বিজ্ঞান

পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে কিভাবে

ইন্টারনেটের দ্রুত গতিকে হাতিয়ার করে পর্ণোগ্রাফি আজকাল অধিকাংশ মোবাইলেই প্রায় উঁকি মারে। আর তার হাতছানিতে সাড়া দেন কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অনেকেই। সমীক্ষা জানাচ্ছে ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড হওয়া মোট কনটেন্টের ৩৫% পর্ণোগ্রাফি। ১৮-২৪ বছর বয়সী ৭০% পুরুষরা মাসে অন্তত একবার হলেও পর্ণসাইট দেখেন। এখন প্রশ্ন এই পর্ণোগ্রাফি আমাদের মস্তিষ্কের উপর আদেও কি প্রভাব ফেলে? কিছুদিন আগেই প্রকাশিত জার্মান গবেষণাপত্রে পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে বলে দাবি করা হয়েছে। পর্ণোগ্রাফির নেশা শিখন পদ্ধতি (learning process) ও স্মরণক্রিয়া দুটোতেই ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে।

মস্তিষ্কে তথ্য ধারণ করে রাখার যে প্রক্রিয়া কিংবা মস্তিষ্কের ধরে রাখা তথ্যকে স্মৃতি বলে। এই প্রক্রিয়ার প্রথমে  ধাপে তথ্য আহরণ করে মস্তিষ্কে জমা করা হয় এবং পরবর্তীতে দরকার অনুযায়ী সেই তথ্য আবার ভান্ডার থেকে খুঁজে নিয়ে আসা হয়। জমা রাখা পুরনো তথ্য হারিয়ে গেলে কিংবা সময়মত খুঁজে পাওয়া না গেলে তা দুর্বল স্মৃতিশক্তির লক্ষণ।

সাইন্যাপটিক প্লাসটিসিটি মডেল (synaptic plasticity model) অনুযায়ী মস্তিষ্ক তার ক্ষমতা অনুসারে বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় সাড়া দিতে স্নায়ুকোষ বা  নিউরনসমূহের মধ্যকার সংযোগগুলোর শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কতটা পরিমাণ এবং কী ধরণের স্নায়বিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে এবং তার সঙ্গে কী পরিমাণ নিউরোট্রান্সমিটার বা স্নায়বিক সংবাহকের নির্গমন ঘটবে, তা নিয়ন্ত্রণ করাও এই ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। ডোপামাইন এই ধরনের এক নিউরোট্রান্সমিটার। স্নায়ুতন্ত্র বিভিন্ন স্নায়ু কোষের মধ্যে বার্তা আদান প্রদান করতে ডোপামাইন ব্যবহার করে। তাই একে রাসায়নিক বার্তাবহও বলা হয়।

একঘেয়েমি
উদ্দীপন, ডোপামাইন ও আনন্দানুভূতি চক্র

আমাদের আনন্দ ও উত্তেজনার কারণ ডোপামাইন। যখন আমরা খুব আনন্দে থাকি ও উৎসাহ বোধ করি ডোপামাইন মস্তিষ্কে ওই বিশেষ অনুভূতি বয়ে নিয়ে যায়। উদ্দীপক যথাযথ উদ্দীপনা না দিতে পারলে নিউরোট্রান্সমিটার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করতে পারে না। আমাদের মস্তিষ্ক তার কার্যকলাপ ও তা থেকে প্রাপ্ত প্রতিসংকেতের (reaction) মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে প্রেষণা (motivation) পায়। আনন্দদায়ক নতুনত্ব (novelty) মস্তিষ্ককে ডোপমাইন পুরস্কার হিসেবে দেয়। এই ধরনের নিউরোকেমিক্যাল পুরস্কার হিসেবে মস্তিস্ক না পেলেই আসে বিষণ্নতা ও একঘেয়েমী। (প্রসঙ্গত, আমাদের একঘেয়ে লাগে কেন জানতে এখানে দেখুন।) আমাদের চিন্তা করা, সেইমত কাজ করা এবং কাজ করে তৃপ্তি পাওয়া – এই পুরো ব্যাপারটাতে মনোযোগ ও মেজাজ প্রত্যক্ষ ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ডোপামাইন। আনন্দ অনুভব, প্রতিদান, শিক্ষণ প্রক্রিয়া ইত্যাদিতে ডোপামাইনের ভূমিকাই মুখ্য। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন ডোপামাইন আনন্দের পরিস্থিতি তৈরি করে, নয়তো প্রত্যক্ষ আনন্দ দানে অংশ নেয়। মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যকলাপের ভিত্তিতে চরম আনন্দ লাভের মুহূর্তে, নয়তো আনন্দ লাভের পরে, বেশি বেশি করে ডোপামাইন নিঃসরণ ঘটে। এই নিঃসরণের সময়, ডোপামাইন শারীরিক ক্রিয়ার সাথে মস্তিষ্কের নতুন সংযোগগুলোকে আরও বেশি শক্তিশালী এবং দৃঢ় করে। যা ব্যক্তিকে পুরনায় একই বা  আরো বেশী আনন্দ লাভের জন্য ওই ধরণের নতুন কাজ করতে বার বার উৎসাহ দিতে থাকে।

কোকেইন জাতীয় নেশার জিনিসগুলো মস্তিষ্কের যে গঠনতন্ত্রকে উদ্দীপ্ত করে, পর্ণোগ্রাফিও ঠিক সেই গঠনতন্ত্রকেই উদ্দীপ্ত করে। ফলে আসক্তির জন্ম হয়। পর্ণোগ্রাফি ডোপামিনারজিক সিস্টেমকে সক্রিয় করে তোলার জন্য পর্দায় দেখা যৌন ক্রিয়াকলাপ গুলো ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিপটে না গিয়ে স্থায়ী স্মৃতিতে প্রবেশ করে।এখানেও ডোপামাইন দৃঢ়ীকরণ (reinforcement) এর কাজ করে কারণ পর্ণোগ্রাফি নিয়ে নানান অলীক কল্পনা করার মাধ্যমে দর্শক তৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করে।ফলে যথেষ্ট ডোপামাইন ক্ষরণ হয়। দৃশ্যগুলো দর্শকের মনে রিপিট মোডে বার বার ভাসতে থাকে তাই তা দৃঢ়ভাবে স্মৃতিতে গেঁথে যায়। এক্ষেত্রে সমস্যা  হলো, কোনো কিছুকে যত বেশি স্মরণ ও অনুশীলন করা হবে, মস্তিষ্কে তা চিরস্থায়ী স্মৃতি তৈরি করবে। যেমন  ছোটবেলায় ছড়া মুখস্থের জন্য বার বার পড়তে হত। তাই পর্ণের মতো একটা অলীক বিষয় আমাদের স্মৃতিরজালে অনেকটা জুড়ে থাকলে তার শুধু শুধু অপচয় ঘটাবে।

এছাড়াও নতুন নতুন পর্ণোগ্রাফি দেখার ইচ্ছে তৈরি হবে আরও বেশি ডোপামাইনের পুরস্কার পাওয়ার আশায়। এই আসক্তি বাড়তেই থাকবে ফলে দেরিতে ঘুমানো, অবসর সময়ে বিশ্রাম ছেড়ে পর্ণোগ্রাফি দেখার চেষ্টা চলবে। এর ফলে মন ও ইচ্ছা পর্নোগ্রাফির দৃশ্যের পুনর্মঞ্চায়ন করতে চাইবে যার অনিবার্য পরিণতি হতাশা। এই পুনর্মঞ্চায়নের প্রত্যাশা পূরণ হবার নয়। ফলে মন মেজাজ চিড়চিড়ে হয়, বিষণ্নতা নেমে আসে যার ফলে বাস্তব ও পারিবারিক জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। গবেষণায় উঠে এসেছে ইন্টারনেটের পর্ণসাইটে আসক্ত শিক্ষার্থীরা পড়াশুনায় অবহেলা, অমনোযোগী হয়। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা অফিসে কাজ ফাঁকি দেন, দায়িত্ব এড়িয়ে যান, অসময়ে ঘুমান এমনকি সম্পর্কগুলোর মূল্যও তাদের কাছে কমে যায়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় সময়ে অসময়ে যৌনউত্তেজনা স্বাভাবিক যৌনজীবনে দারুণ কুপ্রভাব ফেলে। পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলোর প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক হয়। মনোযোগ কমে যাওয়ায় মস্তিস্কে তথ্য-জারন ক্রিয়ায় বিলম্ব হয়। তাই সুস্থ জীবন যাপনের জন্য পর্নোগ্রাফি এড়িয়ে চলুন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন