সববাংলায়

বিদ্যাসাগরের রসিকতা

বিভাগঃ ,

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যার সাগর ছিলেন একথা সকলেই জানি। তিনি দয়ারসাগর বা করুণাসাগর এও আমরা জেনে এসেছি। সেই একগুঁয়ে, এক রোখা মানুষটি যে রসিকতাতেও কম যেতেন না এই কথা কিন্তু খুব একটা প্রচারিত নয়। তাঁর জীবন কাহিনী ঘেঁটে দেখলে তাঁকে রসসাগর বা রসিকরাজ আখ্যা দিলেও বোধহয় ভুল হতো না। আসুন এখানে বিদ্যাসাগরের রসিকতা নিয়ে কয়েকটি কাহিনী জেনে নেওয়া যাক।

বিদ্যাসাগরের বিয়ে –

প্রথমেই শুরু করা যাক তাঁর বিবাহবাসরের কথা দিয়ে। বিদ্যাসাগরের বিয়ে হয়েছিল ১৮৩৫ সালে অর্থাৎ মাত্র ১৫ বছর বয়সে। সেই বিবাহবাসরে একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল যা বিদ্যাসাগর পরবর্তীকালে অন্য একটি বিবাহবাসরে বন্ধুদের বলেছিলেন। আসুন, শুনে নিই বিদ্যাসাগর মহাশয় কী বলেছিলেন সেই আসরে।

বন্ধুর বাড়ীতে সেই বিবাহবাসরে নানা বিষয়ে আড্ডা-রসিকতা হচ্ছিল। এমন সময় বিদ্যাসাগর মহাশর বললেন :-“আজ কাল বিবাহে আর তেমন আমোদ নাই। ৰৱকেও তেমন সঙ্কট পরীক্ষায় আজ কাল আর পড়িতে হয় না।” তখন কেউ কেউ সেই সময়ের গল্প এক আধটা বলবার জন্য অনুরোধ করল, তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় বললেন : — ” এখন আর কি আছে? সে কালে বর বাসর ঘরে প্রবেশ করিতে না করিতে তাকে তার ক’নে খুঁজিয়া লইতে হইত। ছাল্‌না তলার শুভ দৃষ্টির সময়ে একটী বার চারিচক্ষে দেখা হয় কিনা সন্দেহ, সেই দেখায় বাসর ঘরে আসিয়া ক’নে খুঁজিয়া বাহির করা কিরূপ কঠিন কাজ! আমার বিবাহের সময়ে বাসর ঘরে পা দিতে না দিতে আমাকে বলিল, ‘তোমার ক’নে খুঁজিয়া বাহির কর।” ক’নে খুঁজিয়া বাহির করিতে হইৰে শুনিয়া মহা মুস্কিলে পড়িলাম। আমি দেখিলাম সেই মেয়ের দঙ্গলের ভিতর থেকে আমার সেই অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনীকে খুঁজিয়া বাহির করা আমার কৰ্ম্ম নয়— আমি ভাৰিয়া চিন্তিয়া শেষে আমারই বরসের বেশ একটী টুকটুকে ফরশা মেয়েকে ধরিয়া বলিলাম, ‘এই আমার ক’নে’। যেমন ধরা অমনি এক মহা গণ্ডগোল পড়িয়া গেল। কে কার ঘাড়ে পড়ে, কে কোথা দিয়া পলাইবে তার পথ পায় না। আমি যাকে ধরিছি, তাকে খুবই ধরিছি, তার আর পলাইবার উপায় নাই ! আমি তার হাত ধরিয়া বলিলাম, ‘তুমিই আমার কানে ; তোমাকে হ’লেই আমার ঘর চলবে। আমি আর অন্য ক’নে চাই না।” সে মেয়েটীত বাপরে মারে গেলুমরে বলিয়া চীৎকার শুরু করিল। গিন্নীবান্নী গোছ দুই একজন নিকটে আসিয়া বলিল, ‘ও তোমার ক’নে নয়, ওকে ছেড়ে দাও।’ আমি বলিলাম, ‘ছাড়িব কেন ? খুঁজে নিতে বলেছ, আমি খুঁজিয়া এইটীকেই বাহির করিয়াছি, এইটী হ’লেই আমার বেশ মনের মত হবে’। তার পর সেই মেয়েটী হাতে পায়ে ধরিয়া বলিল,’আচ্ছা আমাকে ছাড়িয়া দাও, আমি তোমার ক’নে বা’র ক’রে দিচ্চি’। তখন আপনারাই ক’নে আনিয়া হাজির করিল।” বিবাহ-বাসর সঙ্কটে বিদ্যাসাগর মহাশয় পরিহাসপ্রিয় আত্মীয় স্বজনের হাত থেকে এইভাবে ছাড়া পেয়েছিলেন, বলাবাহুল্য এরপর আর তাঁকে কেউ ঘাঁটাবার সাহস করেনি।

ছাত্র বিদ্যাসাগরের রসিকতা

বিদ্যাসাগরের রসিকতা নিয়ে ছাত্রজীবনের আরেকটি কাহিনীর কথা বলা যাক। কলেজে কাব্য শাস্ত্রের অধ্যাপক জয়গোপাল তর্কালঙ্কার মহাশয় একবার “গোপালায় নমোহস্তু মে” এইটাকে চতুর্থ চরণ করে সকলকে শ্লোক রচনা করতে বললেন, বিদ্যাসাগর মহাশয় তৎক্ষণাৎ পণ্ডিত মহাশয়কে জিজ্ঞাসা করলেন : “মহাশয়, কোন্ গোপালের বিষয় বর্ণনা করিব? এক গোপাল আমাদের সম্মুখে উপস্থিত রহিয়াছেন, আর এক গোপাল বহুকাল পূর্ব্বে বৃন্দাবনে লীলা করিয়াছিলেন। এ দুজনের কোনটী ?” ছাত্রের এই সহজাত রসিকতায় যোগ দিয়ে পন্ডিত মহাশয় বললেন,  “বেশ বেশ, বৃন্দাবনের গোপালের বর্ণনা কর।”

ভোজনপ্রিয় বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর বেশ ভোজনপ্রিয় ছিলেন। তিনি খেতে এবং খাওয়াতে খুবই ভালবাসতেন। এবারের ঘটনাগুলি সেই খাওয়াকে নিয়েই।

তিনি জনা দশেক বন্ধুকে নিয়ে একটি সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন – সংস্থার নামে “ভোজন সভা”। এই সংস্থার কাজ ছিল ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে হঠাৎ দল বেঁধে গিয়ে খেতে চাওয়া। এই সংস্থার নাম অচিরেই ছড়িয়ে পড়েছিল ঘনিষ্ঠ মহলে। তাই প্রত্যেকেই ভয়ে ভয়ে থাকতেন — এই বুঝি ভোজনসভার সভ্যরা এলো!

একবার এক কান্ড ঘটল। ভোজনসভার সভ্যরা দল বেঁধে এক বন্ধুর বাড়িতে বেশ ঘটা করে খাওয়া দাওয়া করল। খাওয়া-দাওয়ার পরের দিন সংস্থার এক সভ্যর পেটের অসুখ হল। বেশ কয়েকদিন তার দেখা নেই। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে সভ্যটি ভোজনসভার বন্ধুদের কাছে এলো। বলাবাহুল্য বন্ধুরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাসা করতে লাগল। তার উদ্দেশ্যে সবাই বললেন, এ বড়ো পেট-রোগা! ভোজনসভার সভ্য হওয়ার উপযুক্ত নয়। একে সংস্থা থেকে বাদ দেওয়া উচিত।

এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন বিদ্যাসাগরমশাই। এবার তিনি মুখ খুললেন। হাসতে হাসতে বললেন, “না হে না, তোমরা ঠিক বলছো না, ওই তো আমাদের মধ্যে একমাত্র সভ্য যে আদর্শের জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে উদ্যত। ওকে ভোজনসভা থেকে কোনো মতেই বাদ দেওয়া যায় না।’

বিদ্যাসাগরের রসিকতা শুনে সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন।

খাদ্য রসিক বিদ্যাসাগরের আরেকটি গল্প শোনাই। আগেই বলেছি, তিনি খেতে ও খাওয়াতে খুবই ভালবাসতেন। কখনো কখনো তিনি অতিথিদের নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতেন। খাদ্যসামগ্রী পরিবেশনের সময় তিনি ছড়া কেটে বলতেন :

‘হুঁ হুঁ দেয়ং হাঁ হাঁ দেয়ং দেয়ঞ্চ করকম্পনে
 শিরসি চালনে দেয়ং ন দেয়ং ব্যাঘ্রঝম্পনে।’

অর্থাৎ পরিবেশনের সময় যিনি খাচ্ছেন তিনি যদি হুঁ হুঁ করে বা হাঁ হাঁ করে খাবার দিতে বারণ করেন তখন খাবার দিতে হবে, হাত নেড়ে বা মাথা নেড়ে বারণ করলেও খাবার দিতে হবে। কেউ যদি থালার উপর লাফিয়ে পড়ে থালা আড়াল করে বারণ করে তবেই খাবার দেওয়া যাবে না। 

অতিথিরা স্বভাবতই বিদ্যাসাগরের এই রসিকতায় মজা পেতেন।

মদ খেতে অর্থব্যয়

বিদ্যাসাগর নাকি মদ খেতেও টাকা দিতেন – আসুন সেই নিয়েই একটি মজার ঘটনা শুনি।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদেশে থাকাকালীন আর্থিক অনটনে পড়েছিলেন। বিদেশে অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন কবি, এই খবর কানে এল বিদ্যাসাগরের। করুণাসাগর বিদ্যাসাগরের মন কেঁদে উঠল মাইকেলের দুর্দশার কথা শুনে। কবি বন্ধুর দুর্দিনে বিদ্যাসাগর মাসে মাসে টাকা পাঠিয়ে দিতেন। এই খবর শুনে একদিন এক ভদ্রলোক বিদ্যাসাগরের কাছে এসে বললেন, ‘পণ্ডিতমশাই, আপনি নাকি মধুসূদনকে টাকা পাঠাচ্ছেন ?’ বিদ্যাসাগর বললেন, ‘ হ্যাঁ পাঠাচ্ছি।’ ওই ব্যক্তি বললেন, “ওকে টাকা পাঠান কেন?’ বিদ্যাসাগর বললেন, ‘ওর টাকার দরকার বলেই পাঠাই।’ ব্যক্তিটি এবার বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনি কি জানেন, মধুসূদন ওই টাকা দিয়ে কী করবে?’ বিদ্যাসাগর বললেন, ‘হ্যাঁ জানি তো, ও মদ খাবে।’ ব্যক্তিটি বলে উঠলেন, ও মদ খাবে জেনেও আপনি ওকে টাকা দিচ্ছেন?’ বিদ্যাসাগর উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ জেনেও দিচ্ছি।’ ব্যক্তিটি কিঞ্চিৎ রেগে বললেন, ‘আপনি তাহলে মদ খাওয়ার জন্য টাকা দেন?’ বিদ্যাসাগর মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, দিই, তবে জায়গা বিশেষে।’ ব্যক্তিটি এবার উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘আমি যদি মদ খাই আমাকেও টাকা দেবেন?’ বিদ্যাসাগর বললেন, ‘নিশ্চই দেব, নিশ্চই দেব।’ ব্যক্তিটি দ্বিগুণ উৎসাহে বললেন, ‘কই টাকা দিন তাহলে – ‘ বিদ্যাসাগর হেসে বললেন, ‘তোমাকে মদ খাওয়ার জন্য টাকা তো দেব, তার আগে তুমি একটা ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ লেখ দেখি।’

উপযুক্ত জবাব পেয়ে ভদ্রলোক পালাবার পথ পেলেন না!

শুঁড় তোলা চটি

বিদ্যাসাগর খুবই সরল সাধারণ জীবন পালন করতেন। সেই নিয়ে কেউ মজা করতে এলে তিনিও উপযুক্ত জবাব দিতে ছাড়তেন না। সেরকমই এক কাহিনী শুনুন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিয়মিত বিভিন্ন সাহিত্য সভায় যেতেন। এক সাহিত্য সভায় তাঁর দেখা হল সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। বঙ্কিমচন্দ্র সেই সভায় যথারীতি সৌখিন পোশাক পরে গেছেন কিন্তু বিদ্যাসাগরের সেই চির পরিচিত পোশাক। গায়ে মোটা চাদর এবং পায়ে এক জোড়া শুঁড় তোলা চটি। বিদ্যাসাগরের চটির দিকে চোখ যেতেই সেদিকে অঙ্গুলি তুলে বঙ্কিমচন্দ্র রসিকতা করে বললেন, ‘পন্ডিতমশাই, আপনার চটির শুঁড় তো দেখছি ক্রমশই ওপরের দিকে উঠছে। দেখবেন, শেষে মাথায় গিয়ে না ঠেকে।

‘রসিক’ বিদ্যাসাগরও কম যান না! তিনি হাসতে হাসতে বঙ্কিমচন্দ্রকে বললেন, ‘কী আর করা যায় বলো! চট্টরা যতই পুরনো হয় ততই দেখি বঙ্কিম হয়ে ওঠে!’

বামুনের বামনাই

বিধবা বিবাহ প্রচলন, স্ত্রী শিক্ষার প্রচলন ইত্যাদি বহু প্রথাবিরোধী কাজ করেছেন বিদ্যাসাগর। তিনি প্রাচীন কুসংস্কার মানতেন না। সেই প্রথাবিরোধের একটি কাহিনী শোনাই।

বিদ্যাসাগরের কাছে সব ধরনের মানুষ দেখা করতে আসতেন। সেরকমই একদিন তাঁর সঙ্গে এক ব্রাহ্মণ দেখা করতে এলেন। সেই ব্রাহ্মণ ছিলেন গোঁড়া। তিনি অন্যান্যদের প্রণাম পাওয়ার রীতিতে অভ্যস্ত ছিলেন। বিদ্যাসাগর নিজে যদিও ব্রাহ্মণ সন্তান হলেও তিনি এই প্রথার বিরোধী ছিলেন। সেই ব্রাহ্মণ আশা করেছিলেন, বিদ্যাসাগরের অনুগামীরা তাঁকে প্রণাম করবেন। কিন্তু বিদ্যাসাগরের একজন অনুগামীও ব্রাহ্মণটিকে প্রণাম করলেন না। অসন্তুষ্ট সেই ব্রাহ্মণ বিদ্যাসাগরকে বললেন, ‘এই সব অর্বাচীনরা কি জানে না যে, ব্রাহ্মণরা বেদজ্ঞ, বর্ণশ্রেষ্ঠ। একসময় তাঁরা দেশের কল্যাণ সাধন করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই প্রণম্য?’

গম্ভীর মুখে সব শুনে বিদ্যাসাগর বললেন, ‘মশাই, এক সময় শ্রী বিষ্ণু বরাহ অবতার রূপে মর্ত্যে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই বলে কি ডোমপাড়ার সব শুকরদের দেখলেই মাথানত করে প্রণাম করতে হবে?’

বিদ্যাসাগরের এই কথা শুনে ব্রাহ্মণত্ব নিয়ে বড়াই করা ব্রাহ্মণের মুখটি দেখার মত হয়েছিল!

এই প্রথা নিয়েই আরেকটি রসিকতার কথা শোনা যাক।

ডিরোজিওর ছাত্র রামতনু লাহিড়ী ছিলেন ইয়ং বেঙ্গল-এর সভ্য। এক সময় বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়। রামতনু লাহিড়ী পিতার নিষেধ না শুনে ব্রাহ্ম হয়ে কাশীতে গিয়ে পৈতে ফেলে আসেন। এমনকি পিতার সঙ্গে তর্ক করে আলাদা বাড়িতে থাকতেও শুরু করেন। এমনই এক সময় বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা হলে রামতনু বললেন, ‘ওহে বিদ্যাসাগর, তুমি আমাকে একটা রাঁধুনি যোগাড় করে দিতে পারো? রাঁধুনি যেন বামুন হয় বুঝলে?’

বিদ্যাসাগর বললেন, ‘কেন হে, তোমার আবার বামুনের দরকার কেন? বাবুর্চি খানসামা হলেও তো চলে।’

রামতনু বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার ওতে কোনো আপত্তি নেই বটে, কিন্তু বাড়ির ভেতর বামুন ছাড়া যে চলবে না।’

বিদ্যাসাগর হাসতে হাসতে এবার বললেন, ‘বাপের কথায় পৈতেগাছাটা রাখতে পারলে না। এখন পরিবারের কথায় বেরিয়েছ বামুন খুঁজতে ?”

আসলে বিদ্যাসাগর তাঁর পিতা-মাতা ঠাকুরদাস ও ভগবতী দেবীকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর কাছে পিতা-মাতা সবার আগে, অন্য কিছু তার পরে। তাই কেউ পিতা-মাতার আদেশ অমান্য করলে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন। তাই রামতনু লাহিড়ীকে বিদ্যাসাগর খোঁচা দেওয়ার সুযোগটি হাত ছাড়া করেননি।

স্নান পর্ব

বিদ্যাসাগর মহাশয় খুনসুটি অরার সুযোগ পেলে তার পূর্ণ ব্যবহার করতেন। সেরকম একটি কাহিনী শোনাই – ‘বান্ধব’ পত্রিকার সম্পাদক রায় বাহাদুর কালিপ্রসন্ন ঘোষ একবার এসেছেন বিদ্যাসাগরের বাড়িতে। গৃহস্বামী বিদ্যাসাগর অতিথির আপ্যায়নের ত্রুটি রাখলেন না। বিভিন্ন পদের খাবার রান্না হল কালিপ্রসন্নর জন্য। কালিপ্রসন্ন স্নান করবেন। এই সময় বিদ্যাসগর একটু রসিকতা করার সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। বাড়ির কাজের লোকটিকে ডেকে বললেন, ‘ওহে শোনো, আজ বাড়িতে যে বাবুটি এসেছেন, তিনি লোক ভাল, তবে মাথায় ছিট আছে। একটু বেশি জল তাঁর মাথায় ঢাললেই তিনি তোমায় জল ঢালতে বারণ করে দিতে পারেন। কিন্তু সাবধান! তুমি তাঁর কথায় কান দেবে না। বরং আরো বেশি বেশি জল ঢালতে থাকবে। বুঝলে?”

ওদিকে বিদ্যাসাগর কালিপ্রসন্নকে আলাদা ডেকে বললেন, “মশাই, আমার চাকরটা এমনিতে বেশ ভাল, কিন্তু তার একটাই বাতিক – কাউকে স্নান করাতে হলে তার মাথায় খুব বেশি জল ঢালে। যদি বারণ করা হয় তাহলে সে আরো বেশি বেশি জল ঢালতে থাকে। আপনি দয়া করে একটু সহ্য করে নেবেন’।

এবার শুরু স্নানপর্ব। কালিপ্রসন্ন স্নান করতে এলেন। চাকরটি খুব জল ঢালছে দেখে তিনি বিরক্ত হয়ে চাকরটিকে বললেন, ‘এত জল ঢালছ কেন?’ কালিপ্রসন্ন তাকে বেশি জল ঢালতে নিষেধ করলেন, কিন্তু চাকরটি ভাবল, সত্যিই বুঝি বাবুর মাথায় ছিট আছে! এই ভাবা মাত্র সে কালিপ্রসন্নর মাথায় আরো জল ঢালতে লাগল। এদিকে চাকরের জল ঢালা দেখে কালিপ্রসন্ন ভাবলেন, বিদ্যাসাগরমশাই ঠিকই বলেছেন, চাকরের তাহলে জল ঢালা বাতিক আছে!

চাকরের জল ঢালা নিয়ে কালিপ্রসন্নর নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে বিদ্যাসাগর মহাশয় শিশুর মতো হাসতে থাকলেন।

ঘরোয়া বৈঠকে রসিকতা

বিদ্যাসাগরের শেষ জীবন বেশ দুঃখেই কেটেছিল। আত্মীয়-পরিজনদের থেকে নানান মানসিক আঘাত, মাতৃ বিয়োগ, পিতৃবিয়োগ, পত্নী বিয়োগ ইত্যাদি মৃত্যু যন্ত্রণা মিলিয়ে জীবনের শেষ কয়েকটা বছর বেশ দুঃখ কষ্টেই কাটে এসব কথা আমরা কম বেশি অনেকেই জানি। এরই মধ্যে কিছুটা সুখের আবহ ছিল যখন বাদুড়বাগানের বাড়িতে কন্যা এবং তাঁদের ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে থাকতেন। এই সময় মাঝে মাঝে বিদ্যাসাগরের বসার ঘরে পরিবারের সকলে মিলিত হতেন। মেয়েরা এক এক কোণে এক এক জন দাঁড়াতেন আর নাতিরা ডানে, বামে ,সামনে পিছনে ঘিরে ধরত। বিদ্যাসাগর মহাশয় সকলকে নিয়ে নানা গল্প শোনাতেন। মাঝে মাঝে সকলেই তাঁর চর্বিত পানের ভাগ পাওয়ার আশায় থাকতেন। সবাইকে একবারে দেওয়া সম্ভব হত না বলে মাঝে মাঝে অল্প করে দিতেন। তাঁর প্রসাদী পান পাওয়াটা মেয়ে ও নাতিদের কাছে একটা বিশেষ সম্মানলাভের ব্যাপার ছিল। প্রসাদের দাবিদার হলেই বলতেন, ‘আচ্ছা একটু বিলম্ব কর, সম্বরা দিই’। এর মানে হল, পান খেতে খেতে একবার তামাক খেতে হবে। পানে সম্বরা দিয়ে তারপর সকলকে অল্প অল্প করে পান দিতেন। এদের মধ্যে সকলের ছোট নাতি, রামকমল তাঁর খুব প্রিয় ছিল। এই শিশুটিই এরকম সান্ধ্য আসর জমিয়ে রাখত। বিদ্যাসাগর তাকে উপহার দেওয়ার জন্য সিকি, দুআনি, আধুলি ও টাকা সবসময় নিজের সঙ্গে রাখতেন। বাচ্চাটি চাইলেই বিদ্যাসাগর তাকে দিতেন। বাচ্চাটিকে তিনি জিজ্ঞাসা করতেন, “দাদা, তুমি কাকে ভালবাস?” বাচ্চাটি বলত, “দাদা মশাই, তোমাকেই খুব ভালবাসি। আর তোমার চেয়ে তোমার ঐ নতুন নতুন সিকি, আধুলি, টাকা বেশি ভালবাসি”। বিদ্যাসাগর মহাশয় বলতেন, “সকলেই তাই করে, তবে তুমি বোঝ না তাই বলে ফেল, অন্যেরা স্বীকার করে না।”

এই রকমই ছিলেন আমাদের বিদ্যাসাগর, কখনও রসিকতার মাধ্যমে রূঢ় বাস্তবকে তুলে ধরেছেন অথবা কখনও শিশুর মতো সরল রসিকতা করেছেন।


লেখক : সম্বিত শুক্লা
সম্বিত শুক্লার জন্ম পূর্ব বর্ধমান জেলার মানকর গ্রামে। মানকর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে বিদ্যালয়ের পড়াশোনা করেন ও ন্যাশানাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় প্রায় দুই দশক ধরে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি সববাংলায় এর মুখ্য কার্য নির্বাহক, প্রধান সম্পাদক ও টেকনিক্যাল বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও লেখালিখি ও বিভিন্ন সামাজিক গঠনমূলক কাজে যুক্ত রয়েছেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1.  বিদ্যাসাগর, শ্রীচন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃতীয় সংস্করণ, ১৯০৯
  2. বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গ, শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading