বিজ্ঞান

ছায়াতে রাখলে কাপড় শুকনো হয় কীভাবে

কাপড় কাচার পর বাইরের কড়া সূর্যের আলোয় কিছুক্ষণের জন্য তা মেলে রেখে দিলেই ভিজে কাপড় সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে যায়। এই ঘটনা আমরা সকলেই দেখেছি বা জানি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঘটনা আসলে কোন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসারে হয়? কোথায় ভিজে কাপড় মেলে রাখলে অপেক্ষাকৃতভাবে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়, আলোতে না ছায়াতে? গরমকালে রোদ থাকে, তাপও থাকে। তাই কাপড় শুকোনো নিয়ে চিন্তা থাকে না। কিন্তু বর্ষাকালে তো চিন্তার শেষ নেই। এই ভালো রোদ ছিল দেখে কাপড় মেললেন, ব্যস অমনি তেড়ে বৃষ্টি। এলো তো এলো, সারাদিন চললো। অগত্যা মেলে দিলেন ঘরের ভিতরেই, কিন্তু আশ্চর্য পরদিন সকালেই দেখলেন কাপড় শুকিয়ে গেছে। তাহলে আসুন জেনে নেওয়া যাক ছায়াতে রাখলে কাপড় শুকনো হয় কীভাবে ।

ছায়াতে রাখলে কাপড় শুকনো হয় কীভাবে এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথমেই বলতে হয় যে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করে ভিজে কাপড় রোদের তাপ পেয়ে শুকনো হয়, সেই প্রক্রিয়ার নাম ‘বাষ্পীভবন’ বা ‘evaporation’। বাইরে থেকে কোনো তাপ প্রয়োগ না করে পরিবেশের তাপের সাহায্যে জলের সম্পূর্ণ পৃষ্ঠতল থেকে ধীরে ধীরে জলের বাষ্পে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে বলে বাষ্পীভবন। ভিজে কাপড়কে রোদে মেলে দিলে সেই কাপড়ের সুতোর ফাঁকে আটকে থাকা জলের কণাগুলি বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্য থেকে লীনতাপ গ্রহণ করে ধীরে ধীরে বাষ্পে পরিণত হয়ে যায়। ফলে ভিজে কাপড় আবার তার আগের শুকনো অবস্থায় ফিরে যায়। কাপড় শুকানোর এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে বেশ খানিকটা সময় লাগে। পুরো প্রক্রিয়াটি নির্দিষ্ট কিছু ধাপ অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়। আগে আমাদের সেই ধাপগুলি জেনে নেওয়া দরকার –

·         ভিজে কাপড়কে রোদে মেলে দেওয়া হলে সেই কাপড়ের সুতোর ফাঁকে ফাঁকে আটকে থাকা জলের কণাগুলি সরাসরি সূর্যের তাপের সংস্পর্শে আসে। জলের অণুগুলির মধ্যে এমন কিছু আলগা অণু থাকে যারা শুধু লীনতাপ গ্রহণ করেই বাষ্পে পরিণত হয়ে যায়। এজন্য তাদের স্ফূটনাঙ্কে (জলের স্ফুটনাঙ্ক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পৌঁছাবার দরকার হয় না, কারণ আগে থাকতেই তাদের মধ্যে বাষ্পে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গতিশক্তি উপস্থিত থাকে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


·         তাপের প্রভাবে জলের বাকি কণাগুলির উষ্ণতা ক্রমশ বাড়তে থাকে।

·         আস্তে আস্তে উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার ফলে জলের অণুগুলি তাদের নিজেদের মধ্যেকার অন্তরাণবিক বন্ধন (intramolecular bond) এবং জলের অণু ও কাপড়ের সুতোর মধ্যেকার আন্তরাণবিক বন্ধনকে নিষ্ক্রিয় করে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় গতিশক্তি (kinetic forcee) লাভ করে।

·         এই শক্তি অর্জন করার পরে জলের কণাগুলির মধ্যে ভৌত পরিবর্তন ঘটে ও জলকণাগুলি তরল অবস্থা থেকে বাষ্পীয় অবস্থায় রূপান্তরিত হয়।

·         এরপর ওই জলীয় বাষ্প ব্যাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাতাসে মেশে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তরল বা বাষ্পীয় পদার্থ কোনো বাহ্যিক প্রভাবক ছাড়াই বেশি ঘনত্বের দিক থেকে কম ঘনত্বের দিকে ছড়িয়ে পরে ও ক্রমশ সমঘনত্বে পরিণত হয়। এই ঘটনাকেই ‘ব্যাপন’ বা diffusion বলে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ভিজে কাপড়ের সুতোর ফাঁকে ফাঁকে আটকে থাকা জলের কণাগুলি সূর্যের তাপের প্রভাবে বাষ্পে পরিণত হওয়ার পর কাপড়কে ছেড়ে পরিবেশের বাতাসের মধ্যে মিশে যায়।

·         এই জলকণা-সমৃদ্ধ বায়ু বায়ুপ্রবাহের ফলে ভিজে কাপড়ের সংলগ্ন স্থান থেকে দূরে সরে যায়। আশেপাশের শুষ্ক বায়ু তখন ঐ খালি জায়গা দখল করে নেয়। ওই শুষ্ক বায়ু আবার ভিজে কাপড় থেকে জলীয় বাষ্প গ্রহণ করতে শুরু করে।

এই ধাপগুলি ক্রমাগত চলতে থাকে যতক্ষণ না কাপড়ের মধ্যেকার সব জল সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়ে পরিবেশের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায় ও ভিজে কাপড় পুরো শুকিয়ে যায়। কাপড় পুরো শুকিয়ে গেলে এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে কয়েকটি বিশেষ পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর, সেগুলি হল —

পরিবেশের উষ্ণতা:-

বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ার হারের সঙ্গে পরিবেশের উষ্ণতার সম্পর্ক সমানুপাতিক। অর্থাৎ, পরিবেশ যত বেশি উষ্ণ হবে, বাষ্পীভবনের হার তত বেশি হবে। এর ফলে কাপড়ের সুতোর ফাঁকে আটকে থাকা জল তাড়াতাড়ি বাষ্পে পরিণত হয়ে গিয়ে পরিবেশের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায় এবং ভিজে কাপড় শুকিয়ে যায়। এই কারণেই কড়া রোদে কাপড় মেললে তা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।

পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল:-

বাষ্পীভবন সম্পূর্ণরূপেই তরলের পৃষ্ঠতল-নির্ভর একটি ঘটনা। তরলের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফলের সঙ্গে বাষ্পীভবনের হারের সম্পর্ক সমানুপাতিক। অর্থাৎ, তরলের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল যত বেশি হবে সেই তরলের বাষ্পে পরিণত হওয়ার হারও তত বেশি হবে। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, ভিজে কাপড়কে যদি এক বা একাধিকভাবে ভাঁজ করে মেলে দেওয়া হয়, তবে কাপড়ের সুতোর ফাঁকে ফাঁকে আটকে থাকা জলের কণাগুলি সম্পূর্ণভাবে সূর্যের তাপের সংস্পর্শে আসতে পারে না। ফলে প্রয়োজনীয় গতিশক্তি অর্জন করতে না পারার জন্য বাষ্পে পরিণত হতে অনেক বেশি সময় নিয়ে নেয় এবং কাপড় শুকাতেও অনেক বেশি সময় লাগে। অন্যদিকে, ভিজে কাপড়কে কোনো ভাঁজ না করে টানটান করে মেলে রাখলে সব জলকণাগুলি সূর্যের তাপ ভালোভাবে পায় এবং তাড়াতাড়ি বাষ্পে পরিণত হয়ে যায়। ফলে ভিজে কাপড়ও তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।

পরিবেশের আর্দ্রতা:-

আমরা জানি, কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জলীয় বাষ্প গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকে। সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ জলীয় বাষ্প গ্রহণ করার পর সেই বায়ু জলীয় বাষ্প দ্বারা ‘সম্পৃক্ত’ হয়ে যায় ও নতুন করে আর জলীয় বাষ্প গ্রহণ করতে পারে না। এখন পরিবেশের আর্দ্রতার সঙ্গে বাষ্পীভবনের হারের সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ, পরিবেশের বায়ুতে যত বেশি পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকবে বা পরিবেশের বায়ু যত বেশি পরিমাণ আর্দ্র হবে, বাষ্পীভবনের হার তত কম হবে। ফলে ভিজে কাপড়ের সুতোর ফাঁকে আটকে থাকা জলকণাগুলি বাষ্পে পরিণত হতে অনেক বেশি সময় নেবে ও ভিজে কাপড় শুকাতে দেরি হবে। এই কারণেই রোদ-ঝলমলে দিনের তুলনায় বর্ষার দিনে বা ভ্যাপসা গরমের দিনে ভিজে কাপড় শুকাতে অনেক বেশি দেরি হয়।

বায়ু প্রবাহ:-

বায়ু প্রবাহিত হতে থাকলে জলীয় বাষ্প দ্বারা সম্পৃক্ত বায়ু ভিজে কাপড় সংলগ্ন জায়গা থেকে দূরে চলে যায় ও আশেপাশের শুষ্ক ও অনার্দ্র বায়ু সেই ফাঁকা স্থান দখল করে। বায়ুপ্রবাহের হারের সঙ্গে বাষ্পীভবনের হারের সম্পর্ক সমানুপাতিক। অর্থাৎ, বায়ু জোরে প্রবাহিত হলে বাষ্পীভবনের হার বৃদ্ধি পায়। ফলে ভিজে কাপড় তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।

    এ তো গেল কাপড় শুকোনোর সাধারণ একটা ধারণা। রোদে কীভাবে কাপড় শুকোয় তা তো জানলেন। এবারে চলুন জেনে নিই ছায়াতে কীভাবে কাপড় শুকোয়। ভিজে কাপড়কে রোদে না রেখে যদি ছায়াতে রাখা হয় বা ঘরের ভিতর রাখা হয় তাহলে প্রায় একই পদ্ধতি অনুসরণ করে ভিজে কাপড় শুকনো হয়। কিন্তু ছায়াযুক্ত স্থানে সূর্যের আলো না থাকার জন্য কাপড়ের জলকণাগুলি পরিবেশ থেকেই তাদের বাষ্পে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় লীনতাপ সংগ্রহ করে। তবে রৌদ্রকরোজ্জ্বল পরিবেশের তুলনায় ছায়াযুক্ত স্থানে ভিজে কাপড় দেরিতে শুকায়। এর কারণ হল—

·         ঘরের ভিতরের পরিবেশ বা ছায়াযুক্ত স্থানের পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই রৌদ্রযুক্ত স্থানের তুলনায় কম উষ্ণ হয়। ফলে জলকণাগুলির মধ্যে ভৌত পরিবর্তন হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গতিশক্তি অর্জন করতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। এই কারণে উন্মুক্ত পরিবেশের তুলনায় ছায়াযুক্ত স্থানে ভিজে কাপড় রাখলে তা শুকাতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে।

·         ঘরের ভিতরের পরিবেশ বা ছায়াযুক্ত পরিবেশ যদি বেশি আর্দ্র হয় তাহলে সেই বায়ুর আর নতুন করে জলীয় বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা থাকে না। ফলে বাষ্পীভবনের হার কমে যায় ও কাপড় শুকাতে দেরি হয়।

·         ঘরের মধ্যে বায়ু ঠিকভাবে চলাচল করতে না পারলে ভিতরের জলীয় বাষ্প সম্পৃক্ত বায়ু স্থান পরিবর্তন করতে পারে না এবং শুষ্ক বায়ু ভিজে কাপড় সংলগ্ন স্থানে পৌঁছাতে পারে না। ফলে কাপড় শুকাতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়।

এই সব কারণের জন্য ছায়াযুক্ত জায়গায় ভিজে কাপড় দেরিতে শুকায়। এবং একই কারণে মেঘলা দিনে, বর্ষার দিনে ও উষ্ণ-আর্দ্র পরিবেশে ভিজে কাপড় শুকাতে বেশি সময় নেয়। তবে ঘরের ভিতর আলো জ্বালিয়ে ও পাখা চালিয়ে রাখলে ঘরের উষ্ণতা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পায় ও বায়ু চলাচল ব্যবস্থাও ঠিক থাকে। ফলে তুলনামূলকভাবে ভিজে কাপড় তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। এবার আশা করি বোঝা গেল ছায়াতে রাখলে কাপড় শুকনো হয় কীভাবে ।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও