বহু বহু প্রাচীনকাল থেকে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখে আসছে। একেকটি তারার গঠন একেকরকম, আবার এক তারা থেকে পার্শ্ববর্তী অন্য তারাদের কাল্পনিক রেখা দিয়ে যুক্ত করে কত রকম গঠন তৈরি করেছে মানুষ। একেক রকম গঠন নিয়ে আলাদা আলাদা কাল্পনিক কাহিনীও মানুষ তৈরি করেছে। এই বিরাট মহাকাশ হয়ে উঠেছে মানুষের বিস্তৃত কল্পনার ভূমি। দূরবীন যখন আবিষ্কার হয়নি, মানুষ খালি চোখেই এইসব তারাদের পর্যবেক্ষণ করে এই মহাকাশের বিবিধ রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করত। তাই অনেক কাল আগেই প্রাচীন ভারত সহ বিশ্বের অনেক দেশেই জ্যোতির্বিজ্ঞান নামে একটি পৃথক জ্ঞানচর্চার শাখার জন্ম হয়েছে। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি তা একটি সৌরমণ্ডলের অংশ, আবার এই সৌরমণ্ডল বিরাট মহাকাশের অসংখ্য নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যে একটি বিশেষ নক্ষত্রপুঞ্জের অংশ। এই নক্ষত্রপুঞ্জকেই সহজ ভাষায় ছায়াপথ বলা হয়, ইংরেজিতে বলে galaxy। সংক্ষেপে বললে ছায়াপথ মহাবিশ্বের এমন এক মহাজাগতিক কাঠামো যাতে একত্রে অনেক নক্ষত্র, গ্রহ, পুঞ্জীভূত গ্যাস, ধূলিকণা এবং মেঘ মহাকর্ষীয় আকর্ষণে একত্রিত ও দলবদ্ধ থাকে। বহুধা বিস্তৃত এই ছায়াপথের গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক চলুন।
প্রাচীনকালে রাতের আকাশে খালি চোখে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার তারাকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন হিপ্পারকাস। কিন্তু গ্যালিলিওই প্রথম দূরবীনের সাহায্যে প্রমাণ করেন যে মহাকাশের অসংখ্য নক্ষত্রের মধ্যে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথ আসলে বহু নক্ষত্রের সমষ্টিমাত্র। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, একটি ছায়াপথে প্রায় ১০ হাজার কোটি নক্ষত্র, অগুনতি বিশালাকায় ধূলোর মেঘ চাকতির মতো আবর্তিত হতে পারে। এই চাকতির কেন্দ্রে এবং প্রান্তে তারাদের বেশি জমাট বেঁধে থাকার কারণে তারাগুলিকে পৃথকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় না এবং একে অদৃশ্য সাদা আলোর পটির মতো দেখায়। তাই সেই প্রাচীনকাল থেকেই এই সাদা আলোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অনেক রূপকথা আর উপকথা। প্রাচীন ভারতীয়দের কাছে এই সাদা আলোর পটি ছিল স্বর্গের সিঁড়ি, আবার মিশরীয়রা মনে করত এটি স্বর্গের নীল নদ। গ্রিকরা আবার এই সাদা আলোর পটিকে গ্রিক দেবী হেরার বুকের দুধের প্রবাহ বলে মনে করত। এই ছায়াপথের সৃষ্টি কীভাবে হল তা নিয়ে গ্রিক উপকথায় এক আশ্চর্য কাহিনী আছে। গ্রিক উপকথা অনুযায়ী দেবরাজ জিউস একবার রাজা অ্যাম্ফিট্রায়োনের স্ত্রী অ্যালেকম্যানের রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে গোপনে মিলিত হন এবং অ্যালেকম্যান এর ফলে গর্ভবতী হয়ে পড়েন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর এক পুত্র সন্তান জন্মায় হেরাক্লেজ নামে। জিউসের স্ত্রী হেরা এই পুত্রের কথা জানতে পারলে তার ক্ষতি করতে পারেন এই আশঙ্কায় হেরাক্লেজকে জন্মের পরেই উন্মুক্ত এক প্রান্তরে রেখে আসেন অ্যালেকম্যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই সৌভাগ্যবশত হেরা এবং এথেনা ঐ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় শিশু হেরাক্লেজকে দেখতে পান এবং মাতৃস্নেহে হেরাক্লেজকে স্তন্যপান করাতে থাকেন হেরা। এদিকে শিশু হেরাক্লেজ অনেক জোরে জোরে স্তন্যপান করতে থাকলে ব্যথায় স্তনবৃন্ত সরিয়ে নেন হেরা। এতেই কিছুটা দুধ বাইরে ছিটকে পড়ে এবং এ থেকেই এই ছায়াপথের সৃষ্টি হয় বলে গ্রিকরা বিশ্বাস করতেন।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন এই মহাবিশ্বে প্রায় ২ লক্ষ কোটি ছায়াপথ ছড়িয়ে আছে যারা ক্রমেই একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং এই জন্যেই মহাবিশ্বের বিস্তৃতি প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে। এই ছায়াপথ গুলির মধ্যে সবথেকে উজ্জ্বল এবং আকারে বড় প্রাণের উৎস সম্পন্ন ছায়াপথ হল আমাদের আকাশগঙ্গা (milky way)। এছাড়াও অন্য কয়েকটি ছায়াপথের নাম জানা যায় – আরসা মেজর ২ ড্রফ (arsa major 2 drof), বুটেস ১ (bootes 1), লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউড (large magelanic cloud), আরসা মাইনর ড্রফ (arsa minor drof), ড্রাকো ড্রফ (draco drof), স্কাল্পচার ড্রফ (sculpture drof), লিও ২ ড্রফ (leo 2 drof), লিও ১ ড্রফ (leo 1 drof) ইত্যাদি। এই ম্যাজেলানিক মেঘ দক্ষিণ গোলার্ধে রাতের আকাশে খালি চোখেই দেখা যায় বলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। এছাড়া আকাশগঙ্গা ছায়াপথের খুব কাছেই রয়েছে অ্যাণ্ড্রোমিডা ছায়াপথ (andromeda galaxy), স্যাজিটারিয়াস ডোয়ার্ফ ইলিপ্টিকাল গ্যালাক্সি (sagitarius dwarf elliptical galaxy) এবং ক্যানিস মেজর ডোয়ার্ফ গ্যালাক্সি (cannis major dwarf galaxy)। আমাদের এই আকাশগঙ্গার ব্যাস প্রায় ১ লক্ষ আলোকবর্ষ। অর্থাৎ স্বাভাবিক গতিতে এই ছায়াপথ পার করতে আলোর ১ লক্ষ বছর সময় লাগবে। এই নক্ষত্রপুঞ্জের কেন্দ্র থেকে সূর্য প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে আছে। সমগ্র ছায়াপথটির এক পাক আবর্তন সম্পূর্ণ করতে সময় লাগে প্রায় ২২ কোটি বছর। শুনলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় কোথায় এই পৃথিবী নিজের চারদিকে এক পাক দেয় মাত্র এক দিনে আর সূর্যের চারদিকে এক পাক দেয় মাত্র এক বছরে, সেখানে ২২ কোটি বছর! অনুমান করে বলা যায় পৃথিবীতে জীব সৃষ্টির সময়ের আগে থেকে আজ অবধি এক পাকও সম্পূর্ণ হয়নি এই আকাশগঙ্গা ছায়াপথের। এই ছায়াপথটিকে বাইরে থেকে অনেকটা শিউলি ফুলের পাপড়ির মতো দেখতে যার একেবারে কেন্দ্রে এর সকল ভর পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে যাকে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর (black hole) বলা হয়। এই গহ্বরের ব্যাস ২২ কোটি কিলোমিটার হলেও এর ভর বিজ্ঞানীদের মতে ৩০ লক্ষ সূর্যের ভরের সমান। শুধু এই আকাশগঙ্গাই নয়, মহাবিশ্বের সব ছায়াপথের ক্ষেত্রেই সমস্ত ভরের ৯০ শতাংশই তার কেন্দ্রে পুঞ্জীভূত থাকে। এই ছায়াপথগুলি আবার আকারে বাড়তে বা কমতে পারে এবং একটি ছায়াপথের সঙ্গে অপর ছায়াপথের সংঘর্ষ হতে পারে। তখনই ঘটে মহাপ্রলয়। বিজ্ঞানীদের মতে আনুমানিক ১৩৬০ কোটি বছর আগে এই ছায়াপথ তৈরি হয়েছিল মহাবিশ্বে। সাধারণভাবে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা কৃষ্ণগহ্বরটিকে বিজ্ঞানীরা ‘স্যাজিটারিয়াস এ’ (sagitarius A) নামে চিহ্নিত করেছেন যাকে কেন্দ্র করে প্রতি সেকেণ্ডে ২২০ কিলোমিটার বেগে ছায়াপথ আবর্তিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে এক বিরাট বিগ ব্যাং-এর (Big Bang) মধ্যে দিয়েই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে এবং ক্রমে ক্রমে মহাকর্ষীয় আকর্ষণের প্রভাবে এই ছায়াপথগুলি সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে আবার মনে করেন গ্লোবিউলার ক্লাস্টার (Globular Cluster) থেকেই ছায়াপথের সৃষ্টি।
ছায়াপথ গুলিকে তাদের পৃথক পৃথক আকার-আকৃতি অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। যেমন – উপবৃত্তাকার ছায়াপথ, সর্পিল ছায়াপথ , অনিয়মিত ছায়াপথ, লেন্টিকুলার ছায়াপথ ইত্যাদি। আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের গঠন দিকে তাকালে দেখা যাবে এই ছায়াপথের কেন্দ্রের চারপাশে একটি ‘স্ফীত অঞ্চল’ থাকে যা কিনা ঘন তারায় সমৃদ্ধ। এখান থেকেই ফুলের পাপড়ির মত বেশ কয়েকটি বাহু বেরিয়ে এসে কেন্দ্রকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘিরে রেখেছে। এই কুণ্ডলীকেই বলা হয় ‘ডিস্ক’ (disc)। এই ডিস্কের মধ্যেই রয়েছে অনেকগুলি বাহু (arm), যেমন – ধনু বাহু, কালপুরুষ বাহু, পার্সিয়ুস বাহু, নরমা বাহু, স্কুটাম সেন্ট্রাস বাহু ইত্যাদি। কালপুরুষ বাহুটির একটি শাখাতেই রয়েছে আমাদের এই সূর্য। আমাদের এই সৌরমণ্ডলই কত বৃহৎ আর মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে এই ছায়াপথ তার তুলনাতেও আরও আরও বৃহৎ। এই বিশালত্বের ধারণা করাও মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য। এই যে বিরাট ছায়াপথ তা একটা বিশেষ তলে অবস্থান করে এবং চাকতি-সদৃশ সেই তলের উপরে ও নীচে কিছু কিছু বর্তুলাকার নক্ষত্র থাকে। এই নক্ষত্রের সমাহারে ছায়াপথের ঐ বিশেষ অঞ্চলকে বিজ্ঞানীরা ‘বর্ণ বলয়’ (Halo) বলে চিহ্নিত করেছেন। ছায়াপথের কুণ্ডলী এবং বাহুগুলির মধ্যে যে তারাদের দেখা যায় তাদের বলা হয় ‘পপুলেশন ১’ আর এই বর্ণবলয়ের মধ্যে থাকা তারাগুলিকে বলা হয় ‘পপুলেশন ২’। ‘পপুলেশন ১’ জাতীয় তারা বা নক্ষত্রগুলি সাধারণত নীল রঙের হয় এবং এতে ভারী মৌলগুলি পাওয়া যায়। অন্যদিকে ‘পপুলেশন ২’ জাতীয় নক্ষত্রগুলি সাধারণত লাল রঙের হয় আর এগুলি বয়সে অনেক পুরনো। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ছায়াপথগুলিতে ৯০ শতাংশই হল ডার্ক ম্যাটার।
ছায়াপথগুলির মধ্যেকার নক্ষত্রেরও নানা রূপভেদ রয়েছে, সে অনেক জটিল তত্ত্ব। আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের একটি সৌরমণ্ডলের মধ্যে প্রধান নক্ষত্র হল সূর্য। এরকম অসংখ্য ছায়াপথে হাজার হাজার সূর্যের মতো নক্ষত্র আছে বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান এবং তাঁদের মতে আমাদের সৌরমণ্ডলের সূর্যের থেকেও অনেক বৃহৎ আকারের নক্ষত্র এই মহাবিশ্বে রয়েছে কোনো না কোনো ছায়াপথে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব ।। বিগ ব্যাং | সববাংলায়Cancel reply