ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উল্লেখযোগ্য সক্রিয় যোদ্ধা এবং উর্দু ভাষার একজন উল্লেখযোগ্য কবি হাসরাত মোহানী (Hasrat Mohani)। ভারতীয় বিপ্লববাদের ইতিহাসে বিখ্যাত শ্লোগান ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর প্রবক্তা ছিলেন তিনিই। ১৯২১ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আহমেদাবাদের সর্বভারতীয় সমাবেশে তিনিই প্রথম ভারতের সম্পূর্ণ স্বরাজ দাবি করেন। জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন হাসরাত মোহানী। ‘প্রগতিশীল লেখক সংঘ’-এর সক্রিয় সদস্য হলেও একটা সময় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ত্যাগ করেন তিনি। প্রথমে কংগ্রেসে এবং তারপর মুসলিম লীগে যোগদান করে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন হাসরাত মোহানী। অন্যদিকে উর্দু ভাষার একজন বিখ্যাত কবি হিসেবে তাঁর লেখা ‘শের-ই-কালাম-ই-গালিব’, ‘নুকাত-ই-সুখনান’ ইত্যাদি বইগুলি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি।
১৮৭৫ সালের ১ জানুয়ারি উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলার মোহন নামের এক ছোট্ট শহরে হাসরাত মোহানীর জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম সৈয়দ ফজল-উল-হাসান। হাসরাত মোহানী এই ছদ্মনামটি তিনি উর্দু কবিতা লেখার সময় ব্যবহার করতেন। তাঁর জন্মস্থান মোহনকে স্মরণে রেখেই এই নামকরণ নিয়েছিলেন তিনি। ইরানের নিসাপুর থেকে তাঁর পূর্বজরা এদেশে অভিবাসিত হয়ে আসেন।
কানপুরের নিকটবর্তী শহর ফতেহ্পুর হাশায় হাসরাত মোহানীর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছিল। তারপর মোহন শহরের একটি গভর্নমেন্ট মিডল স্কুলে ভর্তি হন তিনি। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাঁর উর্দু কবিতা লেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং ঠিক এই সময় থেকেই তিনি ফৈজল-উল-হাসান থেকে হাসরাত মোহানীর ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। তাঁর বিখ্যাত গজল ‘চুপকে চুপকে রাত দিন’ তিনি লিখেছিলেন স্কুলজীবনেই। এরপরে হাসরাত মোহানী ১৯০৩ সালে মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন। এই সময়ের আগে ব্রিটিশ-বিরোধী কথা বলার জন্য তাঁকে কলেজ থেকে তিনবার বহিষ্কার করা হয়েছিল। এই কলেজে তাঁর সহপাঠী ছিলেন মৌলানা মহম্মদ আলি জওহর এবং মৌলানা শওকত আলী। এই কলেজেই হাসরাত মোহানীর কবিতার শিক্ষক ছিলেন তস্লিম লাক্নোয়ি এবং নসিম দহ্লভি। স্কুলে পড়াকালীন তাঁর অসম্ভব মেধার পরিচয় পেয়ে আলিগড় কলেজের স্যার জিয়াউদ্দিন তাঁকে আলিগড়ের মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজে ভর্তি হতে বলেন। কলেজে পড়ার সময় হাসরাত মোহানী নিজের সম্পাদনায় লক্ষ্ণৌ থেকে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন ‘উর্দু-ই-মুয়ালা’ নামে এবং একইসঙ্গে কানপুর থেকে একটি সংবাদপত্রও প্রকাশ করতে থাকেন ‘মুস্তাকিল’ নামে।
পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি হাসরাত মোহানী ছিলেন একজন সক্রিয় জাতীয়তাবাদী এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী গোষ্ঠীকে প্রবলভাবে সমালোচনা করতেন তিনি। কোনো বাঁধাধরা চাকরি করতে পছন্দ করতেন না হাসরাত। তাঁর ইচ্ছে ছিল সাংবাদিকতা করার। ১৯০৩ সালে হাসরাত মোহানী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। তাঁর পত্রিকায় বহু ব্রিটিশ-বিরোধী লেখা প্রকাশ এবং ব্রিটিশ-বিরোধী মন্তব্য করার জন্য ১৯০৯ সালে কারারুদ্ধ হন তিনি। শাস্তিস্বরূপ নির্ধারিত জরিমানার টাকা দিতে না পারায় ব্রিটিশ সরকার তাঁর সংগ্রহের সমস্ত দুষ্প্রাপ্য বই বাজেয়াপ্ত করে নেয়। এরপরেও বহুবার নানা সময় কারারুদ্ধ হয়েছেন হাসরাত মোহানী। ভারতীয় ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ১৯২১ সালে আহ্মেদাবাদে জাতীয় কংগ্রেসের সর্বভারতীয় অধিবেশনে প্রথম পূর্ণ স্বরাজের কথা সোচ্চারে ঘোষণা করেন। ১৯২৫ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন হাসরাত মোহানী। তিনিই প্রথম কানপুরে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সেখানে লাল পতাকা উড্ডীন করেন। ১৯২৫ সালের ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। এই সম্মেলনের সভাপতির বক্তব্যে পার্টির সঙ্গে তাঁর যোগদানের কারণ এবং এই পার্টির লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যে, কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য গড়ে ওঠা এই কমিউনিস্ট দল সোভিয়েত বিপ্লবের মতো যেনতেন প্রকারেণ পূর্ণ স্বরাজ অর্জন করা, কৃষকদের স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করা, স্বরাজ আনার লক্ষ্যে কমিউনিজমের মতবাদ প্রচার করা ও মানুষজে এই মতবাদে বিশ্বাসী করে তোলা। এই বক্তব্যে তিনি এও উল্লেখ করেন যে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি কোনো বৈদেশিক সহায়তায় গড়ে ওঠেনি আর এই দল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে স্বাগত জানায়। কমিউনিস্ট পার্টি যে কোনোভাবেই ইসলামের বিরোধী নয় তা তিনি স্বীকার করেন। ফলে পূর্বতন জাতীয়তাবাদী মতবাদের বিশ্বাসকে ত্যাগ করে হাসরাত মোহানী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের পরে সমাজতান্ত্রিক মতবাদে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। এই পার্টিতে থাকাকালীন ‘উর্দু-ই-মুয়ালা’ পত্রিকায় সমাজতন্ত্রের উপর অনেকগুলি লেখা লিখেছিলেন হাসরাত মোহানী যাদের মধ্যে ‘সমাজতন্ত্র কী চায়?’, ‘রাশিয়ার নতুন প্রজন্মের উন্নতি’, ‘পণ্ডিত নেহেরু ও সমাজতন্ত্র’, ‘সমাজতন্ত্র ও মৌলানা আজাদ’ এবং ‘ইসলাম ও সমাজতন্ত্র’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের পরেও জাতীয় কংগ্রেসের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে মুসলিম লীগেও যোগ দেন হাসরাত মোহানী। তাঁর এই স্ববিরোধী কাজকর্মের জন্য কমিউনিস্ট পার্টি থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। এর পরে ১৯৩১ সালে তিনি নিজে গড়ে তোলেন ‘আজাদ পার্টি’। ১৯৩৬ সালে তিনি যোগ দেন লক্ষ্ণৌতে প্রগতিশীল লেখক সংঘে। ১৯৪৬ সালে লোকসভা নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে তিনি লীগের একজন সদস্যরূপে নির্বাচিত হন। কিন্তু সেই মুসলিম লীগেও মহম্মদ আলি জিন্নাহ্র দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পরিকল্পনাকে মান্যতা দিতে পারেননি হাসরাত মোহানী আর তাই মুসলিম লীগ থেকেও পদত্যাগ করেন তিনি। ভারতের সংবিধান রচনার সময় সেই সংবিধান কমিটির সদস্য ছিলেন হাসরাত মোহানী এবং সেই সুবাদেই সংবিধানের খসড়ায় তিনি স্বাক্ষর করতে চাননি। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল যে, এই সংবিধান সমাজের সুবিধেভোগী শ্রেণির কথা মাথায় রেখেই নির্মিত হয়েছে, এতে সমাজের সাধারণ মানুষের স্বার্থ বা অধিকারের কথা ভাবা হয়নি। সেইসঙ্গে এই সংবিধানে কোথাও সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়নি এই মর্মে তিনি এই খসড়ায় সম্মত ছিলেন না। দেশভাগের পরে ভারত যখন স্বাধীন হল, সেই সময় শুধুমাত্র ভারতীয় মুসলিমদের একটি পৃথক সংগঠনের ছাতার তলায় সংঘবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তিনি পাকিস্তানের বদলে ভারতেই থেকে যান। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কখনোই তিনি কোনো সরকারি অনুদান বা সরকারি আবাসনের সহায়তা গ্রহণ করেননি। তিনি আমৃত্যু মসজিদে থেকেছেন এবং সংসদে গিয়েছেন ভাড়া করা টাঙা গাড়িতে করে। একেবারে আন্তরিকভাবে তিনি একজন ধার্মিক মুসলমান ছিলেন যিনি আমৃত্যু খুব সরল সাদা-সিধে আড়ম্বরহীন জীবন-যাপন করতেন। এমনকি রেলের তৃতীয় শ্রেণির কামরাতেই তিনি সবসময় যাতায়াত করতেন।
হাসরাত মোহানী ছিলেন একাধারে একজন মুসলিম কমিউনিস্ট। হিন্দু ধর্মের কৃষ্ণের প্রতি খুবই ভক্তিমান ছিলেন তিনি। শোনা যায় জন্মাষ্টমী উদ্যাপনের সময় তিনি প্রায়ই মথুরায় যেতেন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য। আবার বহুবার তিনি হজ করতে মক্কায় গিয়েছেন। ফলে এই সব কর্মকাণ্ড তাঁকে ঐতিহাসিকভাবে এক স্ববিরোধী ব্যক্তিত্ব হিসেবেই গড়ে তুলেছে।
১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার সংগ্রহ ‘কুলিয়াত্-ই-হাসরাত মোহানী’। তারপর একে একে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর লেখা অন্যান্য উর্দু কাব্যগ্রন্থ ও গজলের বইগুলি। এছাড়াও গালিবের কবিতার ব্যাখ্যা করে তিনি লেখেন ‘শের-ই-কালাম-ই-গালিব’ এবং কবিতার মূলগত বিশ্লেষণ ও তাত্ত্বিক আলোচনা করে তিনি লেখেন ‘নুকত্-ই-সুখন্’। বিভিন্ন উর্দু কবিদের সম্পর্কে একটি বই লেখেন তিনি যার নাম ‘তাজ্কিরা-তুল-সুয়ারা’।
হাসরাত মোহানীর মৃত্যুর পরে ১৯৫১ সালে করাচিতে স্থাপিত হয় হাসরাত মোহানী মেমোরিয়াল সোসাইটি। কানপুরের চমনগঞ্জে তাঁর নামে একটি হাসপাতালের নামকরণ করা হয়েছে। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাস নামাঙ্কিত হয়েছে তাঁরই নামে।
১৯৫১ সালের ১৩ মে হাসরাত মোহানীর মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান