ইতিহাস

হিবাকুজুমোকু

হিবাকুজুমোকু (Hibakujumoku) একটি জাপানী শব্দ। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট এবং ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকি শহরদুটিতে পরমাণু বিস্ফোরণের পরেও যে গাছগুলি বেঁচে যায় তাদের জাপানী ভাষায় হিবাকুজুমোকু বলা হয়। জাপানীতে ‘হিবাকু’ শব্দের অর্থ – ‘পরমাণু বোমা দ্বারা আক্রান্ত’ এবং ‘জুমোকু’ শব্দের অর্থ- ‘গাছ’।

হিরোশিমা এবং নাগাসাকি মিলিয়ে প্রায় ১৭০টি এরকম গাছ আছে যেগুলি পরমাণু বিস্ফোরণের তীব্র আঘাত সত্ত্বেও কোন না কোনভাবে বেঁচে গেছে। এই ১৭০টি গাছের প্রতিটির গায়ে একটি করে হলুদ কার্ড আটকানো থাকে যাতে লেখা আছে- আমি একজন হিবাকুজুমোকু।

১৯৪৫ সালে ৬ আগস্ট সকাল ৮.১৫ মিনিটে হিরোশিমার ওপর আমেরিকা ‘লিটল বয়’ নামক পরমাণু বোমাটি ফেলার ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যে সেটি বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের ঠিক এক সেকেন্ডের মধ্যে ২৮০ মিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে একটি আগুনের গোলা ছড়িয়ে পড়ে যার কেন্দ্রমন্ডলের তাপমাত্রা ছিল দশ লক্ষ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। ওই প্রবল বিস্ফোরণের ফলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় তিন হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায় যা লোহার গলনাঙ্কের দ্বিগুণ। পরিবেশের এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে চারপাশের বায়ু প্রবল প্রসারিত হয়ে পড়ে যার থেকে তীব্র বিস্ফোরণ সৃষ্টি হয় যা শব্দের থেকেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর সাথে সাথে বিস্ফোরণের ঠিক পরেই হঠাৎ পরিবেশে বায়ু চাপ অস্বাভাবিক কমে যায় তৈরি হয়’ব্যাক ড্রাফট'(Back draft) যার ফলে চোখ থেকে অক্ষিগোলক(eye ball) ঠিকরে বেরিয়ে আসে।

এই পরমাণু বিস্ফোরণে বিকিরিত রশ্মির নব্বই শতাংশ ছিল গামা রশ্মি আর দশ শতাংশ নিউট্রন তরঙ্গ। বিস্ফোরণের দুদিন পর ম্যানহাটন প্রকল্পের চিকিৎসক হ্যারল্ড জ্যাকবসন ঘোষণা করেন আগামী ৭০ বছর হিরোশিমাতে কোন উদ্ভিদ জন্মাবে না। সবুজের লেশ পর্যন্ত থাকবে না হিরোশিমাতে, মাটি এখানকার এতই তেজস্ক্রিয় হয়ে আছে।

জ্যাকবসনের এই বক্তব্যের ঠিক একমাসের মধ্যে বিস্ফোরণ স্থলের এক কিলোমিটারের মধ্যে যেখানে অবস্থিত সবকিছু বিস্ফোরণের সাথে সাথে ধ্বংস হয়ে গেছিল ঠিক সেখানেই দেখা যায় একটি লাল ক্যানা ইন্ডিকা(Canna Indica) ফুলের চারা মাটি ভেদ করে জন্ম নিয়েছে।

এর কিছুদিন পরেই ভয়ংকর মাকুরাজকি টাইফুনে আবার তছনছ হয়ে গেল হিরোশিমা। দুহাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারালেন এই ঝড়ের তান্ডবে। কিন্তু এই ঝড় যেমন প্রাণ নিল তেমনি প্রাণ দানও করে গেল ধ্বংসের বেশে তা বুঝল হিরোশিমাবাসী যখন কিছুদিনের মধ্যেই হিরোশিমা জুড়ে ধীরে ধীরে সবুজ জন্ম নিতে শুরু করল। ঝড় বৃষ্টির প্রবল দাপটে হিরোশিমার তপ্ত মাটি থেকে সমস্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থ ধুয়ে গিয়ে মাটিকে প্রাণ ধরণের উপযোগী করে তোলে।

এই ঝড় হিরোশিমায় প্রাণ ধরণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করল ঠিকই কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয় এইরকম তেজস্ক্রিয়তাপূর্ণ মাটিতে উদ্ভিদ জন্ম নেওয়ার।

বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন বিস্ফোরণস্থল থেকে মাত্র ৬৫০ গজ দূরত্বে ওই প্রবল বিধ্বংসী তাপ ও চাপ সহ্য করে, পুড়ে ঝলসে গিয়েও বেঁচে গিয়েছে বেশ কিছু গাছ। এই বেঁচে যাওয়া গাছগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- জিংকো, রক্তকরবী, ক্যানা, কর্পূর, ব্ল্যাক লোকাস্ট ইত্যাদি। আমেরিকান বিজ্ঞানীর করা ভবিষ্যৎবাণীকে মিথ্যে প্রমাণিত করে বেঁচে যাওয়া এই গাছগুলি হিরোশিমাবাসীর কাছে আশা ভরসার প্রতীক হয়ে উঠল। তাঁরা বিশ্বাস করতে শুরু করলেন এই মাটিতে এখনো প্রাণ ধারণ সম্ভব। রক্তকরবী(Oleander) ফুলকে হিরোশিমার জাতীয় ফুল এবং কর্পূর(Camphor) গাছকে জাতীয় বৃক্ষের মর্যাদা দেওয়া হল।

হিরোশিমা মরুভূমি হয়ে যায়নি দেখে জাপানের অন্যান্য রাজ্য বিপুল পরিমাণে গাছের চারা পাঠালো হিরোশিমাতে। ক্রমেই হিরোশিমা সবুজ হয়ে উঠতে শুরু করল।

পরমাণু বিস্ফোরণেও কিছু গাছের বেঁচে যাওয়ার রহস্য উদঘাটন করতে জাপানের বিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করলেন। তাঁরা দেখলেন মানুষের থেকে উদ্ভিদ তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রতি বেশি সহনশীল হয় সাধারণত। মানুষ যেখানে ৭ Gy (Gy- হল কোন মানুষ বা প্রাণীর ওপর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মাপবার একক) এর বেশী বিকিরণ সহ্য করতে পারেনা, একটি পপলার গাছ সেখানে ৫০ Gy এর বেশী বিকিরণ সহ্য করতে পারে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন জাপানে যেসমস্ত গাছ পরমাণু বিস্ফোরণ প্রতিহত করে বেঁচে গেছে তাদের মধ্যে জিংকো (Gingko ) গাছই বেশী। বিস্ফোরণের প্রবল তাপে জিংকো গাছের ছাল সহ বাইরের অংশ পুড়ে ঝলসে নষ্ট হয়ে গেলেও মাটির নীচে থাকা মূলের কিছু অংশ কিন্তু অক্ষত থেকে গেছে। জিংকো গাছ মাটির গভীরে উদ্ভিদ কোষের সমন্বয়ে এমন একটি জটিল গঠন তৈরি করে যা পরমাণু বিস্ফোরনেও নষ্ট হয়না। তাই বাইরে থেকে পাতাহীন ডালহীন দগ্ধ গাছ দেখালেও ভিতরে ভিতরে কিন্তু সজীব উদ্ভিদের সমস্ত লক্ষণ মজুত থাকে জিংকোর। বসন্ত এলেই জিংকো আবার স্বমহিমায় ফিরে আসতে থাকে।

জাপানে এই ১৭০টি হিবাকুজোমুকোর প্রত্যেকটির আলাদা নাম আছে। এই গাছগুলি জাপানীদের কাছে অপরিসীম শ্রদ্ধা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক।

১৯৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা প্রাপ্তির দুশো বছর উপলক্ষ্যে জাপান সরকারের পক্ষ থেকে বনসাই বিশেষজ্ঞ মাসারু ইয়ামাকি আমেরিকাকে ৫৩টি প্রজাতির বনসাই গাছ শান্তির প্রতীক হিসেবে উপহার দিয়েছিলেন। এর বেশ কিছু বছর পর আমেরিকা জানতে পারে এই ৫৩টি বনসাইয়ের প্রতিটি ছিল আমেরিকারই ফেলা পরমাণু বোমায় বেঁচে যাওয়া হিবাকুজোমুকোর অংশ যার মধ্যে ৩৯০ বছর প্রাচীন একটি বনসাইও ছিল।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।