সববাংলায়

পদবীর উৎস (বর্ণানুক্রমিক ভ এবং ম বর্ণ)

পদবী নিয়ে আমাদের অনেকেরই শ্লাঘার শেষ নেই, আবার বিশেষ কিছু পদবীর প্রতি শ্লেষও কম নেই। কেউ কেউ মনে করেন যে পদবীর ইতিহাস সেই মান্ধাতার আমল থেকে আমাদের সঙ্গে জুড়ে আছে বুঝি। পদবীর উৎস জানতে গিয়ে ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায় যে, পদবী আদৌ তত প্রাচীন নয় যতটা আমরা কল্পনা করি। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গীয় শব্দকোষে পদবীর বিভিন্ন অর্থের মধ্যে উল্লেখ করেছেন – উপাধি (title), বংশসূচক শব্দ (Surname), গুণ-বিদ্যাজন্য উপনাম ইত্যাদি। সাধারণভাবে, আমাদের সমাজে কোনও ব্যক্তির নামের দুটি অংশ – নাম ও উপনাম। এই উপনাম শব্দটিকেই পদবী (Surname) বলা হয়। এখন তাহলে পদবীর উৎপত্তি সন্ধানে জেনে নেওয়া যাক বর্ণানুক্রমিক ‘ভ’ এবং ‘ম’ বর্ণ অবধি পদবীগুলি কীভাবে প্রচলিত হল।

ভক্ত – অনেক এমন পদবী আছে যাদের উৎস বাংলার বাইরে, অর্থাৎ পদবীগুলি বাংলার নিজস্ব নয়। ভক্ত এমনই এক পদবী যে এসেছে পার্শ্ববর্তী রাজ্য উড়িষ্যা থেকে।   

ভঞ্জ – ভঞ্জ পদবীর উৎপত্তি নিয়ে সংশয় আছে। অনেকের মতে ভঞ্জ এসেছে ‘ভঞ্জদেব’ উপাধি থেকে, যা সম্ভবত ময়ূরভঞ্জ রাজবংশের সাথে সম্পর্কিত। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, ‘ভঞ্জবাহাদুর’ বা ‘ভজন’ থেকে ভঞ্জ পদবীর আগমন। 

ভট্ট ও ভট্টাচার্য – এই দুটি পদবীর উৎস একই। লৌকিক শব্দকোষ মতে, বিভিন্ন বংশের পরিচয়দাতা ছিলেন ‘ভট্ট’। এঁদের মধ্যে কেউ ‘আচার্য’ বা শিক্ষক হয়ে ওঠেন, তখন ভট্ট এর সাথে আচার্য জুড়ে ভট্টাচার্য হয়। পরে এই দুটি পদবী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মূলত ব্রাহ্মণদের মধ্যেই এই দুটি পদবী দেখা যায়।

ভদ্র- কায়স্থ জাতি গুপ্ত সাম্রাজ্য বিস্তারের বহু আগেই বাংলায় আসে এবং তাঁদের অনেকেই নিজেদের ধর্মাচার্যগণের উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। এরকমই এক উপাধি ‘ভদ্র’, যা পরে পদবী হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়।

ভড় – এই পদবীর উৎস খুব স্পষ্ট নয়। স্থানভিত্তিক হতে পারে। একটি মত অনুযায়ী, প্রাচীন গৌড়ের একটি অঞ্চলের নাম ছিল ‘ভড়’ এবং পদবীটি সেখান থেকেই এসেছে। আবার, ‘ভড়’ অর্থ মালবাহী বড় নৌকা। এই নৌকা চালনার পেশার সঙ্গে পদবীটি যুক্ত থাকতে পারে বলেও অনুমান। কেউ কেউ বলেন ভড় এসেছে ‘বাজ’ থেকে।

ভট্টশালী – স্থানভিত্তিক পদবী। এসেছে গাঞি নাম অনুসারে। কথিত আছে যে আদিশুরের পৌত্র ক্ষিতিশুর ছাপ্পান্নজন ব্রাহ্মণকে ছাপান্নটি আলাদা আলাদা গ্রাম থাকার জন্য দান করেছিলেন। যিনি যে গ্রামে থাকতেন তিনি ও তাঁর উত্তরপুরুষেরা সেই গ্রামের নামে পরিচিত হতেন। সেই ছিল তাঁদের গ্রামীণ বা গাঞি নাম। ভট্টশালী তেমনই এক গ্রামের নাম যার থেকে এই পদবীটি এসেছে। রাঢ় অঞ্চলের ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই পদবীটি দেখা যায়।

ভার্গব- গোত্র প্রবর্তক বা প্রবর এর নাম থেকে কিছু কিছু পদবী এসেছে। ভার্গব এমনই এক পদবী। সাঁইত্রিশটি গোত্র এবং উনসত্তরটি গোত্র প্রবরের নাম পাওয়া যায়। এমনই এক গোত্র প্রবর্তক ছিলেন ভার্গব, যাঁর নাম থেকে এই পদবীর প্রচলন।

ভাদুড়ি – স্থানভিত্তিক পদবী। এসেছে গাঞি নাম অনুসারে। কথিত আছে যে আদিশুরের পৌত্র ক্ষিতিশুর ছাপ্পান্নজন ব্রাহ্মণকে ছাপান্নটি আলাদা আলাদা গ্রাম থাকার জন্য দান করেছিলেন। যিনি যে গ্রামে থাকতেন তিনি ও তাঁর উত্তরপুরুষেরা সেই গ্রামের নামে পরিচিত হতেন। সেই ছিল তাঁদের গ্রামীণ বা গাঞি নাম। মনে করা হয়, ভাদড় গ্রামের নাম থেকে ভাদুড়ি পদবীটি এসেছে। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই পদবীটি দেখা যায়।

ভূঁইয়া/ভৌমিক/ভূঁঞা – ভূঁইয়া (ভূঁঞা) এর সাথে ‘ভূমি’র যোগ আছে। মূলত এঁরা ছিলেন ভূম্যধিকারী জমিদার। গবেষকরা মনে করেন যে, ‘ভৌমিক’ শব্দটি ‘ভূমিকা’ হয়েছে, এবং পরে তা ‘ভূঁইয়া’ হয়েছে।

মণি – এই পদবীর উৎস খুব পরিষ্কার নয়। অনেক মনে করেন যে, ‘রত্ন’ বা ‘শ্রেষ্ঠ’ বোঝাতে মণি ব্যবহার করা হত, পরে তা পদবীতে রূপান্তরিত হযেছে। 

মন্ডল – মনে করা হয় পেশাভিত্তিক পদবী। মন্ডল বা মোড়ল ছিল গ্রামের প্রধান ব্যক্তি। কখনও কখনও এঁরা জমিদারের প্রতিনিধিরূপেও কাজ করতেন। ‘মন্ডলপতি’, ‘মন্ডলেশ্বর’ ইত্যাদি ছিল রাজকর্মচারীদের পদ। সেখান থেকেই মন্ডল পদবী এসেছে বলে মনে করা হয়।

মল্লিক – পাঠানদের আমলে যে সকল রাজপুরুষ জায়গীর বা জমিদারি পেতেন, তাঁদের ‘মল্লিক’ উপাধি দেওয়া হত। মনে করা হয় যে পদবীটি এখন থেকেই এসেছে। আবার অনেকে মনে করেন, ‘মল্ল’ থেকে মল্লিক এসেছে।

মহন্ত/মোহান্ত – দেবমন্দির বা মঠের অধ্যক্ষকে মহন্ত/মোহান্ত বলা হয়। এঁরা সাধারণভাবে পূজার কাজ করেন না, মন্দির বা মঠের পরিচালনার ভার থাকে এঁদের হাতে। পদবীটি এখন থেকেই এসেছে। একাধিক জাতির (মাহিষ্য, সদগোপ, নমঃশূদ্র, সবিতৃব্রাহ্মণ ইত্যাদি) মধ্যে এই পদবীটির প্রচলন আছে।

মহান্তি – বাংলায় প্রচলিত কিছু পদবী বাংলার নিজস্ব নয়, এসেছে আশপাশের রাজ্য থেকে। ‘মহান্তি’ বা ‘মোহান্তি’ এরকমই এক পদবী যা এসেছে উড়িষ্যা থেকে।

মোদক – পেশাভিত্তিক পদবী। মোদক শব্দের উৎসে ‘মন্থন’ রয়েছে। দুধ সংগ্রহ, মন্থন ও তা থেকে মিষ্টান্নদ্রব্য প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকতেন যাঁরা তাঁদের ময়রা/মোদক বলা হত। সেই পেশা থেকেই পরে পদবীটি এসেছে বলে মনে করা হয়। 

মহাপাত্র  – পেশাভিত্তিক পদবী। আর্য যুগে প্রত্যেক মহারাজার রাজসভায় একটি করে মন্ত্রীসভা, বিচার-পারিষদ ও সৈন্যবাহিনী ছিল। মন্ত্রীসভার প্রধানমন্ত্রীকে ‘মহাপাত্র’ এবং অন্যান্য মন্ত্রীকে ‘পাত্র’ বলা হত। এই পদ পরে পদবীতে পরিণত হয়েছে। মহাপাত্র পদবীটির উৎস অবশ্য বাংলায় নয়, উড়িষ্যায়। এই পদবীর উৎপত্তি নিয়ে অন্য একটি মতও প্রচলিত। মল্লরাজারা তাঁদের পটে আঁকা দুর্গামূর্তি (বড়ঠাকরুন, মেজঠাকরুন ও ছোটঠাকরুন)-র পূজারীদের ‘মহাপাত্র’ উপাধিতে ভূষিত করতেন। সেখান থেকেও পদবীটি এসে থাকতে পারে।

মজুমদার  – পেশাভিত্তিক পদবী। জমিদারি আমলে যাঁরা জমিদারদের হয়ে খাজনা আদায় করতেন ও রাজস্বের হিসেব রাখতেন তাঁদের ‘মজুমদার’ বলা হত। প্রধান কর্মাধ্যক্ষের নিচেই ছিল এঁদের স্থান। কেউ কেউ মনে করেন যে, পাঠান আমলেও এই পদটি ছিল। পাঠান যুগে সুলতানেরা দেশ বা অঞ্চলকে কয়েকটি মুলুক বা মহালে ভাগ করে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক রাজস্ব আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহালগুলোর ইজারা নিতেন যাঁরা সেই মহালের ইজারাদারদের ‘মজুমদার’ বলা হত। আবার মুঘলযুগে মৌজা-র অধিকর্তাকে মজমাদার বা মজুমদার বলার চল ছিল। এই সব পদ পরে পদবীতে রূপান্তরিত হয়েছে। কায়স্থদের মধ্যে এই পদবীর প্রচলন সবচেয়ে বেশি।

মহলানবিশ – পেশাভিত্তিক পদবী। ‘নবিশ’ ফার্সি শব্দ, অর্থ লিপিকার। আরবি ভাষায় নগরের অংশ বা পাড়াকে ‘মহল্লহ’ বলা হয়। এই পাড়া বা মহল্লার হিসাবরক্ষককে মহালনবীশ/মহলানবিশ বলা হত। এটি ছিল মুঘল আমলের সরকারি পদ। পরে পদবী হিসেবে এর প্রচলন হয়। কায়স্থদের মধ্যে এই পদবীর প্রচলন বেশি।

মাজি – এই পদবীটির সাথে মাঝি বা নৌচালকের কোনও সম্পর্ক নেই বলেই মনে করা হয়। আদিবাসী সমাজে গ্রামের প্রধান বা মুখ্য ব্যক্তিকে ‘মাজি’ বলার চল ছিল। সম্ভবত, এই পদবীর উৎপত্তি সেখান থেকেই। সাধারণভাবে উগ্রক্ষত্রিয়, পৌন্ড্রক্ষত্রিয়, মাহিষ্য, সদগোপ, কৈবর্ত্ত, শবরদের মধ্যে মাজি পদবীটি পাওয়া যায়।

মান্না – মহারাণা থেকে মান্না এসেছে বলে মনে করা হয়। আবার মান্য থেকে মান্না এসেছে বলে একাংশের অনুমান।

মাল – মল্ল শব্দের অপভ্রংশ হিসেবে মাল এসেছে বলে মনে করা হয়। বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের থেকেই মল্ল/মাল পদবীর উৎপত্তি।

মালি/মালী – পেশাভিত্তিক পদবী। উদ্যানকার বা মাল্যকার পেশা থেকেই মালি/মালী পদবীর উৎপত্তি। মূলত মাহিষ্য, পৌন্ড্রক্ষত্রিয়, নমঃশূদ্র, ডোম, কুম্ভকার ইত্যাদি জাতির মধ্যে মালি/মালী পদবীটি চোখে পড়ে।

মাইতি – মাইতি পদবীর উৎপত্তি নিয়ে অনেকরকম মত পাওয়া যায়। একটি মত অনুসারে, ফার্সি শব্দ ‘মনতাহি’ বা ‘মুন্সিকী’ থেকে মাইতি এসেছে। এই অর্থে মাইতির সাথে মুন্সিয়ানা বা পাণ্ডিত্যের যোগ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, মহৎ বা মহত্তর থেকে মাইতি এসেছে। আবার অন্য একটি মতে, মহান্তি (দলপতি) থেকে মাইতি এসেছে। 

মালাকার – পেশাভিত্তিক পদবী। পেশা নিয়ে যদিও খানিক দ্বিমত রয়েছে। মাল্যকার বা উদ্যানকার পেশা থেকে মালাকার এসে থাকতে পারে। অথবা, প্রতিমাকে ডাকের সাজে সুসজ্জিত করতেন যে পেশার মানুষ তাঁদেরকে মালাকার বলা হত। সেখান থেকেও এই পদবীটি এসে থাকতে পারে বলে মনে করা হয়।

মিত্র – মূলত কায়স্থ পদবী। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, চিত্রগুপ্ত ছিলেন কায়স্থ। সেই বংশের রাজা ধর্মযজ্ঞ তাঁর এগারোজন পুত্রকে নৈমিষয়ারণ্যে আটজন ঋষির কাছে পাঠিয়েছিলেন শিক্ষার জন্য। যে ঋষির কাছে যে পুত্র গিয়েছিলেন সেই ঋষির গোত্র তিনি লাভ করেন এবং নিজ গুণ বা কাজের জন্য আলাদা আলাদা উপাধি পান। ধর্মযজ্ঞের এক পুত্র অতিক্রান্ত বিশ্বামিত্র মুনির আশ্রমে বিদ্যাশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন এবং মন্ত্রকুশলতার কারণে ‘মিত্র’ উপাধি লাভ করেন। পৌরাণিক মতে এই হল মিত্র পদবীর উৎস। নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, মিত্র পদবীটি বৌদ্ধ নামের শেষাংশ থেকে এসেছে।  

মিদ্দা/মিদ্যা – পেশাভিত্তিক পদবী। মিদ্যা/মিদ্যে/মিদ্দা কথার অর্থ নাবিক। নদী প্রধান বাংলায় একসময় এই পেশার কদর ছিল। বহু মানুষ এই পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী কালে মিদ্যা/মিদ্দা পদবী হিসেবে প্ৰচলিত হয়।

মিশ্র – বাংলায় প্রচলিত কিছু পদবী বাংলার নিজস্ব নয়, এসেছে আশপাশের রাজ্য থেকে। মিশ্র এরকমই এক পদবী যা এসেছে উড়িষ্যা থেকে। এটি মূলত ব্রাহ্মণদের পদবী।

মিস্ত্রি  – পেশাভিত্তিক পদবী। মিস্ত্রি শব্দের অর্থ কারিকর বা কারিগর। কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের পেশাকে এক কথায় মিস্ত্রি বলা হত। পদবীটি সেখান থেকেই এসেছে।

মুচি/মুচী – পেশাভিত্তিক পদবী। মুচি বলতে আমরা জুতো তৈরি ও মেরামতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের বুঝি। প্রাচীন ইরানীয় শব্দ ‘মুচ’ এবং পারসিক শব্দ ‘মোচক (Mocak)’ এর অর্থ হাঁটু অব্দি চামড়ার জুতো। মনে করা হয় এই শব্দগুলি ভারতে আসে ও গৃহীত হয়। যে ‘মোচক’ তৈরি করে তাকে ‘মোচিক’ বলার চল ছিল। এই ‘মোচিক’ থেকেই পরে চর্মকার অর্থে ‘মুচি’ বা ‘মোচি’ এসেছে। খেয়াল করার বিষয় যে মুচি একটি জাতি নাম। এই জাতির মানুষদের মধ্যেই পরে পদবী হিসেবে মুচি চালু হয়। 

মুদি/মুদী/মোদি – মুদি শব্দের ব্যাখ্যায় ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর (রবীন্দ্রনাথের ভাইপো, হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে) তাঁর ‘মুদীর দোকান’ বইয়ে লিখেছেন, ‘মুদী নামের ধাত্বর্থ হর্ষ; হর্ষ বা প্রাণের আনন্দজ্ঞাপক মুদ্ ধাতু হইতে ‘মুদী’ শব্দের উৎপত্তি’। তিনি আরও বলেছেন যে – চাল, ডাল, গৌধুম প্রভৃতি অন্ন বা ওষধির সাধারণ বৈদিক নাম ‘মুদ’। এই মুদ বা অন্ন যার বাড়িতে অথবা পণ্যশালায় আছে, তিনিই মুদি। এই মুদি শব্দটাই অন্য রাজ্যে মোদি রূপ নিয়েছে। সাধারণত তিলি, সদগোপ, ব্যগ্রক্ষত্রিয় ইত্যাদি জাতির মধ্যে মুদি পদবীটি চোখে পড়ে।

মুন্ডা – স্থানভিত্তিক পদবী। ‘মন্ডী’ থেকে মুন্ডা এসেছে বলে মনে করা হয়। পঞ্জাবের একটি জায়গার নাম ‘মন্ডী’। সেই অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের জাতিনাম সেই জায়গার নাম অনুসারেই। সেখান থেকেই পরে পদবীটি এসেছে।

মুন্সি/মুন্সী/মুনশী – পেশাভিত্তিক পদবী। আরবি শব্দ মুন্সি-র অর্থ কেরানি/লেখক। এঁরা মূলত লেখাপড়ার কাজ করতেন, বিচারের সময় জবানবন্দী লিখে রাখতেন। মুন্সি মুঘল যুগে একটি সরকারি পদ ছিল। মুন্সি পদবীটি মূলত ব্ৰাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থদের মধ্যে দেখা যায়।

মুর্মু – প্রাণিবাচক পদবী। আদিবাসী সমাজে গোত্রের প্রচলন ব্যাপক। দেখা গেছে যে গোত্রের নামগুলো  গাছপালা, জীবজন্তু বা জড় পদার্থের নাম থেকে আসে। এই গোত্রনাম পদবী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মুর্মু (সম্বর হরিণ) তেমনই এক প্রাণিবাচক পদবী।

মুখোপাধ্যায়/মুখার্জি/মুখুজ্যে – স্থানভিত্তিক পদবী। এসেছে গাঞি নাম অনুসারে। কথিত আছে যে আদিশুরের পৌত্র ক্ষিতিশুর ছাপ্পান্নজন ব্রাহ্মণকে ছাপান্নটি আলাদা আলাদা গ্রাম থাকার জন্য দান করেছিলেন। যিনি যে গ্রামে থাকতেন তিনি ও তাঁর উত্তরপুরুষেরা সেই গ্রামের নামে পরিচিত হতেন। সেই ছিল তাঁদের গ্রামীণ বা গাঞি নাম। আদি পদবী ছিল মুখ, বাঁকুড়া জেলার অম্বিকা পরগণার মুকটি গ্রামের নাম অনুসারে। আচার, বিদ্যা, বিনয়, প্রতিষ্ঠা, তীর্থদর্শন, নিষ্ঠা, আবৃতি, তপঃ ও দান – এই নয়টি গুণের অধিকারী ব্রহ্মণদের মূল উপাধি ‘উপাধ্যায়’ এর সাথে গাঞি নাম যুক্ত হয়ে মুখোপাধ্যায় হয়েছে। মুখ বা মুখুটির সাথে ওঝা (উপাধ্যায় থেকে ওঝা) জুড়ে মুখুওঝা -> মুখুজ্যে হয়েছে। মুখার্জি এসেছে ইংরেজদের ভ্রান্ত উচ্চারণের দরুণ। শুধু ব্রাহ্মণদের মধ্যেই এই পদবী দেখা যায়।

মুস্তাফি – পেশাভিত্তিক পদবী। দেওয়ানি সেরেস্তার সেরেস্তাদারদের মুস্তাফি বলা হত। এঁরা ছিলেন মুঘলযুগের ‘বড়বাবু’ বা ‘হেডক্লার্ক’। রাজস্বের হিসেব পরীক্ষা করা ছিল এঁদের কাজ। এই পদ থেকেই পদবীর উদ্ভব।

মুহুরি/মুহুরী – পেশাভিত্তিক পদবী। আরবি শব্দ ‘মুহররির’ থেকে মুহুরি এসেছি। এঁরা ছিলেন কেরানি, হিসেবের খাতা লেখার কাজ করতেন। এই পেশাগত পরিচিতি পরে পদবীতে পরিণত হয়েছে।

মৈত্র – স্থানভিত্তিক পদবী। এসেছে গাঞি নাম অনুসারে। কথিত আছে যে আদিশুরের পৌত্র ক্ষিতিশুর ছাপ্পান্নজন ব্রাহ্মণকে ছাপান্নটি আলাদা আলাদা গ্রাম থাকার জন্য দান করেছিলেন। যিনি যে গ্রামে থাকতেন তিনি ও তাঁর উত্তরপুরুষেরা সেই গ্রামের নামে পরিচিত হতেন। সেই ছিল তাঁদের গ্রামীণ বা গাঞি নাম। মৈত্র গ্রামের নাম থেকে মৈত্র পদবীটি এসেছে। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন যে, মিত্র বা মিত্র সম্বন্ধীয় থেকে মৈত্র এসেছে। আবার এই পদবীতে বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে বলে অনেকের অনুমান। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই পদবীটি দেখা যায়।
মৌলিক – আভিধানিক অর্থ মূল সম্বন্ধীয়। এই পদবীর তেমন নির্ভরযোগ্য উৎস পাওয়া যায় না। বংশগত বিভাজনের ইতিহাসে ‘মৌলিক’ একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে চিহ্নিত। মনে করা হয় যে অন্য কোনও বংশধারার সঙ্গে এঁদের সামাজিক লেনদেন ছিল না। কিন্তু, মজার ব্যাপার এই যে প্রায় সব জাতির মধ্যেই মৌলিক পদবীটি দেখা যায়।

পদবীর উৎস

পদবীর উৎস (বর্ণ – ব) পদবীর উৎস (বর্ণানুক্রমিক য থেকে শ বর্ণ)

সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. বঙ্গীয় শব্দকোষ – হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  2. আমাদের পদবীর ইতিহাস – লোকেশ্বর বসু
  3. পদবীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস – শ্রীখগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
  4. বাংলার পদবি কথা – দেবাশিস ভৌমিক

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading