বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশিরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল গাজীপুর জেলা (Gazipur)।
কাঁঠাল আর পেয়ারার জন্য বিখ্যাত গাজীপুর জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ গাজীপুর জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়৷ গাজীপুরের পাতলা চিঁড়ে ‘ধনীর চিঁড়ে’ নামে সমগ্র বাংলাদেশে পরিচিত।
বাংলাদেশের একটি অন্যতম জেলা হল গাজীপুর জেলা৷ উত্তরে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ জেলা, পূর্বে কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা, দক্ষিণে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এবং পশ্চিমে ঢাকা ও টাঙ্গাইল জেলা ঘিরে রয়েছে সমগ্র জেলাটিকে। বাংলাদেশের বুকের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে অজস্র নদী যা সমৃদ্ধ করেছে এখানকার ভূপ্রকৃতি ও মানুষকে৷ গাজীপুর জেলার প্রধান প্রধান নদীগুলি হল পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বংশী, বালু, বানার, গারগারা, চিলাই প্রভৃতি। নদীর পাশাপাশি এখানে বেশ কিছু বিল দেখা যায় যেমন ডাকুরাই বিল, বেলাই বিল, মকেশ্বর বিল, লবলং বিল উল্লেখযোগ্য। এই জেলার অনেকটা অংশ জুড়ে দেখা যায় শালবন৷ শালবনকে কেন্দ্র করে এখানকার মানুষের জীবিকাসংস্থান ঘটে৷ শালগাছের কাঠ দিয়ে বাড়িঘর নির্মাণ, নৌকা ও রেলের স্লিপার তৈরি, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি এবং অন্যান্য নির্মাণকাজে শাল গাছের কাঠ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। শালগাছের মোটা কাণ্ড থেকে একধরনের সুগন্ধি আঠা তৈরি হয় যেগুলি ‘শাল দামার’, ‘রাল’ অথবা ‘ধুম’ নামে পরিচিত। এই আঠা নৌকার ছিদ্র বন্ধ করতে, কার্বন পেপার, টাইপরাইটারের ফিতে, বার্নিশ এবং রং তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
আয়তনের বিচারে গাজীপুর জেলা সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় ১৭৭০.৫৪ বর্গ কিলোমিটার স্থান জুড়ে অবস্থান করছে৷ ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে গাজীপুর জেলা সমগ্র বাংলাদেশে সপ্তম জনবহুল জেলা।
গাজীপুর জেলার নামকরণ সম্পর্কে বিলু কবীরের লেখা ‘বাংলাদেশর জেলা নামকরণের ইতিহাস’ বই থেকে জানা যায় মহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনকালে জনৈক মুসলিম কুস্তিগির গাজী নামক এক ব্যক্তি এই অঞ্চলে বসবাস করতেন৷ অনেকেই মনে করেন, সেই গাজী পালোয়ানের নামানুসারেই এই অঞ্চলের নাম গাজীপুর হয়েছে। আরেকটি মতামত অনুসারে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে চবি্বশ পরগণার জায়াগিরদার ছিলেন ঈশা খাঁ। তাঁর প্রধান অনুসারীর ছেলে ফজল গাজীর নাম থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয় গাজীপুর।
গাজীপুর নাম হওয়ার আগে এই অঞ্চলের নাম ছিল জয়দেবপুর। আরো আগে এই জয়দেবপুর ভাওয়াল নামে পরিচিত ছিল আর সেখানকার জমিদার ছিলেন জয়দেব নারায়ণ রায়চৌধুরী। তিনি এই অঞ্চলে বসবাস করার জন্য চিলাই নদীর দক্ষিণ পাড়ে একটি গৃহ নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময়ে জমিদারের নামের সঙ্গে মিল রেখে এই অঞ্চলটির নাম হয় ‘জয়দেবপুর’। মহকুমা হওয়ার আগে পর্যন্ত এই নামটিই প্রচলিত ছিল। মহাভারতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের যে বর্ণনা আছে সেখানে ভবপাল নামক রাজ্যের উল্লেখ আছে। কারো কারো মতে, ‘ভাওয়াল’ নামের উৎপত্তি ‘ভবপাল’ থেকেই এসেছে। প্রাচীনকালের জয়দেবপুরে অবস্থিত ‘সাকাশ্বর স্তম্ভ’ প্রমাণ করে দেয় এই জনপদ একসময়ে মৌর্য সম্রাট অশোকের শাসনাধীন ছিল। গাজীপুর জেলার ক্ষুদ্র জনপদগুলির মধ্যে ডবাক, ডাকুরাই, সাকেশ্বর প্রভৃতি স্থান পাল, দাস, চেদী ও চণ্ডালের দ্বারা শাসিত হতো। পরবর্তীকালে জনপদগুলো ‘ভাহওয়াল’ কিংবা ‘ভাডয়াল’ নামে সুবৃহৎ পরগণায় পরিণত হয়। ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থেই প্রথম এই অঞ্চলের ভাওয়াল নামের উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য আছে পরবর্তী সময়ে ইখতিয়ার উদ্দীন বখতিয়ার খিলজী সেনবংশীয় রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে নাটকীয়ভাবেই বাংলাদেশ দখল করেন আর সেই সময় থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম শক্তির উত্থান ঘটে। এখানে ভাহওয়াল (ভাওয়াল) গাজীও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন আর এই ‘ভাহওয়াল’ থেকে ধীরে ধীরে ‘ভাওয়াল’ নামের উৎপত্তি ঘটে। শেরশাহের সময়কালে ঢাকার উত্তরদিকে অবস্থিত চেদী রাজ্যগুলোতে ভাহওয়াল গাজী জমিদারি লাভ করেন। মনোএল দ্য আসুম্পসাঁও নামের এক পর্তুগীজ পাদ্রি এই গাজীপুরেই বসে ১৭৩৩ সালে লিখে ফেলেন বাংলা ভাষার প্রথম অভিধান ও ব্যাকরণ গ্রন্থ ‘বাংলা পর্তুগীজ শব্দকোষ’। প্রথম বাংলা ভাষায় মুদ্রিত যে গদ্যের বই ‘ব্রাহ্মণ রোম্যান ক্যাথলিক সংবাদ’ তাও লেখা হয়েছে এই জেলাতেই।
গাজীপুর জেলায় ‘বাংলা’ ভাষার ব্যবহার প্রচলিত হলেও এই জেলার একটি নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে৷ বলা হয় কথ্য বাংলা গদ্যের জন্মস্থান ভাওয়াল বা গাজীপুর। প্রাচীনকালে চীনা পরিব্রাজকেরা যখন বাংলাদেশ ভ্রমণ করতে আসতেন তখন সারা বাংলায় আর্য ভাষার প্রচলন হয়। ভাওয়ালেও তথা গাজীপুর জেলাতেও তখন আর্য ভাষা প্রচলিত হয়েছিল।
গাজীপুর জেলায় ৫টি উপজেলা রয়েছে। যথা- শ্রীপুর উপজেলা, কালিয়াকৈর উপজেলা, কালীগঞ্জ উপজেলা, কাপাসিয়া উপজেলা এবং গাজীপুর সদর উপজেলা।
চাষবাসের দিক থেকে গাজীপুর জেলা যথেষ্ট উন্নত৷ এখানে মরসুমে ধান, গম, আলু, চিনাবাদাম, তৈলবীজ, বেগুন, শীম, মটরশুঁটির পাশাপাশি আম, লিচু, কলা, পেয়ারা, নারকেল, পেঁপে, তরমুজ প্রভৃতি ফলের চাষ করা হয়ে থাকে।
গাজীপুর জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণস্থানের তালিকা অপূর্ণই থেকে যাবে যদি তালিকার শুরুতেই ভাওয়াল রাজবাড়ির নাম না থাকে। ভাওয়াল রাজবাড়ি ছাড়াও বিখ্যাত ভ্রমণস্থানের মধ্যে পড়ে বলধার জমিদারবাড়ি, প্রাচীন রাজধানী ইন্দ্রাকপুর, বলিয়াদী জমিদারবাড়ি, কাশিমপুর জমিদারবাড়ি, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, নুহাস পল্লী, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, মনপুড়া পার্ক, সেন্ট নিকোলাস চার্চ, বড় ভূঁইয়া বাড়ি ইত্যাদি। গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরে অবস্থিত ভাওয়াল রাজ শ্মশানেশ্বরী সমাধিসৌধটি স্থাপন করা হয়েছিল জমিদার পরিবারের সদস্যদের শবদাহ সৎকারের উদ্দেশ্যে। পরিবারের মৃত সদস্যদের নামে নামফলক ও সৌধ ছাড়াও শ্মশান চত্বরে মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ছয় স্তম্ভবিশিষ্ট একটি শিবমন্দির রয়েছে যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন ধরা পড়েছে বেলাই বিলে৷ বর্ষাকালে এই বিলের সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয়ে যায়৷ শাপলা ও শালুকময় এই বিলে মনোহর নৌকাবিহার এখানকার মূল আকর্ষণ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও সরকার-স্বীকৃত একমাত্র জাতীয় উদ্যান ভাওয়ালগড় ও এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় সাফারি পার্ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক গাজীপুরেই অবস্থিত। বাংলাদেশের একমাত্র অস্ত্র কারখানাও গাজীপুরে অবস্থিত। বাংলাদেশের ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার রয়েছে যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ‘কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার’ গাজীপুরে অবস্থিত। এছাড়া এখানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ ধান ও তুলা গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশের একমাত্র টাঁকশাল বা টাকা তৈরির কারখানা অবস্থিত।
গাজীপুর জেলা বেশ কিছু প্রখ্যাত ব্যক্তির জন্মস্থান। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের ভূমিকা পালনকারী মরহুম শামসুল হক, শহীদ আরজ উদ্দিন, গাজী গোলাম মোস্তফা মরহুম হাবিবুল্লাহ, শহীদ হুরমত আলী, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার প্রমুখ। বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ড. এখলান উদ্দিন এবং বিজ্ঞানী ও গবেষক অধ্যাপক ড. অজিত কুমার সাহার জন্মও বাংলাদেশের গাজীপুরে৷
গাজীপুর জেলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ হল ভাওয়াল সঙ্গীত। তার পাশাপাশি পালাগান, জারী, সারি, ভাটিয়ালি গানও জায়গা করে নিয়েছে৷ বাংলার সুলতান সিকান্দর শাহের প্রথম পুত্র গাজীর জীবন কাহিনী নিয়ে রচিত ‘গাজীর গীত’ এই জেলার সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ। এছাড়া ধান কাটার উদ্দেশ্যে গাওয়া গীত এবং নানা আনুষ্ঠানিক গীতের ভূমিকাও উল্লেখ। গাজীপুর জেলায় ঘরে ঘরে কুটির শিল্প বিস্তার লাভ করেছে। অলংকার শিল্প, কাঁথা শিল্প, আসন শিল্প, পাখা শিল্প, কাঠ শিল্প, মাদুর শিল্প, ধুপ শিল্প, খেজুর পাতার পাটি শিল্প ইত্যাদি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। গাজীপুরের ধনীর চিড়া তো সমগ্র বাংলাদেশে খুবই বিখ্যাত। শোনা যায় কালিয়াকৈরের ধনীর রানীর তৈরি এই চিঁড়ে ইংল্যাণ্ডের রানির জন্মদিনে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। গাজীপুরের কাপাসিয়া তিতবাটির কাপাস তুলো দিয়ে একসময় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মসলিন কাপড় তৈরি হত।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to ময়মনসিংহ জেলা | সববাংলায়Cancel reply