বিজ্ঞান

নিউট্রন তারকা

নিউট্রন তারকা

রাতের আকাশের দিকে চোখ মেলে তাকালে মুগ্ধ হয়ে আমরা তারাগুলি দেখি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য ছায়াপথ রয়েছে, রয়েছে অসংখ্য নীহারিকা আর তার পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য নক্ষত্র। রাতের কালো অন্ধকার আকাশের প্রেক্ষাপটে উজ্জ্বল আলোকিত বিন্দুগুলিকেই আমরা তারা বা নক্ষত্র বলে চিনি। হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম সমন্বিত বিশালাকায় একপ্রকার মহাজাগতিক বস্তু হল এই নক্ষত্র যাদের অভ্যন্তরে নিউক্লীয় বিভাজনের ফলে প্রচুর তাপ ও আলো উৎপন্ন হয়। এই নক্ষত্রদের মধ্যেও রয়েছে অনেক রকম প্রকারভেদ, তাদের নির্দিষ্ট জীবনকালের দশাও রয়েছে কতগুলি। তেমনই একটি বিশেষ দশাযুক্ত নক্ষত্র হল নিউট্রন তারকা (Neutron Star)।

এই মহাবিশ্বে কোনও একটি বিশালাকায় নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে গেলে সেই নক্ষত্র সংকুচিত হতে হতে একসময় এই নিউট্রন তারকা জন্ম হয়। নক্ষত্রের একেবারে কেন্দ্রীয় অঞ্চলে প্রোটন ও ইলেকট্রনগুলি এই সংকোচনের সময় নিউট্রনে পরিণত হয় যে সময় প্রচন্ড তাপের সৃষ্টি হয় ও ফলস্বরূপ সুপারনোভা দেখা যায়। সুপারনোভার পর অবশিষ্ট নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের ১.৪ গুণ এর বেশি হয়, তবেই তা নিউট্রন তারকায় পরিণত হতে পারে। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য নক্ষত্রের এই ভরের সীমা নির্ধারণের ব্যাপারে ভারতীয় বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর সুব্রহ্মণ্যনের নাম জড়িয়ে আছে এবং একে চন্দ্রশেখর সীমা বলা হয়। তবে এই অবশিষ্ট নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের তিনগুণ হয় তাহলে তার ঘনত্ব ও মাধ্যাকর্ষণ বল অনেক বেশি হয় ফলে তা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়।) এই সংকোচনের ফলে সূর্যের মত ভরের বস্তু একটি শহরের আকার নেয় এবং বৃহদাকার নক্ষত্রের অবশিষ্টাংশগুলি প্রায় ২০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত হয়। নিউট্রন তারকার উপাদানের একটি চিনির ঘনকের ন্যায় অংশের ভর পৃথিবীতে প্রায় ১০০ কোটি টনের কাছাকাছি হবে অর্থাৎ তা প্রায় একটি পর্বতের ওজনের সমান। মহাবিশ্বে বহু নিউট্রন তারকাকে পর্যবেক্ষণ করাই সম্ভব হয় না, কারণ তারা কোনও রকম বিকিরণ ঘটায় না। বিজ্ঞানীরা এমন বেশ কিছু নিউট্রন তারকা আবিষ্কার করেছেন যেগুলি সুপারনোভার অবশিষ্টাংশের কেন্দ্রে বসে এক্স রশ্মি নির্গত করে। সহজ করে বলতে গেলে যে সকল বৃহদাকার নক্ষত্রের ভর এক সময় সূর্যের ভরের চার থেকে আট গুণ হয়ে গিয়েছিল, সেগুলি সুপারনোভায় বিস্ফারিত হওয়ার ফলেই এই নিউট্রন তারকার জন্ম হয়। এই ধরনের বিস্ফোরণের ফলে নক্ষত্রের বহিঃস্তর সম্পূর্ণরূপে মহাশূন্যে বেরিয়ে আসে, কিন্তু এর কেন্দ্রীয় অঞ্চল (Core) অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু এটি আর কোনও রকম নিউক্লীয় সংযোজন প্রক্রিয়ার অন্তর্গত হয় না। অভিকর্ষের আভ্যন্তরীণ টান বজায় রাখার জন্য বাহ্যিক চাপ ছাড়াই নক্ষত্রটি তখন ঘনীভূত হতে শুরু করে এবং নিজেই ভেঙে পড়ে। নিউট্রন তারকাগুলিকে প্রদক্ষিণকারী একরকমের বেলুনের মত মেঘের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন তাঁরা রোচে লোব (Roche Lobe)।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

বিজ্ঞানি জেমস চ্যাডউইক নিউট্রন কণা আবিষ্কারের দু বছর পরে ১৯৩৩ সালেই ওয়াল্টার বেড এবং ফ্রিৎজ আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির সম্মেলনে নিউট্রন তারকার অস্তিত্বের কথা জানান। ১৯৬৭ সালে ফ্র্যাঙ্কো প্যাসিনি জানান যে নিউট্রন তারকা যদি ঘুরতে থাকে এবং তার যদি নির্দিষ্ট চৌম্বকক্ষেত্র থাকে, তাহলে তা তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করবে। ১৯৭৪ সালে পালসার জাতীয় নিউট্রন তারকা উদ্ভাবন করে বিজ্ঞানী অ্যান্টনি হিউইশ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।

নিউট্রন তারকার ভর ১.১ সৌরভর থেকে ২.১৬ সৌরভর পর্যন্ত হতে পারে। নিউট্রন তারকার এই সর্বোচ্চ ভরের সীমাকে আবিস্কারকদের নাম অনুসারে টোলম্যান-ওপেনহাইমার-ভোলকফ সীমা (Tolman–Oppenheimer–Volkoff limit)  বলা হয়। এর আকার বা পরিধি হয় প্রায় ২০ কিলোমিটার। ফলে এর ঘণত্ব হয় অনেক অনেক বেশি। একটি নিউট্রন তারকার কেন্দ্রস্থলের ঘণত্ব  ১০১৫ গ্রাম/কিউবিক-সেমি এবং এর চৌম্বকক্ষেত্রের পরিমাপ ১০১৪ থেকে ১০১৫ গাউস (Gauss)। নিউট্রন তারকা সাধারণভাবে পৃথিবীর তুলনায় অত্যন্ত বেশি শক্তিশালী অভিকর্ষজ টান বহন করে। পরিসংখ্যানের হিসেবে নিউট্রন তারকার মাধ্যাকর্ষণ টান পৃথিবীর তুলনায় ২০০ কোটি গুণ বেশি হয়ে থাকে। ক্ষুদ্রাকার হওয়ায় এর মহাকর্ষীয় শক্তি এতটাই প্রবল। যখন এই নিউট্রন তারকা গঠিত হয়, মহাশূন্যে তা ঘুরতে থাকে। যখন সেগুলি সংকুচিত এবং ঘনীভূত হতে শুরু করে, ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্রানুসারে তার ঘূর্ণন গতিও তার বাড়তে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রতি মিনিটে এই নিউট্রন তারকা ৪৩ হাজার বার ঘূর্ণনে সক্ষম। এই ধরনের নিউট্রন তারকা ধীরে ধীরে শ্লথ হতে থাকে। কিন্তু যে তারকাগুলি তখনও পর্যন্ত দ্রুত গতিতে ঘূর্ণায়মান, তা থেকে এমন বিকিরণ নির্গত হয় যার কারণে পৃথিবী  থেকে দেখে মনে হয় এই তারাগুলি জ্বলছে, নিভছে। ঠিক যেভাবে একটি লাইট হাউস থেকে আলো নির্গত হয় এবং ঘুরতে থাকে, তেমনই দেখে মনে হয় এই নিউট্রন নক্ষত্রগুলিকে। এই স্পন্দনজনিত কারণে বেশ কিছু নিউট্রন তারকাকে ‘পালসার’ (Pulsar) নামেও ডাকা হয়ে থাকে। কয়েক কোটি বছর ঘূর্ণনের পরে এই ধরনের পালসারগুলি তাদের শক্তি নিষ্কাশন করে এবং স্বাভাবিক নিউট্রন তারকা হিসেবে পরিণতি পায়। এই পালসার তারকা অন্যতম পরিচিত এক প্রকার নিউট্রন নক্ষত্র। মহাবিশ্বে বিজ্ঞানীদের মতে প্রায় ১ হাজার পালসারের অস্তিত্ব রয়েছে এবং আমাদের এই ছায়াপথে কয়েক কোটি বছরের পুরনো নিউট্রন নক্ষত্রের অস্তিত্ব রয়েছে। ২০১০ সালে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এরকম ১৮০০টি নিউট্রন তারকার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।

নিউট্রন তারকার আন্তর্গঠন

নিউট্রন তারকার গঠন ঠিক কেমন হয় তা জানতে গেলে পাশের ছবিটি দেখতে হবে। ছবিতে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে যে এই ধরনের নিউট্রন তারকা মূলত চারটি স্তর নিয়ে গঠিত হয়। এর একেবারে উপরের বহিরাবরণটি প্রকৃতিতে কঠিন, কিন্তু এর একেবারে অন্তঃস্তরটি অতিতরল (Superfluid) প্রকৃতির। এই দুটি স্তরই নিউট্রন তারকার পালসার আলোকচ্ছটার জন্য দায়ী। প্রতিটি স্তরের ঘনত্ব এবং ব্যাসার্ধ ছবিতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্তরগুলিকে ক্রমান্বয়ে সাজালে এভাবেও দেখা যেতে পারে – পরিবেশ (atmosphere), আবরণ (envelope), বহিরাবরণ (Crust), বহিঃস্তর (Outer Core) এবং অন্তঃস্তর (Inner Core)।  

নিউট্রন তারকা মূলত দু ধরনের হয়ে থাকে – পালসার (Pulsur) এবং ম্যাগনেটার (Magnetar)।

  • পালসার : এই পালসারগুলি আসলে ঘূর্ণায়মান নিউট্রন নক্ষত্র যেগুলির ক্ষেত্রে কয়েক মিলি সেকেন্ড থেকে কয়েক সেকেন্ডের নির্দিষ্ট বিরতিতে বিকিরণ লক্ষ্য করা যায়। এই পালসারগুলির মধ্যে খুব শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে। যেহেতু এগুলিতে চৌম্বক ক্ষেত্রটি ঘূর্ণন অক্ষের সঙ্গে সারিবদ্ধ থাকে না, তাই তারাটি ঘোরার সঙ্গে সঙ্গেই কণা ও আলোক রশ্মিগুলিও চারপাশে ভেসে আসে। পৃথিবী থেকে দেখলে মনে হবে যে নিউট্রন তারকাগুলি জ্বলছে এবং নিভছে। আলোর এই স্পন্দনের কারণে একে অনেকে লাইট হাউসের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
  • ম্যাগনেটার :    সাধারণভাবে নিউট্রন তারকাগুলির ক্ষেত্রে চৌম্বকীয় আকর্ষণ পৃথিবীর তুলনায় কয়েক লক্ষ কোটি গুণ বেশি হয়, কিন্তু এই ধরনের ম্যাগনেটারের ক্ষেত্রে তা আরও হাজার গুণ শক্তিশালী হয়ে থাকে। সকল নিউট্রন তারকার ক্ষেত্রে তারকার বহিরাবরণ চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে এমনভাবে আটকানো থাকে যাতে কোনও একটি অঞ্চলের উপর পরিবর্তন ঘটলে তা অন্যান্য অঞ্চলকে প্রভাবিত করবে। ফলে বহিরাবরণের উপরে এতমাত্রায় চাপ থাকে যে সামান্য গতির কারণেই তা বিস্ফারিত হতে পারে। ম্যাগনেটারের ক্ষেত্রে অধিক শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের জন্য, বহিরাবরণের গতির কারণে বিরাট পরিমাণ শক্তি তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণের আকারে নির্গত হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে ‘এসজিআর ১৮০৬-২০’ (SGR 1806-20) নামের একটি ম্যাগনেটার গোত্রীয় নিউট্রন তারকা ঠিক এইরকমভাবেই বিকিরণ ঘটিয়েছিল যার ফলে উদ্ভূত শক্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল সূর্য থেকে বিগত ১ লক্ষ বছরে নির্গত শক্তির সমান।

প্রতিটি নিউট্রন তারকা সবসময় একইরকম উত্তপ্ত থাকতে পারে না। প্রতিনিয়ত শক্তি বিকিরণের কারণে সেগুলি ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকে। ক্রমে সেগুলি মহাবিশ্ব থেকেই অদৃশ্য হয়ে যায়। সুপারনোভা থেকে জন্ম নেওয়া এই নিউট্রন তারকা হারিয়ে যায় বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অসীমের মধ্যে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন