সববাংলায়

হরি ঘোষের গোয়াল

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “হরি ঘোষের গোয়াল”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: অলস ও নিষ্কর্মা লোকজনের কোলাহলপূর্ণ আড্ডা। এই প্রবাদের উৎস নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। একটি মত অনুসারে হরি ঘোষের গোয়াল প্রবাদের উৎপত্তির সঙ্গে নদীয়ার হরি ঘোষের গোশালায় রঘুনাথ শিরোমনির চতুষ্পাঠীর সংযোগ রয়েছে। আবার অন্য মতানুসারে, কলকাতার দানবীর হরি ঘোষের সম্পর্ক রয়েছে। এখানে আমরা সেই দুটি মত নিয়েই আলোচনা করব।

১৪৭২ খ্রিস্টাব্দে শ্রীহট্টের ইটার পঞ্চখণ্ডে মতান্তরে নদীয়ার নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত ন্যায়শাস্ত্রবিদ পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি। কাণভট্ট শিরোমণি এবং তার্কিক চূড়ামণি ভট্টাচার্য নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গে নবদ্বীপে শিক্ষা গ্রহণকালে তিনি অনেক যুক্তি ও মতামত আদান-প্রদান করেছেন বলে কথিত আছে। নবদ্বীপের তুখোড় পণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌমের ছাত্র ছিলেন এই রঘুনাথ শিরোমণি।

নবদ্বীপের টোলের পাঠ শেষ করে রঘুনাথ মিথিলায় অধ্যাপক পণ্ডিত পক্ষধর মিশ্রের কাছে ন্যায়শাস্ত্র (তর্কশাস্ত্র) অধ্যয়ন করেন। সেখানে তর্কবিদ্যায় পণ্ডিত হয়ে গুরু পক্ষধরকে বিতর্কে পরাজিত করে শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতের খ্যাতি লাভ করেন এবং শিরোমণি উপাধি পান। নবদ্বীপ থেকে ন্যায়শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি প্রদানের অধিকার লাভ করে বাংলার জন্য প্রভূত গৌরব বয়ে আনেন রঘুনাথ শিরোমণি। এর আগে নবদ্বীপের পণ্ডিতরা ন্যায়শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি দেবার অধিকারী ছিলেন না। স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনাথ সর্বত্র তর্কযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে প্রাচীন শাস্ত্র যুগোপযোগী করায় মনোযোগ দেন। এ কারণে তিনি নবন্যায়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পণ্ডিত সমাজে সুখ্যাত।

নারায়ণ সান্যালের রূপমঞ্জরী থেকে জানা যে, আনুমানিক ১৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে রঘুনাথ শিরোমণির জন্ম। ১৪৮০-৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পক্ষধরের সাথে ন্যায়শাস্ত্র বিষয়ে যখন রঘুনাথের বিতর্ক হয় তখন তিনি তরুণ ।

পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি সম্পর্কে অনেক উপকথা প্রচলিত হলেও একথা জানা যায় যে, তিনি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন এবং কমপক্ষে ৩৮টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। মিথিলার পাঠ শেষ করে নবদ্বীপে রঘুনাথ ফিরে সেখানে উন্নতমানের টোল খোলার বন্দোবস্ত করেছিলেন। কিন্তু অর্থের অভাব, উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকের অভাব এবং পণ্ডিত সমাজের বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। সেই সময় নবদ্বীপে বাস করতেন হরি ঘোষ নামে এক ধনী গোয়ালা। গরু রাখার জন্য তাঁর বিশাল এক গোয়ালঘর বা গোশালা ছিল। রঘুনাথের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য মুগ্ধ করেছিল হরি ঘোষকে। অবশেষে টোল খোলার জন্য হরি ঘোষের গোয়ালঘরে স্থান পেলেন রঘুনাথ। নবদ্বীপে এই শ্রেষ্ঠ টোল বা চতুষ্পাঠী অচিরেই বিদ্যার্থী ছাত্রদের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে। এই কারণে প্রবাদে পরিণত হল হরি ঘোষের গোয়াল বা হরের গোয়াল নামটি।

এই প্রবাদের পিছনে ঐ সময়ে নবদ্বীপের তথাকথিত উন্নত পণ্ডিত এবং অভিজাতদের কাছে রঘুনাথ এবং হরি ঘোষ হয়ত কিছুটা তাচ্ছিল্যের শিকার ছিলেন। এই প্রবাদের মাধ্যমে তৎকালীন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আভাস পাওয়া যায়। মনে হয় অন্যান্য টোলের পণ্ডিত ও শাস্ত্র-ব্যবসায়ীদের মতো কঠোর না হওয়ায় সাধারণ ঘরের সন্তানদের শিক্ষার স্থান হয়েছিল রঘুনাথের টোলে। আর এই টোল হরি ঘোষের দেওয়া আশ্রয়ে হওয়ায় তা গোয়ালঘর হোক বা না হোক তা হরি ঘোষের হিসেবে আখ্যাত হয়েছিল উন্নাসিক এবং ধর্ম-ব্যবসায়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দ্বারা।

দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন – “মিথিলায় তিনি তাঁহার গুরু বাসুদেবের ন্যায়-সম্বন্ধীয় অনেক পুস্তক কণ্ঠস্থ করিয়া ফেলিয়াছিলেন। যেহেতু মিথিলায় টোলের নিয়ম ছিল না যে, তথাকার পুঁথি কোনো বিদেশী ছাত্র নকল করিয়া স্বদেশে লইয়া যায়। যে করিয়াই হউক রঘুনাথ যেদিন নবদ্বীপে হরি ঘোষের বাড়িতে টোল খুলিলেন, সেই দিন হইতে মিথিলার সূর্য অস্তমিত হইল; নবদ্বীপে টোলে পাঞ্জাব, কনোজ, মদ্র ও তামিল দেশের ছাত্রেরা পড়িতে আসিতে লাগিল। হরি ঘোষ গয়লা ছিলেন — সেই টোলগৃহ অল্পদিনের মধ্যে শত শত ছাত্রের গুঞ্জরণে এরূপ কোলাহলময় হইয়া উঠিল এবং ন্যায়ের পরিভাষা-দুর্বোধ তর্কযুদ্ধে এবংবিধ মুখরিত হইতে লাগিল যে, লোকে সেই টোলের নাম দিল — হরের গোয়াল।’

অন্য একটি মতানুসারে, বাস্তবিক অর্থে এটি গোয়ালঘর নয়। কলকাতায় হরি ঘোষের একটি বড় বৈঠকখানা ছিল। অনেক নিষ্কর্মা লোক সারাদিন সেখানে আড্ডা দিত। তাদের খাবারের চিন্তা ছিল না; হরি ঘোষের অবারিত দ্বার; ভোজনাগারে যে যখন যেত, তখনই সে খেতে পেত। এই জন্য যেখানে অনেক নিষ্কর্মা লোক এক সাথে বসে কোলাহল করে বা আড্ডা দেয়, সেখানে এই প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়। কলকাতায় হরি ঘোষ স্ট্রিটে এই হরি ঘোষের বাড়ি ছিল।

সংসদ বাঙালি চরিতাভিধানেও এই মতের প্রমাণ পাওয়া যায়। এখানে বলা হয়েছে যে, হরি ঘোষ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুঙ্গের দুর্গের দেওয়ান ছিলেন। বাংলা ও ফারসি ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও তিনি পারদর্শী ছিলেন। দেওয়ানি থেকে অবসর নিয়ে কলকাতায় বাস করতেন। তিনি প্রচুর অর্থ দান করতেন সৎকাজে। উত্তর কলকাতায় তাঁর বাড়িতে বহু গরীব ছাত্র থাকা-খাওয়ার সুযোগ পেত। তাছাড়া তাঁর বৈঠকখানায় খোশগল্পের আসর বসত। শতশত নিষ্কর্মা লোকও সুযোগ বুঝে সেখানে আড্ডা দিত এবং খাওয়া-দাওয়ার কাজ সারত। তা থেকেই হরি ঘোষের গোয়াল – প্রবাদের উৎপত্তি।

ষোড়শ শতাব্দীর পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কথিত হরি ঘোষের সুস্পষ্ট পরিচিতি পাওয়া যায় না। কিন্তু পরবর্তীকালের অর্থাৎ আঠার-উনিশ শতকের কলকাতাবাসী হরি ঘোষের পরিচয় ঐতিহাসিকভাবে পাওয়া যায়।

অনেকে এই দুই মত মিলিয়ে মনে করেন যে, হরি ঘোষের গোয়াল প্রবাদটি পঞ্চদশ শতাব্দীতে নদীয়ার হরি ঘোষের নামে প্রাথমিকভাবে প্রচলিত হয় এবং অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতার হরি ঘোষের নামে পরিপুষ্ট হয়।

‘হরি ঘোষের গোয়াল’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। বিধুবাবু দু’পয়সা আয়ের আশায় ছাত্রাবাস খুলেছিলেন, এখন সেটা হরি ঘোষের গোয়াল হয়ে গেছে।
২। বাবা-মা বাইরে গেলে ছেলেটা ঘরকে হরি ঘোষের গোয়াল বানিয়ে ফেলে!


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১৭০ পৃঃ
  2. https://www.anandabazar.com/
  3. https://www.ebanglalibrary.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading