গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (Gayatri Chakravorty Spivak) একজন বিখ্যাত ভারতীয় সাহিত্য-তাত্ত্বিক এবং নারীবাদী সাহিত্য সমালোচক । উত্তর-ঔপনিবেশিকতাবাদের আলোকে বাংলা সাহিত্যকে নতুনভাবে পড়ে দেখার ধারা তৈরি করেছেন তিনি। ভারত তথা সমগ্র বিশ্বের উত্তর-ঔপনিবেশিক বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক অন্যতম। ‘ক্যান দ্য সাব-অল্টার্ন স্পিক’ কিংবা জাঁক দেরিদার লেখা ‘অফ গ্রামাটোলজি’র ইংরেজি অনুবাদের জন্য সাহিত্য-তাত্ত্বিকদের মধ্যে তিনি বিখ্যাত। তাঁর এই দুটি কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বহু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানীয় ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেছে। মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব এবং বিনির্মাণের নতুন ভাবনার জগতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর কয়েকটি উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদও করেছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক।
১৯৪২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম পরেশচন্দ্র চক্রবর্তী এবং তাঁর মায়ের নাম শিবানী চক্রবর্তী। তাঁর বাবা পেশায় একজন ডাক্তার ছিলেন এবং তাঁর মা ছিলেন সমাজকর্মী। পরবর্তীকালে ১৯৬৪ সালে ট্যালবট স্পিভাকের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়, যদিও ১৯৭৭ সালেই তাঁর সঙ্গে গায়ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটে। এরপরে পুনরায় তিনি বিবাহ করেন বাসুদেব চ্যাটার্জীকে। বর্তমানে তাঁদের কোনও সন্তানাদি নেই।
কৈশোরে কলকাতার সেন্ট জনস্ ডায়োসেশন গার্লস হাই স্কুলে পড়াশোনা করার পর ১৯৫৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম বিভাগে স্নাতক উত্তীর্ণ হন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক । এরপরে ১৯৬১ সালে নিউ ইয়র্কের ইথাকাতে কর্ণওয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে স্নাতক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। সেই সময় প্রভূত ঋণ নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬২ সালে ইংরেজি পড়ার খরচ জোগাতে না পেরে তিনি তুলনামূলক সাহিত্য পড়তে শুরু করেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ডিরেক্টর পল ডি মানের তত্ত্বাবধানে তুলনামূলক সাহিত্য পড়তে থাকেন গায়ত্রী। কিন্তু তখনও ফরাসি বা জার্মান ভাষা সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞানও তাঁর ছিল না। পল ডি মান নিজেও একজন বিখ্যাত সাহিত্য তাত্ত্বিক ছিলেন। তাঁরই তত্ত্বাবধানে স্নাতক স্তরে একটি গবেষণা পত্র প্রস্তুত করেছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যার বিষয় ছিল ডব্লিউ. বি. ইয়েটস-কে ঘিরে। সেই গবেষণা পত্রটির শিরোনাম ছিল ‘মাইসেল্ফ মাস্ট আই রিমেক : দ্য লাইফ অ্যান্ড পোয়েট্রি অফ ডব্লিউ. বি. ইয়েটস’। ১৯৬২ সালে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর স্তরে আরেক বিখ্যাত সাহিত্য-তাত্ত্বিক এম. এইচ. আব্রামসের তত্ত্বাবধানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় সারল্যের প্রতীতি বিষয়ে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক আরেকটি বিখ্যাত গবেষণা পত্র প্রস্তুত করেন।
১৯৫৯ সালে স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই প্রথমে ১৯৬৩ সালে সপ্তাহে চল্লিশ ঘন্টা ইংরাজি পড়ানোর জন্য চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত হন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক । তারপর ১৯৬৩ সালে কেমব্রিজের গার্টন কলেজে অধ্যাপক টি. আর. হেনের তত্ত্বাবধানে গবেষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৬৩ সালেই আয়ারল্যান্ডের স্লিগো সামার স্কুলে একটি গ্রীষ্মকালীন কোর্সে তিনি ইয়েটসের কবিতায় মৃত্যুভাবনা বিষয়ে পড়িয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালের শেষ দিকে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত হন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি এখানেই অধ্যাপনা করেছিলেন। তিনি তখনও পর্যন্ত কোনও গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেননি, কিন্তু পরবর্তীকালে ইয়েটসের উপর একটি সমালোচনামূলক বই লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি যা স্নাতক স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের উপযোগী হবে। ১৯৬৭ সালে সাধারণ কৌতুহলবশত ‘অফ গ্রামাটোলজি’ নামে একটি বই কেনেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। সেই বইয়ের লেখকের নামও সেদিন তাঁর কাছে অচেনা ছিল। জাঁক দেরিদার লেখা সেই বইটি তিনি অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং একটি দীর্ঘ অনুবাদকের ভূমিকা লিখেছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। ক্রমেই তাঁর সেই অনুবাদের ভূমিকাটি সমগ্র পৃথিবী জুড়ে বিনির্মাণের দার্শনিক প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৭১ সালে জাঁক দেরিদার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ ঘটে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের। ১৯৭৪ সালে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অনুবাদের পাঠক্রমে এমএফএ নামে একটি নতুন পাঠ্যক্রম চালু করেন তিনি। এর পরের বছরই তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের ‘ডিরেক্টর অফ দ্য প্রোগ্রাম’ পদে অধিষ্ঠিত হন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। সেই সময় থেকেই পূর্ণ সময়ের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত হন তিনি। ১৯৭৮ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি জাতীয় মানবিকী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। এছাড়াও বহু জায়গায় অতিথি অধ্যাপক বা লেকচারার পদেও কাজ করেছেন গায়ত্রী। ১৯৭৮ সালেই অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি এবং তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৮২ সালে এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের লংস্ট্রিট অধ্যাপক হিসেবে তাঁকে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৮৬-তে পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রথম ইংরেজি বিভাগের মেলোন অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত হন। এখানে গায়ত্রীই প্রথম কালচারাল স্টাডিজ নামে নতুন একটি পাঠক্রম চালু করেন। ১৯৯১ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যার ‘অ্যাভালন ফাউন্ডেশন অধ্যাপক’ হিসেবে নিযুক্ত হন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। এখানেই ২০০৭ সালে মানবীবিদ্যার বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক পদে উন্নীত হন তিনি। ১৯৮৬ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের সীমান্তে ভূমিহীন নিরক্ষরদের শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত ছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। ১৯৯৭ সালে এই কাজের জন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘পরেশচন্দ্র অ্যান্ড শিবানী চক্রবর্তী মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন ফর রুরাল এডুকেশন’। বহু বিদ্যায়তনিক জার্নালের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন গায়ত্রী। সেই সব জার্নালগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘জানুস আনবাউন্ড : জার্নাল অফ ক্রিটিক্যাল স্টাডিজ’, ‘ডিফারেন্সেস, সাইন্স : জার্নাল অফ ওমেন ইন কালচার অ্যান্ড সোসাইটি’, ‘ইন্টারভেনশনস : ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ পোস্ট-কলোনিয়াল স্টাডিজ’, ‘ডায়াস্পোরা : এ জার্নাল অফ ট্রান্সন্যাশনাল স্টাডিজ’ ইত্যাদি। ১৯৯৩ সালে ‘ইমাজিনারি ম্যাপস’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয় যেখানে মহাশ্বেতা দেবীর তিনটি গল্পের ইংরেজি অনুবাদ সংকলিত ছিল। তাছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর ‘স্তন্যদায়িনী ও অন্যান্য গল্প’, ‘চোট্টি মুন্ডার তীর ও অন্যান্য’, ‘সাঁঝ সকালের মা’ ইত্যাদি গল্পগুলিও অনুবাদ করেছিলেন গায়ত্রী স্পিভাক।
দেরিদার পাশাপাশি বাঙালি সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী এবং অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত কবি রামপ্রসাদ সেনের সাহিত্যও ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বই ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ বিশ্বে তাঁর খ্যাতির মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। আন্তোনিও গ্রামশির উদ্ভূত শব্দবন্ধ নিম্নবর্গ বা সাবঅল্টার্ন-এর প্রয়োগ করে গায়ত্রী তাঁর এই প্রবন্ধে বিনির্মাণের এক দার্শনিক প্রতর্ক গড়ে তুলেছেন। ১৯৮০ সালের শুরুর সময় থেকেই উত্তর-ঔপনিবেশিকতাবাদের একজন অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করেন গায়ত্রী এবং ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘ক্রিটিক অফ পোস্ট-কলোনিয়াল রিজন : টুওয়ার্ডস এ হিস্ট্রি অফ দ্য ভ্যানিশিং প্রেজেন্ট’ বইতে তাঁর এই মনোভাব ও প্রজ্ঞার প্রতিফলন ঘটেছে।
গায়ত্রীর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজগুলির মধ্যে রয়েছে ‘ইন আদার ওয়ার্ল্ডস’ (১৯৮৭), ‘আউটসাইড ইন দ্য টিচিং মেশিন’ (১৯৯৩), ‘ডেথ অফ এ ডিসিপ্লিন’ (২০০৩), ‘আদার এশিয়াস’ (২০০৮) এবং ‘অ্যান এস্থেটিক এডুকেশন ইন দ্য এজ অফ গ্লোবালাইজেশন’ (২০১২)।
১৯৯৭ সালে ইংরেজিতে অনুবাদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান তিনি। মোট এগারোটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানীয় ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়, ওবার্লিন কলেজ, ইউনিভার্সিটাট রোভিরা ভার্জিলি, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিডাড নাসিওনাল ডি সান মার্টিন, সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, ঘানা-লেগন বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সম্মানীয় ডক্টরেট উপাধি প্রদান করা হয়। ২০১২ সালে শিল্পকলা ও দর্শন বিষয়ে একমাত্র ভারতীয় হিসেবে কিয়োটো পুরস্কার অর্জন করেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক । ২০১৩ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মভূষণ’-এ সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ২০১৮ সালে ‘মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাসোসিয়েশন অফ আমেরিকা’ তাঁকে ‘লাইফটাইম স্কলারলি অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করে। ওবেরলিন কলেজে তাঁকে গুগেনহেইম সদস্যপদে অভিষিক্ত করা হয় এবং ২০০৭ সালের মার্চ মাসে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি লি বোলিংগার তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করেন।
২০২১ সালে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক ব্রিটিশ অ্যাকাডেমির করেসপন্ডিং সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to আজকের দিনে ।। ২৪ ফেব্রুয়ারি | সববাংলায়Cancel reply