ইস্তেহার প্রকাশের নির্দেশ দেয়।

নির্বাচনী ইস্তেহারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ দলীয় মতাদর্শ দ্বারা সাধারণ মানুষের উন্নতিসাধনের প্রতি জোর দেওয়া। তবে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলি প্রশাসনিক পরিকল্পনার অধিক ভোটবাক্স কেনার অলীক প্রতিশ্রুতিতে ভরিয়ে ইস্তেহার প্রকাশ করে এবং নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর যার বাস্তবায়ন বেশী দেখা যায় না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading