ইতিহাস

ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন

ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন

ভারতবর্ষে প্রাচীনকালে রাজ-রাজড়াদের শাসন কায়েম ছিল আর এইসব রাজারা নিজেদের দেশীয় রাজ্যগুলিকে শাসন করতেন। সকলের উপরে কর্তৃত্বে ছিল ব্রিটিশ সরকার। সিপাহি বিদ্রোহের সময় ইতিহাসে দেখা যায় অযোধ্যা, সিতারা ইত্যাদি রাজ্যগুলিকে দেশীয় করদ রাজ্যে পরিণত করেছিলেন ব্রিটিশরা। এর অর্থ হল শাসনভার রাজাদের হাতে থাকলেও সেইসব রাজাকে বাধ্যতামূলকভাবে ব্রিটিশ সরকারকে কর দিতে হতো। দেশ স্বাধীনের সময় ব্রিটিশরা যখন ভারত বিভাজন করলো, পাকিস্তান আর ভারতবর্ষের বিভাজনের পর্বে এমনই কিছু কিছু দেশীয় রাজ্য কার সঙ্গে যুক্ত হবে সেই বিষয়ে দেশীয় রাজাদের সঙ্গে ব্রিটিশদের চুক্তি হল।  এমনই একটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হল ‘ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন’(Instrument of Accession)। আর এই চুক্তির মাধ্যমেই প্রথম ১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর প্রদেশকে ভারতীয় মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এই চুক্তিই পরবর্তীকালে জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ব্রিটিশ শাসন চলাকালীন ভারতে ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য ছিল যেগুলি পুরোপুরি ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং সেখানে কোনোদিনই ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়নি। অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির মাধ্যমে এই সব রাজ্যগুলি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইতিহাসে আমরা অনেকেই পড়েছি ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড ওয়েলেসলি বহু দেশীয় রাজ্যকে একপ্রকার বাধ্য করেছিলেন এই অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি স্বীকার করে নিতে। ব্রিটিশ ভারতেই ‘গভর্নমেন্ট অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯৩৫’ প্রথম পাশ হয় যে আইনে বলা হয় এই দেশীয় রাজ্যগুলি নিজেদের সম্মতিক্রমে অখণ্ড ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কিন্তু দেশীয় রাজ্যের রাজারা প্রথমে এই যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার তীব্র বিরোধিতা করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তারা ক্রমেই এই ধারণায় বিশ্বাসী হয় এবং একে একে এই আইনি চুক্তিতে সম্মত হয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা পাকাপাকিভাবে ভারতবর্ষ ছেড়ে যেতে সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময়েই ভারতের সব দেশীয় রাজ্যগুলির ভবিষ্যৎ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পর্যবসিত হয়। তারা নিজেরা নিজেদের মতো করে সদ্যগঠিত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভাজিত হতে পারবে না। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ইণ্ডিয়ান ইণ্ডিপেণ্ডেন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী সকল দেশীয় রাজ্যের উপর ব্রিটিশের শাসন ও আধিপত্য খর্ব করা হয়। এর ফলে দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পূর্ণভাবে স্বাধীনতা লাভ করে, যদিও তাদের মধ্যে অধিকাংশ রাজ্যই নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, আর্থিক সাহায্য ও অন্যান্য পরিকাঠামোর জন্য ভারত সরকারের উপর নির্ভরশীল ছিল। দেশীয় রাজ্যগুলি স্বাধীন হওয়ার পরে দেশীয় রাজাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে তারা ভারত নাকি পাকিস্তান কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়।

এর ফলেই ভারত সরকার ও দেশীয় রাজ্যের রাজাদের মধ্যে এই ‘ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যার ফলে দেশীয় রাজ্যগুলির বন্টন ও একীভূতকরণ সহজ হয়। বহু দেশীয় রাজ্য এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। তবে তার মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটে জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে যা ভারতীয় ইতিহাসে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের জন্ম দেয়। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার অনুমোদন দেন। ২৭ অক্টোবর, ১৯৪৭ তারিখে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন জম্মু ও কাশ্মীরের এই একীভূতকরণে সম্মতি জানান। মহারাজা হরি সিং ও মাউন্টব্যাটেনের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্রটির বয়ান এখানে দেওয়া হল –

“ইণ্ডিয়ান ইণ্ডিপেণ্ডেন্স অ্যাক্ট, ১৯৪৭ অনুযায়ী স্বাধীন ভারতে ব্রিটিশ আধিপত্য খর্ব হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। গভর্নমেন্ট অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯৩৫ অনুযায়ী ভারতের গভর্নর জেনারেলের অনুমতিক্রমে দেশীয় রাজ্যগুলি বাতিল, সংযোগ, আত্তীকরণ এবং পুনর্নির্মাণ ইত্যাদির মাধ্যমে ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

গভর্নর জেনারেলের অনুমতিক্রমে গভর্নমেন্ট অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯৩৫ অনুযায়ী কোনো দেশীয় রাজ্য তার শাসক রাজার সম্মতিক্রমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশনের সাহায্যে।

এখন, এতদুপলক্ষে আমি শ্রী ইন্দ্র মহেন্দ্র রাজরাজেশ্বর মহারাজাধিরাজ শ্রী হরি সিংজী, জম্মু ও কাশ্মীর নরেশ তথা তিব্বতাদি দেশের অধিপতি, জম্মু ও কাশ্মীরের শাসক আমার সার্বভৌমত্বের বলে আমার শাসিত রাজ্য ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন চুক্তি স্বীকার করছে এবং –

১. এতদ্বারা আমি ঘোষণা করছি যে আমি ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হতে সম্মত এবং ভারতের গভর্নর জেনারেল, অধিরাজ্যের আইনসভা, ফেডেরাল আদালত ও অন্যান্য ডোমিনিয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে এই ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশনে আমি চুক্তিবদ্ধ হলাম। গভর্নমেন্ট অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯৩৫ আইন বলে আমার রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে স্বাধীন ভারতীয় ডোমিনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হল।

২. এই চুক্তির বাধ্য-বাধকতা সম্পর্কে আমি অবগত এবং সেই নিয়মবিধি মেনেই আমি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছি।

৩. অধিরাজ্যের আইনসভা নিজ কর্তৃত্ববলে এই রাজ্যের উপর সমস্ত প্রকার আইনবিধি চালু করতে পারে এবং এই বিধিতে আমি সম্মত।

৪. যদি কোনো সময় ভারত সরকার কোনো নতুন আইন বলবৎ করে তা এই রাজ্যের উপরেও কায়েম হবে এবং জম্মু ও কাশ্মীর সেই আইন বিনা বাক্যব্যয়ে স্বীকার করবে।

৫. এই ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশনের নিয়মাবলীতে কোনো পরিবর্তন করা হবে না যদি না আমার সম্মতিক্রমে গভর্নমেন্ট অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্টে কোনো পরিবর্তন সাধন হয়। কিংবা যদি এই চুক্তির সঙ্গে ইন্সট্রুমেন্ট সাপ্লিমেন্টারি কার্যকর করা না হয় তাহলে কোনোরকম পরিবর্তন করা হবে না।

৬. এই চুক্তি অনুযায়ী কখনোই অধিরাজ্যের আইনসভা নির্দিষ্ট কারণে বাধ্যতামূলকভাবে এই ভূখণ্ড দখল করতে পারবে না। তবে ডোমিনিয়নের বিশেষ প্রয়োজনে এই ভূখণ্ড আইনি হস্তক্ষেপে আমি তুলে দিতে বাধ্য থাকবো। তাদের অনুরোধেই আমি তাদের অর্থসাহায্যে এই ভূখণ্ড অধিকার করবো অথবা যদি আমার অধিকারে থাকে তাহলে তা হস্তান্তর করবো। ভারতের মুখ্য বিচারপতি কর্তৃক নির্বাচিত একজন সালিশিকারী মারফত এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে।

৭. এই চুক্তিবলে এমন কোনো বাধ্য-বাধকতা আমার উপরে সৃষ্টি করা হবে না যা ভবিষ্যতের ভারতীয় সাংবিধানিক আইনকে মানতে বাধ্য করে। ভবিষ্যতের কোনো প্রকার সাংবিধানিক পরিবর্তন আমি মেনে নিতে বাধ্য থাকবো না।

৮. আমার সার্বভৌমত্ব এই রাজ্যের মধ্যে ও বাইরে যেমন ছিল, তেমনই অটুট থাকবে। এই রাজ্যের শাসক হিসেবে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও অধিকার ভোগ করেছি এবং এখন থেকে এই রাজ্যে ভারতীয় সংবিধানের যে কোনো আইনই বৈধ বলে স্বীকৃত হবে।

৯. এতদ্বারা আমি ঘোষণা করছি, এই রাজ্যের পক্ষে এই চুক্তি আমি মেনে নিচ্ছি এবং বংশপরম্পরায় আমার উত্তরাধিকারীরাও এই চুক্তি মানতে বাধ্য থাকবে।”

এই বয়ানের নীচে মাউন্টব্যাটেন এবং মহারাজা হরি সিং-এর স্বাক্ষর ছিল। এই চুক্তিতে বলা হয় কাশ্মীরের ভূখণ্ড থেকে সমস্ত অনুপ্রবেশকারীদের সরিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং তারপর কাশ্মীরের বাসিন্দাদের গণভোটের রায়ে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারন করা হবে। যে সময় এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়, তখন কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হিন্দু এবং প্রজারা ছিলেন মুসলিম। অন্যদিকে ভারতের আরেকটি দেশীয় রাজ্য জুনাগড়কে নিয়েও একটি বিতর্ক তৈরি হয় ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশনকে ঘিরে। জুনাগড়ের নবাব ছিল মহম্মদ মহবত খানজি তৃতীয় আর সেখানকার সকল প্রজাই ছিলেন হিন্দু। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখে জুনাগড়ের নবাব এই ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে পাকিস্তানের সঙ্গে জুনাগড়কে যুক্ত করার সম্মতি জানায়। এর ফলে ভারত একে তিন দিক থেকে ঘিরে সমস্ত বাণিজ্যপথ বন্ধ করে দেয় যার ফলে জুনাগড়ে চরম সঙ্কট দেখা দেয়। নবাব মহম্মদ মহবত করাচি পালিয়ে যান এই পরিস্থিতিতে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নির্দেশে পাকিস্তানকে এই চুক্তি বাতিল করে জুনাগড়ে গণভোট করানোর দিন নির্ধারিত করে দেওয়া হয়। বল্লভভাই প্যাটেলের বক্তব্য ছিল দেশীয় রাজ্যের শাসকের বদলে সেখানকার মানুষরা গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে যে তারা কোন দেশের সঙ্গে যুক্ত হবে। পাকিস্তানের সরকার এই প্রস্তাবে অসম্মত হলে ভারতের সৈন্য বলপূর্বক জুনাগড়ের দখল নেয় এবং সেখানে গণভোট করায়। সাংবিধানিকভাবে গণভোটের রায়ে জুনাগড় ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

মনে রাখতে হবে, কাশ্মীরের সঙ্গে ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন চুক্তির ধারাবাহিকতা ক্রমেই রূপ দিয়েছে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার। ১৯৪৭ সালের ১৭ অক্টোবর এই সাংবিধানিক ধারার মাধ্যমে কাশ্মীরকে ভারতের সংবিধানের আওতামুক্ত রাখা হয়। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ এই তিনটি বিষয়ে কেবল জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের উপর নির্ভরশীল। এই ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন ক্রমে বিতর্ক বাড়িয়েছে, ৩৭০ ধারা প্রবর্তন কাশ্মীরের অবস্থা আরো সঙ্গীণ করে তুলেছিল।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

4 Comments

4 Comments

  1. Pingback: জুনাগড় সংযুক্তিকরণ | সববাংলায়

  2. Pingback: গোয়া সংযুক্তিকরণ | সববাংলায়

  3. Pingback: দেশীয় রাজ্যগুলির সংযুক্তিকরণ | সববাংলায়

  4. Pingback: হায়দ্রাবাদ সংযুক্তিকরণ | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়