যুদ্ধের আবহে বিভিন্ন মিসাইল নিয়ে চর্চা হয়ে থাকে। বহুদূরে বসে থেকে শত্রুপক্ষের উপর আঘাত হানতে মিসাইলের জুড়ি মেলা ভার। এই মিসাইলও আবার বিভিন্ন ধরণের হয়, যেমন ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল ইত্যাদি। আমরা এখানে ক্রুজ মিসাইল (Cruise Missile) নিয়ে আলোচনা করব। ভারতের ব্রাহ্মোস বা নির্ভয় সিরিজের ক্ষেপনাস্ত্রগুলি ক্রুজ মিসাইল। এই ক্রুজ মিসাইল কাজ করে কীভাবে তাই হল আমাদের আলোচ্য বিষয়।
ক্রুজ মিসাইল এক ধরণের নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র (Guided Missile) যা তার পুরো উড্ডয়ন পথে বায়ুমণ্ডলের মধ্যেই থাকে এবং ডানা ও জেট ইঞ্জিনের সাহায্যে উড়োজাহাজের মতো উড়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এটি ব্যালিস্টিক মিসাইলের মতো বায়ুমণ্ডলের বাইরে যায় না। এর কর্মপদ্ধতি খুব জটিল, তবে এখানে সহজ করে ক্রুজ মিসাইল কাজ করে কীভাবে তার ব্যাখ্যা করা হল।
১. প্রপালশন সিস্টেম (Propulsion System):
ক্রুজ মিসাইলে সাধারণত জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। এই ইঞ্জিনগুলো নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র অনুসারে কাজ করে।
এক্ষেত্রে ইঞ্জিনটি বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং জ্বালানির সাথে মিশিয়ে দহন ঘটায়। এই দহনের ফলে উচ্চ-তাপমাত্রা ও উচ্চ-চাপের গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা ইঞ্জিনের পেছনের দিক দিয়ে প্রচণ্ড বেগে নির্গত হয়। এই গ্যাসের নির্গমনের ফলে সামনের দিকে ধাক্কা (Thrust) তৈরি হয়, যা মিসাইলকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
কম উচ্চতায় এবং সাবসনিক (শব্দের গতির কম) বা ট্রান্সসনিক (শব্দের গতির কাছাকাছি) গতিতে চলার জন্য টার্বোফ্যান বা টার্বোজেট ইঞ্জিন বেশি কার্যকর। আবার সুপারসনিক (শব্দের গতির বেশি) বা হাইপারসনিক (শব্দের গতির পাঁচ গুণের বেশি) ক্রুজ মিসাইলের জন্য র্যামজেট বা স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।
২. অ্যারোডাইনামিক লিফট (Aerodynamic Lift):
ক্রুজ মিসাইলের ডানাগুলো উড়োজাহাজের ডানার মতোই অ্যারোডাইনামিক লিফট তৈরি করে, যা মিসাইলকে বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকতে সাহায্য করে।
বার্নোলির নীতি (Bernoulli’s Principle) এবং নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্রের প্রয়োগে ডানাগুলো কাজ করে। ডানার উপর দিয়ে বায়ু দ্রুত প্রবাহিত হয় এবং ডানার নিচের দিকে বায়ু অপেক্ষাকৃত ধীর গতিতে প্রবাহিত হয়। ফলে ডানার উপরে চাপ কমে যায় এবং নিচে চাপ বেশি থাকে, যা একটি ঊর্ধ্বমুখী শক্তি (লিফট) তৈরি করে। এই লিফট মিসাইলকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় উড়তে সাহায্য করে। বিস্তারিত জানতে এরোপ্লেন আকাশে ওড়ে কীভাবে দেখুন।
৩. গাইডেন্স ও নেভিগেশন সিস্টেম (Guidance and Navigation System):
ক্রুজ মিসাইল অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য বিভিন্ন অত্যাধুনিক গাইডেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে। এখানে বিভিন্ন নেভিগেশন সিস্টেমের বিষয়ে দেওয়া হল।
INER (Inertial Navigation System): এই সিস্টেমে জাইরোস্কোপ (Gyroscopes) এবং অ্যাক্সেলেরোমিটার (Accelerometers) ব্যবহার করা হয়, যা মিসাইলের গতি, দিক এবং অবস্থান পরিমাপ করে। নিউটনের গতিসূত্রের ওপর ভিত্তি করে এটি কাজ করে। প্রাথমিক উৎক্ষেপণের পর এটি মিসাইলকে একটি পূর্ব-নির্ধারিত পথে চলতে সাহায্য করে।
GPS (Global Positioning System): উপগ্রহের সিগন্যাল ব্যবহার করে মিসাইলের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা হয় এবং সেই অনুযায়ী পথ পরিবর্তন করা হয়। এটি সময়ের সঙ্গে সিগন্যালের পার্থক্য পরিমাপ করে কাজ করে।
TERCOM (Terrain Contour Matching): এই সিস্টেমে মিসাইলের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যের ভূখণ্ডের একটি ডিজিটাল ম্যাপ সংরক্ষিত থাকে। মিসাইল ওড়ার সময় তার রেডার বা সেন্সরের মাধ্যমে ভূখণ্ডের উচ্চতা পরিমাপ করে এবং সংরক্ষিত ম্যাপের সাথে তুলনা করে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে ও সঠিক পথে অগ্রসর হয়। এটি ডিজিটাল ইমেজ প্রসেসিং এবং প্যাটার্ন রিকগনিশন নীতির ওপর নির্ভরশীল।
DSMAC (Digital Scene Matching Area Correlation): লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি এসে এই সিস্টেমটি কাজ করে। মিসাইলে থাকা ক্যামেরা বা সেন্সর লক্ষ্য এলাকার একটি ছবি নিয়ে মিসাইলের মেমোরিতে সংরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুর ছবির সঙ্গে তুলনা করে চূড়ান্ত আঘাতের জন্য পথ ঠিক করে। এটি কম্পিউটার ভিশন এবং ইমেজ প্রসেসিংয়ের উপর ভিত্তি করে কাজ করে।
রেডার সিকার (Radar Seeker): কিছু ক্রুজ মিসাইল লক্ষ্যবস্তুর রেডার সিগন্যাল শনাক্ত করে বা নিজস্ব রেডার ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুকে অনুসরণ করে। এটি ডপলার প্রভাব (Doppler Effect) এবং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ ব্যবহার করে।
৪. নিম্ন উচ্চতায় উড্ডয়ন (Low-Altitude Flight):
ক্রুজ মিসাইলগুলো প্রায়শই ভূ-পৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি (১০-১১০ মিটার উচ্চতায়) উড়ে যায়। এটি মূলত প্রতিপক্ষের রেডার সনাক্তকরণ এড়াতে সাহায্য করে, কারণ পৃথিবীর বক্রতার কারণে এবং ভূমিরূপের প্রতিবন্ধকতার জন্য রেডারের সিগন্যাল নিম্ন উচ্চতার বস্তুকে সহজে ধরতে পারে না (Line-of-Sight Blockage)। এটিকে “টেরেন-হাগিং” বা “সি-স্কিমিং” বলা হয়। এর ফলে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজে এটিকে সনাক্ত করতে পারে না।
৫. ওয়ারহেড (Warhead):
ক্রুজ মিসাইলের প্রধান উদ্দেশ্য হল একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে বিস্ফোরক ওয়ারহেড বহন করে নিয়ে যাওয়া। ওয়ারহেডটি প্রচলিত বিস্ফোরক (Conventional Explosives) বা পারমাণবিক বিস্ফোরক (Nuclear Warhead) হতে পারে। বিস্ফোরকগুলো রাসায়নিক শক্তিকে দ্রুত গতিতে তাপশক্তি এবং বিস্ফোরণ তরঙ্গে রূপান্তরিত করে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায়।
সংক্ষেপে, ক্রুজ মিসাইল মূলত নিউটনের গতিসূত্র, অ্যারোডাইনামিক্স, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের সম্মিলিত প্রয়োগে কাজ করে। এটি একটি স্ব-চালিত, নির্দেশিত উড়ন্ত যান যা তার সুনির্দিষ্ট নেভিগেশন সিস্টেমের সাহায্যে কম উচ্চতায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান